হঠাৎ ওঠা কালবৈশাখী ঝড়ের তীব্র দাপটে হঠাৎ সারা প্রকৃতি যেন প্রবল ঝংকারে গর্জে উঠেছে।স্বর্গ মর্ত্য পাতালে সবকিছু ফুঁড়ে যেন বেরিয়ে আসছে বহুদিন ধরে চেপে থাকা প্রকৃতির রোষানলের তীব্র আস্ফালন।মধ্যাহ্নের ভাতঘুমের সময়। সর্বজয়াদেবী ভাঁড়ার ঘরে গিয়ে গতকালের গড়ে রাখা নারকেল নাড়ুর বয়ামটা হাতে নিয়ে নাতনীকে ডাক দিতে যাবেন...এমন সময় হঠাৎ এমন তীব্রবেগে ঝড়টা উঠল যে এখনই দরজা জানলা বন্ধ না করলে ঘরের সব জিনিসপত্র একেবারে ওলটপালট হয়ে যাবে।সর্বজয়াদেবী তাড়াতাড়ি করে বয়ামটা আগের জায়গায় রেখে সবার আগে দোতলা থেকে দৌড়ে তিনতলায় গেলেন কারণ ঝড়বৃষ্টি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এখানকার সব ঘরগুলো।তিনি তাড়াহুড়ো করে তিনতলায় পৌঁছেই ঝটপট করে সমস্ত ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করতে লাগলেন।বাড়ির চাকরগুলো সারাদিনের কাজ সেরে এখন একেবারে নাকে তেল দিয়ে দিবানিদ্রা দিচ্ছে। এখন এদেরকে ডাকাডাকি করতে গিয়ে যে সময় নষ্ট হবে তার থেকে এই বাতের ব্যাথা পা নিয়েও নিজে গিয়ে ঝটপট করে জানলা দরজাগুলো বন্ধ করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।সব জানলা দরজা বন্ধ করে তিনি একবার লাইব্রেরীর ঘরে ঢুকলেন।লাইব্রেরীর চারপাশে এখন বড় বড় গাছ উঠে গিয়েছে বলে লাইব্রেরীর ভিতরটা বেশ অন্ধকার হয় বলে এখানে বসে বই পড়তে গেলে আজকাল দিনের আলোতেও আলো জ্বালবার দরকার হয়।ঝড়বৃষ্টির দাপট আর প্রভাবও এই ঘরে বেশ কম।কিন্তু এখন এই ভরদুপুরবেলা এখানে আলো জ্বালিয়ে কে বই পড়ছে!নিশ্চয়ই নাতনী তাথৈ।যাক...আর তাহলে নাতনীকে ডাকতে এই বাতে ধরা পা নিয়ে একতলায় নামবার দরকার নেই।ওর বই পড়া শেষ হলে একবার যেন ঠাকুরমার কাছে ঘুরে যায়,সেটা বলার জন্য তিনি লাইব্রেরীর মধ্যে প্রবেশ করলেন।দেখলেন,তাথৈ টেবিলের মধ্যে একেবারে ঝুঁকে পড়ে কি একটা জিনিস খুব মনোযোগ সহকারে নিরীক্ষণ করে চলেছে।সর্বজয়াদেবী ধীরপায়ে এসে নাতনীর মাথায় হাত রাখলেন।সাথে সাথে মুখ ঘুরিয়ে,"এইটা কি ঠাকুমা...দাদুর বইএর আলমারীর লকারের ভিতরে এত যত্ন করে রাখা..."
বলে তাথৈ মাথাটা যেই সরালো সাথে সাথে নাতনীর হাতের তালুতে ওই জিনিসটি দেখে বুকের ভিতরটা একেবারে ছ্যাঁৎ করে উঠল সর্বজয়া দেবীর।
---"তুমি এটা কি করে হাতে পেলে দিদিভাই?"
---জানো তো ঠাম্মি...আমি দাদুর একখানা পোট্রেট বানাব ঠিক করেছি।বাবার কাছে দাদুর ছবি চাইলাম,বাবা আমাকে তাঁর বয়সকালের ছবি ধরিয়ে দিলেন।আমি আসলে আঁকতে চাইছি ওনার অল্প বয়সের একটা পোট্রেট।বাবা বললেন,সেরকম ছবি ঘরে কোথাও পাওয়া যাবে না।লাইব্রেরীতে দাদুর নিজস্ব আলমারিটার চাবি আমাকে দিয়ে বললেন,তোর যা দরকার এই আলমারি খুললেই পেয়ে যাবি।এ নিয়ে মা ঠাম্মিকে জ্বালাস না।
---সে তো বুঝলুম...কিন্তু এ জিনিস তো তাঁর আলমারি খুলেই হাতে পাবার কথা নয়...তোর হাতে এটা এল কি করে?
---আরে ঠাম্মি...এক কান্ড হয়েছে।তিনদিন আগে দাদুর আলমারির দরজা খুলেই আমি একটা অদ্ভুত ধরণের কান্নার আওয়াজ পাচ্ছিলাম।আমার বেশ ভয় ভয় করছিল।তাও ভীষণ সাহসে ভর করে আমি বুঝতে পারলাম,এই শব্দের উৎস আলমারির ভিতরেই রয়েছে আর আমাকে ওটা বার করে জানতেই হবে ব্যাপারটা কি!কান খাড়া করে শব্দের গতি অনুসরণ করে আমি একটা ভীষণ সুন্দর কারুকার্য করা কাঁচের বাক্স হাতে পাই।ওই বাক্সটার কোনো মুখ বা ঢাকনা খোলার ব্যবস্হা ছিল না জানো...অথচ ওর ভিতরেই এই জিনিসটা ছিল আর সেটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল।আমি বুঝতে পারলাম ভিতরের জিনিসটা আমি হাতে নিয়ে দেখতে পারব না।তাই উপর থেকেই নেড়েচেড়ে দেখছিলাম।হঠাৎ জিনিসটা আমার হাত থেকে পড়ে গেল।কাঁচ ভেঙ্গে গিয়ে জিনিসটা আমার হাতে এল।এত সুন্দর কবচ আমি আগে কখনো দেখিনি।জিনিসটা নিয়ে নিতে ইচ্ছা করছিল কিন্তু কাউকে না জানিয়ে দাদুর আলমারি থেকে একটা জিনিস নিয়ে নেওয়াও উচিত নয় তাই সব কাঁচ নিজে পরিষ্কার করে ফেলে দিয়ে কবচটা আলমারিতেই রেখে দিয়েছি।মাঝেমধ্যে দেখতে আসি।দেখো কি সুন্দর...
বলে তাথৈ কবচটা দিতে গেল ঠাম্মির হাতে।
সর্বজয়া দেবী সাংঘাতিক আতঙ্কিত হয়ে দুইহাত দিয়ে মাথা চেপে ধরলেন।তাঁর বিস্ফারিত দুইচোখ দিয়ে নির্গত হতে থাকল কোনো এত অজানা বিপদের অশনিসংকেতের দরুন তীব্র ভীতি।তাথৈ কবচটা টেবিলে রেখে একছুটে এসে ঠাম্মিকে জড়িয়ে ধরল।
---কি হয়েছে ঠাম্মি?কবচটা দেখে তুমি অমন করছ কেন?ঠিক আছে...এক্ষুনি আমি এটা তুলে রাখছি যেখানে ছিল এটা।তুমি শান্ত হও ঠাম্মি...আর আমি ওটা আলমারি থেকে বার করব না।
সর্বজয়া দেবী কোনোমতে একটা চেয়ার টেনে তাতে বসলেন।ক্ষীণ কন্ঠে স্বর ফুটিয়ে বললেন,"একটু জল দে দিদিভাই..."
তাথৈ লাইব্রেরীর দরজার পাশে রাখা পিতলের কলসি থেকে গ্লাসে জল ঢেলে এনে ঠাম্মিকে দিল।
জলটল খেয়ে একটু দম নিয়ে সর্বজয়া দেবী আকূল কন্ঠে বলে উঠলেন...ওই কবচটা কেন হাতে নিলি দিদিভাই!ও যে বড় সর্বনেশে জিনিস।এক্ষুনি ওটা আলমারির ভিতরে পুরে আলমারি তালা দিয়ে লক করে দে...
---ঠিক আছে ঠাম্মি আমি এটা যেমন ছিল তেমন করে রেখে তালাবন্ধ করে দিচ্ছি আলমারি। তুমি শুধু একটু শান্ত হও।
এরপর তাথৈ কবচটা আলমারীর ভিতরে ঠিক সেইখানে রেখেছিল যেখান থেকে সে ওটা পেয়েছিল।তারপর আলমারি তালাবন্ধ করে দিয়ে সে ঠাম্মির কাছে এসে বসল।কবচ আলমারি বন্দি হয়েছে দেখে একটু হয়তো শান্ত হলেন সর্বজয়া দেবী।তাথৈ ধীর পায়ে এসে বসল ঠাম্মির কাছে।তারপর ঠাম্মির ডানহাতটা নিজের দুইহাতের মধ্যে চেপে ধরে বলে উঠল,"ওই কবচটা দেখে তুমি অমন করে উঠলে কেন ঠাম্মি?ভয় পাওয়ার মতো কি আছে ওই কবচে?"
সর্বজয়া দেবী তাথৈকে জন্ম থেকেই কোলেপিঠে করে বড় করেছেন।উনি জানেন, মাত্র বারো বছরের বালিকা হলে কি হবে!অতটুকু মেয়ের মধ্যে যেমন সাহস আছে...তেমনই রয়েছে অজানাকে জানবার অদম্য কৌতূহল।এই মেয়ের চোখে কিছু যদি পড়ে তো ওর কাছ থেকে কিছু চেপে যাওয়া বা যা হোক কিছু বুঝিয়ে ভুলিয়ে দেওয়ার কোনো চেষ্টাই ওর ক্ষেত্রে অন্তত খাটবে না।তবে বয়সের তুলনায় যথেষ্ট পরিণত তাথৈ।তাই ওর কাছে ভরসা করে কোনো কথা বলার মতো আস্হা যথেষ্টই আছে সর্বজয়া দেবীর।
তিনি নাতনীকে বললেন, "বেশ।আমি তোমাকে বলব এই কবচটার ইতিহাস তবে এখন নয়।কাল দুপুরে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে,তখন এসো আমার ঘরে।তখন বলব।তবে খবরদার দিদিভাই।ওই কবচটার ধারেপাশে তুমি আর যাবে না...আমাকে কথা দাও...
---ঠিক আছি ঠাম্মি।আমি তোমায় কথা দিচ্ছি আমি দাদুর ওই আলমারির কাছেই আর যাব না।"
---কোথা থেকে কি যে হয়ে গেল...ঠাকুর তুমি দেখো...কোনো অনর্থ যেন না হয়...বাতের ব্যাথাটা আবার বেড়েছে আমাকে একটু ধরে আমার ঘর পর্যন্ত নিয়ে চলো দিদিভাই...
তাথৈ লাইব্রেরীর আলোটালো সব নিভিয়ে দিয়ে জানলা বন্ধ করে ঠাম্মিকে হাত ধরে নিয়ে দরজার বাইরে পর্যন্ত এল আর তারপর বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে ছিটকিনি আটকে দিল।তারপর ঠাম্মিকে ধরে ধরে সে তিনতলা থেকে নামতে লাগল ধীরে ধীরে।তিনতলাটায় থাকে না কেউ। থাকলে লক্ষ্য করত,পুরো অাঁধার নিমজ্জিত তিনতলার জনমানবশুন্য লাইব্রেরীর ঘরের দরজার তলা দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে একটি লাল কম্পমান আলোকতরঙ্গ...।
পরদিন দুপুর হতে না হতেই আর যেন তর সইল না তাথৈএর।গরমের ছুটির এই নির্জন দুপুরটা আজ আর লাইব্রেরী নয়,তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এসে বসাল ঠাম্মির ঘরে।আর সর্বজয়াদেবীও এক কথার মানুষ।নাতনিকে দেওয়া কথা তিনি রাখবেন না এও তো হয় না।নাড়ুর বয়াম পাশে নিয়ে নাতনীরই আসবার অপেক্ষায় দুই হাতে খবরের কাগজের পাতা মেলে ধরে চোখ বোলাচ্ছেন।তাকেও যে জানতে হবে...তার বিয়ের পরবর্তীকাল থেকে আরম্ভ করে এত বছর কেটে গেল,তার নিজের পুত্রকন্যা,পুত্রবধূ,জামাতা,
নাতি নাতনী কেউ আজ পর্যন্ত যে কবচের উপস্থিতির খবরই জানে না,হঠাৎ দীর্ঘ এত বছর বাদে তার এই দ্বাদশবর্ষীয়া নাতনীর হাতে এইভাবে পড়ে গিয়ে একেবারে পৃথিবীর বাতাসের সংস্পর্শে এভাবে চলে আসাটা কি নিছক কাকতালীয় ব্যাপার নাকি এর পিছনে রয়েছে গূঢ় কোনো রহস্য!নাতনীর সাথে কথা বলা আর গল্প বলার ফাঁকে তাকে জানতে হবে অনেক কিছু অস্হির মনটা তার কিছুতেই সায় দিচ্ছে না।আবার মনের অস্হিরতা কাটাতে কারোর সাথে এ নিয়ে কথা বলবেন সে উপায়ও নেই।বার বার তার মনে পড়ে যাচ্ছে জীবদ্দশায় তাঁর স্বামীর দেওয়া ভবিষ্যৎদ্বানীর কথাগুলো।সবই তো দেখছি মিলে যাচ্ছে।সামনে খবরের কাগজের পৃষ্ঠা মেলে ধরে তিনি আপ্রাণ গোপন করার চেষ্টা করে চলেছেন তার মনের কোণে জমে ওঠা মহাপ্রলয়ের অশনিসংকেতের কালো মেঘের তীব্র গর্জনধ্বনি।যথা সময়ে চঞ্চল ভ্রমরের মতো সর্বজয়া দেবীর ঘরে লাফিয়ে ঢুকে এসে পিছন থেকে তাঁকে জড়িয়ে ধরে ব্যগ্রচিত্তে বলে উঠল তাথৈ..."ঠাম্মি...সবাই যে যার ঘরে ঘুম নয় সেলাই ফোঁড়াই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছে।এবার তুমি আমায় গল্প শোনাবে।কালকের ওই কবচটার গল্প।বলো না ঠাম্মি...আমার যে আর তর সইছে না।"
মুখের সামনে থেকে খবরের কাগজটা সরিয়ে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন সর্বজয়া দেবী।নাতনীর দুকাঁধে হাত রেখে তাকে সামনে বসিয়ে বললেন,"দিদিভাই...আজ তোমাকে যা যা বলব সেগুলো কোনোটাই কিন্তু গল্প নয়।আমি তোমার সামনে যেমন দাঁড়িয়ে রয়েছি তুমি দেখছ,ঠিক ততটাই বাস্তব সত্যি ঘটনার কথা বলতে যাচ্ছি তোমায়।কিন্তু তার আগে তুমি আমাকে বলো তোমার হঠাৎ দাদুর অল্পবয়সের প্রতিকৃতি আঁকবার ইচ্ছা হল কেন?আঁকাজোকার প্রতি আগ্রহ কবে থেকে তোমার এসেছে দিদিভাই?"
---আসলে ঠাম্মি...একটা কথা সেভাবে কাউকেই বলিনি...দিন চারেক আগে আমি ভোররাতে একটা খুব অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি।দাদু অল্পবয়সে কেমন দেখতে ছিলেন সে সম্বন্ধে আমার কোনো আইডিয়া নেই।কিন্তু স্বপ্নে আসা ওই বছর পঁচিশের ভদ্রলোক যে দাদুই ছিলেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।উনি নির্জন অন্ধকারে একটা গর্তের ভিতরে আটকা পড়ে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন বেরিয়ে আসতে,কিন্তু পারছেন না।আমি তাঁকে এভাবে আটকা পড়া অবস্হায় দেখতে পেয়ে দুহাত দিয়ে তাঁকে ওপরে টেনে তোলার চেষ্টা করছি কিন্তু কিছুতেই পেরে উঠছি না।দাদু তখন আমাকে কাতর স্বরে বলছেন,"দিদিভাই,তুমি আমাকে এই গর্ত থেকে যদি বার করতে চাও তো হাতে তুলি নাও তুলির মাধ্যমে আমার প্রতিকৃতি আঁকো।আমি একমাত্র সেখান দিয়েই বেরিয়ে আসতে পারব।মুক্তি দাও দিদিভাই...আমাকে মুক্তি দাও...
দাদুর অমন আর্তনাদ কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ভয়ংকর অট্টহাসিতে রূপান্তরিত হল।আর দাদুর চেহারাটাও ক্রমশ বিকৃত হতে হতে একটা ভয়ংকর পিশাচ জাতীয় একটা কিছুর চেহারা নিতে থাকল।এরপর হঠাৎই আমার ঘুমটা ভেঙ্গে গেল।আমি বুঝতে পারছি যে এরকম একটা স্বপ্নের কোনো মাথামুন্ডুই নেই।তাও তারপর থেকে আমার দাদুর অল্পবয়সের একটা প্রতিকৃতি আঁকবার ইচ্ছাটা চাগাড় দিয়ে উঠল।কিন্তু ঠাম্মি,বাবা বলেছেন বটে দাদুর অল্প বয়সের কোনো ছবি দাদুর সেখানেই পাওয়া যাবে কিছু আমি তো সেখানে কতগুলো ইংরেজী বই ছাড়া আর তেমন কিছুই পেলাম না।
সর্বজয়া দেবীর শিঁড়দাড়া দিয়ে যেন একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।কিন্তু তিনি তার মনের ভাব নাতনির কাছে গোপন করে গেলেন।ঠাম্মিকে অন্যমনস্ক দেখে নাতনি ব্যস্তসমস্ত হয়ে সর্বজয়া দেবীর দুইহাত ধরে অল্প ঝাঁকুনি দিয়ে বলে উঠল,"ও ঠাম্মি...কি ভাবতে শুরু করলে!বলো না আমায় ওই কবচের গল্প!
ধীর স্হির দৃষ্টি নিয়ে সর্বজয়াদেবী একটু আনমনা হয়ে গেলেন।যেন পুরোনো কোনো স্মৃতির অতলে নিমগ্ন চিত্তে অবগাহন করেছেন। মৃদুস্বরে তিনি বলা শুরু করলেন।
সে অনেক বছর আগেকার কথা।মোটামুটি পঁয়তাল্লিশ কি ছেচল্লিশ বছর মতো হবে।আমি তখন অষ্টাদশী যুবতী।সদ্য বিয়ে হয়েছে আমার। তোমার দাদু তখন বছর পঁচিশের তরতাজা যুবক।ইতিহাসের প্রতি তাঁর ছিল এক অমোঘ আগ্রহ আর টান।তিনি ইতিহাস নিয়ে ডক্টরেট করে তখন কলেজে অধ্যাপনা করতেন।খুবই হাসিখুশি ছিলেন তিনি আর তার ছিল যেকোনো আড্ডা জমিয়ে মাতিয়ে রাখবার মতো তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত রসবোধ।তখন এ বাড়ির বৈঠকখানাতে ওনার বিভিন্ন কৃতী ও গুণি বন্ধুবান্ধবদের আনাগোনা লেগেই থাকত।বিভিন্ন যুক্তি তর্ক জ্ঞান বিজ্ঞান নিয়ে শুরু হয়ে যেত জমাটি আলোচনা আর আড্ডা।নতুন বৌ হয়ে এ বাড়িতে আসার পরে শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেকের দেখভাল করা ছাড়া ওনার এই অতিথি বন্ধুদের চা জলখাবার পরিবেশন করার সমস্ত ভার ছিল আমার ওপর।নতুন বউ আমি সবসময় একটা সংকোচ আর জড়োসড়ো লজ্জাতে সবসময়েই সিঁটিয়ে থাকতাম। তো বিয়ের পর মোটামুটি দেড় থেকে দুইমাস পরেকার কথা।এমনই এক বৈঠকী আড্ডায় গমগমে সন্ধ্যায় সকলের আব্দার মতো গরম গরম কফি আর মাংসের কাটলেট ভেজে প্লেটে সাজিয়ে নিয়ে পরিবেশন করতে গেলাম যখন...তখন সেখানে এক ভ্রমণ নিয়ে বিভিন্ন রসাত্মক আলাপ আলোচনা চলছিল।হঠাৎ ওনার এক বন্ধু আমায় শুধোলেন..."বৌদি...আপনার ঘোরা বেড়ানোর শখ আছে নাকি?আমরা বন্ধুরা সবাই এই ছুটিতে বেড়াতে যাব প্ল্যান করছি।দাদাকেও ছাড়ছি না।আর আপনাকেও কিন্তু না নিয়ে ছাড়ব না। দিনক্ষণ খুব ঠিকঠাক করা থেকে আরম্ভ করে টিকিট কাটার ব্যবস্হা সবই তাড়াতাড়ির মধ্যেই হয়ে যাবে।আপনি লাগেজ গোছানো আরম্ভ করে দিন।সব শুনেটুনে এই প্রতিদিনকার একঘেয়ে গৃহস্হালী রোজনামচায় আটকা পড়া আমার ভিতরে একটুকরো সতেজ রৌদ্রকিরণ ঢুকে যেন সবকিছু একদম চনমনে করে দিল।একটু লাজুক মুখেই খাবারদাবার পরিবেশন করে দিয়ে আমি সেখান থেকে সরে আসলাম বটে,কিন্তু তারপরেই রান্নাঘরে রাতের রুটি বেলতে বেলতে আমার মাথার ভিতরে ঘুরপাক খেতে লাগল লাগেজের ব্যাগে কি কি জিনিস ভরব...পাহাড়ী জায়গাতে ঠান্ডা কেমন পড়বে...গরম জামা কতগুলো নেওয়া ঠিক হবে...সেই সংক্রান্ত বিবিধ চিন্তা।চঞ্চল একটি প্রজাপতি হঠাৎ উজ্জীবিত হয়ে আমার সারামন জুড়ে ওড়াউড়ি শুরু করে দিল।যথাসময়ে সমস্ত বন্দোবস্ত হয়ে গেল আর টিকিটও কাটা হয়ে গেল।আমি আর তোমার দাদু,আর ওনার বাকি বন্ধু আর বন্ধুপত্নীরা মিলে আমরা মোট সাতজন ছিলাম।আমি আর তোমার দাদু ছাড়াও আরো দুটি কাপল ছিল আর একজন ছিল ব্যাচেলর।ওনার ছেলেবেলার বন্ধু অজিতেশবাবু আর তার স্ত্রী গৌরী এবং ওনার এক ডাক্তার বন্ধু কুন্তলবাবু আর তার স্ত্রী সুরবালা।সাথে ওনার কলেজেরই এক সহ অধ্যাপক রমাকান্ত রায়।গৌরী স্কুল শিক্ষিকা আর সুরবালা একজন ট্রেনি নার্স আমি হাউস ওয়াইফ।তিনজনের তিনরকম জীবন হলেও তিনজন অপরিচিতা যখন একসাথে হয়ে ট্রেনের বার্থে মেয়েলি আড্ডায় মেতে উঠলাম আর তোমার দাদুরা তাঁদের জম্পেশ আড্ডায় তখন বাতাসের প্রতিটি কণায় এক অনির্বাচনীয় আনন্দের শিরশিরানি আমাদের প্রত্যেকের কানে কানে যেন ফিসফিস করে বলে যাচ্ছিল,আমাদের সকলের বয়স যেন দশ বছর কমে গিয়েছে।
ট্রেনের মধ্যে চুটিয়ে আড্ডা, খানাপিনা আর অন্ত্ক্ষরী খেলে কিভাবে যে সময় কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না।শেষমেষ যথাসময়ে ট্রেন গিয়ে থামল কালিম্পং এর স্টেশনে।আমরা হোটেলের ঘর বুকটুক করে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিলাম।তবে বেশি রাত করলাম না।কারণ আগামীকাল একেবারে ভোরবেলা আমাদের বেরিয়ে পড়বার পরিকল্পনা ছিল।মোটামুটি রাত নটার মধ্যেই গরম রুটি আর কষা মাংস দিয়ে রাতের আহার সেরে আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম।পরদিন সারাগায়ে পুরো ব্যান্ডেজের মতোই গরমজামা দিয়ে মুড়েটুরে আমরা ভোরভোর বেরিয়ে পড়লাম পাহাড় দেখতে।পাহাড়ী জায়গাতে ঘুরতে ঘুরতে মনের ভিতর ভীষণ রোমাঞ্চ অনুভব হচ্ছিল।আমরা ঘুরতে ঘুরতে পাহাড়র ভিতরকার জঙ্গলের অনেকটা ভিতরে চলে এসেছিলাম।পাহাড়ী জঙ্গলের ভিতরকার গা ছমছমে পরিবেশ আমাদের ভীষণভাবে সম্মোহিত করে ফেলেছিল।আমরা যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ভিতরে...আরো ভিতরে ঢোকার জন্য তীব্র হাতছানি অনুভব করছিলাম।আমাদের সাথে যে গাইড ছিল সে একটা নির্দিষ্ট রাস্তার পরে আরো ভিতরে যেতে বড্ড গাঁইগুঁই করছিল।ওর হাতে তোমার দাদু কিছু টাকার নোট ধরাতেই গাইড আরো কিছু পথ আমাদের সাথে চলতে রাজী হল বটে,কিন্তু একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আসার পর সে এমনভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল যেন তাকে সীতার গন্ডি পার হতে বলা হচ্ছে।সে পুরোপুরি অনড় হয়ে গেল।আর তার হাতে টাকার নোট ধরিয়েও কোনো লাভ হল না।উপরন্তু তোমার দাদুর দেওয়া যে নোটটি সে খানিক আগেই পকেটস্থ করেছিল,সেটা পকেট থেকে বার করে তোমার দাদুর হাতেই ফের ধরিয়ে দিয়ে যেন নিজের প্রাণটাই পকেটে পুরে নিয়ে প্রায় চোঁ চাঁ দৌড় দিয়ে স্হান পরিত্যাগ করল।অজিতেশ বাবু বললেন,"যতসব গ্রাম্য কুসংস্কারে এখনো ডুবে রয়েছে এখানকার সব স্হানীয় লোকজন।শিক্ষাদীক্ষার আলো যে এইসব জায়গায় ঠিকভাবে কবে পৌঁছবে কে জানে...।"
তোমার দাদু সবার উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন,"যার যাবার ছিল সে তো পালাল...কারোর সাহায্য না পেলে কি আমাদের ঘোরা বাকি থেকে যাবে?চল আমরা সামনে এগোই।"
সবাই তাতে সায় দিয়ে বলে উঠল...হ্যাঁ হ্যাঁ চল সামনে এগোই।
এক অজানা চাপা উচ্ছ্বাস আর উত্তেজনার সংমিশ্রণে আমার এবং বোধ করি অন্য সকলেরই এবার এই গভীর পাহাড়ী জঙ্গল পেরিয়ে আরো গভীরতা ভেদ করার আকাঙ্কা আগের চাইতে আরো দশগুণ হয়ে উঠেছিল।লোকালয়ে থাকতে আমরা শুনেছিলাম এই জঙ্গলের ভিতরে নাকি প্রেতযোনির উপাসনা হয়েছিল একসময়ে।আর তাই ভয়ে এখানকার স্হায়ী বাসিন্দাদের কেউই এই জঙ্গলের ধারপাশ মাড়ায় না।আমাদের আগ্রহ আসলে পড়ে ছিল সেখানেই।আমি সাধারণ গৃহবধূ হলেও আমি ছিলাম তখনকার দিনের ম্যাট্রিক পাশ মেয়ে।কাজেই সেইযুগের আর পাঁচটা মেয়ের তুলনায় আমি ছিলাম যথেষ্ট সাহসী এবং কুসংস্কারমুক্ত।তাই ভূত বা প্রেতাত্মাজনিত কোনো ভীতি আমার ছিল না।আমাদের সাতজনের মনেই তখন দারুণ রোমাঞ্চের একটা অনুভূতি জাগছিল যা তখন শুধুই ওই ঘন জঙ্গলের কুহেলীসম দুর্ভেদ্য জঙ্গল আরো আরো ভেদ করার জন্য উৎসুক হয়ে উঠেছে।আর ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়ার সেই আলোআঁধারির মধ্যে হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছিল।হাঁটতে হাঁটতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামল আমরা কেউই সেটা খেয়াল করিনি।হঠাৎই আমাদের এই হাঁটার আনন্দকে ঘপ্ করে গিলে নিয়ে সূয্যিমামা চম্পট দিলেন আর আমরা,এই সাতজন লক্ষ্যহীন পথিকের টনক নড়ল যে এইবার হোটেলে ফিরতে হবে।কিন্তু একেয় এইভাবে আমাদের চোখের সামনের দৃশ্যমান যা কিছু সেসবই অন্ধকারের উদরে চলে গেছে, তায় কোনো পথপ্রদর্শকও নেই যে আমাদের ফিরতে একটু সাহায্য করবে।গাইড যখন জঙ্গলে ঢোকবার মুখেই নিজের ডিউটি শিকেয় তুলে বখশিশের টাকা তোমার দাদুর হাতে গুঁজে দিয়ে চম্পট দিয়েছিল তখনই আমার মনটা যে মৃদু হলেও প্রমাদ গোনেনি তা নয়...এখন তো আমাদের সাতজনেরই মনে হচ্ছে, এই এত ঘন একটা জঙ্গল পেরোনোর উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে গাইডকে ফিরিয়ে দেওয়াটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি।কিন্তু কি আর করা...যা হবার তা তো হয়েই গিয়েছে।এবার প্রশ্ন হল হোটেলে কিভাবে ফেরা যাবে...।তখনকার দিনে আমাদের কারোর হাতে মোবাইল ফোন ছিল না।একটা টর্চ লাইট তোমার দাদু এনেছিলেন বটে,কিন্তু এখন সাথে করে সেটা নিয়ে আসতে তিনি বেমালুম ভুলে গিয়েছেন।কাজেই অন্ধকার ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসতে আমাদের নিজেদের একে অপরের মুখ দেখতে পাওয়াটাই দায় হয়ে উঠল তো সেই অবস্থায় ওই ঘন জঙ্গলের মধ্যেকার পথ চিনে হোটেলে ফেরাটা তো রীতিমতো অসম্ভব ব্যাপার।মেঘের আস্তরণের সাথে লুকোচুরি খেলায় রত একফালি চাঁদের ওই সামান্য আলোতে যে যৎসামান্য দৃষ্টিশক্তি আমাদের প্রত্যেকের কাজ করছিল তাতে আমরা পরস্পরকে চিনতে বুঝতে পারছি সেটাই যথেষ্ট ছিল।কুন্তলবাবু বললেন,"কোনো উপায় নেই।কোনোভাবে আজ রাত্তিরটা আমাদের এইখানেই কাটাতে হবে।কাল দিনের আলো ফোটার আগে হোটেলে ফেরার কথা ভেবে লাভ নেই।"
কথাটা শিউরে ওঠার মতন হলে পরেও এটা আমরা প্রত্যেকেই উপলব্ধি করলাম,উনি ঠিক বলছেন
অন্তত পক্ষে রাতটুকু না কাটলে একটা কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যের পথ ধরে এগিয়ে চলাটা যে নিতান্তই অসম্ভব সেটা আমাদের প্রত্যেকেরই বোধগম্য হল।কি আর করা!ঘন জঙ্গলের আলকাতরার মতো মিশমিশে অন্ধকার ভেদ করে আমরা চলতে থাকলাম উদ্ভ্রান্ত পথিকের মতো একটা কোনো এমন জায়গার খোঁজে যেখানে আমরা বসে বা একটু গা এলিয়ে রাতটুকু কাটিয়ে দিতে পারি।আমাদের সাথে একসাথে তাল মিলিয়ে চলতে থাকল নিকষ কালো আকাশের বুকজুড়ে মিটমিট করে চেয়ে থাকা তারা আর একফাঁলি চাঁদ।তারাই বোধহয় এই দিকভ্রষ্ট পথিকদের একটা দিশা দেখাল অবশেষে।এই ঘন গহিন জঙ্গলের মিশমিশে কালো অন্ধকারের সঙ্গে হোলিখেলায় রত আমাদের সাতমূর্তির চোখেই ভীষণ আবছাভাবে হলেও ধরা পড়ল একটি সুবিশাল বাংলোবাড়ির ধ্বংসাবশেষ।ওই অন্ধকারেও আমরা প্রত্যেকেই বুঝতে পারলাম,প্রাসাদতুল্য অট্টালিকাসম এই বাংলোবাড়িটির মধ্যে তীব্রভাবে এক রাজকীয় প্রতাপ স্পষ্ট বিদ্যমান হওয়া সত্ত্বেও এখন এই বাংলোটি এতটাই ভগ্ন আর ক্লিষ্ট যে বর্তমানে এটি মানুষের বাস করবার অযোগ্য। আমাদের তখন প্রয়োজন রাতটুকু কোনোমতে পার করবার জন্য যা হোক একটা আশ্রয়স্থল। সেখানে এ তো আমাদের কাছে মেঘ না চাইতেই জল।এই আদ্যিকালের ভগ্ন লবঝরে বাংলোবাড়ির ভগ্নাবশেষ দেখামাত্র আমাদের প্রত্যেকেরই যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল।যাক।এই ঠান্ডায় এই ঘন জঙ্গলের ভিতরে একটা রাত কাটিয়ে দেওয়াটা এতটাও কষ্টকর হবে না।আমরা সকলে দারুণ খুশি হয়ে সদলবলে ওই বাংলোবাড়ির ভিতরে ঢোকার উদ্দেশ্যে তাড়াতাড়ি করে পা চালালাম।আমাদের মনে তখন স্বস্তি আর শান্তি।ক্ষিদেয় আমাদের সকলেরই পেট চুঁইচুঁই করছে।তোমাদের দাদু বেশ ভালো পরিমাণেই কেক ফল মিষ্টি সাথে নিয়েছিলেন পথে খাবার জন্য।এখন সেগুলোই আমাদের সবার কাজে লাগবে।বেশ অভিনব...অন্যরকম একটা রাত কাটানোর অভিজ্ঞতার ভাগীদার হতে চলেছি আমরা সদলবলে।দারুণ একটা উত্তেজনার রেশএ আমার মনটা ভীষণ চনমনে...দারুণ উচাটন হয়ে উঠেছিল।আর বাকি প্রত্যেকেরই মনের ভিতরে যে একই অনুভূতির আলোড়ন তোলপাড় করছিল সেটাও আর বোঝার বাকি ছিল না।ভয় আর দুশ্চিন্তায় কালো হয়ে ওঠা আমাদের মুখগুলিতে এইবার খই ফুটতে আরম্ভ করল।চারপাশে বন্য নেকড়ে শৃগাল ও হিংস্র জন্তুজানোয়ারদের মর্মভেদী ক্ষুধার্ত আর্তনাদ আর ঝিঁঝিঁপোকার অক্লান্ত কোরাসের গা ছমছমে ওই জনমানবহীন বন্য পরিবেশের ভিতর আমাদের কথার কলকল যেন মরূভূমির বুকে স্রোতস্বিনী নদীর ন্যায়ে প্রবাহিত হচ্ছিল চারপাশের মরা বাতাসকে জাগিয়ে।অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা ওই ভগ্ন বাংলোটির সামনে পৌঁছে গেলাম।ওই নিকষ অন্ধকারেও বাংলোর সিংহ দরজা খুঁজে পেতে বড় অসুবিধা হল না।অবশেষে বাংলোর ওই ভঙ্গুর সিংহ দরজা পায়ের একটি আঘাতেই ভাঙলেন তোমার দাদু।
ঘ্যাঁঅ্যাঅ্যাচ্ করে একটা কর্ণবিদারক শব্দ হওয়ার সাথে সাথে আমাদের মাথার উপর দিয়ে ঝটপট করে তীব্রবেগে উড়ে চলে গেল একঝাঁক বাদুড়।আর সাথে সাথে একটা ভ্যাপসা গন্ধ আমাদের নাকে এল।এটা বুঝতে বাকি রইল না,যে বাংলোর ভিতরটা বহুযুগ বাদে বাইরের বাতাসের স্পর্শ পাচ্ছে।অন্ধকার রাতের চাঁদনী আলোর আবছা আবহে বাইরে থেকে দেখে বাংলোর আদলটা যতটা সুন্দর মনে হয়েছিল,ভিতরটা তার থেকেও বেশি চোখ ধাঁধাঁনো আর রাজকীয়।শুধু যুগের পর যুগ ধরে ধূলোময়লা মাকড়সার জালের আস্তরণ পড়ে পড়ে,পোকামাকড়ের স্হায়ী আস্তানা এই ক্ষয়প্রাপ্ত জরাজীর্ণতায় আচ্ছাদিত বাংলোটি বার্ধক্যের ভারে ভগ্নপ্রায়।কিন্তু গাঢ় অন্ধকারে চোখ সয়ে আসা আমরা চাঁদের আলো যেটুকু দরজার ভিতর দিয়ে ঢুকছে সেই স্বল্প আবছা আলোআঁধারিতেই স্পষ্ট দেখলুম...বাংলোর ভিতরের রাজকীয়তা অর্থ ও যশের এক দাপুটে প্রতাপপূর্ণ অতীতের বহিঃপ্রকাশ করছে নিঃশব্দে।আমরা একে একে সবাই বাংলোর ভিতরটায় ঢুকলাম।কি সুবিশাল তার অন্দরমহল।আমাদের মাথার উপরে যেন একটা বিশালাকৃতি উল্টোনো বাটি ছাদের রূপ নিয়ে নিজের জায়গায় বিদ্যমান।বাটির সুবিশাল গোলাকৃতি ধারজুড়ে কক্ষের সারি এবং তার সামনে ঝুলন্ত ব্যালকনি যেন গোটা বাংলোর উপরের চতুর্দিকে পরিখার মতো ঘিরে রেখেছে।বাংলো বাড়িটি যেন আসলেই শুধু বাংলো নয়,একেবারে রাজপ্রাসাদ।আমরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে মুগ্ধদৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করে চলেছি এই অপূর্ব সৌন্দর্য। হঠাৎ খেয়াল হল,অজিতেশ বাবু দেশলাই জ্বেলে কিছু কাঠকুটো যোগাড় করে আগুন জ্বালিয়েছেন।সেই আলোতেই মায়াময় কূহেলীর আস্তরণে মোড়া এই মায়াময় পরিবেশের অনির্বাচনীয় সৌন্দর্য আমাদের চোখে ধরা দিতে পারছে।আমাদের হুঁশ ফিরল ওনারই হাঁকডাকের সাথে।"বাংলোর ভিতরে ঢুকে সবাই কি ভাবের ঘোরে চলে গেলে নাকি?বলি...রাত তো কম হল না।ক্ষিদেয় পেটে ইঁদুর দৌড়োনো শুরু করে দিয়েছে।খেতেটেতে হবে তো নাকি?ফল মিষ্টি যা আছে সব বার করো ভাই...এবার আলো আঁধারিতে পিকনিকটা আরম্ভ হয়ে যাক...
আমাদের সকলের সম্বিত ফিরল।আমরা আমরা সবাই একে একে অজিতেশবাবুর জ্বালানো অাগুনের চারধার ঘিরে বসে গেলাম একেবারে পিকনিকের মেজাজে।সত্যিই আমাদের সবারই খুব ক্ষিদে পেয়ে গিয়েছিল।তোমার দাদু এবার তাঁর ব্যাগ থেকে ফল মিষ্টি সব বার করতে থাকলেন একে একে।হঠাৎ একটা ভয়ঙ্কর কর্ণবিদারক শব্দে আমাদের হৃদপিন্ড কেঁপে উঠল যেন।আমরা সবাই একেবারে বোবা হয়ে গেলাম।কোথা থেকে এমন কলিজা কাঁপানো শব্দ হল আমরা কেউই সেটা বুঝে উঠতে পারলাম না।তোমার দাদু উঠে দাঁড়িয়ে শব্দের উৎস খোঁজার চেষ্টা করতে থাকলেন এবং তারপর হয়তো কিছু একটা বুঝে নিয়ে হনহন করে এগিয়ে গেলেন বাংলোর সিংহদরজার দিক অনুসরণ করে।আমরা এ ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে থাকলাম।হঠাৎ তোমার দাদু ভীষণ হন্তদন্ত হয়ে আমাদের মাঝে এসে আতঙ্কে ভিজে আসা কন্ঠে সমস্ত শক্তি জড়ো করে বললেন,"সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে। যে দরজা দিয়ে আমরা ভিতরে ঢুকেছিলাম সেটা বন্ধ হয়ে গেছে বাইরে থেকে। ওই দরজা আমরা সকলে মিলে চেষ্টা করলেও খুলতে পারব না এটা আমার বুঝতে এতটুকুও বাকি নেই!"
এতটুকু বলে উনি একেবারে মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়লেন।আমাদের প্রত্যেকের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল।কোনো এক অদৃশ্য,অপার্থিব শক্তির বজ্রমুষ্ঠির কবলে আমরা আটকা পড়ে গিয়েছি যেখানে আমাদের অন্তিম লগ্নের সূচনা হয়ে গিয়েছে এটা বুঝতে আমাদের কারোর আর বাকি রইল না।আমরা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম নিজেদের অদৃষ্টের খেদ হাতে নিয়ে।
বাংলোর বন্ধ দরজার ভিতর আমরা সাতটি প্রাণী তখন শুধুমাত্র মৃত্যুর অপেক্ষায় প্রহর গোনা শুরু করেছি।এলাকার সকলের যাবতীয় নিষেধ আর সাবধানবাণী উপেক্ষা করে...নিজেদের গাইডকে মাঝপথে ফিরিয়ে দিয়ে জঙ্গল বেড়ানোর যে তীব্র নেশা আমাদের সকলের মধ্যে চাগাড় দিয়ে উঠেছিল...সেই চরম মূর্খামির জন্য নিজেদেরকেই নিজেরা এখন তীব্র ভৎসনা করে হায় হায় করা ছাড়া আর কোনো উপায়ই এখন অবশিষ্ট নেই।ক্ষণিকের ভ্রমণ পিপাসা এখন সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত হয়ে আমাদের সকলের সামনে দাঁড়িয়ে যেন অট্টহাস্য করে চলেছে ক্রমবর্ধমানভাবে।সুবিশাল এই বাংলোটির ভিতরটা ভীষণই চমৎকার।ধূলার পুরু আস্তরণে চাপা পড়া অবস্হাতেও দেওয়ালের আনাচে কানাচে বাঘের কাটামাথার গৃহসজ্জা,পুরু ধূলার আড়ালে উঁকি দিয়ে জানান দেওয়া বাঘছালের কার্পেটের অস্তিত্বে যেন বাংলোর অন্দরমহল জুড়ে প্রকট হয়ে পড়ছে দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজকীয় জীবনযাপনের চালচিত্র।আমরা যখন একেবারে বুঝেই গেলাম,যে ফেরার বা বাঁচবার আর কোনোরকম আশাই অবশিষ্ট নেই...আমাদের সবাইকে এই বাংলোর ভিতরেই এমনভাবে মরতে হবে যে হয়তো আমাদের প্রিয়জনেরা আমাদের মৃতদেহও হয়তো হাতে পাবে না।এই দরজা খোলা মানুষের সাধ্যের বাইরে।সবার প্রথমে আমার মায়ের মুখটা দুচোখ জুড়ে ভাসতে লাগল।তারপর এক এক করে সেখানে আসতে লাগল বাবা,দাদু,ঠাকুরমা আর ছোট বোনটার ছবি।এই মৃত্যু আটকানো কোনোমতে সম্ভব নয়।চোখের জল ক্রমে মুছে নিয়ে ভিতরের সমস্ত শক্তি জড়ো করে প্রস্তুত হতে শুরু করলাম আসন্ন মৃত্যুর জন্য।আমি অবাক হয়ে দেখলাম, এই ভীষণ পরিস্থিতিতেও তোমার দাদু ভেঙ্গে পড়েননি।আমরা সবাই আমাদের ভাগ্যের হাতে নিজেদের সমর্পণ করে হাহুতাশ করছিলাম যখন,তোমার দাদু তখন বাংলোর ভিতরের সমস্ত জায়গা জুড়ে ইতস্তত বিচরণ করে ইতিউতি কি যেন খুঁজে চলেছেন।এ যে কোনো অপার্থিব শক্তির যাদুবলেই আজ আমাদের এই পরিণতি এটা বুঝতে আমাদের আর কোনো বাকি ছিল না।অজিতেশ বাবু,কুন্তল বাবু, আর রমাকান্ত বাবু তিনজন পুরুষ মানুষ আর বাকি আমরা মেয়েরা সবাই মিলে ওই দরজা খোলবার চেষ্টা করেছি সর্বশক্তি প্রয়োগ করে।অতঃপর অলঙ্ঘনীয় এই অপার্থিব শক্তির এই মৃত্যুনির্মাণের কাছে আমরা সবাই পরাজিত হয়ে যে যার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে বা বসে মৃত্যুর অতল হাঁয়ের ভিতরে নিজেদের নিঃশর্তভাবে সঁপে দেওয়ার জন্য মনে মনে তৈরি হচ্ছি আর একপাশে আবর্জনার মতো পড়ে রয়েছে আমাদের রাতের আহারের জন্য রাখা ফল আর মিষ্টির বাক্স।আর তোমার দাদু তখন একেবারে নিস্পৃহ ঠান্ডা মাথায় বাংলোর ভিতরকার এ মাথা থেকে ও মাথা ঢুঁড়ে ফেলছেন অজ্ঞাত কোনকিছুর সন্ধানে।ওনার দিকে কারোর দৃষ্টি না পড়লেও আমি একবার প্রায় নিঃশেষিত গলিত মোমবাতির আলোয় তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম।ওই আলোআঁধারিতেও যেন স্পষ্ট দেখলাম তাঁর চোখেমুখে দৃঢ়চেতা এক হার না মানা দুর্জয় হৃদয়ের বজ্রমুষ্ঠিসমেত তীব্র প্রতিফলন। হ্যাঁ। তাঁকে আমি চিনি।হার মানবার মানুষ তিনি নন।এই ভয়ংকর বিপদে যখন আর কোনো আশা না দেখে সবাই যখন বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছে তখন তিনি জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পড়া পর্যন্ত খুঁজে চলেছেন এই অপার্থিব শক্তির সামনাসামনি হওয়ার কোনো উপায়।আমার ভিতর হতে বড়ো লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল বাংলোর ভিতরের বাতাসের প্রতিটি কণাকে কাঁপিয়ে তুলে...হা অদৃষ্ট...এমন উপহাস তুমি কেন করলে!
মোমবাতির আলোটা ক্ষমেই তার আয়ুর একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই দপ করে নিভে যাবে আমাদের সাতজনের জীবদ্দশায় পৃথিবীতে অবশিষ্ট অন্তিম আলোখানি।এরপর যে কি হবে...সেটা ভাবতেই আমার বুকের ভিতরের রক্ত ঠান্ডা হয়ে এল।আমার এই চিন্তা মনে খুব বেশিক্ষণ স্হায়ী হওয়ার সুযোগ পেল না।একটা সময়ে হঠাৎ করেই আমরা সাতজন তলিয়ে গেলাম নিকষ অন্ধকারের সমুদ্রে। আমরা এখন আর কেউ কারোর চেহারাই দেখতে পাচ্ছি না।শুধুমাত্র কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি।আমরা সবাই এখন এটা বুঝতে পারছি যে রাত কেটে গিয়েছে।এটা আসলেই দিনের বেলা।কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার...এ অন্ধকার এমনই এক অদ্ভুত অন্ধকার যার সাথে যেন আলোর শত্রুতা জন্ম জন্মান্তরের।এ অন্ধকার কোনো সাধারণ অন্ধকার নয়।এ অন্ধকার যেন মানুষকে নিংড়ে পিষে মারতে চায়।এ অন্ধকার যেন নিজের রোমশ ধারালো নখযুক্ত থাবার ভিতরে একটু একটু করে মানুষের প্রাণবায়ূ শুষে নিয়ে নিকেষ করতে উদ্যত।রেহাইএর যে কোনো পথ অবশিষ্ট নেই একথা বোঝার আর কিছু বাকি ছিল না।মৃত্যু যখন একেবারে ঘাড়ের কাছে এসে নিঃশ্বাস ফেলছে তখন আমি বাকি সমস্ত চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে তোমার দাদুর খোঁজ করতে শুরু করলাম ওই অন্ধকারের মধ্যেই।চেঁচিয়ে ডাকতে শুরু করলাম তাঁকে।মরবার সময়টুকু অন্তত যদি স্বামী স্ত্রী একসাথে থাকি তবে এই নির্মম মৃত্যুর যন্ত্রনাটাও খানিকটা ফিকে হবে সেই আশায় আমি অন্ধকারে এলোপাথারি ডাকাডাকি আর খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম।হঠাৎ একটা কিছুতে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ে গেলাম পাশে।পা টা বিশ্রীভাবে মচকে গেল।হঠাৎ খেয়াল করলাম,আমার চারপাশে কোনো মানুষজনের অস্তিত্ব নেই।তোমার দাদুকে খুঁজতে খুঁজতে অন্ধকারে অনেকটা হাঁটাহাঁটি করেছি আর তা করতে গিয়েই বুঝেছি,বাংলোখানা বাইরে থেকে দেখে যতটা বিশাল মনে হয়,ভিতরটা তার শতগুণ বললেও কম হবে না।যতই চলি না কেন...যত সামনে এগোই ততই যেন হাঁটবার জন্য রাস্তা খুলে যাচ্ছে। আর যত সময় যাচ্ছিল,এই অন্তিমকালে তোমার দাদুুর দেখা পাওয়ার জন্য তত উচাটন হয়ে উঠছিলাম।আর এই নিকষ মানুষখেকো রাক্ষুসে অন্ধকার সাঁতরে পথ চলতে চলতে যতটা পথ চলে এসেছি,ততটা হাঁটলে যে ফেল আমাদের হোটেলের রুমেই পৌঁছে যাওয়া সম্ভব এটা যখন বুঝতে পারলাম,আমার শিড়দাড়া বেয়ে যেন বরফশীতল একটি স্রোত বয়ে গেল নিঃশব্দে।আমি এবার বাকি সকলের নাম ধরে ডাকাডাকি শুরু করলাম।কারোর কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না।কোথা দিয়ে কেমন করে কতটা এসে পড়েছি সেটাই বোঝবার কোনো উপায় ছিল না,তো বাংলোর সিংহদরজা...যেখানে আমরা সাতজনের একসঙ্গে ছিলাম...সেইখানে ফিরে যাব কেমন করে!আমি এবার গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে সকলের নাম ধরে ডাকতে শুরু করলাম।অনেক্ষণ ভয়ার্ত কন্ঠে সকলের নাম ধরে এভাবে আর্তচিৎকার করে করে এক সময় আমি বিদ্ধস্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম।এখানকার মাটিটাও এখন আমার মারাত্মক রকম উত্তপ্ত...কেমন একটা আঠালো লাগছে।যেন সর্বাঙ্গে ছ্যাঁকা দিচ্ছে...মাটি থেকে চটচটে কিছু লেপ্টে যেতে চাইছে গায়ে।এমন সময় হঠাৎ আমি আমার এই দীর্ঘ আর্তনাদের প্রত্যুত্তর পেলাম। বৌদি...বৌদি...তুমি তাহলে এখানে...যাক তবু নিশ্চিন্ত হলাম।আমি চোখ মেলে চেয়ে দেখলাম,এই রাক্ষুসে অন্ধকারের বুকে ছুরি মেরে হাতে একটি অদ্ভুত আলো নিয়ে শশব্যস্ত হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে আমার দিকে অর্ধেক হেঁটে অর্ধেক ছুটে এগিয়ে আসছে গৌরী।
আতঙ্ক ওর মুখচোখ একেবারে গ্রাস করে নিয়েছে।ওর হাতের তালুতে একটি লাল আপেল।তবে এই আপেলটির ভিতর থেকে এমন অপার্থিব এক মায়াবী আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে চারপাশটা এমন রহস্যাবৃত মায়াবী কুহেলীতে আচ্ছন্ন করে তুলেছে যে আমার বা গৌরীর পা যে অন্তত পৃথিবীর মাটিতে নেই এটা বুঝতে আমার আর বেগ পেতে হল না।আমি কাঁপা কাঁপা গলায় তাকে শুধোলাম..."বাকি সবাই কোথায়?তোমার দাদাকে দেখেছ?"
গৌরী ভয়ার্ত কন্ঠে বলল,"দিদি...এই অন্ধকারে আমি কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না গো...হাঁটতে হাঁটতে আমিও এই জায়গায় চলে এসেছি।হঠাৎ করেই এই আপেলখানা কুড়িয়ে পেলাম।এটার থেকে যে আলো বেরোচ্ছে সেটার সাহায্যেই খুঁজে তোমাদের সবাইকে এতক্ষণ ধরে খুঁজে চলেছি।হেঁটে হেঁটে পথ ফুরোয় না...আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না কেমন করে তোমাদের খুঁজব...মরতে যখন হবেই একসঙ্গে মরাই ভালো তাই না!তা যা হোক শেষ পর্যন্ত দাদাকে খুঁজে পেয়েছি।উনিও হেঁটে হেঁটে শুধু তোমার খোঁজ করছিলেন।এখন ক্লান্ত হয়ে এক জায়গায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন।তাই আমি তোমায় খুঁজতে খুঁজতে আসছিলাম। ভালো হল।দাদা অপেক্ষা করে রয়েছেন।তুমি আর দেরী কোরো না।চলো আমার সঙ্গে।"
গৌরীর কথা শুনে আমার ধড়ে যেন প্রাণ এল।তোমার দাদুর খবরখানা পেয়ে আমার মন আবার উচাটন হয়ে উঠল।আমি সাথে সাথে গৌরীকে বললাম "চলো...চলো গৌরী...এখনই তোমার দাদার কাছে আমায় নিয়ে চলো।"
---হ্যাঁ তোমায় নিয়ে যাওয়ার জন্যই তো এসেছি।আমি এগোচ্ছি তুমি সাবধানে এসো আমার পিছনে।আমি উতলা চিত্তে গৌরীর পিছু নিলাম।চারপাশটা এখন আর আগের মতো নিকষ অন্ধকার নয়।একটা মায়াবী রক্তিম আলোর মৃদু বিচ্ছুরণে চারপাশটা আবছা হলেও দেখা যাচ্ছে।চারপাশে মৃত শেয়াল কুকুর আর মানুষের হাড়গোড় পড়ে রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।বাতাসটা মনে হচ্ছে যেন ছ্যাঁকা দিতে চাইছে শরীরে।মৃত্যু অবধারিত জেনেও আমার ভিতরটা ভীষণভাবে দুমড়ে মুচড়ে উঠছিল।মুখ দিয়ে কোনো কথা সরছিল না।
কিছুক্ষণ হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আমার একটা সন্দেহ হল।গৌরীর হাঁটা চলা কথা বলার ধরণধারণ কেমন জানি অন্যরকম।ট্রেনে করে আসবার সময় মেয়েটাকে যেমন দেখেছিলাম...এখন ওর সন্দেহজনক বাচনভঙ্গি,ইঙ্গিতপূর্ণ চোখের চাহনি দেখে আমার মনের ভিতরটাতে কেমন যেন কু ডাক শুরু হল।তার পরক্ষণেই আমার মনে হল...ধুর...জীবনের অন্তিমকালে পৌঁছে আমার মাথাটাই গেছে।একটা মানুষ খামখা বদলাতেই বা যাবে কোন দুঃখে!বাংলোর ভিতরে ঢোকা ইস্তক যা সব ঘটে চলেছে চোখের সামনে,তাতে আমার মাথাটাই গেছে।আমি এইসব চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বরং তোমার দাদুর কথা মনে করে আরো বেশি উচাটন হয়ে গৌরীর পিছন পিছন এগিয়ে চললাম।গৌরী এসে থামল একটা বিকট দর্শন দরজার সামনে।একটি বিশালাকৃতি মড়ার খুলির উন্মুক্ত হাঁয়ের ভিতরে দরজা।
"এ কোন জায়গায় এসে পড়লাম বলো তো গৌরী..."
ভয়ার্ত কন্ঠে বললাম আমি।
চিন্তান্বিত কন্ঠে সে বলল...এ যে কোন অভিশপ্তপুরীতে এসে পৌঁছোলাম আমরা তা কেবল ঈশ্বরই জানেন।এই দরজার ভিতর দিয়ে ঢোকো...দাদা এখানেই বিশ্রাম নিচ্ছেন। আমি বরং বাকিদের খোঁজ করি যাই...সবাই একসাথে হলেই ভালো হয়..."
আমি বললাম,হ্যাঁ ঠিক বলেছ গৌরী...ঢুকেছি যখন একসঙ্গে মরবও একসঙ্গে। তুমি বাকিদের খোঁজ করো...আমি তোমার দাদাকে নিয়ে আসছি।"
সম্মতি জানিয়ে গৌরী পিছন ফিরে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল।এই দৃশ্যটা আমার মনে একটা তীব্র খটকা তৈরি করল।তার পরক্ষণেই তোমার দাদুর কথা মনে পড়তেই আমি খুলি দরজার উন্মুক্ত হাঁয়ের ভিতরে ছুটে গেলাম।সেখানে ঢুকে যে দৃশ্য দেখলাম তাতে আমার রক্তহিম হয়ে গেল।চোখের সামনে লুটিয়ে রয়েছে গৌরীর রক্তাক্ত থ্যাঁতলানো আধখাওয়া মৃতদেহ।
আমার সারা শরীর এবার থরথর করে কাঁপতে লাগল তীব্র আতঙ্কে। এতক্ষণ তাহলে যার সাথে কথা বলছিলাম...যার সাথে এতটা পথ হেঁটে এলাম,সে তাহলে কে!!
আমার সামনে সমস্তকিছু যেন ভীষণভাবে আন্দোলিত হতে শুরু করল।আমি বুঝতে পারছি আমার সমস্ত চেতনা লোপ পাচ্ছে।আমি দুচোখে রীতিমতো অন্ধকার দেখতে শুরু করলাম।এমন সময়ে হঠাৎ আমার কাঁধে একটা মানুষের হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম।আমার মনে হল...যেন তোমার দাদু অবশেষে এই সর্বনেশে গোলকধাঁধায় আমায় খুঁজে পেলেন।আমি ব্যগ্রচিত্তে সাথে সাথে পিছনে ঘুরে তাকালাম।তবে তাকিয়ে আশাহত হলাম,কারণ আমার কাঁধে যার হাতের স্পর্শ আমি অনুভব করেছি সেই স্পর্শ তোমার দাদুর ছিল না।আমার কাঁধে হাত রেখে রীতিমতো জিভ বার করে দম নিচ্ছে সুরবালা।আর তার পিছনে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন কুন্তলবাবু।চারপাশে এক অপার্থিব আবছা মায়াবী আলোর আচ্ছাদনে এক অমোঘ মৃত্যুর হাতছানি প্রতিমূহুর্তে যেন জানান দিচ্ছে ...হাতে সময় খুবই কম।পায়ের তলায় যেন আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভা কোনোমতে চাপা দেওয়া রয়েছে।যেকোনো মূহুর্তে অগ্নিকুন্ড যেন মুক্তির উল্লাসে সর্বগ্রাসী লেলিহান হয়ে আমাদের সবাইকে গিলতে আসবে।নরকের দরজার ভীষণ কাছাকাছি এসে গিয়েছি আমরা...এটা উপলব্ধি করতে আমার আর বড় একটা বাকি রইল না।সুরবালা আমার দুইহাত ঝাঁকিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত বিস্ফারিত চোখে রীতিমতো হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল..."দিদিভাই...সর্বনাশ হয়ে গেছে...গৌরীর ভিতর কোনো খুনে আত্মা ভর করেছে।ও নিজের স্বামীকে আমাদের চোখের সামনে নৃশংসভাবে খুন করে উন্মাদ পিশাচের মতো খুবলে খুবলে মাংস খাচ্ছিল।আমরা সে দৃশ্য চোখে দেখতে পারছিলাম না...চিৎকার করে যখন অচিন্ত্যবাবুকে ডাকতে গেলাম...তখন হঠাৎ গৌরী ওর এই পৈশাচিকতার ঘোর থেকে বেরিয়ে এল যেন...তারপর হঠাৎ আমাদের দুজনের দিকে একটা ক্রূর দৃষ্টি নিয়ে ওর তীক্ষ্ণ দাঁত নখ বাগিয়ে তাড়া করতে শুরু করল।তোমায় আর কি বলব ভাই...অচিন্ত্যবাবু প্রথমে গায়েব হলেন এই ফাঁদ থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে।তারপর বাংলোর ভিতরে ঢুকে তুমিও ওনাকে এলোপাথারি খোঁজাখুঁজি করতে শুরু করলে।মাঝে একবার অচিন্ত্যবাবু রীতিমতো হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এসেছিলেন আমাদের কাছে।উনি বললেন..."তোমায় ডেকে যেন সাবধান করে দিই আমরা।সামনে খুব বড় একটা বিপদ আসছে।"
বলেই তিনি বাংলোর ভিতরে উধাও হয়ে গেলেন।তারপর বাংলোর ভিতরকার চেনা সেই ভঙ্গুর চেহারা পালটে সেটা ক্রমশ ধীরে ধীরে এই ভয়াল মৃত্যুপুরীর রূপ নিল আমাদের চোখের সামনে।বাংলোরই কোনো অস্তিত্ব আর নেই তো তার দরজা কোথায়ই বা পাব আমরা!ক্রমশ কে যে কোথায় হারিয়ে গেল এই গোলকধাঁধার ভিতরে তা ঈশ্বরই জানেন।আমরা গৌরীর ওই আগ্রাসনের সামনে থেকে কোনোমতে পালিয়ে এসেছি।তোমায় বলছি ভাই...প্রথমটা তুমি ধরতেই পারবে না যে গৌরী আর আগের অবস্হাতে নেই।যদি ওর সাথে তুমি মুখোমুখি হও তাহলে সাথে সাথে পালিও।নাহলে তোমার অবস্হাও অজিতেশবাবুর মতো হবে।"
একনাগাড়ে এতটা বলে ভীষণভাবে হাঁপাচ্ছিল সুরবালা।আর মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়া কুন্তলবাবু এখন সংজ্ঞা হারিয়ে অচৈতন্য অবস্হায় লুটিয়ে পড়ে রয়েছেন। অজিতেশ বাবু আর আমাদের মধ্যে নেই...শেষ পর্যন্ত তার কি মর্মান্তিক পরিণতি হল...এটা ভেবেই আমার সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে উঠল।
সুরবালা বলল..."
অচিন্ত্যবাবুর খোঁজ পেলে?উনি কোথায় আছেন?যে কোনো পরিস্থিতি আসুক...ওনার সমস্তকিছুর শেষ পর্যন্ত্য লড়ে দেখে নেওয়ার বেপরোয়া মনোভাবটা না শেষে ওনার কাল হয়ে দাঁড়ায়!ওনার স্হির বিশ্বাস...এই ফাঁদে ঢোকার রাস্তা যখন আছে...তখন বেরোবার রাস্তাও রয়েছে। পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে
তিনি এখন মরিয়া।তুমি ওনাকে খুঁজে বার করে তাঁকে আটকাও।না হলে ওনারও অজিতেশ বাবুর মতো দশা হতে বাকি থাকবে না...আমি দেখি আমার স্বামীর জ্ঞান ফিরিয়ে তাঁকে সুস্হ করি গে...
আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম।আমি সুরবালাকে বললাম...
"তুমি কুন্তলবাবুকে দেখো...আমি দেখি...যেমন করে হোক ওনাকে খুঁজে বার করতেই হবে।"
আমি আর একদন্ডও না সময় নষ্ট না করে..."যা হবার হয়ে যাক "...এই মনোভাব নিয়ে পাগলের মতো তোমার দাদুর খোঁজ করতে শুরু করে দিলাম ওই আর সর্বনেশে গোলকধাঁধার শিরায় উপশিরায় আরো গভীরেভাবে জড়িয়ে যেতে থাকলাম।
সামনে যত এগোতে থাকি, অপার্থিব কোনো প্রজ্জ্বলিত আগুনের লেলিহান শিখা সদৃশ এক ভয়াল আগুনের আস্ফালনের প্রতিরূপ তীক্ষ্ণ একধরনের আলো ক্রমশ তার জালবিস্তার করতে থাকে...দেখতে পাই।আর সেই আলোতেই আমি বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে দেখি...চতুর্দিকে শাখাপ্রশাখার ন্যায়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে অতল গহ্বরের মতো রাস্তা।আমি দিকভ্রষ্ট পথিকের মতো চলতে থাকি সামনে।হঠাৎ একটা দৃশ্য দেখে আমার রক্ত হিম হয়ে যায়।দেখলাম,সামনে কুন্তলবাবুর আধখাওয়া মৃতদেহটি ক্ষতবিক্ষত আর রক্তাক্ত অবস্হায় বীভৎসভাবে লুটিয়ে পড়ে রয়েছে।দুই কি তিন সেকেন্ড আগেও আমি দেখলাম মানুষটা চিন্তান্বিত হয়ে মাথায় হাত দিয়ে ভূমিসংলগ্ন হয়ে বসে রয়েছেন...আর মাত্র কয়েক মূহুর্তের মধ্যেই তার এমন মর্মান্তিক পরিণতি কি করে হতে পারে...আমি এবার ভয়ে কাঁপতে শুরু করলাম।আতঙ্কে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম।এই তীব্র আতঙ্কের মধ্যেও একটা ব্যাপার আমার মাথার ভিতর ঝিলিক দিয়ে গেল।সুরবালাকে আমি অত্যন্ত সচেতনভাবে মুছতে দেখেছি তার ঠোঁটের কোণ ভিজে থাকা আঠালো লাল তরলজাতীয় কিছু।সেটা যে আসলে মানুষের রক্ত...এবং অন্য কেউ নয়, তারই স্বামীর রক্ত এটা আমি অচিরেই বুঝে ফেললাম।আর সাথে সাথে আমার এও চকিতে মাথায় এল,আমার সাথে কথা বলার সময়ে গৌরীও তার হাতের তালুতে লেগে থাকা এমনই দাগ সচেতনভাবে মুছে নিয়েছিল।আর তারপরেই আমি অজিতেশবাবুর আধখাওয়া ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ চাক্ষুষ করি।এসব কি হচ্ছে!কেন হচ্ছে !আমার হাত পা যেন পেটের ভিতর সেঁধিয়ে ঢুকে যেতে চাইছে।এই নস্বর জীবনের আর যে কোনো রেয়াতই নেই সেটা আমি ভীষণভাবে অনুভব করতে শুরু করেছি।হঠাৎ আমার,তোমার দাদুর কথা মনে পড়ল।তিনি কোথায় কি অবস্হায় রয়েছেন সেটা জানার জন্য...তাঁকে একবার স্বচক্ষে দেখবার জন্য আমার প্রাণটা কেঁদে উঠল।মৃত্যুর অমোঘ ঘন্টাধ্বনি যতই বুকের ভিতর দামামা বাজাক...আমি আমার মনের ভিতরে যত শক্তি ছিল সব একসাথে জমা করে ফের উঠে দাঁড়ালাম।মাথাটা ভীষণ ঘুরছিল।তাও টলমল পায়ে এক পা...দুই পা...এগোতে থাকলাম।হঠাৎ সামনে যে দৃশ্য দেখলাম তাতে আতঙ্কে ভয়ে আর আমি দুইপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেললাম।চোখের সামনে পড়ে রয়েছে গৌরীর আধখাওয়া মৃতদেহ।আমি আর সহ্য করতে পারলাম না।আমি জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লাম সেই লাভার মতো উত্তপ্ত অপার্থিব ভূমিতে।কতক্ষণ সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে ছিলাম জানি না।ধীরে ধীরে চোখ মেললাম।চারদিকে নিস্তব্ধতা যেন ছোবল মারছে।অদূরে মাথায় হাত দিয়ে বসে রয়েছেন রমাকান্তবাবু।তাকে দেখে সহজেই বোধগম্য করতে পারলাম,তিনি মারাত্মক বিদ্ধস্ত এবং আতঙ্কগ্রস্হ।পথভ্রষ্ট পথিকের মতো ধপ করে যেন বসে পড়েছেন একটু দম নেওয়ার জন্য।ওনাকে দেখে আতঙ্কগ্রস্হ বলে মনে হল।আর আতঙ্ক যে কি প্রকার ভয়ানক হতে পারে সেটা খুব সহজেই অনুমেয়।আমি চারপাশটা ভালো করে দেখে নিলাম।আমি যেন অবস্থান করছি কোনো গোপন সুড়ঙ্গপথের পেটের ভিতর যার শিরা উপশিরা ফিসফিস করে প্রতি মূহুর্তে বলে দিয়ে যাচ্ছে..."আর নিস্তার নেই"।
উত্তপ্ত গলিত লাভার প্রচন্ড উত্তাপেরা যেন সাময়িক জিরিয়ে নিচ্ছে এখানকার বাতাসের প্রতিটি কণায়, কণায় আর শানিয়ে নিচ্ছে নিজের লেলিহান মৃত্যুপ্রলয়ের তরবারিটি।নরকের দ্বারের একেবারে নাগালের ভিতরে চলে এসেছি এটা উপলব্ধি করতে পারার আর কিছু বাকি নেই।অজিতেশ বাবু...গৌরী...কুন্তল বাবু এদের সকলের বীভৎস মৃত্যু চাক্ষুস করেছি আমি।হঠাৎ আমার মনে হল...রমাকান্তবাবু যদি এই রহস্যাবৃত গোলকধাঁধার ভিতর কোনোভাবে দেখে থাকেন তোমার দাদুকে...কোথায় কি অবস্হায় এখন আছেন তিনি...এটা যদি তিনি দেখে থাকেন...আমার প্রাণটা আকুলিবিকুলি করে উঠল।আমি তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করার উদ্দেশ্যে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলাম।দেখলাম,রমাকান্ত
বাবু একটু একটু করে মাথা তুলছেন।মাথা তুলে তাঁর স্হির এবং শীতল দৃষ্টি আমার দিকে নিক্ষেপ করলেন। মৃদু রক্তাভ আলোয় আমি হঠাৎ স্পষ্ট লক্ষ্য করলাম ...রমাকান্ত বাবুর দুই হাতের আঙুলের ডগায় লেগে থাকা চাপ চাপ রক্ত।এই দৃশ্য দেখে আমার যেন শ্বাসরোধ হওয়ার উপক্রম হল।আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম।কে যে কাকে কেন এভাবে নৃশংস হত্যা করে চলেছে তার কোনো দিশা খুঁজে পেলাম না আমি।তবে রমাকান্ত বাবুর হাতে রক্ত দেখে আমার হঠাৎ গৌরী আর সুরবালার সাথে কথপোকথনের সময়গুলি আমার মনের দৃশ্যপটে হঠাৎ ভাসতে শুরু করল।আর তার সাথে ভেসে উঠল অজিতেশ বাবু,কুন্তলবাবু আর গৌরীর অন্তিম পরিণতির মর্মবিদারক চিত্র।এক অজানা ভয়ে আমি হঠাৎ রমাকান্ত বাবুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য প্রাণপণে যেদিকে দুচোখ যায় দৌড়োতে শুরু করলাম।
ভয়ে আতঙ্কে অন্ধ হয়ে উন্মাদের মতো দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ সোজা গিয়ে ধাক্কা খেলাম তোমার দাদুর পৃষ্ঠদেশে।ধাক্কাটা খেয়ে তারপর আমার হুঁশ ফিরল।আমি আমি যখন তাঁর এই স্বশরীরে উপস্থিতিটা বাস্তবিক রূপে উপলব্ধি করলাম তখন আমি পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে তাঁকে প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম।উনি আমাকে পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করতে লাগলেন।আর আমার কানের কাছে নিজের মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন,"দুশ্চিন্তা কোরো না।আমাদের মরতে হবে না।বেঁচে যাব।"
তাঁর বলা প্রতিটি শব্দের মধ্যে এমন একটা দৃঢ়তা ছিল,যে এই সাংঘাতিক মরণফাঁদের ভিতরে ওই ভয়াবহ পরিস্থিতির ভিতরে আমি যেন ভীষণভাবে মনোবল পেলাম।জীবনকে ফের আঁকড়ে ধরবার আশা পেলাম।উনি আমাকে বললেন..."সর্বজয়া...তুমি রমাকান্তকে কোথাও দেখেছ?ওর সাথে একটু আগে আমার দেখা হয়েছিল।কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপারখানা কি জান?ও আমাকে দেখে হয়তো কিছু বলবে বলে এগিয়ে আসছিল।তারপরেই হঠাৎ ওর কি মনে হল...আমার দিকে একবার তাকিয়েই এমনভাবে দৌড় দিল যেন ওকে আমি এক্ষুনি জ্যান্ত খেয়ে ফেলব।ওকে আর দোষ কি দিই...ইতিমধ্যেই অজিতেশ,গৌরী আর কুন্তলের কি অবস্হা হয়েছে সেটা তুমি জান?"
আমার দুচোখ দৃঢ়ভাবে যেন বন্ধ হয়ে এল।ওদের পরিণতির সে দৃশ্য কল্পনা করাটাও যেন অভিশাপের।
তোমার দাদু বললেন..."রমাকান্তকে দেখে তোমার কি কোনো সন্দেহ হয়েছিল সর্বজয়া?সত্যি করে বলো।"
উনি ব্যাপারটা ধরে ফেলেছেন দেখে আমি আরও শক্ত করে ওনার হাতটা চেপে ধরলাম।চাপা গলায় বললাম..."শ্...শ্...শ্..."
আস্তে বলো...কি যে হয়ে চলেছে কিচ্ছু মাথামুন্ডু বুঝছি পারছি না...কিন্তু এটুকু পরিষ্কার...আমরা দুজন বাদে বাকি প্রত্যেকে নৃশংস ভাবে মরেছে নয় বাকিদের মারার জন্য দাঁত নখ শানাচ্ছে।
আমাদের দুজনকে এখন বাকি সকলের আশা ছেড়ে ওদেরই হাত থেকে বেঁচে ফেরার চেষ্টা করতে হবে।
উনি বললেন..."গন্ডগোলটা যে কোথায় হয়েছে সেই সূত্রটা বোধহয় আমি ধরতে পেরেছি সর্বজয়া।আর আমি যদি খুব ভুল না হই...তাহলে আমরা এখন নরকের দরজার একেবারে কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছি।বহু বছর আগে এই বাংলোতে প্রেতযোনির উপাসনা হয়েছিল যার ফলপ্রসূ প্রায় একশো বছর আগে এই বাংলোর সাথে ক্ষণিকের জন্য নরকের দরজার একটা দৃঢ় সংযোগ স্হাপিত হয়েছিল।নরকের দ্বার থেকে বেরিয়ে আসা রক্তপিপাসু প্রেতাত্মা মানুষের শরীরে বাসা বেঁধে অন্য মানুষকে হত্যা করে তার রক্তপান করে।এ প্রেতাত্মা মহামারীর থেকেও ভয়ংকর।একজন মরে আর অশুভ আত্মা তক্ষুনি ভর করে অন্য মানুষের শরীরে।এই আত্মা যদি একবার পৃথিবীর মুক্ত বাতাসে নিজের অস্তিত্ব করে নিতে পারে...তাহলে আর দেখতে হবে না।গোটা পৃথিবী একেবারে শ্মশানভূমিতে পরিণত হবে।তুমি সাবধানে থাকো এখানে।কোথাও যেও না কিন্তু...রহস্যের নিরানব্বই ভাগ আমি সমাধান করে ফেলেছি।এই কবচটা তোমার হাতে সাবধানে রাখো।এখন কোনো প্রশ্ন কোরো না।আমাদেরই কারোর হাত লেগে মন্ত্রঃপূত কবচটা মাটিতে পড়ে গিয়ে তার শক্তি ফিরে পেয়ে জেগে উঠেছে পুনরায়।ফের নরকের দরজা এসে ঠেকেছে এই শতবর্ষ পুরোনো বাংলোয়।আগে এই অপশক্তিকে যেভাবে হোক ঠেকিয়ে তাকে ফের এই কবচের ভিতর বন্দী করতে হবে।আমি যতক্ষণ না আসছি...এটা যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখবে।আগামীর পৃথিবীর পরিত্রাণ এখন তোমার হাতে সঁপে দিলাম।সাবধানে থাকো এইখানে আমি এক্ষুনি আসছি।রমাকান্তর সাথে আমায় একবার দেখা করতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।"
রমাকান্তবাবুর নাম শোনামাত্র আমার আতঙ্কে কালো হয়ে ওঠা মুখ দেখে উনি সাথে সাথে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন..."ভয় পেয়ো না...রমাকান্তর সাথে দেখা করলে আমার কোনো ক্ষতি হবে না।জীবন আর মৃত্যুর মাঝে এখন ছলনার খেলায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছে আগামী পৃথিবীর নিধনযজ্ঞের অশনিসংকেত।ওই শয়তানী আত্মাকে কজ্বা করে ফের এই কবচে পুরব আমি।কবচটা হাতে নিয়ে এখানেই অপেক্ষা করো আমি আসছি।"
কথাগুলো তাড়াহুড়ো করে শেষ করেই ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেলেন উনি।আর আমি হতভম্বের মতো নিষ্পলক চেয়ে রইলুম আমার দৃষ্টিসীমা হতে তাঁর বাহির হওয়া অব্দি।উনি আমায় যা যা বলে গেলেন...তার কোনোকিছুই আমি ঠাহর করতে পারলুম না।কিন্তু অনাগত ভবিষ্যতের কোনো অজানা কালছায়ার অশনিসংকেত অনুভবহেতু তাঁর চোখেমুখে গভীর দুশ্চিন্তার ভাঁজ দেখেছি তাতে ভয়ে আমারও হাত পা শীতল হয়ে এল।
হঠাৎ অনুভব করতে শুরু করলাম,আমার চারপাশের বাতাস ভীষণ রকমের গুমোট লাগতে শুরু করেছে।আমার দমবন্ধ হয়ে আসবার উপক্রম হয়েছে।চারপাশ থেকে যেন বহুযুগের মুক্তিপিপাসু উত্তপ্ত লাভার মতো আগুনের হলকার এই অকস্মাৎ আগ্রাসনে আমার তো প্রাণ যায় যায় অবস্হা।এটা পরিষ্কার বুঝতে পারলাম,আর একটা মিনিটও যদি আমি দাঁড়িয়ে থাকি তাহলে হয়তো শ্বাসবন্ধ হয়ে মরেই যাব।আমি পড়ি কি মরি হয়ে সামনে যেদিকে দুচোখ যায়,ছুটতে শুরু করলাম।ক্রমশ আমি অনুভব করতে থাকলাম,একটা দৈত্যাকার ড্রাগনরূপী অগ্নিপিন্ড যেন পাতাল ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে তার বহুযুগ ধরে জমে থাকা আক্রোশ এক লহমায় উগরে দিচ্ছে উন্মাদের মতো।আমার মাথায় তখনো তোমার দাদুর বলা কথাগুলো বারংবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।আমি তাঁর কথাগুলোর সারমর্ম একটু একটু করে উপলব্ধি করতে শুরু করেছি।আমার ডান হাতের তালুতে তোমার দাদুর দেওয়া কবচখানি দৃঢ়ভাবে মুষ্ঠিবদ্ধ করে নিয়ে শরীরে মনে যতটুকু শক্তি অবশিষ্ট ছিল সমস্তটুকুকে একসাথে জড়ো করে নিয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে শুধু সামনের দিকে ছুটতে থাকলাম।আমি যেন এক অতিকায় সাপের পেটের ভিতর দিয়ে ছুটে চলেছি যার দৈর্ঘ্যের কোনো সীমা পরিসীমা নেই।চতুর্দিক হতে ক্রমাগত লকলকে জিহ্বার মতো শত শত ফণা তুলছে আগুনের লেলিহান শিখা।আমি তখন বুঝেই নিয়েছিলাম,বাঁচার কোনো রাস্তাই আর অবশিষ্ট নেই।শুধু তোমার দাদুর সাথে যদি একবার মুখোমুখি হয়ে যেতে পারি...তবে একসাথে মরতে তো পারব...এই আশা নিয়েই ছুটে চলেছি প্রাণপণ।এমন সময়ে আমার দুই পায়ের তোলপাড় করা গতি যার সাথে ধাক্কা খেয়ে স্তিমিত হল সেই দৃশ্য দেখে যে আমার খুব বেশি বিস্ময়ের উদ্রেগ হল,তা নয়।আমার পা ঠেকেছে সুরবালার ক্ষতবিক্ষত এবং ছিন্নবিচ্ছিন্ন আধখাওয়া মৃতদেহের গায়ে।আমার মনটা এবার সাংঘাতিকভাবে কু ডাক দিল।আমি আরো তীব্রগতিতে সামনের দিকে ছুটতে শুরু করলাম।আমি কোথাও যেন বুঝতে শুরু করলাম...আমার হাতের এই কবচের সঙ্গে দৈত্যাকার ড্রাগনরূপী আগুনের এই ভয়ানক আস্ফালনের একটা কোনো সংযোগ আছে।সে ভীষণভাবে তড়পাচ্ছে...ছটফট করছে।
আমি উন্মাদপ্রায় হয়ে শুধু সামনের দিকে ছুটে চলেছি।হঠাৎ সামনে দেখি...তোমার রমাকান্ত বাবু আর দাদু ছুটে আসছেন আমারই দিকে।তোমার দাদু চেঁচিয়ে বলে উঠলেন..."সর্বজয়া...কবচটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে থাকো..."।
তারপর চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই উনি প্রায় যেন উড়ে এসে বাজপাখির মতো খপ করে আমার হাতের মুঠো থেকে যেন ছিনিয়ে নিলেন কবচটা।তারপর সাথে সাথে বলে উঠলেন..."রমাকান্ত...কুইক..."।
কথাটা তাঁর মুখ থেকে নির্গত হওয়ার সাথে সাথেই প্রায় ততোধিক গতিতেই রমাকান্ত বাবু নিজের পকেট থেকে প্রায় বিদ্যুত গতিতে বার করে ফেললেন একটি সুদৃশ্য কাঁচের বাক্স।সেটি তোমার দাদুর হাতে দিয়ে তিনি ভাঙ্গা কাঁপা গলায় বলে উঠলেন..."দাদা...সময় আর নেই...জলদি...।
বাক্সটা হাতে পাওয়ামাত্রই তোমার দাদু সাথে সাথে তার ভিতরে কবচখানা পুরে রাখলেন আর সাথে সাথে আমি দেখলুম এক বিস্ময়কর ঘটনা।দৈত্যাকার আগুনের লেলিহান শিখার ড্রাগনরূপী সেই দানবটা কেমন বাধ্য শিশুর মতো সুড়সুড় করে সেই বাক্সের ভিতরে ঢুকে গিয়ে একেবারে নিশ্চিহ্ন...অদৃশ্য হয়ে গেল।আর তার প্রায় সাথে সাথেই সেই সুদৃশ্য কাঁচের বাক্সটির উপরে আমাদের তিনজনের চোখের সামনে দিয়ে আস্তে আস্তে কাঁচের প্রলেপ তৈরি হয়ে গেল।আমি অবাক হয়ে দেখলুম,কাচের আবরণের ভিতরে কবচটি কেমন নিরীহ শিশুর মতো যেন ঘুমিয়ে রয়েছে।কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা তিনজনেই বুঝলাম...সেই ভয়াল অতিপ্রাকৃতিক জগৎ...ওই উত্তপ্ত লাভারূপী অগ্নিগহ্বরের চিহ্নমাত্র আর নেই।আমরা এখন দাঁড়িয়ে রয়েছি যেখানে সেটি একটি ভগ্ন বাংলোবাড়ি যার ভিতরে রাত কাটাবার জন্য আমরা সাতজন ঢুকেছিলাম অ্যাডভেঞ্চার করার লোভে।আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এখন সেই বাংলো বাড়ির ভিতরে দাঁড়িয়ে আমরা মাত্র তিনজন।আমি...তোমার দাদু আর রমাকান্ত বাবু।বাংলো থেকে বাইরে এসে যখন শেষ পর্যন্ত ফিরলাম...তখন আমাদের চারদিকে শুধুই শোকের ছায়া।সাতজনের মধ্যে জীবিত ফিরতে পেরেছিলাম আমরা মাত্র তিনটি মানুষ...আর বাকি চারজনের যে অন্তিম পরিণতি আমরা চাক্ষুস করেছি,তা আর কোনো মানুষকে বর্ণনা করার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।তাদের আধখাওয়া ছিন্নবিচ্ছিন্ন দেহাবশেষ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি কোনোভাবেই।তাদের পরিবার পরিজনের আছড়ে পড়া শোকের ঝড় সামলানোটা মারাত্মক বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।আমার শরীর তখন ভীষণভাবে ভেঙ্গে পড়েছে।মন মেজাজও একেবারেই ভালো নেই।মনটা একটু ভালো করার জন্য ভাবলাম,লাইব্রেরীর ঘরে গিয়ে দুচারখানা বই নিয়ে এসে পড়ব।এই ভেবে লাইব্রেরীর ঘরের দরজার দিকে পা বাড়ালাম।রাত তখন সাড়ে বারোটা হবে।বাড়িদ সবাই ঘুমে কাদা।লাইব্রেরীর ঘরের দিকে যেতে গিয়েই বুঝলাম...লাইব্রেরীর ঘরের ভেতরে আলো জ্বলছে।কেউ নিশ্চয়ই রয়েছে লাইব্রেরীর ঘরে।আমি ধীরপায়ে লাইব্রেরীর দরজাটা খুলে দেখলাম...তোমার দাদু লাইব্রেরীর ঘরের একটা কোণার দিকে চেয়ার টেনে বসে একমনে কি যেন পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন।একটু কাছে যেতে বুঝলাম,উনি নিজের ডানহাতের তালুতে সেই সুদৃশ্য কাঁচের বাক্সখানি নিয়ে একমনে পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন।
আমি কাছে যেতেই তিনি যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন।আমি তাঁকে রীতিমতো ঝাঁঝিয়ে উঠে শুধোলাম..."ওই অভিশপ্ত জিনিসটা এখনো কেন পুষে রেখে দিয়েছ তুমি?"
তোমার দাদু শশব্যস্ত হয়ে আমায় থামিয়ে দিলেন।
"আস্তে...এই বাক্সটার অস্তিত্বের কথা কেউ যেন না জানতে পারে..."
আমি বললাম...ওই জিনিস তুমি কেন নিজের সাথে করে নিয়ে এসেছ?ওই কবচের দিকে অমনভাবে চেয়ে কি ভাবছ তুমি?যাদের যাওয়ার ছিল,তারা তো গেছেই...আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।ওই অভিশপ্ত জিনিস শিগগির ফেলে দাও বলছি...নাহলে আমি একেবারে দক্ষযজ্ঞ বাঁধিয়ে ছাড়ব বলে দিলাম।"
ওই কবচ পুনরায় তোমার দাদুর হাতে দেখে যতটা আতঙ্ক গ্রাস করেছিল আমায়...ততটাই রাগ উঠে গিয়েছিল আমার।
তোমার দাদু বললেন,"দীপা...এই ছোট্ট কাঁচের ভিতরেই লুকিয়ে রয়েছে নরকের পিশাচ প্রেতাত্মা।গোটা পৃথিবীকে শ্মশানভূমি করে ফেলবার ক্ষমতা রাখে এই কবচ।যখন আমরা মৃত্যুফাঁদে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা পড়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম...তখন আমি মুক্তির পথ খুঁজতে খুঁজতে এই কবচের সন্ধান পাই।তুমি শুনবে এ কবচের ইতিহাস?
বিস্ময়ে আমার মুখ দিয়ে যেন কথা সরছিল না।তোমার দাদুর কথার শেষে আমার মুখ দিয়ে যেন অজান্তেই বেরিয়ে গেল..."শুনব"...।
তবে শোনো এ কবচের প্রকৃত অস্তিত্ব আর ইতিহাস।...
আমি চেয়ার টেনে তোমার দাদুর সামনে একখানি চেয়ার এনে তাতে বসলাম গভীর বিস্ময় আর প্রশ্নের ঝুলি নিয়ে।উনি বলতে থাকলেন...
"যখন ওই বাংলোয় আমরা সকলে আটকা পড়ে গিয়েছিল...ধীরে ধীরে মৃত্যু যখন ঘাড়ে তার শীতল নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে...আমি তখন মরিয়া হয়ে খুঁজতে থাকি পরিত্রাণের যাহোক একটা কোনো রাস্তা।পাগলের মতো এদিক ওদিক হাতড়াতে হাতড়াতে হঠাৎ আমার হাতে এসে ঠেকে একটি সাদা কাগজ।সাদা কাগজ দেখে আমি সেটা একপাশে সরিয়ে রাখতে যাব...এমন সময় আমার হঠাৎ কি মনে হল...আমি কাগজটাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করলাম দেশলাই জ্বেলে সেই আগুনের আলোয়।যদিও কোনো অক্ষর দেখা যাচ্ছিল না...তবুও আমার কেন জানি না মন বারবার বলে উঠছিল,এই কাগজে কিছু লেখা আছে...আমাকে সে লেখা পড়তেই হবে।হঠাৎ আমার মাথার ভিতরে কে যেন বলে উঠল..."কাগজটায় আগুন ধরিয়ে দে..."আমি কেমন যন্ত্রের মতো ফস করে দেশলাই জ্বেলে দিলাম ওতে আগুন ধরিয়ে।এরপর যে দৃশ্য দেখলাম তার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না।চোখের সামনে আমি দেখলাম...কাগজটাতে কালো পোড়ার দাগ ধরা তো দূরের কথা...ওতে একটু একটু করে ফুটে উঠছে বাংলা হরফে কিছু অক্ষর।এইভাবে যখন পুরো কাগজটা অক্ষরে ভরে উঠল,তখন সে কাগজ আর কাগজ থাকল না।একটা বড়সড় চিঠির রূপ নিল। পরিত্যক্তচবাংলোবাড়িতে যে পা রাখবে,এ চিঠি যে তার উদ্দেশ্যে,সেটা বুঝতে আমার বাকি রইল না।আমি ক্রমশ আর কিছু না ভেবে সেই চিঠিখানি পড়ায় মনোযোগ দিলাম।সেই চিঠি পাঠোদ্ধার করেই জানতে পারলাম সব।সেই বাংলোবাড়ির যিনি মালিক ছিলেন তিনি ছিলেন একজন ধনী ব্যবসায়ী।তার ছিল বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি আর জমিজমা।দুই বছরের শিশুপুত্র বিমলকে রেখে তার প্রথম স্ত্রী অকালেই মারা যান।নিজের মাতৃহারা শিশুপুত্রের কথা ভেবেই তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন।কিন্তু তার দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভজাত পুত্র অজয় তার বৈমাত্রেয় জ্যেষ্ঠভ্রাতার প্রতি বিষদৃষ্টি পোষণ করত।প্রতিহিংসায় অন্ধ হয়ে সে তার সহজ সরল দাদাটিকে এমনভাবে মারবার পরিকল্পনায় ছিল যাতে সে পায় পৃথিবীর সবথেকে যন্ত্রনাদায়ক মৃত্যু।দাদার স্বভাব চরিত্র ভালো বলে দিনরাত বাবার মুখ থেকে দাদার প্রশংসার বাণী শুনতে শুনতে তার মনে হত...দাদাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে জ্যান্ত অবস্হায় যদি তার সর্বশরীরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে যন্ত্রনা দিয়ে দিয়ে তাকে শেষ করতে যদি পারত...তাহলে তার রাতের ঘুমটা একটু শান্তির হয়...।একদিন সে রাগে দুঃখে নির্বাসনে চলে গেল।কোথায় গিয়েছিল...কেন গিয়েছিল...কেউ জানত না।বছর পাঁচেক বাদে যখন সে ফিরল,তখন সবাই জানতে পারে,সে বিদেশ ভ্রমণে গিয়েছিল...এখন ঘরে ফিরেছে বাপের ব্যবসা দেখাশোনা করার জন্য।তার কদিনের মধ্যেই নিখোঁজ হয়ে যায় ওই পরিবারের জ্যেষ্ঠপুত্র।আর সমস্যার স্হাবর অস্হাবর সম্পত্তির মালিকানা চলে যায় বিদেশ ভ্রমণ সেরে ফিরে আসা কনিষ্ঠ পুত্র অজয়ের হাতে।সকলেরই প্রথমটায় সন্দেহ হয়েছিল,বিমলের এই রহস্যজনক অন্তর্ধানের পিছনে নিশ্চয়ই তার বৈমাত্রেয় ভাইয়ের হাত রয়েছে।দিন যত যায়,কানাঘুষো তত বাড়তে থাকে বটে,কিন্তু যখন কোনোভাবেই বিমলের মৃতদেহের খোঁজটুকু পর্যন্ত কেউ পেল না,তখন ধীরে ধীরে কানাঘুষো র তীব্রতা হ্রাস পেতে পেতে শেষে একেবারে থেমে গেল।আর আসল হত্যাকারীও বহাল তবিয়তে বাপের সম্পত্তির দখলদারি নিয়ে তাতে রাজ করতে থাকল।দিন কাটছিল বেশ।কেউ জানতেও পারেনি,দীর্ঘ পাঁচ বছর সে কিভাবে কোথায় ছিল।বড় দাদার প্রতি বাবার অপার স্নেহভালোবাসা দিনকেদিন যখন তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠছিল,তখন রাগে দুঃখে সে বাড়ি ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিল বহুদূরে...যেদিকে দুচোখ যায়...।লক্ষ্য ছিল শুধু একটাই।একদিন সে নিজে হাতে শেষ করবে বড় দাদাকে।সে জাহাজে করে অজানার উদ্দেশ্যে সাগরে পাড়ি দিল।সাগরপথে হঠাৎ তুমুল ঝড় উঠল।সমুদ্র এমন টালমাটাল হয়ে উঠল,যে জাহাজ তার গতি আর ভারসাম্য রাখতে পারল না। প মাঝসমুদ্রেই জাহাজডুবি হল।সে ধরে নিয়েছিল এই বুঝি তার অন্তিম মুহুর্ত।মাঝসমুদ্রে উত্তাল ঢেউএর প্রলয়ক্ষ্যাপা উন্মত্ত আছাড়িবিছাড়ির ভিতর ক্ষুদ্র কীটের ন্যায়ে সাঁতরানোর যে তার তীব্র প্রচেষ্টা...পরিশেষ তা ব্যর্থ হয়নি।দিশাহীনভাবে সাঁতরাতে সাঁতরাতে সে পৌঁছে যায় একটা অজানা দীপের কিনারায়।সেখানে সংজ্ঞাহীন অবস্হায় পড়ে ছিল কতক্ষণ তা হিসেবের বাইরে।আস্তে আস্তে চোখ মেলে যখন চারপাশে তাকাল,তখন সে দেখল...তাকে ঘিরে রয়েছে কতগুলো ছাইভস্ম মাখা ছালপাতার পোশাক পরিহিত বুনো আদিবাসীর দল।প্রথমটায় সে যারপরনাই হচকিয়ে গেলে পরে আস্তে ধীরে ওদের সাথেই মিলেমিশে থাকতে শুরু করে দিল।ডাক্তারি পাশ করা অজয় ওদের ছোটোখাটো অসুখ বিসুখ সারিয়ে তুলত।তাই ওরা তাকে ঈশ্বরজ্ঞান করত।ওদের সাথে থাকতে থাকতে সে শিখতে থাকল প্রাগৈতিহাসিক যুগের তন্ত্রবিদ্যার গুপ্ত বিদ্যা আর কলাকৌশল আর পরিশেষে হাতে পেল একটি মন্ত্রঃপূত কবচ।এই কবচের ভিতর থেকে তন্ত্রসাধনা সঠিকভাবে প্রয়োগ করার মাধ্যমে এর পিশাচশক্তিকে একবার জাগিয়ে তুলতে পারলে,সেই তন্ত্রসাধনার জায়গার সঙ্গে নরকের দরজার একটা সরাসরি যোগসূত্র তৈরি হয়ে ওঠে আর সেইখান থেকে বেরিয়ে আসে পৈশাচিক প্রেতাত্মা যা সামনে থাকা যে কোনো মানুষ অথবা প্রাণীর শরীরে ঢুকে পড়ে আর তারপরেই বেজে যায় ধ্বংসলীলার ঘন্টাধ্বনি।সে সামনে থাকা যেকোনো মানুষ বা প্রাণীকে ছলেবলে কৌশলে ভোলায় আর তারপর তাকে নৃশংসভাবে জ্যান্ত ছিঁড়ে খায় তার পরক্ষণেই তার সেই খাদ্যের রূপ নিজে ধারণ করে বেরিয়ে পড়ে নতুন শিকারের খোঁজে।এই পদ্ধতি চলতে থাকে...চলতেই থাকে।এভাবেই সেই অপার্থিব পৈশাচিক প্রেতাত্মার হাতে পরিশেষে শ্মশানভূমিতে পরিণত হওয়ার পথে যায় ধরিত্রীর মাটি।এই প্রেতাত্মার মুক্তি যদি একবার এই ধরিত্রীর বুকে সংঘটিত হয় তাহলে যদি না তাকে ফের এই কবচের ভিতরে পুরে না ফেলা পর্যন্ত চলতে থাকে তার মারণ ধ্বংসলীলা।এই হত্যালীলা একবার শুরু হয়ে গেলে পৃথিবী উজাড় হতে আর খুব বেশি সময় লাগবে না।এমন একটি শক্তির প্রয়োগক্ষমতা হাতে পেয়ে অজয়ের মনে হল,সে অবশেষে পেরেছে নিজের অদৃষ্টকে জয় করতে।আর কাউকে নয়...সে শুধু চেয়েছে নিজের বড়দাদাকে নৃশংস যন্ত্রনা দিয়ে হত্যা করতে।এখন এই অপার্থিব শক্তির প্রয়োগ ক্ষমতা হাতে পেয়ে সে সবার আগে মনে মনে পরিকল্পনা করে নিল...কিভাবে সে তাদের ছুটিতে বিলাসব্যসনের উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ করে রাখা বাংলোবাড়িটিতে তার দাদার রাত কাটানোর জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে আর সেখানে কবচ থেকে প্রেতাত্মাকে জাগিয়ে তুলে তার দেহ জ্যান্ত ছিঁড়ে খুবলে খাওয়ার নির্মম যন্ত্রনা দিয়ে হত্যা করবে।আর পরিশেষে পুনরায় ওই প্রেতাত্মাকে ফের বন্দী করে ফেলবে কবচের ভিতরে চিরকালের জন্য।প্রফুল্ল চিত্তে সে দীর্ঘ পাঁচ বছর বাদে সমুদ্রযাত্রার মাধ্যমে নিজের ঘরে ফেরার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল।সে ফিরে আসবার পরে পুত্রশোকে পাথর হয়ে পরা তার বৃদ্ধ পিতা বিহ্বলচিত্তে আকুল হয়ে তার হারিয়ে গিয়ে হঠাৎ ফিরে আসা পুত্রকে বুকে জড়িয়ে ধরে প্রাণত্যাগ করলেন।পরিবারের সবাই তাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে তুলল আর বুঝিয়ে দিল,আসলেই পরিবারে তার জায়গা কতখানি...।তার বড়দাদাও তাকে সব তিক্ততা ভুলে নিজের বুকের মাঝখানে তার জন্য পেতে দিল সোনার সিংহাসন।কিন্তু এতকিছুর পরেও বড়দাদার প্রতি তার প্রতিহিংসা গেল না।
গ্রামের গরীব চাষীর মেয়ে নয়নতারার সঙ্গে বিমলের দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কের কথাটা পরিবারের অন্দরমহলে কারোরই অজানা ছিল না।দীর্ঘ বছর ধরে বিমল নয়নতারাকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেওয়ার জন্য তার বাবার কাছে কাকুতি মিনতি করে চলেছে একটিমাত্র আশায়...এক না এতদিন ঠিক বাবা তাকে মেনে নেবেন।আর নয়নতারাও আকুল নয়নে বছরভর শুধুই অপেক্ষা করে চলেছে বিমলের পাশে অর্ধাঙ্গিনীরূপে দাঁড়ানোর একটু স্বীকৃতি পাওয়ার আশায়।এমনিভাবেই চলছিল...।ওদিকে তখন বিমল আর নয়নতারা দুজনেই পরিবারের কাছ থেকে বিয়ের জন্য এমনভাবে চাপ খাচ্ছিল যে পরিস্থিতি মারাত্মক তিক্ত হয়ে ওঠে।দুজনের দেখাসাক্ষাৎ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়।পরিস্থিতি যখন এমন একটি জায়গায় মোড় নিয়েছে,সেই সময়েই দীর্ঘ পাঁচ বছর নিরুদ্দেশ থাকার পর ঘরে ফিরে এসেছে অজয়।অজয় পরিস্থিতি মেপেজুপে নিয়ে বিমলকে ফাঁদে ফেলে মারবার ছকটা একেবারে পাকাপাকিভাবে কষে নিল।সে এমন ভাব দেখানো আরম্ভ করল...যেন দাদার এই যন্ত্রনায় সে ঘোরতর সমব্যথী।সে মনেপ্রাণে চায় দাদার সঙ্গে নয়নতারা নামে গরীব চাষীর মেয়েটির বিয়ে হোক আর তারা সুখী হোক।আর এর জন্য দাদাকে সবরকম সাহায্য করতে সে প্রস্তুত। ছুটিতে বিলাসব্যসনের উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত বাংলোবাড়িটাতে বিমলের সঙ্গে নয়নতারার একবার গোপনে সাক্ষাৎ করার একটা বন্দোবস্ত করে ফেলল সে।একসঙ্গে দুজনের খোঁজ না পাওয়া গেলে সহজেই সবাই ধরে নেবে দুজনে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে নিয়েছে।এই অপরাধে বাবা এমনিতেই দাদাকে ত্যজ্যপুত্র করবেন।আর তারপর দীর্ঘদিন ধরে তাদের খোঁজ যখন কেউ পাবে না...ততদিনে পরিস্থিতিকে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আসাটা তার পক্ষে একেবারেই কঠিন ব্যাপার হবে না।পরিকল্পনা কার্যকর করার জন্য অজয় গোপনে নয়নতারাকে খবর পাঠাল আর তাকে গোপনে বাংলোবাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসবার যাবতীয় বন্দোবস্ত করে ফেলল।বিমলের নিজের হাতে লেখা চিঠি হাতে পেয়ে নয়নতারা সাথে সাথে অজয়ের পাতা ফাঁদে পা দেবার আগে এতটুকুও চিন্তাভাবনা করল না।গভীর রাতে যখন বাংলোবাড়ির ভিতরে বহুদিনের তৃষ্ণার্ত প্রেম যখন প্রাণ ভরে তাদের বিরহযন্ত্রনার পিপাসা মেটানোর তীব্র আকুতির সাগরে মূহ্যমান...ঠিক তখনই অজয় তার সাথে করে নিয়ে আসা সেই কবচটা বার করে এবং ওই বাংলোবাড়ির সাথে একেবারে সোজাসুজি যোগসূত্র স্হাপন করে নরকের দরজার।তারপর বাংলোবাড়ির ভিতরের পরিস্থিতি যা হয়...সে তোমার আমার কারোরই অজানা নয়।বিমল সেখানেই মারা যায়।অজয়ের হাতে বেশি সময় ছিল না।ভোরের আলো ফোটার আগেই কাজটা সেরে নিয়ে সে নিজের শয্যায় গিয়ে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকবে এই ছিল তার পরিকল্পন। বিমল আর নয়নতারা দুজনেরই মৃত্যু হয়ে গিয়েছে ধরে নিয়ে অজয় তাড়াহুড়ো করে কবচটিকে নিষ্ক্রিয় করে দিল।আর ওইটাই অজয়ের সবথেকে বড় ভুল ছিল।নয়নতারা তখনো মরেনি।উপরন্তু সে অজয়ের সমস্ত কার্যকলাপ আড়াল থেকে লক্ষ্য করেছিল।সে জেনে ফেলেছিল কবচের প্রকৃত রহস্য।সে তখন একেবারে রণচন্ডীর রূপ ধারণ করল।হাতের সামনে পড়ে থাকা একটি ধারালো ছুরি হাতে পেয়ে সে অজয়কে রীতিমতো কাবু করে ফেলল।তারপর আহত রক্তাক্ত অজয়ের কাছ থেকে কবচটি নিজের হাতে নিয়ে নেওয়াটা একেবারেই কঠিন হল না তার কাছে।সে অজয়ের যাবতীয় কার্যকলাপ লক্ষ্য করে ওই কবচকে জাগিয়ে তোলার পদ্ধতিটি শিখে নিয়েছিল।এবার সে প্রতিশোধ নিতে নিজে অজয়কে বাংলোর একটি সুসজ্জিত ঘরে বন্ধ করে ওই বাংলোবাড়িটির ভিতরে কবচটিকে জাগিয়ে তুলল।তারপর নিজে চলে এল বাংলোর সীমার বাইরে।নিজের পাতা ফাঁদে এবার নিজেরই এমন দুর্ভাগ্যজনকভাবে পা পিছলে গেল অজয়ের।নিজের হত্যার ঔষধে এইভাবে মৃত্যু হল তার নিজেরই।এরপর নয়নতারা ওই কবচটিকে নিষ্ক্রিয় করে দিল আর ছুঁড়ে দিল বাংলোবাড়িটির ভিতরে।আর একটি চিঠি লিখে রাখল এই বাংলো আর ওই কবচটির ইতিহাস ব্যক্ত করে তাদের উদ্দেশ্যে,যে বা যারা ওই বাংলোর ভিতরে পা রাখবে ভবিষ্যতে।তাদের হাতে যদি কোনোভাবে ওই কবচের ভিতরের প্রেতশক্তি জেগে যায়...তাহলে তার পরিণতি আর ভবিতব্যের আসল চিত্রটা যে কিরকম হবে সেটাই পরিষ্কারভাবে লিখে সাবধান করে দিয়ে গেছে নয়নতারা।নয়নতারাও এরপর আর বাঁচেনি।নিজের প্রিয়তম'র নৃশংস মৃত্যুদৃশ্য দেখে সেও চিঠিতে তার আত্মহননের সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করে গিয়েছে।বাংলোর ভিতরে তোমাদের কারোর চোখে পড়েছিল কিনা জানি না...আমার চোখে পড়েছিল এক সাদা শাড়ি পরা এক আবছা নারীমূর্তির ছায়া।সে যেন মরিয়া...আমাকে সে যেন কিছু বলতে চায়।তারপরেই তার হাতে লেখা এই চিঠিখানি আমি হাতে পাই যা জীবদ্দশায় সে শেষবারের মতো লিখেছিল।লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিল সেই পদ্ধতি যেই পদ্ধতিতে কবচের ভিতরকার অপশক্তিকে ফের নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব।সেই চিঠির বর্ণনা করা নির্দেশ অনুসরণ করেই আমি আর রমাকান্ত অবশেষে ওই ভয়ংকর অপশক্তিকে বন্দী করতে সফল হয়েছি।এই হল এ কবচের প্রকৃত ইতিহাস।"
সবটা শুনে আমার গায়ে রীতিমতো কাঁটা দিয়ে উঠল যেন।আমি ভয় ধরা কন্ঠে বলে উঠলাম..."তুমি এই সর্বনেশে জিনিসটা সাথে করে নিয়ে এলে কেন "
উত্তরে তোমার দাদু বললেন..."এই কবচটা আমি এমনভাবে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছি যে আপাতত এটার থেকে আর কোনো অপশক্তি জেগে ওঠার আর কোনো সম্ভবনা নেই।কিন্তু কবচটা যদি কোনোভাবে কাঁচের আবরণ ভেঙ্গে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে তবে আবার জেগে উঠবে অপশক্তি।এটি নিষ্ক্রিয় করার পদ্ধতি যদি তখন কারোর না জানা থাকে...তাহলে পৃথিবী জুড়ে প্রলয় নেমে আসবে।চোখের নিমেষে শ্মশানভূমি হয়ে পড়বে এই ধরিত্রী।তাই এটা যাতে আর কারোর হাতে না পড়ে...যেভাবে এই অপশক্তিকে বন্দী করে রাখা রয়েছে সেইভাবেই যেন থেকে যায়...তাই নিজের সাথে করে এটি নিয়ে এসেছি।আমায় তুমি কথা দাও...আমি মারা গেলে আমার চিতার সাথে এটার অস্তিত্বও শেষ করে দেবে...তাহলেই পৃথিবী বেঁচে যাবে ভয়াল প্রলয়ের হাত থেকে..."
তোমার দাদু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন আমার হাতদুটি।আমি হতবাক হয়ে শুন্যদৃষ্টি নিয়ে তার দিকে চেয়ে রয়েছি।পরিশেষে আমি তাঁকে কথা দিলাম...তার এই চাওয়াখানি আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। যখন উনি আমাদের সবাইকে ছেড়ে পরোলোকে চলে যান...আমি তার বলে যাওয়া এই তীব্র আকুতিখানি ভুলিনি।কিন্তু লাইব্রেরী তন্ন তন্ন করে খুঁজেও এ কবচখানা আমি পাইনি।তাই তোমার এই চাওয়াখানি আমি পূরণ করতে পারিনি।এরপর কেটে গিয়েছে বহুদিন...আমি সে কবচখানার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলুম।এই এতদিন বাদে এভাবে হঠাৎ কবচখানা সামনে এল।কাঁচের আবরণ ভেঙ্গে একেবারে উন্মুক্ত অবস্থায়। তোমার দাদুর কোনো অনুমান বা ভবিষ্যৎ দর্শন ভুল হয় না।এখন দুয়ে দুয়ে চার করে আমি বুঝতে পারছি এখন কি ভয়ংকর অশনিসংকেতের মুখোমুখি আমরা সবাই দাঁড়িয়ে রয়েছি যার থেকে পরিত্রাণের রাস্তা আমাদের কারোরই জানা নেই।এখন না আছে নয়নতারার হাতে লেখা সেই চিঠিখানি...আর না বেঁচে রয়েছেন তোমার দাদু...হা ঈশ্বর...পথ দেখাও..."
আকূল কন্ঠে দুহাত জড়ো করে উপরের দিকে চাইলেন সর্বজয়া দেবী।আর তার সামনে বিস্ময়ে বড়ো বড়ো চোখ মেলে ঠাকুরমার বলে যাওয়া অতীতের এই ভয়াল কাহিনী শুনছিল ছোট্ট তাথৈ।হঠাৎ বাইরে শোনা গেল সর্বজয়াদেবীর পুত্রবধূর উচ্চৈস্বরে তীব্র কান্নার রোল।সর্বজয়াদেবী প্রথম
টায় চমকে উঠলেন।তারপর হন্তদন্ত হয়ে ঘরের বাইরে বেরোলেন।বাড়ির চাকরেরা কাঁদতে কাঁদতে এসে তাঁকে বলল,"মা ঠাকরুন সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে।এক্ষুনি একবার কুয়োর পাড়টাতে চলুন..."
সর্বজয়া দেবী বললেন..."কি হয়েছে ওইদিকে?আচ্ছা আমি গিয়ে দেখছি"
তিনি ঘরে ঢুকে তাথৈ কে বললেন..."দিদিভাই তুমি একটু বসো...আমি একবার নীচে গিয়ে দেখে আসছি কি হয়েছে..."
তিনি তাড়াহুড়ো করে নেমে কুয়োর পাড়ের দিকটায় গেলেন।সেখানে গিয়ে তিনি যা দেখলেন...তাতে তার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল।কুয়োর তলা থেকে উদ্ধার হয়েছে তার আদরের নাতনী তাথৈএর আধখাওয়া পচাগলা মৃতদেহ...আর এই মৃতদেহ এই কুয়োর ভিতরে কম করে দুইদিন হল পড়ে পড়ে পচেছে।বাগানের মালী দুর্গন্ধের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে কুয়োর ভিতরটা দেখবার জন্য বাড়ির কর্তাকে বলেছিলেন।আজ কুয়োর ভিতরটা হাতড়াতেই পাওয়া গেল বাড়ির মেয়ে তাথৈএর বাসি পচাগলা আধখাওয়া বীভৎস মৃতদেহ।এবার সর্বজয়া দেবীর ভিতরটা যেন উথালপাথাল হয়ে উঠল।তার স্বাভাবিক চিন্তা আর বুদ্ধির সাথে এই ভয়ংকর ধোঁকাটা তিনি কিছুতেই হিসেবে মেলাতে পারছেন না।তাথৈ যদি দুইদিন আগে মারা গিয়ে থাকে তাহলে এতক্ষণ তিনি যাকে তার জীবনের এই রোমহর্ষক কাহিনী শোনাচ্ছিলেন...সে কে??
তিনি তার বার্ধক্যের ভারে জর্জরিক ভারী শরীরখানি নিয়ে পড়ি কি মরি করে সিঁড়ি ভেঙ্গে নিজের ঘরে এসে পৌঁছলেন।দেখলেন...ঘর ফাঁকা।জানলা আর দরজার পরদাগুলো যেন বাঁধন থেকে ছাড়া পাবার জন্য মারাত্মকভাবে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে।চারদিকে ফের শুরু হয়েছে উত্তাল ঝড়।নীচে কান্নাকাটি আর শোকের ধুম পড়ে গিয়েছে।আর পারলেন না সর্বজয়া দেবী।তিনি মাথায় হাত দিয়ে একেবারে মাটিতে বসে পড়লেন।বিছানার চাদরে এখনো ভাসমান তাথৈএর বসবার চিহ্নস্বরূপ ভাঁজের স্পষ্ট দাগ।আগামী পৃথিবী বুকে আগত প্রলয়ের অশনিসংকেত মর্মে মর্মে অনুধাবন করে তার বুকের ভিতরটা যেন এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেল...।
অশনিসংকেত
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
688
Views
12
Likes
2
Comments
3.8
Rating