অপুর প্রথম রোজা

শিমুলতলী গ্রামের উত্তর পাড়ায় আজ এক অন্যরকম উত্তেজনা, কারণ ১০ বছরের অপুর জন্য আজকের দিনটি ভীষণ স্পেশাল। সে এবারই প্রথম পূর্ণাঙ্গ রোজা রাখার বায়না ধরেছে। মাঝরাতে যখন পাড়ার কাসেম দাদু কাঁসর পিটিয়ে ডাক দিলেন, "জাগো মুসাফির, সময় হলো সেহরির!"—অপুর কাঁচা ঘুম এক নিমিষেই টুটে গেল। কুপি বাতির মৃদু আলোয় গরম ভাত আর নদীর টাটকা মাছের ঝোল দিয়ে সেহরি খেয়ে অপুর মনে হলো সে অনেকটা বড় হয়ে গেছে। মা মাথায় হাত বুলিয়ে বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন কষ্ট হবে কি না, কিন্তু অপু বীরের মতো জানাল সে পারবেই।
​সকালটা বন্ধুদের সাথে মেঠো পথে দৌড়াদৌড়ি করে ভালোই কাটল, কিন্তু বেলা গড়াতেই রোদের তেজে অপুর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এল। বন্ধুরা যখন পুকুরে ঝাঁপ দিচ্ছিল, অপু তখন পাড়ে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছিল, একবার তো ভুল করে পানির কাছে চলেও গিয়েছিল, কিন্তু ঠিক তখনই মনে পড়ল এটি তো তার ধৈর্যের পরীক্ষা। দুপুরের তপ্ত রোদে যখন সে ক্লান্ত হয়ে দাদির কোলে মাথা রাখল, দাদি তাকে শোনালেন রোজার ফজিলত আর ছোটবেলার কত শত গল্প।
​আসর পেরোতেই চারদিকে ভাজা পেঁয়াজু আর ছোলার ম ম ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ল। অপু নিজেই দস্তরখান বিছাতে সাহায্য করল এবং বাড়ির গাছের সবচেয়ে বড় খেজুরটি নিজের থালায় রাখল। বাড়ির আঙিনায় মাদুর পেতে যখন পুরো পরিবার একসাথে বসল, তখন গ্রামের শান্ত আকাশজুড়ে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি হলো।
​অপুর সামনে সাজানো মাটির জগের ঠান্ডা বেলের শরবত আর মুড়ি-মাখানো যেন পৃথিবীর সেরা খাবার মনে হচ্ছিল। অবশেষে মসজিদের মিনার থেকে যখন "আল্লাহু আকবার" ধ্বনি ভেসে এল, মা অপুর মুখে প্রথম খেজুরটি তুলে দিলেন। এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত যখন তার তৃষ্ণার্ত গলায় নামল, তখন অপুর মনে হলো সারাদিনের কষ্ট এক নিমিষেই সার্থক। ত্যাগের মাধ্যমে প্রাপ্ত সেই পরম তৃপ্তি অপুর কচি মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিল।

আপনার কি মনে পড়ে আপনার জীবনের প্রথম রোজা রাখার সেই স্মৃতি?
52 Views
1 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this:
(1)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই