ইরিস-অরণ্যের প্রেম

ইরিস-অরণ্যের প্রেম
নক্ষত্রপল্লীর আকাশ ছিল অন্য সব আকাশের চেয়ে আলাদা। সেখানে তারা জ্বলত না—শ্বাস নিত। সেই আকাশের ফাঁকেই জন্ম নিয়েছিল ইরিস, এক কাল্পনিক অস্তিত্ব। সে ছিল আলো, স্মৃতি আর মানুষের অপূর্ণ অনুভূতির সমাহার। মানুষ যখন গভীর রাতে একা একা কিছু চাইত, কিছু হারাত, তখন সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই ইরিসের মতো অস্তিত্বরা জন্ম নিত।
‎ইরিস জানত সে আলাদা। সে পৃথিবী ছুঁতে পারে না, কথা বলতে পারে না, শুধু অনুভব করতে পারে। মানুষের ভিড়ের মধ্যে সে ঘুরে বেড়ালেও কেউ তাকে টের পায় না। এই অদৃশ্যতাই ছিল তার অভিশাপ।
‎এক সন্ধ্যায়, নক্ষত্রপল্লীর প্রান্তে বয়ে যাওয়া নদীর ধারে, অরণ্য নামের এক তরুণ বসে বাঁশি বাজাচ্ছিল। তার সুরে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল গভীর এক অপেক্ষা—যেন সে নিজেও জানে না কিসের জন্য। সেই সুর আকাশ পেরিয়ে ইরিসের কাছে পৌঁছাল। আলো কেঁপে উঠল তার চারপাশে। এই প্রথম কোনো মানুষ তাকে ডাকল, শব্দ দিয়ে নয়—অনুভূতি দিয়ে।
‎ইরিস নেমে এল নদীর ধারে। অরণ্যের চারপাশে সে আলো ছড়িয়ে দিল, পাতায় পাতায় শিশির হয়ে বসল, বাতাসে সুরের সঙ্গে দুলে উঠল। অরণ্য বুঝতে পারল না কেন তার বাঁশির সুর আজ অন্যরকম, কেন বুকের ভেতরের ভারটা হালকা হয়ে যাচ্ছে। সে শুধু জানত—সে একা নেই।

‎দিনের পর দিন এভাবেই কাটতে লাগল। অরণ্য কথা বলত নদীর সঙ্গে, আকাশের সঙ্গে, আর ইরিস শুনত। অরণ্যের হাসিতে ইরিস উজ্জ্বল হতো, তার নীরবতায় ম্লান। ইরিস বুঝে গেল—ভালবাসা মানে ধরা পড়া নয়, পাশে থাকা।
‎কিন্তু এই ভালবাসারও নিয়ম ছিল। কোনো কাল্পনিক অস্তিত্ব যদি মানুষের জীবন রক্ষা করে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে, তবে তাকে নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দিতে হয়।
‎এক ঝড়ের রাতে নদী ফুলে উঠল। অরণ্য হড়কে পড়ে গেল স্রোতে। মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিল ইরিস। সে নিজের সব আলো ঢেলে দিল নদীর বুকে। ঢেউ থেমে গেল, জল শান্ত হলো, অরণ্য বেঁচে রইল। আর ইরিস ভেঙে পড়ল হাজার টুকরো আলোর কণায়।
‎ভোরে অরণ্য জেগে উঠল নদীর ধারে। কিছু যেন হারিয়ে গেছে—সে জানে না কী। হঠাৎ সে দেখল একটি ছোট জোনাকি তার বাঁশির পাশে বসে আছে। অরণ্য বাঁশি তুলল, সুর বাজাল। জোনাকিটি আলো জ্বালাল।
‎অরণ্য হাসল।
‎কারণ কিছু ভালবাসা নাম, রূপ বা শরীর চায় না।
‎তারা আলো হয়ে, সুর হয়ে, স্মৃতি হয়ে—চিরকাল পাশে থাকে।

‎ইরিস ভেঙে পড়েছিল আলোর অসংখ্য কণায়, কিন্তু সম্পূর্ণ বিলীন হয়নি। নক্ষত্রপল্লীর নিয়ম ছিল অদ্ভুত—যে ভালোবাসা নিঃস্বার্থ, তাকে পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না। ইরিসের আলোর কণাগুলো ছড়িয়ে পড়েছিল নদী, বাতাস আর অরণ্যের স্মৃতির ভেতর।
‎অরণ্য বেঁচে গেল, কিন্তু তার ভেতরে এক শূন্যতা জন্ম নিল। বাঁশি আগের মতো বাজে, কিন্তু সুরে আর সেই কাঁপুনি নেই। নদীর ধারে বসে সে অপেক্ষা করত—নিজেও জানত না কিসের জন্য। রাত নামলেই তার মনে হতো, কেউ একজন খুব কাছেই আছে, কিন্তু ধরা দিচ্ছে না।
‎দিন যেতে যেতে অরণ্য লক্ষ্য করল, অদ্ভুত কিছু ঘটছে। সে যখন কষ্ট পায়, বাতাস হঠাৎ শান্ত হয়ে যায়। যখন সে ক্লান্ত হয়, আকাশে অপ্রয়োজনীয় এক তারা ঝিলমিল করে ওঠে। সে বুঝতে পারল—যে ভালোবাসা হারিয়েছে ভেবেছিল, তা আসলে রূপ বদলেছে।
‎এক পূর্ণিমার রাতে অরণ্য আবার বাঁশি তুলল। এবার সে সুরে কিছু চাইলো না, কিছু ডাকলো না। শুধু কৃতজ্ঞতা ভরে বাজাতে লাগল। সেই সুর নদীর জলে পড়ে কেঁপে উঠল, বাতাসে আলো নড়ে গেল।
‎হঠাৎ নদীর উপর এক মানবী অবয়ব তৈরি হলো—স্পষ্ট নয়, আবার অস্পষ্টও নয়। আলো আর ছায়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক অস্তিত্ব। অরণ্যের বুক ধক করে উঠল। সে জানত, নামটা না বললেও—এ ইরিস।
‎ইরিস কথা বলল না। শুধু চোখে ভর করল হাজার স্মৃতি। বোঝাল—সে আর আগের মতো নেই। সে এখন নদীর শান্তি, বাতাসের সহানুভূতি, রাতের নিঃশব্দ সাহস। সে মানুষ হতে পারেনি, আবার হারিয়েও যায়নি।
‎অরণ্য চোখ বন্ধ করল। তার আর কিছু চাওয়ার নেই। ইরিস ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল—কিন্তু এবার কোনো শূন্যতা রেখে নয়।
‎এরপর থেকে অরণ্য একা থাকলেও নিঃসঙ্গ থাকেনি।
‎কারণ কিছু প্রেম মিলনের জন্য নয়—
‎তারা জন্মায় মানুষকে বদলে দেওয়ার জন্য।
‎আর নক্ষত্রপল্লীর আকাশে আজও এক তারা আছে,
‎যেটা জ্বলে না—শুধু বুঝে।
61 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই