শীতকালের নানুবাড়ি

বার্ষিক পরীক্ষার শেষ ঘণ্টার ঘণ্টা বাজতেই আমার বুকটা আনন্দে ভরে উঠল। দীর্ঘ দিনের পড়াশোনার চাপ শেষ, এখন শুধু অপেক্ষা—কবে মায়ের সাথে নানুবাড়ি যাব। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরের দিনই মা বললেন, “কাল সকালে আমরা নানুবাড়ি যাব।” এই কথা শুনে সেই রাতেই আমার ঘুম এল না।
পরদিন শীতের ভোরে আমরা রওনা দিলাম। বাস থেকে নেমে গ্রামের কাঁচা রাস্তায় হাঁটা শুরু করলাম। চারপাশে কুয়াশা, দূরে দূরে তাল-খেজুর গাছ, ক্ষেতের উপর শিশির ঝিলমিল করছে। গ্রামের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, শহরের সব ক্লান্তি যেন ধীরে ধীরে ঝরে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে গ্রামের মানুষ আমাদের দেখে হাসিমুখে সালাম দিচ্ছিল। শীতের হালকা রোদ আর ঠান্ডা বাতাসে হাঁটাটা ভীষণ আনন্দের ছিল।

নানুবাড়ির কাছাকাছি পৌঁছাতেই দেখি উঠোনে নানি রোদে বসে আছেন। আমাদের দেখেই নানি খুশিতে উঠে দাঁড়ালেন। নানু তখন পাশের উঠোনে আগুন পোহাচ্ছিলেন। আমাকে দেখেই নানু আদর করে বুকে টেনে নিলেন। সেই মুহূর্তে মনে হলো, পরীক্ষার সব কষ্ট যেন মুহূর্তেই ভুলে গেলাম।
শীতকালের নানুবাড়ি মানেই পিঠার আনন্দ। নানি ভোর থেকেই রান্নাঘরে ব্যস্ত। ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা আর পুলি পিঠার মিষ্টি গন্ধে পুরো বাড়ি ভরে গেল। খেজুরের গুড়ের রস গড়িয়ে পড়ছে, আর আমরা ভাইবোনেরা লোভে বারবার উঁকি দিচ্ছি। নানি হাসতে হাসতে আমাদের গরম গরম পিঠা খেতে দিলেন।
দুপুরে আমরা গ্রামের মাঠে খেলতে গেলাম। কেউ দৌড়ঝাঁপ করল, কেউ ক্রিকেট খেলল। মাঠের পাশের পুকুরে কুয়াশা তখনও পুরো কাটেনি। পুকুরপাড়ে বসে শীতের রোদ গায়ে মেখে গল্প করতে করতে সময় কেটে গেল। বিকেলে নানু আমাদের গ্রামের ভেতর দিয়ে হাঁটতে নিয়ে গেলেন। কাঁচা রাস্তা, শুকনো পাতার শব্দ আর শীতের নরম হাওয়া—সব মিলিয়ে হাঁটাটা ছিল খুবই শান্তির।
রাতে সবাই একসাথে বড় ঘরে শুয়ে পড়লাম। নানু আমাদের শৈশবের গল্প শোনালেন। বাইরে শীত আর কুয়াশা থাকলেও ঘরের ভেতরে ছিল ভালোবাসার উষ্ণতা। মায়ের পাশে শুয়ে আমি ভাবছিলাম, শীতকালের নানুবাড়ি সত্যিই কত সুন্দর।
পরীক্ষা শেষের পর মায়ের সাথে নানুবাড়ি যাওয়া আমার কাছে শুধু একটা ভ্রমণ নয়, এটা আনন্দ আর ভালোবাসার স্মৃতি। শীত এলেই আমার মন ছুটে যায় সেই গ্রামের পথে, নানুবাড়ির উঠোনে।
58 Views
2 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this:
(2)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই