নামাজ পড়েও জাহান্নামি

শুক্রবার। জুমার দিন। মসজিদ কানায় কানায় পূর্ণ। নীরবতা নেমে এসেছে। মিম্বরে উঠে দাঁড়ালেন মসজিদের ইমাম—মাওলানা আবদুল হাকিম (হাফিজাহুল্লাহ)।
তার কণ্ঠে দৃঢ়তা, চোখে গভীরতা। মুসল্লিদের দিকে তাকিয়ে তিনি একটু থামলেন, যেন সবাই মনোযোগ দেয়। তারপর আল্লাহর হামদ ও রাসুল ﷺ-এর প্রতি দরূদ পাঠ করে তিনি খুতবা শুরু করলেন—আজকের খুতবা এমন এক হাদিস নিয়ে, যা শুনলে ঈমানদার মানুষের হৃদয় কেঁপে ওঠে।

খুতবার বিষয়: হাশরের মাঠের সবচেয়ে নিঃস্ব ব্যক্তি।


সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য, যিনি বিচার দিনের মালিক। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর ওপর, তাঁর পরিবার ও সাহাবিদের ওপর।
হে মুসল্লিগণ!
আজ আমি আপনাদের সামনে এমন এক হাদিস তুলে ধরবো—
যেটা শুনলে শুধু ভয় নয়, নিজেকে নতুন করে হিসাব করার প্রয়োজন হয়।
❖ নিঃস্ব কে?
রাসুলুল্লাহ ﷺ একদিন সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন—
“তোমরা কি জানো নিঃস্ব ব্যক্তি কে?”
সাহাবিরা বললেন—
“ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাদের কাছে নিঃস্ব সেই ব্যক্তি—যার কাছে টাকা-পয়সা নেই, সম্পদ নেই।”

তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন—
“আমার উম্মতের মধ্যে প্রকৃত নিঃস্ব সেই ব্যক্তি—যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও যাকাত নিয়ে আসবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারো সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করেছে, কারো রক্তপাত করেছে, কাউকে মেরেছে। তখন তার নেকি নিয়ে যাদের সে জুলুম করেছে তাদের দেওয়া হবে। তার নেকি শেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপানো হবে, এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”
📖 সহীহ মুসলিম: ২৫৮১

হে মুসল্লিগণ!
খেয়াল করুন—এই লোকটা নামাজি, রোজাদার, যাকাতদাতা।
সে কাফির না, সে বেনামাজি না।
তবু সে নিঃস্ব!
কেন?
কারণ সে মানুষকে কষ্ট দিয়েছে।
❖ মানুষের হক—আল্লাহ মাফ করেন না
হে মুসল্লিগণ!
আল্লাহ তায়ালা নিজের হক চাইলে ক্ষমা করেন।
কিন্তু বান্দার হক আল্লাহ নিজে ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ না হকদার ক্ষমা করে।

রাসুল ﷺ বলেছেন—
“সাবধান! জুলুম করো না। কিয়ামতের দিন জুলুম হবে অন্ধকারের পর অন্ধকার।”
📖 সহীহ মুসলিম: ২৫৭৮

আজ আমরা ভাবি—
• মুখে কটু কথা বলেছি—কিছু না
• জমির এক কোণা চেপে গেছি—চলবে
• পাওনা টাকা দিইনি—সময় হলে দেবো
• আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক ভেঙেছি—ও প্রাপ্য না
কিন্তু হে মুসল্লিগণ!
এই ছোট ছোট জুলুমগুলোই কিয়ামতের দিন পাহাড় হয়ে দাঁড়াবে।

❖ ভয়াবহ বিনিময়: নেকির বদলে গুনাহ
সেদিন কোনো টাকা চলবে না।
কোনো দল, কোনো ক্ষমতা, কোনো পরিচয় কাজে আসবে না।
সেদিন বিনিময় হবে—
➡️ নামাজের বদলে মানুষের হক
➡️ রোজার বদলে জমির দাবি
➡️ যাকাতের বদলে অপমানের ক্ষত
যার নেকি শেষ হয়ে যাবে—
তার কাঁধে অন্যের গুনাহ চাপানো হবে।
এটাই সবচেয়ে বড় দেউলিয়াত্ব।

❖ আমরা কি নিরাপদ?
হে মুসল্লিগণ!
আজ নিজেকে প্রশ্ন করুন—
▪ আমি কি কাউকে কথা দিয়ে কষ্ট দিয়েছি?
▪ আমি কি কারো হক আটকে রেখেছি?
▪ আমি কি আমার ক্ষমতা দিয়ে কাউকে চেপে ধরেছি?
▪ আমি কি ধার্মিকতার আড়ালে জুলুম করেছি?
যদি উত্তর হ্যাঁ হয়—
তাহলে নামাজের সংখ্যা বাড়ানোই সমাধান না।
সমাধান হলো—হক ফিরিয়ে দেওয়া।
❖ মুক্তির পথ এখনো খোলা
হে মুসল্লিগণ!
মৃত্যুর আগে সুযোগ আছে।

রাসুল ﷺ বলেছেন—
“কারো সম্মান বা সম্পদের ব্যাপারে যার ওপর কোনো জুলুম আছে, সে যেন আজই তা থেকে মুক্ত হয়—সেই দিনের আগে, যেদিন কোনো দিনার বা দিরহাম থাকবে না।”
📖 সহীহ বুখারি: ২৪৪৯

আজ যদি ক্ষমা চাও—ক্ষমা পাওয়া যেতে পারে।
আজ যদি জমি ফিরিয়ে দাও—আজাব থেকে বাঁচা যেতে পারে।
আজ যদি পাওনা শোধ করো—নেকি বাঁচানো যেতে পারে।

হে মুসল্লিগণ!
নামাজ মানুষকে আল্লাহর কাছে নেয়।
কিন্তু চরিত্র মানুষকে জান্নাতে নেয়।
যে নামাজ পড়ে, কিন্তু মানুষকে কষ্ট দেয়—
সে হাশরের মাঠে নিঃস্ব হয়ে যাবে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে
নিজের আমল শুদ্ধ করার তাওফিক দিন,
মানুষের হক আদায় করার শক্তি দিন,
এবং কিয়ামতের নিঃস্বদের দলে না ফেলার রহমত দান করুন—আমীন🤲

✍️ Ripon Khan ✍️
125 Views
1 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this:
(1)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই