গোপন বিয়ে রহস্য ফাঁস

সবসময় নিকাব পরা পর্দাশীল মেয়েটির নাম আরিশা। তার মায়ের নাম সায়মা। সায়মা হলেন আরিফের প্রথম স্ত্রী। আরিশা ও তার মা দুজনেই নিকাব পরিধান করেন এবং পর্দাশীল জীবনযাপন করেন।

আরিফের দ্বিতীয় স্ত্রী রোকসানা। রোকসানার ছেলের নাম সজিব। সজিবের বাবার নামও আরিফ। সেই হিসেবে আরিশা ও সজিব সৎ ভাইবোন।

আরিশা ও সজিব একই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। তারা সমবয়সী—উভয়ের বয়স ছয় বছর। সজিব দুঃখ পেলে আরিশা তাকে সান্ত্বনা দেয়, আর আরিশা মন খারাপ করলে সজিবও তাকে বুঝিয়ে দেয়।

একদিন সজিব আরিশার রুমে যেতে চাইল। দরজা একটু ফাঁক ছিল, তবুও সে অনুমতি ছাড়া ভেতরে প্রবেশ করল না। সে দাঁড়িয়ে বলল,
“আরিশা, আমি কি ভেতরে আসতে পারি?”

তখন আরিশা মুখে মাস্ক ছাড়া শুয়ে ফোন দেখছিল। সে বলল,
“ভাইয়া, দরজার সামনে একটু অপেক্ষা করো।”

এরপর আরিশা নিকাব দিয়ে মুখ ঢেকে বলল,
“সজিব, এবার ভেতরে আসো।”

সজিব ভেতরে আসতেই আরিশা জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়া, কোনো সমস্যা হয়েছে?”

সজিব বলল,
“না, কোনো সমস্যা না। তবে আজ মাদ্রাসায় তুমি সবার সামনে যে তেলাওয়াত করেছিলে, সেটা এখনো আমার মনে গেঁথে আছে।”

সজিবের কথা শুনে আরিশার মনটা নরম হয়ে গেল। সে ভেবেছিল হয়তো কোনো ভুল করেছে। একটু আবেগ নিয়ে বলল,
“ভাই, তুমি আমার একমাত্র সৎ ভাই। আমি তো তোমাকে কখনো কষ্ট দিতে চাই না। যদি কোনোভাবে কষ্ট দিয়ে থাকি, আমাকে মাফ করে দিও।”

সজিব শান্ত কণ্ঠে বলল,
“আরিশা, আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি। তোমার তেলাওয়াত খুব সুন্দর ছিল বলেই মনে আছে। তুমি আমার খুব প্রিয় বোন। যদি আমার কথায় কষ্ট পেয়ে থাকো, আমাকেই মাফ করে দিও।”

এরপর সজিব অনুরোধ করল,
“তুমি কি আবার সেইভাবে তেলাওয়াত করবে? শুনতে খুব ভালো লাগবে।”

আরিশা বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি টেবিলে বসে মনোযোগ দিয়ে শোনো।”

আরিশা তার গোল চশমাটি চোখে পরল, কারণ চশমা ছাড়া কোরআনের অক্ষর স্পষ্ট দেখতে পারে না। তারপর সে সূরা আল-বাকারাহ থেকে তেলাওয়াত শুরু করল। ধীরে ধীরে তার কণ্ঠ আরও সুরেলা ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল। পুরো ঘর জুড়ে পবিত্র তেলাওয়াতের সুর ভেসে বেড়াতে লাগল। সজিব মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল, আর তাদের মাঝে এক শান্ত, সুন্দর অনুভূতির সৃষ্টি হলো।

আরিফ ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। এ সময় রোকেয়া ও তানিয়া রান্নাঘরে রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রোকেয়া মূল রান্নার দায়িত্বে আছেন, আর তানিয়া তাকে সহযোগিতা করছেন।

অন্যদিকে, সায়মা কিছুক্ষণ আগে সবজি কেটে নিজের ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। সারাদিনের কাজের পর তিনি বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তাদের ছোট ছেলে সাকিব মায়ের ঘরেই বিছানায় লম্বা হয়ে ঘুমিয়ে আছে। সাকিবের বয়স বর্তমানে তিন বছর।

অবশেষে বাড়ির ভিতরে কলিং বেলটি বেজে উঠল।

তানিয়া বিস্মিত কণ্ঠে বলল,
“এই সময় আবার কে এলো?”

রোকসানা হেসে বলল,
“তুই দরজার কাছে গিয়ে দেখ, আমি এখানেই রান্না সামলাচ্ছি।”

তানিয়া রান্নাঘরের কাজ মাঝপথে থামিয়ে দরজার সামনে গেল। দরজা খুলে ভদ্রভাবে সে প্রশ্ন করল,
“আপনারা কারা, আর কাকে খুঁজছেন?”

দরজার বাইরে অনিক নিজের পরিচয় দিলেন,
“আমার নাম অনিক। আমি আরিফের সাথে দেখা করতে এসেছি। আমি আরিফের বড় ভাই।”

তানিয়া কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
“বড় ভাই? আরিফ আমাদের বলেছিল তিনি এতিম। মনে হয় আপনি ভুলবশত এখানে এসেছেন।”

অনিকে বিরক্তি মেশা ধৈর্য সহকারে বললেন,
“কে আপনাকে এমন কথা বলেছে? তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আরিফের সাথে আমার সম্পর্ক আছে, তাই আমি এখানে এসেছি।”

তানিয়া হঠাৎ ভ্রান্ত ধারণায় বলল,
“মানে আপনি আমাদের ভাসুর?”

অনিক কণ্ঠটা একটু কঠিন করে বললেন,
“কে ভাসুর? আরিফ তো এখনও বিয়ে করেনি। আমি এখানে এসেছি আরিফের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিতে। আর আপনি কি এই বাড়ির কাজের লোক?”

তানিয়া গম্ভীরভাবে, চোখে পানি নিয়ে বলল,
“কি বললেন! আমি এই বাড়ির কাজের লোক? এটা আমার স্বামীর বাড়ি! (গভীর কান্নায়) আপনি আমাকে কীভাবে এমন বলতে পারলেন?”

সে চিৎকার করে ডাকল,
“আরিফ! রোকসানা! দ্রুত এখানে আসো! কে এসেছে আর আমাকে কাজের লোক বলে অপমান করছে?”

কান্না ও ক্রন্দন মিশিয়ে তানিয়া ফ্লোরে বসে পড়ল, ডান হাতে ঠেস দিয়ে নিজের কষ্ট লুকাতে চেষ্টা করল।

তানিয়া চিৎকার করে ঘরটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। আরিশা তেলাওয়াত পড়ছিলেন, কিন্তু তানিয়ার চিৎকার শুনে ভুলক্রমে তেলাওয়াত বন্ধ করে দিলেন। ধীরে ধীরে তিনি আবার থামলেন, আর ভয় কেঁপে উঠল।

আরিশা দ্রুত সজিবের হাত শক্ত করে ধরে টান দিচ্ছেন যেন সে নিরাপদ থাকে। সজিব প্রশ্ন করল, "তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?"

আরিশা বলল, "চুপ করো ভাইয়া, ঘরে ঝামেলা হয়েছে। এখানে এই রুমে শুধু আমরা দু’জনে আছি। আমি সায়মা মায়ের কাছে যাচ্ছি।"

সজিব কিছু বলল না। তারা রুম থেকে বেরিয়ে সায়মার ঘরে পৌঁছালো। সায়মার ঘরে যাওয়ার আগে, আরিশা এবং সজিব দেখল তানিয়া দরজার সামনে মেঝেতে বসে কান্না করছে।

সজিব চিন্তায় বলল, "আমাদের ছোট মা দরজার সামনে মেঝেতে বসে কাঁদছেন।"

আরিশা দ্রুত সজিবের ঠোটে হাত রেখে কানে কানে বলল, "চুপ করো, বেশি জোরে কথা বলো না। দ্রুত আমার সাথে আসো।"

এরপর আরিশা দেখল, রোকসানা মা হাতে দাও নিয়ে সোফায় বসে রুমের প্রধান দরজার সামনে চলে যাচ্ছেন। তারা দু’জন দুঃখ প্রকাশ করল। সায়মা আম্মুকে সব ঘটনা বলবেন। তারা দেরি না করে সায়মার ঘরে চলে গেল।

রোকসানা রান্নাঘর থেকে দা হাতে নিয়ে সোফার দিকে এগোলেন। চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন, তানিয়া দরজার সামনে মেঝেতে বসে অঝোরে কাঁদছেন। তানিয়ার এই অবস্থায় রোকসানা আর চুপ থাকতে পারলেন না।

আসলে অনিক আরিফের বড় ভাই, কিন্তু রোকসানা বা তানিয়া এ বিষয়টি জানতেন না। অন্যদিকে, অনিকও জানতেন না যে তার ছোট ভাই আরিফ গোপনে তিনজনের সঙ্গে বিবাহিত।

মেঝেতে বসে কাঁদতে কাঁদতে তানিয়া বললেন,
"রোকসানা আপা, বাইরে থেকে এই লোক এসে আমাকে অপমান করছে। বলছে আমি নাকি এই বাড়ির কাজের লোক!"

এরপর আরিফের দিকে তাকিয়ে রেগে চিৎকার করলেন,
"আরিফ, তুই কী শুধু দাঁড়িয়ে দেখছিস? তোর ছোট বউ অপমানিত হচ্ছে, আর তুই ওই লোককে সামলাচ্ছিস না?"

রোকসানা হাতের দা অনিকের দিকে তুলে ধরে গর্জে উঠলেন,
"তুই আমার ছোট বোনকে কেন অপমান করছিস? জবাব দে! না দিলে তোকে দা দিয়ে শাস্তি দেব!"

অনিক হকচকিয়ে বললেন,
"আপনি ভুল বুঝছেন। আমি তো শুধু আরিফের জন্য একটা সম্ভাব্য বিয়ে নিয়ে এসেছি। তানিয়াকে আমি চিনি না, তাই ভেবেছি হয়তো কাজের লোক।"

আরিফ কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু রোকসানা তাকে থামিয়ে দিয়ে অনিকের দিকে কণ্ঠস্বর শক্ত করে বললেন,
"বিয়ে নিয়ে এসেছিস মানে? তোর সাহস কত! তানিয়া এই বাড়ির ছোট বউ, আর আমি বড়। আমাদের সামনে আবার বিয়ে নিয়ে কি বলছিস?"

অনিক অবাক হয়ে আরিফের দিকে তাকালেন,
"আরিফ, এসব কী শুনছি? এরা কি সত্যিই তোর স্ত্রী? তুই তো বলেছিলে অবিবাহিত!"

আরিফ মাথা নিচু করে চুপ হয়ে গেলেন, কারণ সত্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তিনি দিশেহারা।

রোকসানা শেষবার হুংকার দিয়ে বললেন, "আজ থেকে বিয়ে নিয়ে মুখ না খোল। আরিফ আমাদের স্বামী, এটা মনে রেখে কথা বল।"

আরিশা এবং সজিব অবশেষে সায়মার রুমে প্রবেশ করলো। তারা প্রবেশ করার মুহূর্তেই রোকসানা চিৎকার শুরু করলেন। এই শব্দে সাকিব ঘুম থেকে জেগে উঠলো।

সায়মা দুঃখিত স্বরে বললেন, “হায় আল্লাহ, ত্রিশ মিনিটও হয়েছে না। ঘরে এই চিৎকারের কারণে আমার ছোট ছেলে সাকিবের ঘুম ভেঙে গেল। (আরিশার দিকে তাকিয়ে) আরিশা, ঘরে কি হয়েছে? তুমি কি জানো কেন এমন চিৎকার করছে?"

আরিশা উত্তর দিলো, “আমরা রুমে কোরআন তেলাওয়াত করছিলাম—আমি এবং সজিব। কিন্তু তারা চিৎকার করার কারণে আমরা সেখানেই থাকতে পারিনি। পরে আমি আপনার রুমে চলে এলাম। আপনার রুমে যাওয়ার আগে তানিয়াকে দেখলাম—তিনি প্রধান দরজার সামনে মেঝেতে বসে কান্না করছিলেন। তার পাশে একজন অপরিচিত মানুষও ছিল। আমার মনে হয়, সেই ব্যক্তি আমাদের ছোট আম্মুকে কান্না করিয়েছেন।”

আরিশা সায়মার কাছে এসে ধরাধরি করল এবং হঠাৎ গভীরভাবে কেঁদে উঠল। নিকাবের আড়ালে তার চোখের পানি ঝরতে থাকলো, ফলে নিকাব ভিজে গেল। সায়মা ধীরে ধীরে তার চোখের পানি মুছতে লাগলেন।

সায়মা বললেন, “বুঝতে পারছি। ঝগড়া থামানোর জন্য আমাকে সরাসরি মুখোমুখি হতে হবে।”

আরিশা এবং সজিব একসাথে বলল, “না, বড় মা, তুমি যেও না।”
কিন্তু সায়মা তাদের কথা শোনেননি। আয়নার সামনে গিয়ে তিনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিলেন। হিজাব ও নিকাব পরার পর তিনি দৃঢ়ভাবে স্থিত হলেন।

সায়মা আলমারি খুলে মাইক বের করলেন। এরপর রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মাইক অন করলেন এবং লাউড স্পিকারের মাধ্যমে উচ্চস্বরে বললেন,
“সবাই একটু শান্ত হও। চিৎকার করলে সমস্যা বাড়বে, কমবে না। এই ঘরে কেউ অপমানিত হবে না—আমরা পরিবার। আগে সবাই বসো, কান্না থামাও। আরিফ, তুমি সামনে এসে সত্য কথা বলো। ভুল বোঝাবুঝি হলে তা এখানেই মিটিয়ে ফেলবো। আল্লাহর নাম নিয়ে শান্তভাবে কথা বলি—এই ঘরে ছোট বাচ্চারাও আছে, তাদের কথা ভেবে ধৈর্য ধরো। রোকসানা, তোমার হাতে দাও নামাও। তানিয়া, তুমি মেঝেতে বসে কান্না করো না, সোফায় বসে পড়। এই ঘরের তিনজন বাচ্চা যখন তোমরা ঝগড়া করবে, তারা আরও ভয় পাবে। বাচ্চাদের কথা ভেবে একবার ভাবো।”

মাইকের কথার পর ঝগড়া থেমে গেল। সায়মা মাইক হাতে রেখে আলমারিতে ফিরে দিলেন। এরপর তিনি নিজে সোফায় চলে এলেন।

সোফায় যাওয়ার আগে তিনি ছেলে-মেয়েদের উদ্দেশ্যে বললেন,
“আরিশা, সজিব, আমার সাথে এসো। আর সাকিবকে আমি কোলে নিচ্ছি।”

আরিশা এবং সজিব একটু ভয় পেলেও সায়মার কথা শুনে তার সঙ্গে একত্রিত হল এবং সবাই সোফায় বসে শান্তভাবে উপস্থিত হলেন।

সায়মা বললেন,
“এখানে কি নিয়ে কথাবার্তা চলছে এবং চিৎকার কেন? তোমাদের চিৎকারের কারণে আমার ছোট ছেলে সাকিব ঘুম থেকে উঠে গেছে। আমি আধাঘন্টা আগে দরকারি কাজ শেষ করে রুমে চলে গিয়েছিলাম, শরীরও খারাপ লাগছিল। কিন্তু তোমাদের জ্বালায় আমি শান্তিতে থাকতে পারছি না। তানিয়া, বল তো, তোর কি সমস্যা?”

তানিয়া উত্তরে বলল,
“বড় আপা, আমি যখন কলিং বেলের শব্দ শুনে দরজা খুললাম, অত্যন্ত ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করেছি উনি কে। উনি বললেন উনি আরিফের বড় ভাই। আমি তখন পুরোপুরি হতবাক। আরিফ তো আমাদের বলেছে উনি এতিম। আমি যখন বললাম আমি আরিফের স্ত্রী, উনি আমাকে দেখে তাচ্ছিল্যপূর্ণভাবে হেসে বললেন, ‘আরিফ বিয়ে করেনি, তুই তো এই বাড়ির কাজের লোক!’ আপা, নিজের স্বামীর বাড়িতে দাঁড়িয়ে পরপুরুষের কাছে কাজের লোকের মতো গালি শোনা কতটা অপমানজনক, সেটা আমি সহ্য করতে পারছি না। উনি আমাকে চোর-চাট্টনির মতো জেরা করছিলেন।”

সায়মা রোকসানার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“রোকসানা, তুমি তো রান্নাঘরে ছিলে। তুমি দা নিয়ে কেন বের হলে?”

রোকসানা উত্তর দিলো,
“আপা, আপনি তো জানেন আমার মেজাজ কেমন। আমি রান্নাঘর থেকে তানিয়ার চিৎকার শুনছিলাম। ভেবেছিলাম কেউ ডাকাত বা খারাপ লোক বাড়িতে ঢুকে তানিয়াকে আক্রমণ করেছে। যখন এসে দেখি সেই লোক (অনিক) তানিয়াকে আঙুল উঁচিয়ে অপমান করছে, তখন আমার রক্ত মাথায় চড়ে গেল।
আমার ছোট বোনকে কেউ কাজের লোক বলবে আর আমি চুপ থাকব? আরিফ তো মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল, তাই আমাকেই রুখে দাঁড়াতে হলো। আমার রাগ তানিয়ার অপমান এবং আরিফের ওই নীরবতার জন্য।”

সায়মা ধীরস্বরে বললেন,
“আরিফ, তোর কিছু বলার আছে?”

আরিফ বলল,
“আমার কিছু বলার আছে।”

সায়মা বললেন,
“বলো।”

আরিফ সবাইকে বলল,
“আমি আজ সবার সামনে সত্যটি জানাতে চাই। অনিক ভাই, হয়তো আপনি অবাক হবেন, কিন্তু আমি তিনজনকে বিবাহ করেছি। এটি হঠাৎ করা কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বিষয়টি নিয়ে আমি ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে কথা বলতাম। তখন আপনি হয়তো হোস্টেলে ছিলেন, তাই এই ব্যাপারগুলো জানতেন না। বাবা প্রথমে রাজি ছিলেন না, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমার সিদ্ধান্ত মেনে নেন। সম্ভবত বয়স বা অন্য কারণে তিনি এখন এই বিষয়গুলো ভুলে গেছেন।”

আরিফ সায়মার দিকে তাকিয়ে বলল,
“নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমি আমার পছন্দের সায়মাকে প্রথমে বিবাহ করি। পরে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময়, সায়মার সম্মতিতে রোকসানাকে বিবাহ করি। পরবর্তীতে তানিয়াকেও বিবাহ করেছি।”

তাঁর কথার শেষে আরিফ অনিক ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি নিজেকে এতিম বলে সবাইকে পরিচয় দিয়েছি, যাতে আমার পরিবারের পরিচয় কেউ না জানে এবং কেউ আমার এই বিবাহ সম্পর্কে জানতে না পারে। তানিয়া এই বাড়ির কাজের লোক নয়; তিনি আমার বৈধ স্ত্রী। আমি সবাইকে জানাতে চাই—আমাদের পরিবারে আমি সহ তিন ভাই এবং দুই বোন রয়েছি।”

সায়মা প্রথমে রোকসানা ও তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“রোকসানা, তানিয়া—শান্ত হও। রাগ বা চোখের জল দিয়ে সম্মান অর্জন করা যায় না। অনিক ভাই আমাদের ভাসুর, অর্থাৎ এই পরিবারের বড় সন্তান। উনি জানতেন না যে আরিফ আমাদের বিয়ে করেছেন, তাই তানিয়াকে কাজের লোক ভেবেছিলেন। অপরিচিত কেউ যদি এমন বলত, খারাপ লাগাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখন সত্যিটা স্পষ্ট হয়ে গেছে।”

সায়মা অনিকের দিকে ফিরে মার্জিতভাবে বললেন,
“ভাসুর ভাই, আপনি আরিফের বড় ভাই হিসেবে আমাদের জন্য খুবই সম্মানীয়। আরিফ আমাদের সঙ্গে মিথ্যা বলেছে যে সে এতিম, যা তার বড় ভুল। তবে আমরা এই বাড়ির পুত্রবধূ; কাজের লোক নই। আপনি যে বিয়ের প্রস্তাব এনেছিলেন, তা ফিরিয়ে দিন। কারণ আরিফের ঘরে ইতিমধ্যেই আমরা তিনজন স্ত্রী এবং তিনটি সন্তান আছি—সায়মা, রোকসানা, তানিয়া এবং আমাদের সন্তানরা: আরিশা, সাকিব, ও সজিব। নতুনভাবে অশান্তি ডাকার কোনো কারণ নেই।”

আরিশা কণ্ঠে চিন্তা নিয়ে বলল,
“আম্মু, আর কোনো ভয় নেই তো? সব সমস্যা কি সমাধান হয়েছে? পরিস্থিতি কি আগের মতো চলতে পারবে?”

সায়মা আরিশাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“তোমার আর কোনো চিন্তা নেই। ঘরে যা ছোটখাটো সমস্যা ছিল, তা সমাধান হয়েছে। পরিস্থিতি আগের মতোই চলবে। তুমি আর সজিব নিয়ে তোমাদের রুমে চলে যাও, কোরআন তেলাওয়াত করতে শুরু কর। আমি এখন খুব ক্লান্ত, ঘুমাতে যাচ্ছি।”

সায়মার কথাগুলো অনিক, রোকসানা ও তানিয়া সবাই বুঝতে পারলেন। শান্তি ফিরে এলে তারা তাদের নিজ নিজ কাজের দিকে ফিরে গেলেন। রোকসানা রান্না শুরু করলেন, আর তানিয়া তাকে সাহায্য করছিলেন। এইভাবে, সায়মা ক্লান্ত হওয়া সত্ত্বেও পরিস্থিতি সমাধান করলেন।

এরপর সায়মা নিজের রুমে গিয়ে সাকিবকে কোলে নিয়ে রুমের দিকে চলে গেলেন। তিনি চেষ্টা করলেন সাকিবকে ঘুম পাড়ানোর। হিজাব ও নিকাব খুলে আলনায় রেখে, সায়মা বিছানায় লম্বা হয়ে ক্লান্ত অবস্থায় শুয়ে পড়লেন এবং শান্তভাবে ঘুমোতে শুরু করলেন।

এদিকে আরিশা ও সজিব তাদের রুমে ফিরে গিয়ে আবারও কোরআন তেলাওয়াত শুরু করলেন। আরিফ ও অনিক সোফায় বসে একে অপরের দিকে তাকালেন

আরিফ শান্তভাবে বলল:
"ভাইয়া, আপনি হঠাৎ করে কীভাবে এই বাড়ি চিনলেন? ঠিকানা কোথা থেকে পেলেন?"

অনিক হাসল,
"তোমার এক পুরনো বন্ধুর কাছ থেকে শুনেছিলাম তুমি এই এলাকায় থাকো। পরে মসজিদের ইমামের কাছ থেকে সঠিক ঠিকানা জেনে এসে পৌঁছালাম।"

আরিফ খানিক অবাক হয়ে বলল,
"আপনি আগে আমাকে জানালেন না কেন?"
অনিক বলল, "ভেবেছিলাম তুমি একা থাকো। তাই সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।"

একটু নীরবতার পর অনিক জিজ্ঞেস করল,
"এখন বলো তো, তোমার স্ত্রীদের নাম কী?"

আরিফ শান্তভাবে উত্তর দিল,
"বড় স্ত্রী সায়মা, দ্বিতীয় রোকসানা, তৃতীয় তানিয়া।"

অনিক মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
"আর আমার ভাতিজা-ভাতিজিদের নাম কী? তারা কী করছে এখন?"

আরিফ জানাল,
"সায়মার মেয়ে আরিশা মাদ্রাসায় পড়ে, কোরআন তেলাওয়াত করে। ছেলে সাকিব এখনো ছোট। রোকসানার ছেলে সজিব মাদ্রাসার ছাত্র।"

অনিক কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাবল, তারপর বলল,
"তাহলে আমি সত্যিই জেঠা হয়ে গেছি…"

আরিফ হেসে বলল,
"হ্যাঁ ভাইয়া, ওরা আপনার ভাতিজা-ভাতিজি।"

কথা শেষ হলে ঘরে নীরবতা নেমে আসে। রান্নাঘরে রোকসানা ও তানিয়া একসাথে রান্না করছে। সায়মা নিজের রুমে ক্লান্ত অবস্থায় শুয়ে পড়েছেন। অন্য রুমে আরিশা ও সজিব জোরে জোরে কোরআন তেলাওয়াত করছে, আর সেই সুর সোফার রুম পর্যন্ত ভেসে আসে। অনিক ও আরিফ চুপচাপ সেই তেলাওয়াত শুনছে।
46 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই