দান সদকা যেনো একটা শস্যবীজ
আমরা এক অদ্ভুত দুনিয়ায় বাস করি। এখানে সব কিছুর দাম আছে—সময়, অনুভূতি, এমনকি বিশ্বাসেরও। আমরা হিসাব করি, মাপি, ওজন করি। কোথায় কত দিলে কতটা কমে যাবে, সেটাই আমাদের বড় চিন্তা। হাতে যা আছে, সেটা আঁকড়ে ধরেই আমরা নিরাপদ বোধ করি। মনে হয়, ছেড়ে দিলে বুঝি শূন্য হয়ে যাব।
একদিন আমাদের সামনে পড়ে একটি ছোট্ট শস্যদানা। দেখতে তেমন কিছু না। হাতের মুঠোয় ধরলে ওজনও টের পাওয়া যায় না। আমরা ভাবি, এ তো কিছুই না। এটাকে ধরে রাখলে কী-ই বা হবে? আবার ছেড়ে দিলে কী-ই বা হবে? এই দানা আমাদের মনে এক অদ্ভুত প্রশ্ন জাগায়—ধরে রাখাই কি আসল বুদ্ধিমানের কাজ, নাকি মাটিতে ছেড়ে দেওয়াই?
আমরা জানি, দানাটাকে যদি শক্ত করে ধরে রাখা হয়, তাহলে সেটা শুকিয়ে যাবে। সময়ের সাথে সাথে তার ভেতরের প্রাণ হারিয়ে যাবে। কিন্তু যদি এটাকে নরম মাটির বুকে ছেড়ে দেওয়া যায়, যদি বিশ্বাস করে তাকে অন্ধকারে ঢেকে দেওয়া যায়, তাহলে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটে। দানা ফেটে যায়। বাইরে থেকে মনে হয়—নষ্ট হয়ে গেল। হারিয়ে গেল। শেষ হয়ে গেল।
কিন্তু আসলে সেখান থেকেই শুরু হয় সত্যিকারের জীবন।
মাটির নিচে, চোখের আড়ালে, নিঃশব্দে দানাটি কাজ করতে থাকে। কেউ দেখে না, কেউ বাহবা দেয় না। তবুও সে থামে না। ধীরে ধীরে একটিমাত্র দানা থেকে বেরিয়ে আসে কচি অঙ্কুর। সময় গেলে তা শক্ত হয়, বড় হয়, মাথা তুলে দাঁড়ায়। তারপর একদিন দেখা যায়—একটি দানা আর একা নেই। তার থেকে জন্ম নিয়েছে সাতটি শীষ। আর প্রতিটি শীষে ভরে আছে অসংখ্য দানা।
আমরা তখন থমকে যাই।
যেটাকে হারানো ভেবেছিলাম, সেটাই হয়ে উঠেছে প্রাপ্তি। যেটাকে শেষ মনে হয়েছিল, সেটাই শুরু হয়ে গেছে নতুনভাবে। এক দানা আর এক দানা থাকে না—তা হয়ে যায় সাতশো।
এই গল্প শুধু শস্যের নয়। এ আমাদের জীবনের গল্প।
আমরা যখন দান করি, তখনও ঠিক এমনটাই হয়। আমরা ভাবি—এটা দিলে কমে যাবে। এটা দিলে হাতে কম থাকবে। কিন্তু দান আসলে হারানো নয়। দান মানে বিশ্বাস করে মাটির বুকে বপন করা। দান মানে আল্লাহর ওপর ভরসা করে ছেড়ে দেওয়া। চোখে দেখা যায় না কীভাবে সেটা বাড়ে, কিন্তু সময় হলে তার ফল ঠিকই সামনে আসে।
আমরা দেখেছি—দান শুধু সম্পদ বাড়ায় না, মনও পরিষ্কার করে। দান করলে বুক হালকা হয়। হৃদয়ের ভেতরের কাঁটা যেন একে একে সরে যায়। দান করলে আশ্চর্য এক শান্তি নামে, যা কোনো জমাকৃত সম্পদ দিতে পারে না। দান আমাদের শেখায়—সবকিছু ধরে রাখার জন্য নয়, কিছু কিছু ছেড়ে দেওয়ার জন্যই সুন্দর।
আমরা আরও বুঝতে শিখি—দান কোনো হিসাবের বিষয় নয়। এখানে লাভ-ক্ষতির অঙ্ক চলে না। কারণ যিনি ফেরত দেন, তিনি আমাদের হিসাবের সীমায় বাঁধা নন। একটি দানা থেকে সাতশো দানা জন্ম দেওয়ার শক্তি যার আছে, তিনি চাইলে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারেন। কখনো দানের ফল আসে সম্পদ হয়ে, কখনো আসে সুস্থতা হয়ে, কখনো আসে অদৃশ্য বিপদ থেকে রক্ষা হয়ে।
আমরা তখন আর ভয় পাই না। হাত খালি হয়ে যাবে—এই ভয় আমাদের পিছু ছাড়ে না। কারণ আমরা জেনে যাই, খালি হাত আসলে খালি নয়। আল্লাহর কাছে জমা রাখা হাত কখনো শূন্য হয় না।
এই দুনিয়ায় আমরা সবাই ক্ষণস্থায়ী। যা আছে, তা একদিন ছেড়ে যেতেই হবে। কিন্তু যে দান মাটিতে বপন করা হয় আল্লাহর পথে, তা হারায় না। তা বেড়ে যায়। সময় পেরিয়ে, চোখের আড়ালে, নিঃশব্দে—ঠিক একটি শস্যদানার মতো।
আর এই কথাগুলো আমাদের কেবল ভাবনা নয়।
এটা আমাদের রবের স্পষ্ট ঘোষণা।
আমাদের আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন—
مَثَلُ ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَٰلَهُمْ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنۢبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِى كُلِّ سُنۢبُلَةٍۢ مِّا۟ئَةُ حَبَّةٍۢ ۗ وَٱللَّهُ يُضَٰعِفُ لِمَن يَشَآءُ ۗ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌ
অর্থঃ
যারা আল্লাহর পথে তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে,
তাদের দানের দৃষ্টান্ত হলো একটি শস্যদানার মতো—
যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়,
আর প্রতিটি শীষে থাকে একশোটি করে দানা।
আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, তার জন্য আরও বহু গুণ বাড়িয়ে দেন।
আল্লাহ অতি প্রশস্ত দাতা, সর্বজ্ঞ।
📖 সূরা আল-বাকারাহ : ২৬১
✍️ Ripon Khan ✍️
116
Views
1
Likes
1
Comments
5.0
Rating

সকল মন্তব্যগুলো (1)
মাশাআল্লাহ অনেক ভালো লাগলো গল্প টা।দানের শক্তি কেমন তা যেনো নতুন করে বুঝলাম। 🤗