সম্পর্কের মূল্য
✦ পর্ব ৩ ”
ফাজিল, ছোটন আর মেজো—তিন ভাই।
বাবা দেলোয়ার হোসেন এবং মা নাজিয়া আক্তার।
গ্রামের ছোট্ট উঠোনে তারা বসে আছে।
বাতাসে হালকা কচকচানি, চারপাশে গাছের ছায়া।
ফাজিল এখনও একটু রাগি, চোখে মাঝে মাঝে শীতল আগুন।
মেজো মাঝখানে বসে, একটু বোকা, একটু রাগি, চোখে বিস্ময়।
ছোটন পাশে বসে, চোখে আনন্দের ঝলক, কিন্তু মনে এক অজানা ফাঁকা।
---
মেজো আর ফাজিলের মধ্যে সবসময় একটা দূরত্বের খেলা চলে।
মেজো ভেতর থেকে হেঁপে উঠতে চায়—
“কেন সব ভালোবাসা বড় ভাইয়ের কাছে যায়?”
কিন্তু সে জানে না, ভালোবাসা কখনো জোর করে পাওয়া যায় না।
তাই সে মাঝেমাঝে রাগ প্রকাশ করে, কিন্তু ভিতরে লুকিয়ে রাখে তার কোমলতা।
ফাজিল দূর থেকে তাকিয়ে থাকে।
সে জানে—মেজো রাগ করছে, কিন্তু ভালোবাসার চাওয়া তার ভেতরেই।
ফাজিলও একসময় সেই বয়সে ছিল, মনে মনে ছোটন আর মেজোর জন্য চিন্তা করতো।
---
বাবা দেলোয়ার হোসেন কাঁচের জায়গায় বসে ধীরে ধীরে কফি খাচ্ছেন।
চোখে একটু ক্লান্তি, কিন্তু মুখে গম্ভীরতা।
মা নাজিয়া আক্তার রান্নাঘর থেকে বার বার চেয়ে দেখছেন, হালকা হাসি আর চোখে নরম আলো।
---
“মেজো, তুমি আবার রাগ করছ?” ফাজিল ভীষণ শান্ত কণ্ঠে বললো।
মেজো কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো, তারপর বললো—
“ভাই, তুমি সবসময় সবাইকে সাহায্য করো। আর আমরা? আমরা কি কম মানুষের মতো?”
ফাজিল একটু হেসে বললো—
“সবাই কম নয়। তুমি বুঝবে সময় আসলে।”
মেজো মনে মনে বললো—“সময় আসবে কি?”
ছোটন তখন পাশে বসে চুপচাপ। সে দেখছে, তার দুই ভাইও মানুষের মতো দুর্বল।
---
ফাজিল উঠে, ছোটনকে পাশে নিয়ে বললো—
“ছোটন, সম্পর্ক মানে শুধু মজা বা হাসি নয়।
যখন তুমি কাউকে সাহায্য করো, সে হয়তো তখন বুঝবে না।
কিন্তু সময় গেলে সে বুঝবে।”
ছোটন মাথা হেলে চুপ।
মেজো কিছু বুঝতে পারছে না, কিন্তু কিছু অনুভব করছে।
---
পরিবারের মধ্যে কখনো হাসি, কখনো কান্না, কখনো রাগ—সব মিলেমিশে একটা অদৃশ্য বন্ধন তৈরি করছে।
মেজো মাঝে মাঝে ভুল বোঝে, ফাজিল রাগ করে, ছোটন খুশি হয়।
তবুও তাদের মধ্যে মায়া আছে, যে অনুভূতি বোঝানো যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।
---
একদিন বিকেল।
গ্রামের মাঠে খেলছে তিন ভাই।
ছোটন দৌড়ে যাচ্ছে বোনের বাড়ির দিকে, হাসছে।
ফাজিল ডেকে ডাকছে—“ছোটন! ওদিকে এসো!”
মেজো হেসে রাগে বললো—
“সবই কি শুধু তার জন্য? আমাদের কি গুরুত্ব নেই?”
ফাজিল চুপ।
তবে সে জানে—মেজোর রাগ শুধু রাগ নয়, ভেতরের আদরের চাওয়া।
---
বাবা ধীরে বললেন—
“মেজো, তুমি এখনো ছোট। কিন্তু মনে রেখো, সময় গেলে তুমি বুঝবে।
যে ভালোবাসা দেওয়া হয়, সেটা কখনো নষ্ট হয় না।
শুধু সবাই তা বুঝতে পারে না।”
মা নাজিয়া আক্তার বললেন—
“ছেলেরা, সম্পর্ক বোঝার জন্য শুধু বয়স নয়, হৃদয় দরকার।
যে হৃদয় দিয়ে কিছু দেয়, সে সবসময় বেঁচে থাকে।”
---
রাতের আকাশে তারা উঠোনে বসে।
ফাজিল, মেজো, ছোটন—তিন ভাই।
বাবা-মা পাশে।
একটা নিঃশব্দ বোঝাপড়া গড়ে উঠছে।
ফাজিল ধীরে বললো—
“সম্পর্ক মানে শুধু পাওয়া নয়।
সম্পর্ক মানে দেওয়া—হৃদয় দিয়ে, বিনিময় ছাড়া।
যে ভালোবাসা নিজের হৃদয় দিয়ে দেয়া হয়,
সেটা চিরদিন থাকে।”
মেজো তখন বুঝতে পারছে—ভালোবাসা শুধু দেখা যায় না, অনুভব করা যায়।
ছোটন শান্ত।
ফাজিল শান্ত।
বাবা-মা চোখে পানি ধরে রেখেছেন।
---
গ্রামের বাতাসে হালকা ঠান্ডা, দূরে নদী বয়ে যাচ্ছে।
তিন ভাই একসাথে বসে, নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া।
ছোটন হেসে বললো—“ভাই, আজ ভালো লাগছে।”
ফাজিল হেসে মাথা নাড়লো।
মেজোও হেসে বললো—“আমিও…”
মায়ের চোখে নরম আলো, বাবার মুখে গম্ভীর শান্তি।
এভাবেই শেষ হলো ছোট্ট পরিবার, তিন ভাই, বাবা-মা,
যারা শিখেছে—সম্পর্ক মানে শুধু প্রয়োজন নয়, হৃদয় দিয়ে দেওয়া ভালোবাসা।
---সমাপ্ত
সম্পর্কের মূল্য
29
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating

কোন মন্তব্য নেই