বর্তমান টেক্সটাইলের কর্মব্যস্ত দুপুর। চারদিকে যন্ত্রের শব্দ আর সুতোর গন্ধ। সাদিকুল ইসলাম গত পাঁচ বছর ধরে এখানে কাজ করছেন। সাদিকুল মানুষ হিসেবে অত্যন্ত সহজ-সরল এবং অমায়িক। অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক বেশ গভীর। একদিন টিফিন পিরিয়ডে আড্ডা দিতে দিতে সাদিকুল হুট করেই তার কলিগদের বলে বসলেন, “আপনারা তো সবাই আমার খুব কাছের মানুষ, একদিন সময় করে আমার গরিবের কুঁড়েঘরে আপনাদের দাওয়াত খেতে হবে।”
সহকর্মীরা এক কথায় রাজি। তবে সাদিকুল জানেন, বাড়ির কর্ত্রী অর্থাৎ তার স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া মেহমান আনা ঠিক হবে না। বাড়িতে ফিরে রাতে খাবারের টেবিলে সাদিকুল আমতা আমতা করে স্ত্রীকে বললেন, “শোনো, অফিসের কলিগরা আমার খুব ভক্ত। বলছিলাম কি, একদিন ওদের যদি দুপুরে আমাদের বাসায় দাওয়াত দিতাম? তুমি কী বলো?”
সাদিকুলের স্ত্রী মরিয়ম বেগম বুদ্ধিমতী এবং ঘরকুনো স্বভাবের। তিনি কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “মেহমান আসা তো বরকতের কাজ। ঠিক আছে, নিয়ে এসো। তবে ঘরদোর একটু গুছিয়ে নিতে হবে।” পরের দুদিন স্বামী-স্ত্রী মিলে পুরো ঘর তকতকে করে ফেললেন। সিদ্ধান্ত হলো দুদিন পরেই মেহমানরা আসবেন।
দাওয়াতের আগের দিন সকালে মরিয়ম বললেন, “এতগুলো মানুষ আসবে, একার হাতে তো সব সামলানো যাবে না। তুমি বরং বাজারটা করে দিয়ে আসো। আমি রান্নাটা চড়িয়ে দিই।” মরিয়ম মুখে মুখে বাজারের একটা লম্বা ফিরিস্তি দিলেন—সেরা মানের গরুর মাংস, আদা, রসুন, এক ডজন ডিম আর কিছু সুগন্ধি মশলা। সাদিকুল খুব উৎসাহ নিয়ে বাজারে গেলেন। কিন্তু মরিয়ম তাড়াহুড়োয় কিছু লিখে দেননি।
বাজারে গিয়ে মানুষের ভিড় আর কোলাহলে সাদিকুল খানিকটা খেই হারিয়ে ফেললেন। তার মনে হলো মরিয়ম বোধহয় মুরগির মাংসের কথাই বলেছিলেন। তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে চার কেজি মুরগির মাংস কিনে সদাই নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।
বাড়িতে ব্যাগ নামাতেই মরিয়ম অবাক হয়ে চাইলেন। গরুর মাংসের জায়গায় মুরগি দেখে তার কপাল কুঁচকে গেল। মেহমানদের সামনে দামী খাবার পরিবেশনের স্বপ্ন ভেঙে যেতে দেখে তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। মরিয়ম বলতে লাগলেন, “হায় রে কপাল! আমার আব্বাজান কার হাতে আমাকে সপে দিলেন? মানুষটা তো দেখছি একেবারে কচি খোকা! কাণ্ডজ্ঞান বলতে কিচ্ছু নেই। কাল দশজন মানুষ আসবে, তাদের সামনে আমি এই মুরগি তুলে দেব? লোকে হাসবে তো! তুমি কি আমাদের সংসারে আগুন লাগানোর ফন্দি করেছো?”
স্ত্রীর এই কটু কথায় সাদিকুলের বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। তিনি কাচুমাচু হয়ে বললেন, “আমি কি খুব ভুল করে ফেলেছি? আমি কি এখনই গিয়ে পাল্টে নিয়ে আসব?” মরিয়ম অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিলেন, “না, আর দরকার নেই। মেহমানদের মুরগিই খাওয়াব। কিন্তু এরপর থেকে আমি আর মুখে কিছু বলব না, ডায়েরিতে লিখে তবেই বাজারে পাঠাব।”
পরদিন সহকর্মীরা এলেন। খাওয়া-দাওয়া হলো, হাসাহাসিও হলো। কিন্তু সাদিকুলের মনে শান্তি ছিল না। স্ত্রীর মনের আক্ষেপ আর স্বামীর প্রতি তার বিরাগভাজন হওয়া তাকে ভাবিয়ে তুলল। সাদিকুল বুঝতে পারলেন তার এই বারবার ভুলে যাওয়াটা কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়।
নিজের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে তিনি শহরের এক অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেন। কয়েক মাসের চিকিৎসা আর নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপনে সাদিকুল ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। তার স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ আবার ফিরে এলো। মরিয়মও স্বামীর এই পরিবর্তন দেখে মুগ্ধ হলেন। অতীতের সব অভিমান ভুলে তারা দুজনে এক নতুন জীবনের পথে পা বাড়ালেন। এখন আর তাদের সংসারে কোনো ভুল বোঝাবুঝি নেই, আছে শুধু একে অপরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস আর ভালোবাসা।

কোন মন্তব্য নেই