তুমি সামনে নেই

রাতটা অদ্ভুত নীরব ছিল। জানালার বাইরে হালকা বাতাসে গাছের পাতা নড়ছিল, কিন্তু তার শব্দও যেন কেমন দূরের মনে হচ্ছিল। মুঠোফোনের স্ক্রিনে একটা ছোট্ট মেসেজ জ্বলজ্বল করছিল—“তুমি সামনে নেই।”
আরিফ অনেকক্ষণ ধরে সেই কথাটার দিকে তাকিয়ে রইল। কথাটা খুব ছোট, কিন্তু তার ভেতরে যেন হাজারটা অনুভূতি লুকিয়ে আছে। সে জানে, এই কথাটা লিখেছে মেহরিন। ওরা বহুদিন ধরে কথা বলে, প্রতিদিন, প্রতিটা ছোট-বড় বিষয় শেয়ার করে। তবুও আজ এই এক লাইনের মেসেজ তার বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা করে দিল।
আরিফ ধীরে ধীরে টাইপ করল, “আমি তো আছি… সবসময়ই আছি।”
কিন্তু সেন্ড করার আগে থেমে গেল। সত্যিই কি সে আছে?
ওরা কখনো সামনে বসে কথা বলেনি। কখনো একসাথে হেঁটে যায়নি, কোনো বিকেলে চা খেতে খেতে গল্প করেনি। তাদের সম্পর্কটা গড়ে উঠেছে শব্দের উপর, স্ক্রিনের আলোতে, ইমোজির হাসিতে আর মাঝে মাঝে কলের কণ্ঠে। কিন্তু বাস্তবের ছোঁয়া—সেটা তো কখনো আসেনি।
মেহরিন আবার লিখল, “অনলাইনে থাকা আর সামনে থাকা এক জিনিস না।”
এই কথাটাই যেন আরিফকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল। সে হঠাৎ বুঝতে পারল, এতদিন সে ভেবেছিল, নিয়মিত কথা বললেই সব ঠিক থাকে। কিন্তু কিছু অনুভূতি আছে, যেগুলো শুধু উপস্থিতি চায়—চোখের দিকে তাকানো, পাশে বসে থাকা, নিঃশব্দে হাত ধরা।
সে ফোনটা নামিয়ে রাখল। মাথার ভেতর অনেক চিন্তা ঘুরতে লাগল। সে কি সত্যিই মেহরিনের জন্য কিছু করেছে? নাকি শুধু নিজের মতো করে একটা “থাকা”র ধারণা তৈরি করেছে?
পরদিন সকালে, আরিফ হঠাৎ একটা সিদ্ধান্ত নিল। সে আর শুধু কথার ভেতর আটকে থাকতে চায় না। সে বাস্তবে যেতে চায়, সামনে দাঁড়াতে চায়।
দুপুরে সে মেহরিনকে একটা মেসেজ পাঠাল, “আজ বিকেলে পার্কে আসবে?”
মেহরিন কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই দিল, “কেন?”
আরিফ লিখল, “কারণ আমি আজ সামনে থাকতে চাই।”
বিকেলে পার্কে হালকা রোদ পড়েছিল। মানুষজন হাঁটছিল, কেউ বেঞ্চে বসে গল্প করছিল। আরিফ একটু নার্ভাস হয়ে চারপাশে তাকাচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, সময় যেন খুব ধীরে যাচ্ছে।
হঠাৎ সে দেখল, সামনে দিয়ে একটা মেয়ে হাঁটছে। সাদামাটা পোশাক, মুখে হালকা হাসি। মেহরিন।
ওরা একে অপরের সামনে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না। শুধু চোখে চোখ পড়ল।
তারপর মেহরিন মৃদু হেসে বলল, “এখন তো সামনে আছো।”

আরিফও হাসল। সে বুঝতে পারল, এই ছোট্ট মুহূর্তটাই এতদিনের সব কথার চেয়েও বেশি সত্যি।
সে ধীরে ধীরে বলল, “হ্যাঁ… এবার সত্যি আছি।”
সেদিন তাদের খুব বেশি কথা হয়নি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, কোনো কথার দরকারও পড়েনি। পাশে বসে থাকা, একসাথে নীরবতা ভাগ করে নেওয়া—এইটুকুই যেন যথেষ্ট ছিল।
আরিফ মনে মনে ভাবল, কখনো কখনো “থাকা” মানে শুধু মেসেজ পাঠানো না, বরং সত্যিই পাশে থাকা। কারণ কিছু অনুভূতি আছে, যেগুলো শুধু অনুভব করা যায়—দূর থেকে নয়, সামনে থেকে।
28 Views
2 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this:
(2)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই