গ্রামের নাম শান্তিপুর। নামের সাথে জায়গাটার একটা মিলও ছিল বটে—নদীর ধারে সবুজ মাঠ, দুপুরবেলার নিস্তব্ধতা, সন্ধ্যায় আজানের ধ্বনি বাতাসে মিশে যাওয়া। এই গ্রামেই, একটা টিনের চালার বাড়িতে, বেড়ে উঠেছিল আব্দুল্লাহ। বাবা করিম মিয়া ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক, সারাদিন মাঠে খেটে যা আয় করতেন, তা দিয়েই সংসার চালাতেন। মা রহিমা বেগম ঘরের কাজ সামলাতেন, আর মাঝে মাঝে পাশের বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করে কিছু বাড়তি টাকা রোজগার করতেন। এই দুজনের কষ্টের ফসল ছিল একটাই সন্তান—আব্দুল্লাহ।
ছোটবেলা থেকেই আব্দুল্লাহর স্বভাব ছিল অন্যরকম। যেখানে অন্য বাচ্চারা খেলনার জন্য কাঁদত, মারামারি করত, সেখানে আব্দুল্লাহ নিজের জিনিস অন্যকে দিয়ে দিতে ভালোবাসত। একবার ঈদের দিন নতুন জামা পরে বের হয়েছিল, পথে দেখল পাশের বাড়ির ছেলেটার গায়ে ছেঁড়া জামা। কোনো দ্বিধা ছাড়াই নিজের নতুন জামাটা খুলে তাকে দিয়ে দিয়েছিল। বাড়ি ফিরে মা যখন জিজ্ঞেস করলেন, "তোর জামা কোথায়?", আব্দুল্লাহ শুধু হেসে বলেছিল, "ওর তো ছিল না মা, আমার তো আরেকটা আছে।"
করিম মিয়া এই কথা শুনে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। মনে মনে গর্বিত হয়েছিলেন, কিন্তু একটা চাপা দুশ্চিন্তাও তাঁর মনে উঁকি দিয়েছিল। তিনি জানতেন, এই দুনিয়া বড় নিষ্ঠুর জায়গা। এখানে সরলতার দাম দেওয়া হয় না, বরং সরলতাকে দুর্বলতা ভেবে মানুষ সুযোগ নেয়। কিন্তু ছেলের সেই নিষ্পাপ হাসি দেখে তিনি আর কিছু বলতে পারেননি।
সময় গড়িয়ে গেল। আব্দুল্লাহ বড় হতে লাগল। স্কুলে ভর্তি হলো, তারপর কলেজে। পড়াশোনায় খুব একটা মেধাবী না হলেও, মানুষ হিসেবে তার সুনাম ছিল পুরো এলাকায়। "আব্দুল্লাহর মতো ভালো ছেলে হয় না"—এই কথাটা প্রায় সবার মুখেই শোনা যেত। কিন্তু এই সুনামের পেছনে লুকিয়ে ছিল একটা বিপদ, যা আব্দুল্লাহ নিজে কখনো বুঝতে পারেনি।
কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আব্দুল্লাহর জীবনে নতুন কিছু মানুষের আগমন ঘটল। শহরের কলেজ, নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধু। রাকিব, সোহেল, তানভীর—এই তিনজন খুব দ্রুতই আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠল। প্রথম প্রথম আব্দুল্লাহ খুব খুশি ছিল। গ্রাম থেকে শহরে এসে একা একা লাগত তার, এই বন্ধুরা যেন তার একাকীত্ব দূর করে দিল। তারা একসাথে ক্লাসে বসত, টিফিনের সময় গল্প করত, ছুটির দিনে ঘুরতে যেত।
কিন্তু ধীরে ধীরে একটা প্যাটার্ন দেখা দিতে লাগল, যা আব্দুল্লাহ কখনো লক্ষ্য করেনি। যখনই তারা কোথাও খেতে যেত, বিল দেওয়ার সময় হঠাৎ করেই রাকিবের মানিব্যাগ "বাসায় ফেলে আসা" হয়ে যেত। সোহেলের হঠাৎ মনে পড়ত যে তার এই মাসের হাত খরচ শেষ। তানভীর তো সরাসরিই বলে দিত, "দোস্ত, তুই দিয়ে দে, পরে শোধ করে দেব।" আব্দুল্লাহ কখনো এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলত না। বাবার দেওয়া টাকা থেকে সে বন্ধুদের জন্য খরচ করত, নিজের জন্য নয়।
একদিন কলেজের মাঠে বসে সোহেল হঠাৎ বলল, "আব্দুল্লাহ, তোর মতো বন্ধু পাওয়া আমাদের সৌভাগ্য রে। তুই না থাকলে আমাদের কী হতো!" আব্দুল্লাহ লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলল। তার মনে হলো, এই বন্ধুত্বই বুঝি সত্যিকারের বন্ধুত্ব। সে জানত না যে এই প্রশংসার পেছনে লুকিয়ে ছিল একটা হিসাব-নিকাশ, যা তার সরল মন কখনো ধরতে পারেনি।
করিম মিয়া প্রতি মাসে ছেলের হাতে যে টাকা তুলে দিতেন, তা আসত অনেক কষ্টের বিনিময়ে। ভোর চারটায় উঠে মাঠে যাওয়া, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে সারাদিন খাটা, তারপর সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরা—এই ছিল করিম মিয়ার দৈনন্দিন জীবন। কোনো কোনো মাসে ফসল ভালো হতো না, তখন ধারদেনা করে হলেও ছেলের খরচ পাঠাতেন তিনি। মা রহিমা বেগম নিজের গয়না বিক্রি করে দিয়েছিলেন ছেলের কলেজের ভর্তির সময়। কিন্তু এসব কথা তারা কখনো ছেলেকে বলতেন না। ফোনে জিজ্ঞেস করলে সবসময় বলতেন, "আমরা ভালো আছি বাবা, তুই পড়াশোনায় মন দে।"
আব্দুল্লাহ জানত বাবা-মায়ের কষ্টের কথা। কিন্তু হয়তো বয়সের কারণে, হয়তো সরল স্বভাবের কারণে, সে কখনো ভাবেনি যে এই টাকা কীভাবে খরচ হচ্ছে, কার জন্য খরচ হচ্ছে। তার কাছে বন্ধুদের হাসিমুখ, তাদের সাথে আড্ডা, তাদের প্রশংসা—এসবই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। নিজের জন্য সে কখনো নতুন জামা কিনত না, দামি জুতা কিনত না, এমনকি মাসের পর মাস একই সাইকেল দিয়ে কলেজে যাতায়াত করত। কিন্তু বন্ধুদের জন্মদিনে দামি উপহার কিনতে তার হাত কাঁপত না।
দ্বিতীয় বর্ষে উঠে আব্দুল্লাহর পরিচয় হলো নতুন একজনের সাথে—ফারহানা। কলেজেরই মেয়ে, পড়ালেখায় ভালো, স্বভাবে চঞ্চল। প্রথম দেখাতেই আব্দুল্লাহর মনে একটা আলাদা অনুভূতি জেগেছিল, যদিও সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারেনি সেটা কী। ফারহানার সাথে তার বন্ধুত্ব গড়ে উঠল লাইব্রেরিতে বই আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে। ফারহানা ছিল আব্দুল্লাহর বন্ধুদের চেয়ে আলাদা—সে কখনো আব্দুল্লাহর কাছে টাকা চাইত না, বরং মাঝে মাঝে নিজেই আব্দুল্লাহকে চা খাওয়াত।
একদিন লাইব্রেরির সামনে বসে ফারহানা হঠাৎ বলল, "আব্দুল্লাহ, একটা কথা বলি? তুই কিছু মনে করবি না তো?" আব্দুল্লাহ কৌতূহলী হয়ে বলল, "না না, বল।" "তুই সবার জন্য এত খরচ করিস কেন? রাকিব, সোহেল, তানভীর—ওরা তো কখনো তোকে কিছু দেয় না। শুধু নেয়।" আব্দুল্লাহ হেসে উড়িয়ে দিল কথাটা, "আরে না, ওরা তো আমার বন্ধু। বন্ধুর জন্য এটুকু করাই যায়।" ফারহানা আর কিছু বলল না, কিন্তু তার চোখে-মুখে একটা দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট ছিল।
এই ঘটনার কয়েকদিন পরই একটা ঘটনা ঘটল, যা আব্দুল্লাহর মনে সামান্য হলেও একটা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানের জন্য টাকা তোলা হচ্ছিল। প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা দিতে হতো। রাকিব এসে বলল, "দোস্ত, আমার কাছে টাকা নাই, তুই আমারটাও দিয়ে দে।" আব্দুল্লাহ কোনো প্রশ্ন না করেই দিয়ে দিল। কিন্তু ঠিক তখনই দূর থেকে সে দেখল, রাকিব তার নতুন কেনা দামি মোবাইল ফোন নিয়ে বন্ধুদের সাথে দেখাচ্ছে, গর্ব করে বলছে কত দাম দিয়ে কিনেছে। আব্দুল্লাহর মনে একটা খচখচে অনুভূতি হলো, কিন্তু পরক্ষণেই সে ভাবল, "হয়তো ওর অন্য কোনো কারণ আছে, হয়তো ফোনটা কেউ উপহার দিয়েছে।" নিজের মনকেই সে প্রবোধ দিল।
এভাবেই দিন গড়াতে লাগল। আব্দুল্লাহর সরলতা যেন দিন দিন বন্ধুদের কাছে একটা সুযোগে পরিণত হচ্ছিল। কেউ বই কেনার নাম করে টাকা নিত, কেউ বাড়িতে সমস্যার কথা বলে ধার নিত, আর সেই ধার আর কখনো শোধ হতো না। আব্দুল্লাহ কখনো তাগাদা দিত না, কারণ তার মনে হতো টাকার জন্য বন্ধুত্ব নষ্ট করা ঠিক না। সে ভুলেই যেত এসব ধারের কথা, অথবা মনে করেও এড়িয়ে যেত।
করিম মিয়া একবার শহরে এসেছিলেন ছেলেকে দেখতে। ছেলের মেসে থেকে একরাত কাটালেন। রাতে খাবার টেবিলে বসে করিম মিয়া লক্ষ্য করলেন, ছেলের কাছে টাকা প্রায় শেষ, অথচ মাস শেষ হতে তখনো দশ দিন বাকি। জিজ্ঞেস করলেন, "বাবা, টাকা তো এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল?" আব্দুল্লাহ একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, "না বাবা, এমনিই... কিছু বই কিনতে হয়েছিল, আর বন্ধুদের সাথে একটু ঘোরাঘুরি করলাম।" করিম মিয়া কিছু বললেন না, কিন্তু তাঁর মনে একটা চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। পরদিন সকালে বিদায় নেওয়ার সময় তিনি ছেলের হাতে আরো কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বললেন, "সাবধানে খরচ করিস বাবা। টাকা রোজগার করা সহজ না।"
আব্দুল্লাহ বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখল, সেই চোখে একটা ক্লান্তি জমে আছে, কিন্তু ভালোবাসার কমতি নেই। বাবা চলে যাওয়ার পর আব্দুল্লাহর মনে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো—অপরাধবোধের মতো কিছু একটা। কিন্তু সেই অনুভূতি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। বিকেলেই রাকিব এসে বলল, "চল দোস্ত, নতুন একটা রেস্টুরেন্ট খুলেছে, খেয়ে আসি।" আব্দুল্লাহ আবারও রাজি হয়ে গেল।
সময় যতই এগোতে লাগল, আব্দুল্লাহর জীবনে একটা অদ্ভুত দ্বৈততা তৈরি হতে লাগল। একদিকে বাবা-মায়ের কষ্টের টাকা, অন্যদিকে বন্ধুদের চাহিদা মেটানোর তাগিদ। সে নিজের জন্য কখনো কিছু চাইত না, কিন্তু বন্ধুদের জন্য সব দিতে প্রস্তুত থাকত। এই স্বভাবের পেছনে হয়তো ছিল একটা গভীর কারণ—ছোটবেলা থেকে একা বেড়ে ওঠা, ভাইবোনহীন জীবন, সবসময় সঙ্গীর অভাব অনুভব করা। বন্ধুদের সান্নিধ্য তার কাছে ছিল পরিবারের মতোই মূল্যবান, আর সেই মূল্যবান জিনিসকে হারানোর ভয়ে সে কখনো "না" বলতে শিখেনি।
ফারহানা মাঝে মাঝে আব্দুল্লাহকে বোঝানোর চেষ্টা করত। একদিন ক্যাম্পাসের বকুল গাছের নিচে বসে সে বলল, "আব্দুল্লাহ, তুই কি জানিস, প্রকৃত বন্ধু কাকে বলে? যে তোর ভালো সময়ে না, খারাপ সময়ে পাশে থাকে। তুই কখনো পরীক্ষা করে দেখেছিস, তোর হাতে টাকা না থাকলে এই বন্ধুরা তোর পাশে থাকবে কিনা?" আব্দুল্লাহ একটু চুপ থেকে বলল, "কেন এমন কথা বলছিস? ওরা তো আমার অনেক ভালো বন্ধু।" ফারহানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আমি শুধু চাই তুই একটু সাবধান হোস। সবাই তোর মতো সহজ-সরল না।"
এই কথাগুলো আব্দুল্লাহর মনে দাগ কাটলেও, সে বিশ্বাস করতে চাইত না যে তার প্রিয় বন্ধুরা তাকে ঠকাচ্ছে। মানুষ যখন কাউকে ভালোবাসে বা বিশ্বাস করে, তখন সত্যিটা দেখতে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আব্দুল্লাহও ঠিক তেমনই এক অবস্থায় ছিল। তার চোখের সামনে সত্য থাকলেও, সে সেটা দেখতে পাচ্ছিল না, কারণ দেখার ইচ্ছা তার মধ্যে তৈরি হয়নি।
দ্বিতীয় বর্ষ শেষ হতে চলল। পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এলো। এই সময়টায় আব্দুল্লাহর বন্ধুরা—রাকিব, সোহেল, তানভীর—হঠাৎ করেই যেন ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজেদের পড়াশোনা নিয়ে। আড্ডা কমে গেল, একসাথে বসে খাওয়ার পরিমাণও কমে গেল। আব্দুল্লাহ ভাবল, হয়তো পরীক্ষার চাপে সবাই ব্যস্ত। কিন্তু পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরও যখন এই দূরত্ব কমল না, তখন আব্দুল্লাহর মনে প্রথমবারের মতো একটা প্রশ্ন উঁকি দিল—কিছু কি বদলে গেছে?
উত্তরটা সে খুঁজে পেল আরো কিছুদিন পর, একটা ঘটনার মধ্য দিয়ে, যা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার শুরু ছিল মাত্র। কিন্তু সেই ঘটনার আগে, আব্দুল্লাহকে আরো কিছু পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল—নিজের বিশ্বাসের পরীক্ষা, নিজের ভালোবাসার পরীক্ষা, আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজেকে চেনার পরীক্ষা।
গ্রামে তখন বর্ষাকাল। করিম মিয়ার জমিতে এবার ফসল ভালো হয়নি, বৃষ্টির অভাবে ধানের চারা শুকিয়ে যাচ্ছিল। ঘরে টানাটানি শুরু হয়েছিল, কিন্তু তবুও প্রতি মাসে ছেলের জন্য টাকা পাঠানো বন্ধ করেননি করিম মিয়া। রহিমা বেগম নিজের খাওয়া কমিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে ছেলের কোনো কষ্ট না হয়। এসব খবর আব্দুল্লাহর কাছে পৌঁছাত না, কারণ বাবা-মা কখনো তাকে বুঝতে দিতেন না তাদের কষ্টের কথা।
শহরের ঝলমলে জীবনে ডুবে থাকা আব্দুল্লাহ জানত না, তার প্রতিটা টাকা খরচের পেছনে লুকিয়ে আছে তার মায়ের না খাওয়া একটা বেলার গল্প, তার বাবার রোদে পোড়া একটা দিনের ঘাম। এই সত্যটা তার সামনে আসতে চলেছিল খুব শীঘ্রই, এমন একটা মুহূর্তে, যা তাকে চিরদিনের জন্য বদলে দেবে।
তৃতীয় বর্ষে ওঠার পর আব্দুল্লাহর জীবনে একটা নতুন ঘটনা ঘটল, যা তার পুরো জগৎটাকেই নাড়িয়ে দিয়েছিল। ঘটনাটা শুরু হয়েছিল একটা সাধারণ বিকেলে, যখন আব্দুল্লাহ মেসে ফিরে দেখল তার ড্রয়ারে রাখা জমানো টাকা—প্রায় পনেরো হাজার—উধাও। এই টাকাটা সে জমিয়েছিল কয়েক মাস ধরে, বাবার পাঠানো টাকা থেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে, একটা উদ্দেশ্যে। উদ্দেশ্যটা ছিল খুবই সাধারণ, অথচ আব্দুল্লাহর কাছে অসম্ভব মূল্যবান—আসন্ন কোরবানির ঈদে বাবা-মায়ের জন্য কিছু কেনা, বিশেষ করে মায়ের জন্য একটা শাড়ি, যা তিনি বহুদিন ধরে চাইছিলেন কিন্তু কখনো নিজের জন্য কিনতে পারেননি।
টাকাটা হারিয়ে যাওয়ার খবরে আব্দুল্লাহর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। মেসের রুমমেট ছিল তানভীর। প্রথমে আব্দুল্লাহ ভাবল হয়তো নিজেই কোথাও রেখে ভুলে গেছে। সারা রুম তন্নতন্ন করে খুঁজল, কিন্তু টাকা পেল না। তানভীরকে জিজ্ঞেস করতেই সে অস্বাভাবিক রকম নার্ভাস হয়ে গেল। "আমি... আমি জানি না দোস্ত, আমি তো সারাদিন ক্লাসে ছিলাম।" কণ্ঠস্বরে একটা কাঁপুনি ছিল, যা আব্দুল্লাহর সরল চোখেও এড়াল না এবার।
সেই রাতে আব্দুল্লাহ ঘুমাতে পারল না। বারবার মনে পড়তে লাগল মায়ের মুখটা, বাবার ক্লান্ত চোখ দুটো। এত কষ্টের টাকা, এত যত্নে জমানো, হঠাৎ করে হাওয়া হয়ে গেল! পরদিন সকালে ক্লাসে গিয়ে সে দেখল রাকিব একটা নতুন জুতা পরে এসেছে—দামি ব্র্যান্ডের, যা আব্দুল্লাহও কিনতে পারত না নিজের জন্য। জিজ্ঞেস করতেই রাকিব একটু হকচকিয়ে গিয়ে বলল, "আরে, এটা তো অনেকদিন ধরে জমানো টাকায় কেনা।" আব্দুল্লাহ কিছু বলল না, কিন্তু মনের ভেতর একটা সন্দেহের বীজ গেঁথে গেল, যা আগে কখনো হয়নি।
দিন কয়েক পর সত্যিটা বেরিয়ে এলো একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে। ফারহানা একদিন লাইব্রেরিতে বসে পড়াশোনা করছিল, তখন তার কানে এলো পাশের টেবিলে বসা দুই ছেলের কথোপকথন। ওরা ছিল তানভীরের পরিচিত, অন্য বিভাগের ছাত্র। একজন হাসতে হাসতে বলছিল, "শুনেছিস, তানভীর নাকি ওর রুমমেটের টাকা সরিয়ে জুতা কিনে দিয়েছে রাকিবকে? বলেছে ধার নিয়েছে, কিন্তু আসলে তো চুরিই।" অন্যজন হেসে বলল, "ওই ছেলেটা তো এমনিতেই বোকা, ওকে ঠকানো তো জলভাত। আগেও কতবার টাকা মেরে দিয়েছে ওরা, কই ছেলেটা তো কিছুই বুঝে না।"
ফারহানার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো। সে সাথে সাথে বই বন্ধ করে বেরিয়ে পড়ল, আব্দুল্লাহকে খুঁজতে লাগল সারা ক্যাম্পাসে। শেষমেশ তাকে পেল কলেজের পেছনের মাঠে, একা বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ফারহানা তার পাশে বসে, একটু ইতস্তত করে, তারপর সবকিছু খুলে বলল। বলার সময় তার কণ্ঠ কাঁপছিল, কারণ সে জানত এই সত্য আব্দুল্লাহর জন্য কতটা কষ্টের হবে।
আব্দুল্লাহ চুপচাপ শুনল। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না প্রথমে। শুধু তার চোখ দুটো ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠতে লাগল। ফারহানা কথা শেষ করার পর অনেকক্ষণ কেউ কিছু বলল না। শুধু বিকেলের বাতাসে গাছের পাতা নড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। অবশেষে আব্দুল্লাহ ফিসফিস করে বলল, "আমি বিশ্বাস করতে পারছি না... তানভীর... ও তো আমার এত কাছের বন্ধু..."
সেই সন্ধ্যায় আব্দুল্লাহ মেসে ফিরে সরাসরি তানভীরের মুখোমুখি হলো। প্রথমে তানভীর অস্বীকার করার চেষ্টা করল, কিন্তু আব্দুল্লাহর দৃঢ়তার সামনে বেশিক্ষণ টিকতে পারল না। শেষমেশ স্বীকার করল সবকিছু। "দোস্ত, আমার আসলে টাকার খুব দরকার ছিল। রাকিব বলল ওর জুতা লাগবে, আমার কাছে টাকা ছিল না, তাই... তাই আমি তোর ড্রয়ার থেকে... আমি ভেবেছিলাম পরে শোধ করে দেব।"
আব্দুল্লাহর গলা ধরে এলো, "তুই আমাকে না বলে কেন করলি এটা? আমি তো তোকে চাইলেই দিতাম, যদি সত্যিই দরকার হতো। কিন্তু তুই চুরি করলি! আমার বাবার কষ্টের টাকা, যা দিয়ে আমি মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনতে চেয়েছিলাম, তুই সেটা দিয়ে জুতা কিনে দিলি রাকিবকে?"
তানভীর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল, কোনো জবাব দিতে পারল না। আব্দুল্লাহ সেই রাতেই তার ব্যাগ গুছিয়ে অন্য একটা মেসে চলে গেল, বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে সাময়িক ব্যবস্থা করে। এই ঘটনা যেন একটা বাঁধ ভেঙে দিল আব্দুল্লাহর মনে। এতদিনের জমে থাকা প্রশ্নগুলো একে একে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে লাগল।
পরের কয়েকদিন আব্দুল্লাহ একা একা থাকতে লাগল, কারো সাথে কথা বলত না। সে ভাবতে লাগল অতীতের সেইসব দিনের কথা—কতবার রাকিব টাকা ধার নিয়ে ফেরত দেয়নি, কতবার সোহেল অজুহাত দিয়ে বিল দেওয়া এড়িয়ে গেছে, কতবার তানভীর ছোটখাটো জিনিস "ভুলে" নিয়ে গেছে আর ফেরত দেয়নি। একটার পর একটা স্মৃতি যেন নতুন আলোয় ধরা দিতে লাগল তার কাছে। আগে যেগুলো সে নিছক দুর্ঘটনা বা ভুল বোঝাবুঝি ভেবে এড়িয়ে গিয়েছিল, এখন সেগুলোর প্রকৃত রূপ স্পষ্ট হতে লাগল।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেল যখন খবর পেল, রাকিব এবং সোহেল দুজনেই তানভীরের এই কাজের কথা আগে থেকেই জানত, এবং তারাও এভাবেই বিভিন্ন সময়ে আব্দুল্লাহর সরলতার সুযোগ নিয়েছে। এই তিনজন মিলে যেন একটা অলিখিত চুক্তি করে নিয়েছিল—আব্দুল্লাহকে ব্যবহার করার চুক্তি। আব্দুল্লাহর মনে হলো, তার এতদিনের বন্ধুত্ব, তার এতদিনের বিশ্বাস, সবকিছু যেন একটা ভাঙা কাঁচের মতো চুরমার হয়ে গেল।
এই সময়টায় ফারহানা তার পাশে ছিল সবসময়। কোনো বড় কথা বলত না, শুধু পাশে থাকত। একদিন বিকেলে ক্যাম্পাসের বকুল গাছের নিচে বসে ফারহানা বলল, "আব্দুল্লাহ, তুই খারাপ কিছু করিসনি। তোর সমস্যা এটা না যে তুই মানুষকে বিশ্বাস করিস, সমস্যা হলো তুই কখনো নিজেকে যাচাই করার সুযোগ দিসনি। ভালো মানুষ হওয়া আর বোকা হওয়া এক জিনিস না।"
আব্দুল্লাহ মাথা নিচু করে বলল, "তাহলে আমি এখন কী করব? আমি তো মানুষকে বিশ্বাস না করে থাকতেই পারি না।" ফারহানা মৃদু হেসে বলল, "বিশ্বাস করা বন্ধ করতে হবে না। শুধু চোখ খোলা রাখতে হবে। ভালোবাসা আর বিশ্বাসের সাথে একটু বিচক্ষণতা মিশিয়ে নিতে হবে, এই যা।"
এই কথাগুলো আব্দুল্লাহর মনে গেঁথে গেল। সে বুঝতে পারল, তার জীবনে একটা পরিবর্তনের প্রয়োজন। কিন্তু পরিবর্তন আনা মানে তো তার মূল স্বভাব বদলে ফেলা নয়, বরং সেই স্বভাবকে একটু গুছিয়ে নেওয়া, একটু সতর্ক করে তোলা।
এই ঘটনার সপ্তাহখানেক পর, গ্রাম থেকে একটা খবর এলো, যা আব্দুল্লাহকে আরো গভীরভাবে নাড়িয়ে দিল। পাশের বাড়ির চাচা ফোন করে জানালেন যে করিম মিয়া কয়েকদিন ধরে অসুস্থ, জ্বরে ভুগছেন, কিন্তু ছেলেকে চিন্তিত করতে চাননি বলে জানাননি। আব্দুল্লাহ তখনই ছুটে গেল গ্রামে। বাড়িতে পৌঁছে দেখল বাবা শুয়ে আছেন, শরীর শুকিয়ে গেছে, মুখটা কেমন যেন মলিন।
মায়ের কাছ থেকে জানতে পারল, এবারের ফসল খারাপ হওয়ায় সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল। তার ওপর ছেলের খরচ চালাতে গিয়ে বাবা নিজের শরীরের যত্ন নেননি, ঠিকমতো খাননি অনেকদিন। রহিমা বেগম বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন, "তোর বাবা তোকে কখনো বুঝতে দেননি বাবা, কিন্তু আমরা অনেক কষ্টে আছি। তবু তোর কোনো কষ্ট যেন না হয়, এই চিন্তায় তিনি নিজের খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন।"
আব্দুল্লাহর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে বাবার পাশে বসে তার হাত ধরল। করিম মিয়া চোখ খুলে ছেলেকে দেখে ম্লান হাসলেন, "কেন এলি বাবা, পরীক্ষার সময় না? আমি তো ঠিকই আছি।" আব্দুল্লাহর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল, "বাবা, আমি অনেক বড় ভুল করেছি। আমি বুঝতে পারিনি তোমাদের কষ্টের কথা। আমি টাকাগুলো এমন মানুষদের জন্য খরচ করেছি, যারা আমাকে কখনো ভালোবাসেইনি, শুধু ব্যবহার করেছে।"
করিম মিয়া দুর্বল হাতে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, "বাবা, ভুল হওয়া মানুষেরই স্বভাব। তুই ভালো মনের মানুষ, এটা কখনো খারাপ কিছু না। কিন্তু ভালো মানুষ হওয়ার সাথে সাথে চোখ-কান খোলা রাখতে হয়, বুঝলি? এটাই শিখলি এখন, এটাই অনেক।"
এই মুহূর্তটা আব্দুল্লাহর জীবনে একটা মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মুহূর্ত হয়ে রইল। বাবার অসুস্থ শরীর, মায়ের ক্লান্ত চোখ, আর নিজের ভুলের উপলব্ধি—সবকিছু মিলিয়ে আব্দুল্লাহ যেন একরাতেই অনেকটা বড় হয়ে গেল। সে সিদ্ধান্ত নিল, এখন থেকে সে বদলাবে। বন্ধুত্বের মানে বুঝবে নতুন করে, টাকার মূল্য বুঝবে নতুন করে, আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের বাবা-মায়ের কষ্টের মূল্য দেবে যথাযথভাবে।
গ্রামে কয়েকদিন থেকে বাবার সেবাযত্ন করে, তাকে সুস্থ করে তুলে আব্দুল্লাহ আবার শহরে ফিরল। কিন্তু এবার সে ফিরল অন্য একজন মানুষ হয়ে। তার চোখে আগের সেই সারল্য ছিল, কিন্তু সেই সাথে যোগ হয়েছিল একটা নতুন দৃঢ়তা, একটা নতুন বিচক্ষণতা। রাকিব আর সোহেল যখন তার সাথে আগের মতো ব্যবহার করার চেষ্টা করল, আব্দুল্লাহ এবার স্পষ্ট ভাষায় তাদের বুঝিয়ে দিল যে সে আর আগের মতো সবকিছু বিনা প্রশ্নে মেনে নেবে না।
এই পরিবর্তন সহজ ছিল না। রাকিব আর সোহেল প্রথমে অবাক হলো, তারপর রাগান্বিত হলো, এবং শেষমেশ ধীরে ধীরে আব্দুল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরে গেল। এই দূরত্ব আব্দুল্লাহকে প্রথমে কষ্ট দিলেও, সে বুঝতে পারল—এই সম্পর্কগুলো কখনো প্রকৃত বন্ধুত্বই ছিল না। প্রকৃত বন্ধুত্ব তো টিকে থাকে ভালোবাসায়, স্বার্থে নয়।
তৃতীয় বর্ষের বাকি সময়টা আব্দুল্লাহর জীবনে এক অন্যরকম অধ্যায় হয়ে রইল। বাবার অসুস্থতার পর থেকে তার ভেতরে যে পরিবর্তন এসেছিল, সেটা ধীরে ধীরে তার প্রতিটা সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হতে লাগল। সে এখনো আগের মতোই মানুষের প্রতি সদয়, এখনো আগের মতোই সাহায্যপ্রবণ, কিন্তু এখন তার সেই সদয়তার সাথে যোগ হয়েছে একটা সতর্ক দৃষ্টি, যা আগে কখনো ছিল না।
প্রথম যে কাজটা সে করল, তা হলো নিজের খরচের একটা হিসাব রাখা শুরু করা। একটা ছোট্ট খাতা কিনে সে প্রতিদিনের আয়-ব্যয় লিখে রাখতে শুরু করল। এই অভ্যাসটা শুরুতে তার কাছে অদ্ভুত লাগছিল, কারণ এতদিন সে কখনো টাকার হিসাব রাখেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারল, এই ছোট্ট অভ্যাসটা তাকে অনেক কিছু শেখাচ্ছে—কোথায় তার টাকা যাচ্ছে, কার জন্য যাচ্ছে, আর সেই খরচগুলো আদৌ প্রয়োজনীয় কিনা।
মেসে নতুন যে রুমে সে উঠেছিল, সেখানে তার সাথে থাকত ইমরান নামের একটা ছেলে। ইমরান ছিল শান্ত স্বভাবের, পড়াশোনায় মনোযোগী, আর সবচেয়ে বড় কথা, তার নিজস্ব একটা আত্মমর্যাদাবোধ ছিল। সে কখনো কারো কাছে অকারণে সাহায্য চাইত না, আবার নিজেও কাউকে বিনা প্রয়োজনে সাহায্য করার নামে আত্মপ্রচার করত না। ধীরে ধীরে আব্দুল্লাহর সাথে ইমরানের একটা সহজ, নির্ভেজাল বন্ধুত্ব গড়ে উঠল।
একদিন সন্ধ্যায় দুজনে মিলে চা খেতে খেতে ইমরান বলল, "তুই জানিস আব্দুল্লাহ, আমার বাবাও কৃষক ছিলেন। ছোটবেলায় দেখেছি বাবা কীভাবে মাঠে খেটে আমাদের পড়াশোনার খরচ চালাতেন। সেই থেকে আমি শিখেছি, টাকার প্রতিটা টাকার পেছনে কারো না কারো ঘাম মিশে থাকে। তাই আমি কখনো কারো টাকা অযথা নষ্ট করতে চাই না, নিজেরটাও না, অন্যেরটাও না।"
এই কথাগুলো আব্দুল্লাহর হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে গেল। সে বুঝতে পারল, প্রকৃত বন্ধুত্ব মানে একে অপরকে বোঝা, একে অপরের কষ্টের মূল্য দেওয়া, শুধু টাকা-পয়সার আদান-প্রদান নয়। ইমরানের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের—এখানে কোনো হিসাব ছিল না, কোনো প্রত্যাশা ছিল না, শুধু ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা।
এই সময়ে ফারহানার সাথেও আব্দুল্লাহর সম্পর্ক আরো গভীর হতে লাগল। বন্ধুত্ব থেকে ধীরে ধীরে সেটা একটা বিশেষ অনুভূতিতে রূপ নিতে লাগল, যদিও দুজনের কেউই প্রথমে সেটা প্রকাশ করার সাহস পাচ্ছিল না। ফারহানা ছিল আব্দুল্লাহর জীবনের সেই মানুষ, যে তাকে কখনো তার সরলতার জন্য বিচার করেনি, বরং সেই সরলতাকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছে, আর একই সাথে তাকে বাস্তবতা বোঝাতে সাহায্য করেছে।
একদিন লাইব্রেরির বাইরে বসে ফারহানা বলল, "আব্দুল্লাহ, তুই কি লক্ষ্য করেছিস, তুই কতটা বদলেছিস গত কয়েক মাসে?" আব্দুল্লাহ একটু হেসে বলল, "হ্যাঁ, তবে আমি ভয় পাই, যদি আমি বদলাতে বদলাতে নিজের সেই ভালো দিকগুলোই হারিয়ে ফেলি।" ফারহানা মাথা নেড়ে বলল, "না, তুই তোর ভালো দিক হারাসনি, তুই শুধু নিজেকে রক্ষা করতে শিখেছিস। এটা তো আরো ভালো, তাই না? একজন মানুষ যখন নিজেকে ভালোবাসতে শেখে, তখনই সে অন্যকে সঠিকভাবে ভালোবাসতে পারে।"
এই কথাগুলো যেন আব্দুল্লাহর জীবনের একটা মূলমন্ত্র হয়ে উঠল। সে বুঝল, নিজেকে অবহেলা করে অন্যকে সব দিয়ে দেওয়াটা ভালোবাসা নয়, বরং এটা এক ধরনের আত্মবিনাশ। প্রকৃত ভালোবাসা এবং উদারতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সাথে থাকে বিচক্ষণতা আর আত্মমর্যাদাবোধ।
এদিকে গ্রামে করিম মিয়া ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিলেন। আব্দুল্লাহ প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে ফোন করত, শুধু কুশল জিজ্ঞাসা করার জন্য নয়, বরং সত্যিকার অর্থে বাবা-মায়ের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য। সে এখন জিজ্ঞেস করত, "বাবা, তোমার শরীর কেমন? ঠিকমতো খাচ্ছ তো? মা, তোমার ওষুধ শেষ হয়ে যায়নি তো?" এই প্রশ্নগুলো আগে কখনো তার মাথায় আসত না, কারণ সে ভাবত বাবা-মা সবসময় ভালো আছেন, তাদের কোনো সমস্যা নেই।
একদিন ফোনে করিম মিয়া বললেন, "বাবা, এবার ঈদে বাড়ি আসবি তো?" আব্দুল্লাহ বলল, "অবশ্যই বাবা, আর এবার আমি নিজের জমানো টাকা দিয়ে মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনব, যেটা গতবার কিনতে পারিনি।" ফোনের ওপাশ থেকে করিম মিয়ার কণ্ঠে একটা তৃপ্তির সুর শোনা গেল, "তোর মা খুব খুশি হবে বাবা। কিন্তু শোন, নিজের জন্যও কিছু কিনিস। তুইও তো আমাদের সন্তান, তোরও তো ভালো থাকার অধিকার আছে।"
এই কথাটা আব্দুল্লাহকে অবাক করে দিল। এতদিন সে নিজের জন্য কিছু কেনার কথা ভাবতেই পারত না, মনে হতো নিজের জন্য খরচ করা মানে যেন স্বার্থপরতা। কিন্তু বাবার কথায় সে বুঝল, নিজের যত্ন নেওয়া আর স্বার্থপরতা এক জিনিস নয়। একজন মানুষ যদি নিজের প্রতি যত্নশীল না হয়, তাহলে সে দীর্ঘমেয়াদে অন্যদের প্রতিও যত্নশীল থাকতে পারে না।
সেমিস্টারের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আব্দুল্লাহ একটা সিদ্ধান্ত নিল—সে খণ্ডকালীন একটা কাজ খুঁজবে। এতদিন সে শুধু বাবার পাঠানো টাকার ওপর নির্ভরশীল ছিল, কিন্তু এখন তার মনে হলো, নিজের কিছু আয় থাকলে বাবার ওপর চাপ কমবে, আর সেই সাথে সে নিজের টাকার মূল্যও বুঝতে পারবে আরো গভীরভাবে। ইমরানের সাহায্যে সে একটা কোচিং সেন্টারে খণ্ডকালীন শিক্ষকতার কাজ পেল, যেখানে সে ছোট ছোট বাচ্চাদের অঙ্ক আর ইংরেজি পড়াত।
প্রথম মাসের বেতন হাতে পাওয়ার দিনটা আব্দুল্লাহর জীবনের একটা স্মরণীয় দিন হয়ে রইল। মাত্র তিন হাজার টাকা, কিন্তু এই টাকাটার মূল্য তার কাছে ছিল অন্যরকম, কারণ এটা তার নিজের পরিশ্রমের ফসল। সেই টাকা হাতে নিয়ে সে বুঝতে পারল, বাবা প্রতি মাসে যে টাকা পাঠাতেন, তার পেছনে কতটা কষ্ট, কতটা পরিশ্রম লুকিয়ে থাকত। এই উপলব্ধি তাকে আরো বিনয়ী, আরো দায়িত্বশীল করে তুলল।
সময়ের সাথে সাথে আব্দুল্লাহর জীবনে একটা ভারসাম্য তৈরি হতে লাগল। সে এখনো মানুষকে সাহায্য করত, কিন্তু এখন সেই সাহায্য হতো বিবেচনা করে, নিজের সামর্থ্য বুঝে। কেউ যদি সত্যিকার অর্থে বিপদে পড়ত, সে ঠিকই এগিয়ে আসত, কিন্তু যদি কেউ শুধু সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করত, সে এখন সেটা বুঝতে পারত এবং প্রয়োজনে "না" বলতে শিখেছিল।
একদিন ক্যাম্পাসে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ রাকিবের সাথে দেখা হয়ে গেল। রাকিব কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে এগিয়ে এসে বলল, "আব্দুল্লাহ, কেমন আছিস? অনেকদিন কথা হয় না।" আব্দুল্লাহ শান্ত কণ্ঠে বলল, "ভালো আছি রাকিব। তুই কেমন আছিস?" রাকিব একটু ইতস্তত করে বলল, "আসলে আমার একটু টাকার দরকার ছিল, যদি তুই..." আব্দুল্লাহ মৃদু হেসে মাথা নাড়ল, "রাকিব, আমি তোকে সাহায্য করতে পারি, যদি তুই আমাকে খুলে বলিস আসলে কী সমস্যা। কিন্তু শুধু চাওয়ার কারণে টাকা দিয়ে দেওয়াটা আমি আর করি না। এটা আমার নিজের প্রতি, আর আমার বাবা-মায়ের কষ্টের প্রতি একটা দায়িত্ব।"
রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আর কিছু না বলে চলে গেল। আব্দুল্লাহর মনে কোনো রাগ বা ঘৃণা ছিল না তার প্রতি, শুধু একটা পরিষ্কার বোধ ছিল—সে এখন জানে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হয়, একই সাথে মানুষের প্রতি সদয় থাকতে হয়।
গ্রীষ্মের ছুটিতে আব্দুল্লাহ বাড়ি ফিরল, নিজের জমানো টাকা আর কোচিং সেন্টারের বেতন থেকে বাঁচানো টাকা নিয়ে। বাজারে গিয়ে মায়ের জন্য একটা সুন্দর শাড়ি কিনল, বাবার জন্য একটা নতুন লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি কিনল। আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের জন্যও একটা সাধারণ শার্ট কিনল, যা এতদিন সে কখনো করেনি।
বাড়িতে পৌঁছে যখন মায়ের হাতে শাড়িটা তুলে দিল, রহিমা বেগমের চোখ ছলছল করে উঠল। "তুই এত টাকা কোথায় পেলি বাবা?" আব্দুল্লাহ হেসে বলল, "মা, আমি একটা কোচিং সেন্টারে পড়াই এখন। নিজের রোজগারের টাকায় কিনেছি এটা।" করিম মিয়া পাশে দাঁড়িয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তার চোখে-মুখে একটা গর্বের ঝিলিক। "আমার ছেলে অনেক বড় হয়ে গেছে," তিনি ফিসফিস করে বললেন, যেন নিজেকেই বলছেন কথাটা।
সেই রাতে উঠোনে বসে, চাঁদের আলোয়, বাবা-ছেলে অনেকক্ষণ কথা বললেন। আব্দুল্লাহ বাবাকে খুলে বলল তার জীবনের সেই কঠিন সময়টার কথা—বন্ধুদের বিশ্বাসঘাতকতা, নিজের ভুল বোঝার কষ্ট, আর তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার গল্প। করিম মিয়া মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন, মাঝে মাঝে মাথা নাড়লেন, আর শেষে বললেন, "বাবা, জীবনে এমন কিছু শিক্ষা আছে, যা বই পড়ে শেখা যায় না, নিজে ঠেকে শিখতে হয়। তুই সেই শিক্ষাটা পেয়ে গেছিস অল্প বয়সেই। এখন তোর পথ আরো পরিষ্কার হবে।
চতুর্থ বর্ষ শুরু হলো নতুন উদ্যমে। আব্দুল্লাহ এখন আর সেই আগের বিভ্রান্ত ছেলেটি নয়, যে সবাইকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করত। কিন্তু তার মনের সেই মূল সারল্য, সেই ভালোবাসার ক্ষমতা—এসব কিছুই অক্ষত ছিল। শুধু এখন এসবের সাথে যোগ হয়েছিল একটা প্রজ্ঞা, একটা অভিজ্ঞতার আলো, যা তাকে পথ দেখাত।
কোচিং সেন্টারের কাজ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আব্দুল্লাহ এখন নিয়মিত পড়াশোনায়ও মনোযোগী হলো। তার রেজাল্ট আগের চেয়ে ভালো হতে লাগল, কারণ এখন তার মন অনেকটা শান্ত, অনেকটা স্থির। মিথ্যা বন্ধুত্বের বোঝা আর ছিল না তার কাঁধে, বরং ছিল কয়েকজন প্রকৃত মানুষের সঙ্গ—ইমরান, ফারহানা, আর কিছু নতুন পরিচিত মানুষ, যারা তাকে তার প্রকৃত রূপেই ভালোবাসত।
ফারহানার সাথে তার সম্পর্ক এই সময়ে একটা নতুন মোড় নিল। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পর, দুজনে মিলে ক্যাম্পাসের বাইরে একটা ছোট্ট চায়ের দোকানে বসেছিল। আকাশে তখন সন্ধ্যার রং লেগেছে, বাতাসে হালকা শীতের ছোঁয়া। আব্দুল্লাহ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে অবশেষে বলল, "ফারহানা, তুই জানিস, গত দুই বছরে তুই আমার জীবনে যা করেছিস, তার কোনো তুলনা হয় না। তুই আমাকে দেখিয়েছিস, কীভাবে ভালোবাসা আর বিচক্ষণতা একসাথে থাকতে পারে।"
ফারহানা মৃদু হেসে বলল, "আমি তো শুধু তোর পাশে ছিলাম আব্দুল্লাহ। বাকি কাজটা তুই নিজেই করেছিস।" আব্দুল্লাহ একটু ইতস্তত করে বলল, "আমি কি তোকে কিছু বলতে পারি?" ফারহানা তার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করল। "আমি তোকে ভালোবাসি, ফারহানা। শুধু বন্ধু হিসেবে না, তার চেয়েও বেশি কিছু হিসেবে। কিন্তু আমি জানি, আমার এখনো অনেক পথ বাকি—পড়াশোনা শেষ করা, একটা চাকরি জোগাড় করা, নিজের পায়ে দাঁড়ানো। আমি চাই না তোকে এখনই কোনো প্রতিশ্রুতির বোঝা দিতে।"
ফারহানার চোখ ছলছল করে উঠল, কিন্তু ঠোঁটে হাসি লেগে রইল। "আব্দুল্লাহ, আমি সেই দিন থেকেই তোর অপেক্ষায় আছি, যেদিন তুই লাইব্রেরিতে আমাকে প্রথম বই এগিয়ে দিয়েছিলি। আমি অপেক্ষা করতে পারব, যতদিন লাগে।"
এই মুহূর্তটা আব্দুল্লাহর জীবনে একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। তার জীবনে এখন একটা লক্ষ্য ছিল, একটা স্বপ্ন ছিল—নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা, বাবা-মায়ের কষ্ট লাঘব করা, আর ফারহানার সাথে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।
চতুর্থ বর্ষ শেষ হতে হতে আব্দুল্লাহর মধ্যে একটা পরিণত মানুষের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে এখন ছোটখাটো টিউশনি আর কোচিং সেন্টারের কাজ থেকে নিজের হাত খরচ চালাত, বাবার ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়ে এনেছিল। প্রতি মাসে সে কিছু টাকা বাঁচিয়ে বাড়িতে পাঠাতেও শুরু করেছিল, যদিও করিম মিয়া প্রথমে রাজি হননি এই টাকা নিতে। "তোর টাকা তুই রাখ বাবা, আমরা তো ঠিকই চলে যাচ্ছি।" কিন্তু আব্দুল্লাহ জোর করেই বাবাকে বুঝিয়েছিল, "বাবা, তোমরা এতদিন আমার জন্য কষ্ট করেছ, এখন আমার পালা তোমাদের একটু আরাম দেওয়ার।"
স্নাতক শেষ হওয়ার পর আব্দুল্লাহ একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেল, শহরেই। প্রথম বেতনের টাকা হাতে পেয়ে সে সরাসরি চলে গেল বাজারে, বাবা-মায়ের জন্য কিছু কিনতে। কিন্তু এবার তার কেনাকাটার ধরনটা ছিল অন্যরকম—হিসেব করে, প্রয়োজন বুঝে, অপচয় না করে। সে শিখে গিয়েছিল, ভালোবাসা প্রকাশের জন্য অতিরিক্ত খরচ করার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন হলো আন্তরিকতার।
কর্মজীবনে প্রবেশের পর আব্দুল্লাহর জীবনে নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হতে লাগল। অফিসের সহকর্মীদের মধ্যেও এমন কিছু মানুষ ছিল, যারা তার সরল স্বভাবের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করত—কেউ তার কাজের কৃতিত্ব নিজের নামে চালিয়ে দিতে চাইত, কেউ তার কাছ থেকে বিনা কারণে সাহায্য আশা করত। কিন্তু এবার আব্দুল্লাহ জানত কীভাবে এসব পরিস্থিতি সামলাতে হয়। সে সাহায্য করত, কিন্তু নিজের সীমারেখা বুঝেই করত। সে বন্ধুত্ব করত, কিন্তু চোখ-কান খোলা রেখেই করত।
একদিন অফিসে নতুন যোগ দেওয়া এক সহকর্মী, নাম রফিক, তার কাছে এসে বলল, "ভাই, আপনি তো অনেক ভালো মানুষ, সবাই বলে। একটু সাহায্য লাগবে, যদি কিছু টাকা ধার দিতেন..." আব্দুল্লাহ শান্তভাবে জিজ্ঞেস করল, "কী প্রয়োজনে লাগবে ভাই? আর কবে নাগাদ ফেরত দিতে পারবেন?" রফিক একটু অবাক হয়ে গেল এই প্রশ্নে, কারণ সে হয়তো আশা করেছিল আব্দুল্লাহ কোনো প্রশ্ন ছাড়াই টাকা দিয়ে দেবে। কিন্তু আব্দুল্লাহ এখন জানত, প্রকৃত সাহায্য মানে অন্ধভাবে দিয়ে দেওয়া নয়, বরং বুঝে-শুনে, দায়িত্বের সাথে সাহায্য করা।
রফিক তার সমস্যার কথা খুলে বলল—তার মায়ের চিকিৎসার জন্য টাকার দরকার। আব্দুল্লাহ সাহায্য করল, কিন্তু একটা সুস্পষ্ট বোঝাপড়ার মাধ্যমে, আর সাথে সাথে রফিককে পরামর্শও দিল কীভাবে ধীরে ধীরে টাকাটা ফেরত দিতে পারবে। এই ঘটনার পর রফিকের সাথে তার একটা সত্যিকারের বন্ধুত্ব গড়ে উঠল, যেখানে ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস।
বছরখানেক চাকরি করার পর আব্দুল্লাহ নিজের পায়ে যথেষ্ট শক্তভাবে দাঁড়িয়ে গেল। এবার সে সিদ্ধান্ত নিল, ফারহানাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে। দুই পরিবারের মধ্যে কথাবার্তা হলো, এবং একটা সুন্দর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আব্দুল্লাহ আর ফারহানার বিয়ে সম্পন্ন হলো। করিম মিয়া আর রহিমা বেগমের চোখে সেদিন ছিল আনন্দের অশ্রু—তাদের ছেলে, যাকে নিয়ে তারা এত কষ্ট করেছিলেন, এত দুশ্চিন্তা করেছিলেন, আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে, একটা সুন্দর পরিবার শুরু করছে।
বিয়ের পর একদিন সন্ধ্যায় আব্দুল্লাহ আর ফারহানা বাড়ির ছাদে বসে ছিল। আকাশে তখন অসংখ্য তারা জ্বলছিল। ফারহানা জিজ্ঞেস করল, "আব্দুল্লাহ, তুই কি এখনো মনে করিস তোর সেই সরলতা তোর দুর্বলতা ছিল?" আব্দুল্লাহ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, "না, এখন আর মনে করি না। আমার সরলতা কখনো আমার দুর্বলতা ছিল না, আমার দুর্বলতা ছিল আমার নিজের প্রতি অবহেলা, নিজেকে যাচাই না করা। আমি এখন বুঝি, ভালো মানুষ হওয়া আর নির্বোধ হওয়া এক জিনিস না। প্রকৃত উদারতা তখনই সুন্দর, যখন তার সাথে থাকে বিচক্ষণতা, আর নিজের প্রতি যত্নশীলতা।"
ফারহানা তার হাতের ওপর হাত রেখে বলল, "আর এই কারণেই তুই এখন এমন একজন মানুষ, যাকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসা যায়, শ্রদ্ধা করা যায়।"
সময়ের সাথে সাথে আব্দুল্লাহর জীবনে আরো উন্নতি এলো। সে নিজের পরিশ্রম আর সততা দিয়ে অফিসে একটা ভালো অবস্থান তৈরি করল। বাবা-মাকে শহরে নিয়ে এলো ভালো চিকিৎসার সুবিধার জন্য, যদিও করিম মিয়া মাঝে মাঝে গ্রামে ফিরে যেতেন তার প্রিয় মাটির টানে। রাকিব, সোহেল, আর তানভীরের সাথে আর কখনো তার যোগাযোগ হয়নি, তবে তাদের প্রতি কোনো তিক্ততা সে মনে রাখেনি। বরং সে মনে করত, তারাই তাকে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা দিয়ে গেছে।
জীবনের পরবর্তী বছরগুলোতে আব্দুল্লাহ প্রায়ই তরুণদের সাথে কথা বলার সুযোগ পেত, বিশেষ করে যারা তার মতোই সরল স্বভাবের, সহজে মানুষকে বিশ্বাস করে ফেলে। তাদের সে বলত, "বন্ধু হও, সাহায্য করো, ভালোবাসো—কিন্তু নিজের মূল্যও বুঝতে শেখো। তোমার সরলতা কারো কাছে দুর্বলতা মনে হলে, সেটা তোমার দোষ নয়, কিন্তু সেই সরলতাকে রক্ষা করার দায়িত্ব তোমারই। প্রকৃত বন্ধু সে-ই, যে তোমার ভালো সময়ে না, খারাপ সময়ে তোমার পাশে থাকে। আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের বাবা-মায়ের কষ্টের টাকার মূল্য বোঝো, কারণ সেই টাকার প্রতিটা কণায় মিশে আছে তাদের ঘাম, তাদের ভালোবাসা, তাদের ত্যাগ।"
আব্দুল্লাহর এই গল্প শুধু একজন মানুষের জীবনের গল্প নয়, এটা এমন এক শিক্ষার গল্প, যা প্রতিটা মানুষের জীবনেই কোনো না কোনোভাবে প্রাসঙ্গিক। সরলতা আর বিশ্বাস মানুষের সবচেয়ে সুন্দর গুণ, কিন্তু সেই গুণকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন বিচক্ষণতা, প্রয়োজন নিজের প্রতি যত্নশীলতা। আর সবচেয়ে বড় কথা, বাবা-মায়ের কষ্টের মূল্য কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়, কারণ তাদের ত্যাগের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে সন্তানের গোটা জীবন।
"যে সন্তান বাবা-মায়ের কষ্টের মূল্য বোঝে, সেই সন্তানই প্রকৃত অর্থে সফল।"
— সমাপ্ত —
সরল হৃদয়ের গল্প
3
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating
কোন মন্তব্য নেই