শিমুলের জমিদার বাড়ি

শিমুলের জমিদার বাড়ি

সময়টা ১৯৯৫ সালের নভেম্বর মাস। সেবার প্রচণ্ড শীত পড়েছিল। চারদিকে কুয়াশা আর ঠান্ডা বাতাসে গ্রামগুলো যেন এক অদ্ভুত নীরবতায় ঢেকে ছিল। আশেপাশের গ্রামের মানুষ তখন শীতের আনন্দে ব্যস্ত—পিঠাপুলি বানানো, খাওয়া আর গল্পগুজব নিয়ে।
কিন্তু শিমুলপুড় গ্রামে সেই আনন্দের ছিটেফোঁটাও নেই।
শিমুলপুড় খুবই শান্ত একটি গ্রাম। কিন্তু কয়েকদিন ধরে গ্রামের মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
কারণ, গ্রামের পুরোনো জমিদারবাড়ির পাহারাদার জগা আর মগা—দুই সহোদর ভাই—কয়েকদিন আগে নির্মমভাবে খুন হয়েছে। বহু বছর ধরে তারা দু’জনেই জমিদারবাড়ির দেখাশোনা করত। কিন্তু হঠাৎ এক রাতে কে বা কারা তাদের এমনভাবে হত্যা করল, তা কেউ বুঝে উঠতে পারছে না।
এই খবর পৌঁছে যায় জমিদার বংশের শেষ উত্তরাধিকারীর কাছে।
তিনি বহু বছর ধরে আমেরিকায় বসবাস করছেন। সেখানেই তিনি বিয়ে করেছেন। কিন্তু জগা আর মগার মৃত্যুর খবর শুনে তিনি আর দেরি করেননি। তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
নভেম্বরের এক হিমেল সকালে কুয়াশায় ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামলেন অমিতাভ রায়চৌধুরী—শিমুলপুড় জমিদার বংশের শেষ উত্তরাধিকার।
বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ। চোখে চশমা, পরনে বিদেশি কোট। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার স্ত্রী ক্যাথরিন—একজন মার্কিন নাগরিক।
ক্যাথরিন এই প্রথম বাংলাদেশে এসেছে। চারপাশের কুয়াশা, ঠান্ডা হাওয়া আর অপরিচিত পরিবেশ দেখে তার মনে একটু ভয়ও কাজ করছে।
বিমানবন্দরের বাইরে আগেই একটি গাড়ি প্রস্তুত ছিল।
ড্রাইভার রামু মাথা নত করে বলল,
“বড়সাহেব, জমিদারবাড়ির অবস্থা খুব একটা ভালো না। গ্রামে সবাই খুব ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে আছে।”
গাড়ি ধীরে ধীরে শিমুলপুড়ের দিকে চলতে শুরু করল।
রাস্তার দু’পাশে কুয়াশা, মাঝে মাঝে তালগাছ আর বাঁশঝাড়ের ছায়া। গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অমিতাভের মনে ভেসে উঠতে লাগল তার ছোটবেলার স্মৃতি।
এই শিমুলপুড়েই তার শৈশব কেটেছে।
সেই লাল ইটের জমিদারবাড়ি…
বাবার কঠোর শাসন…
আর দাদুর মুখে শোনা পুরোনো দিনের গল্প।
সেই সময় তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল—মহেশ। তারা একসঙ্গে স্কুলে যেত, নদীতে সাঁতার কাটত, আর মাঝে মাঝে নারিকেল গাছে উঠে কচি ডাব পেড়ে খেত।
কিন্তু বহু বছর হয়ে গেছে সে গ্রাম ছেড়ে গেছে।
আজ সে ফিরছে… তবে আনন্দের জন্য নয়।
সে ফিরছে একটি রহস্যময় খুনের তদন্ত করতে।
কয়েক ঘণ্টা পর গাড়ি এসে থামল জমিদারবাড়ির সামনে।
বড় কাঠের ফটকটা কুয়াশায় প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা।
রামু গাড়ি থামাল।
অমিতাভ গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে তাকাল।
তারপর বলল,
“পুলিশ এসেছিল?”
রামু বলল,
“হ্যাঁ বাবু, এসেছিল।”
অমিতাভ জিজ্ঞেস করল,
“কিছু জানতে পেরেছে?”
রামু মাথা নিচু করে বলল,
“না বাবু… তারা কিছুই খুঁজে পায়নি।”
অমিতাভ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
“একবার ওসি সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে হবে।”
পরের দিন সকালবেলা।
ঘন কুয়াশার মধ্যে অমিতাভ থানার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
গাড়ি গ্রামের সরু রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ রাস্তার পাশে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে লাগল।
গাড়ি একটু কাছে আসতেই অমিতাভ তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল।
“মহেশ… তুই?”
লোকটা মৃদু হেসে বলল—
“হ্যাঁ রে অমিতাভ… এত বছর পর চিনতে পারলি?”
অমিতাভ গাড়ি থেকে নেমে তাকে জড়িয়ে ধরল।
মহেশ—তার শৈশবের বন্ধু।
কিন্তু আজ মহেশের চোখে অদ্ভুত একটা ভয়।
সে ধীরে ধীরে বলল—
“তুই কি সত্যিই জমিদারবাড়িতে উঠেছিস?”
অমিতাভ বলল,
“হ্যাঁ। কেন?”
মহেশ চারপাশে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“তুই জগা আর মগার মৃত্যুর কথা জানিস তো?”
“হ্যাঁ।”
মহেশের গলা একটু কেঁপে উঠল।
“অমিতাভ… এই খুনটা সাধারণ খুন না।”
অমিতাভ বলল,
“মানে?”
মহেশ ধীরে বলল—
“সেদিন রাতে আমি জমিদারবাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন দেখলাম বাড়ির ভেতর থেকে অদ্ভুত একটা আলো বের হচ্ছে… আর একটা শব্দ…”
অমিতাভ জিজ্ঞেস করল—
“কেমন শব্দ?”
মহেশ ফিসফিস করে বলল—
“মনে হচ্ছিল কেউ কাঁদছে… আবার হাসছেও।”
অমিতাভ একটু বিরক্ত হয়ে বলল—
“এসব গ্রামের গুজব।”
মহেশ মাথা নেড়ে বলল—
“না অমিতাভ… আমি জগা আর মগার লাশ দেখেছি।”
“কি দেখেছিস?”
মহেশ ধীরে বলল—
“ওদের মুখে এমন ভয় ছিল… যেন মৃত্যুর আগে তারা এমন কিছু দেখেছে… যা মানুষ না।”
ঠিক তখনই হঠাৎ এক ঝাপটা ঠান্ডা বাতাস বইল।
মহেশ খুব নিচু গলায় বলল—
“আর একটা কথা…”
“কি?”
মহেশ কাঁপা গলায় বলল—
“গতকাল রাতে আমি জমিদারবাড়ির ছাদের দিকে তাকিয়ে দেখেছি…”
“কি দেখেছিস?”
মহেশ বলল—
“ওখানে কেউ দাঁড়িয়ে ছিল।”
অমিতাভ বলল—
“কে?”
মহেশের ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
সে বলল—
“সমস্যা হলো… তার মুখটা ছিল…”
সে থেমে গেল।
অমিতাভ বলল—
“কার মতো?”
মহেশ ধীরে বলল—
“জগা…”
অমিতাভ স্তব্ধ হয়ে গেল।
কারণ জগা তো তিন দিন আগেই মারা গেছে।
আর ঠিক তখনই দূরে জমিদারবাড়ির দিক থেকে ভেসে এল এক অদ্ভুত শব্দ…
যেন কেউ ধীরে ধীরে হাসছে।
50 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই