নীলা

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
বাইরে ভোরের আলো ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু নীলার ভেতরের অন্ধকার যেন আরও ঘন হয়ে উঠছিল। অর্ণবের স্মৃতিগুলো ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছিল তার বুকে—তাদের প্রথম দেখা, একসঙ্গে কাটানো অজস্র মুহূর্ত। প্রতিটি স্মৃতি যেন এক একটি ধারালো ছুরি, যা তার হৃদপিণ্ডকে ক্ষতবিক্ষত করছিল।
অচেতনভাবে হেঁটে নীলা কখন যে হাসপাতালের গেট পেরিয়ে শহরের রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে, তা সে খেয়ালও করেনি। পায়ের তলায় পিচ রাস্তার রুক্ষতা অনুভব করে সে চমকে উঠল। কোথায় যাচ্ছে সে? তার তো আর কোথাও যাওয়ার নেই। যে মানুষটির হাত ধরে সে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল, সে তো আজ অনন্ত ঘুমের দেশে। আর যাদের সে অর্ণবের আপনজন বলে মনে করত, তাদের চোখে সে আজ হত্যাকারী।
একটি পার্কের ধারে এসে নীলার পা থেমে গেল। ক্লান্ত শরীরে সে একটি বেঞ্চে বসে পড়ল। চারপাশের সবুজ ঘাস, ফুলের বাগান—কোনোটাই তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারল না। তার ভেতরের শূন্যতা যেন সবকিছু গ্রাস করে নিয়েছে।
কতক্ষণ সে ওভাবে বসেছিল, তার খেয়াল নেই। হঠাৎ একটি পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে সে চমকে উঠল।
“নীলা? তুমি এখানে?”
নীলা মুখ তুলে তাকাল। শুভ্রা, অর্ণবের অফিসের সহকর্মী, তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। শুভ্রার চোখে উদ্বেগ স্পষ্ট।
“শুভ্রা? তুমি?” নীলার স্বর ধীর , ভাঙা।
শুভ্রা দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে নীলার পাশে বসল। “আমি যাচ্ছিলাম কাজে। তোমায় এখানে এভাবে দেখে…” শুভ্রার কথা আটকে গেল। সে নীলার বিধ্বস্ত চেহারা, শুকনো চোখ দেখে বুঝতে পারছিল কিছু একটা ভয়ঙ্কর ঘটেছে।
“অর্ণব… অর্ণব আর নেই,” নীলার কণ্ঠস্বর কান্নার দমকে ভেঙে গেল।
শুভ্রা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারল না। “কী বলছ তুমি নীলা? কী হয়েছে অর্ণবের?”
নীলা অস্ফুট স্বরে গতকাল রাতের ঘটনা বলল। অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে আনা, ডাক্তারদের চেষ্টা, আর শেষ পর্যন্ত সেই ভয়ঙ্কর খবর—সবকিছু সে শুভ্রাকে জানাল।
শুভ্রা নীরবে নীলার কথা শুনল। তার চোখও জলে ভরে উঠেছিল। অর্ণবকে সে খুব ভালো করে চিনত। একজন হাসিখুশি, প্রাণবন্ত মানুষ, যে সবসময় অন্যের সাহায্য করতে এগিয়ে আসত।
“আমি বিশ্বাস করতে পারছি না,” শুভ্রা বলল। “কাল রাতেও তো অফিসে ওঁর সঙ্গে কথা হল। হঠাৎ…”
“হঠাৎ সব শেষ হয়ে গেল,” নীলা বলল। “আর ওর পরিবারের লোকেরা… ওরা আমাকে দায়ী করছে। বলছে আমার জন্যই অর্ণবের এই পরিণতি।”
শুভ্রা নীলার হাত ধরল। “তুমি ভেঙে পড়ো না নীলা। আমি জানি তুমি অর্ণবকে কতটা ভালোবাসতে। নিশ্চয়ই কোনো ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে।”
“ভুল বোঝাবুঝি?” নীলা হতাশভাবে হাসল। “ওদের চোখে আমি খুনি শুভ্রা। ওরা আমাকে আর দেখতেও পারে না।”
“তুমি একা নও নীলা,” শুভ্রা বলল। “আমি তোমার সঙ্গে আছি। চলো, আমার সঙ্গে চলো। এখন তোমার বিশ্রাম দরকার।”
নীলা প্রথমে রাজি হতে চায়নি। তার মনে হচ্ছিল তার আর কোথাও যাওয়ার নেই। কিন্তু শুভ্রার আন্তরিকতা আর উদ্বেগে ভরা মুখ দেখে সে আর না করতে পারল না।
শুভ্রা নীলাকে তার ছোট অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে গেল। এক কামরার ছোট্ট ফ্ল্যাট, কিন্তু শুভ্রা নিজের হাতে সবকিছু গুছিয়ে রেখেছে। নীলাকে বসতে দিয়ে শুভ্রা তার জন্য জল আর খাবার নিয়ে এল।
নীলার কিছু খেতে ইচ্ছে করছিল না, কিন্তু শুভ্রার অনুরোধে সে সামান্য জল পান করল। তার শরীর দুর্বল লাগছিল, কিন্তু মনের ক্ষত এতটাই গভীর ছিল যে শারীরিক ক্লান্তিও যেন তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছিল।
শুভ্রা নীরবে নীলার পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। কিছুক্ষণ পর নীলা নিজেই মুখ খুলল। অর্ণবের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা, তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সব সে শুভ্রাকে জানাল। শুভ্রা মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনল, মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমি বুঝতে পারছি তোমার কষ্ট নীলা,” শুভ্রা বলল। “অর্ণব সত্যিই খুব ভালো ছেলে ছিল।”

“তাহলে কেন ওর পরিবারের লোকেরা আমাকে এত ভুল বুঝছে?” নীলার স্বরে অভিমান আর অসহায়তা মেশানো ছিল।
“দেখো নীলা,” শুভ্রা বলল, “এই মুহূর্তে ওরা শোকের মধ্যে আছে। প্রিয়জনকে হারানোর কষ্ট মানুষকে দিশেহারা করে দেয়। হয়তো সেই জন্যই ওরা তোমাকে ভুল বুঝছে। সময় দাও, হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু নীলার মনে কোনো আশা ছিল না। অর্ণবের মায়ের মুখের সেই ঘৃণা ভরা চাহনি, তার তীব্র অভিযোগ—কিছুতেই ভুলতে পারছিল না সে।
পরের কয়েক দিন শুভ্রাই ছিল নীলার একমাত্র অবলম্বন। সে নীলার পাশে ছিল, তার খেয়াল রেখেছিল। নীলাকে সামান্য হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিল। শুভ্রার অ্যাপার্টমেন্টের ছোট্ট বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে নীলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। তারা ভরা রাতের আকাশ তাকে আর শান্তি দিত না, বরং অর্ণবের স্মৃতি আরও তীব্র করে তুলত।
একদিন শুভ্রা নীলার হাতে একটি খাম দিল। “এটা তোমার জন্য।”
নীলা অবাক হয়ে খামটি নিল। উপরে তার নাম লেখা। খাম খুলে সে একটি চিঠি দেখতে পেল। প্রেরকের নাম—অরবিন্দ রায়। অর্ণবের বাবা।
নীলার হাত কাঁপতে লাগল। কী লিখেছেন তিনি? আবার কি কোনো অভিযোগ, কোনো তিরস্কার? ভয়ে ভয়ে সে চিঠি খুলল এবং পড়তে শুরু করল:
“মা,
আমি জানি তুমি এখন গভীর শোকের মধ্যে আছো। আমারও খুব কষ্ট হচ্ছে, আমার একমাত্র ছেলেকে হারিয়েছি। সুলতাও ভেঙে পড়েছে। মায়ের মন তো, তাই হয়তো অনেক কথা তোমাদের দু’জনকে বলেছে। আমরা শোকের মুহূর্তে অনেক ভুল কথা বলে ফেলি, যার জন্য পরে অনুতাপ করতে হয়।
অর্ণব আমার খুব আদরের ছেলে ছিল। ওর সব স্বপ্ন পূরণ হোক, এটাই আমি চাইতাম। ও তোমার কথা প্রায়ই বলত। তোমাদের দুজনের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক আশা ছিল ওর।
মা, আমি জানি অর্ণব তোমাকে কতটা ভালোবাসত। আর তুমিও ওকে ভালোবাসতে, তা আমি বুঝতে পারি। এই দুর্ঘটনায় কার দোষ ছিল, তা নিয়ে এখন আলোচনা করার সময় নয়। যা হওয়ার ছিল, তা হয়ে গেছে।পুলিশ তদন্ত করছে,আসামী ধরা পড়লেই রহস্য উন্মোচন হবে।
তবে একটা কথা আমি তোমাকে বলতে চাই। তুমি একা নও। অর্ণবের স্মৃতি আমাদের সকলের সঙ্গেই থাকবে। যদি কখনো কোনো প্রয়োজন হয়, দ্বিধা না করে আমাদের জানিও।
ইতি,
অরবিন্দ রায়।”

চিঠিটা শেষ করে নীলার চোখ জলে ভরে গেল। অরবিন্দ বাবুর এই অপ্রত্যাশিত বার্তা তার ভেতরের জমে থাকা বরফ যেন গলিয়ে দিল। হয়তো সত্যিই শোকের মুহূর্তে মানুষ দিশেহারা হয়ে ভুল কথা বলে ফেলে। হয়তো অর্ণবের পরিবারের মনেও তার জন্য সামান্য হলেও সহানুভূতি আছে।
কিন্তু সুলতা দেবীর সেই তীব্র ঘৃণা ভরা চাহনি? নীলা কিছুতেই ভুলতে পারছিল না। হয়তো অরবিন্দ বাবু চান সবকিছু স্বাভাবিক হোক, কিন্তু সুলতা দেবীর মন থেকে কি সেই বিদ্বেষ দূর হবে?
কয়েক দিন পর শুভ্রা নীলাকে অর্ণবের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যাওয়ার কথা বলল। প্রথমে নীলার যেতে দ্বিধা হচ্ছিল। সে ভাবছিল, সেখানে গেলে হয়তো আবার তাকে অপমানিত হতে হবে। কিন্তু শুভ্রা তাকে সাহস জোগাল। বলল, অর্ণবের শেষকৃত্যে তার থাকা উচিত।

শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের দিন নীলা শুভ্রার সঙ্গে অর্ণবের বাড়িতে গেল। বাড়ির বাইরে বহু মানুষের ভিড়। ভেতরে কান্নার রোল। নীলাকে দেখেই সুলতা দেবী মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তার চোখে তখনও সেই একই বিদ্বেষের আগুন জ্বলছিল।
কিন্তু অরবিন্দ বাবু এগিয়ে এসে নীলার হাত ধরলেন। তার চোখে জল, কিন্তু কণ্ঠে সান্ত্বনার সুর। “এসো মা, ভেতরে এসো।”
ভেতরে গিয়ে নীলা দেখল অর্ণবের ছবি রাখা। ছবিতে সেই মিষ্টি হাসি, যা তার হৃদয়ে আজও গেঁথে আছে। নীলা এগিয়ে গিয়ে ছবিতে হাত রাখল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে লাগল।
শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে নীলা নীরবে একপাশে দাঁড়িয়েছিল। অর্ণবের আত্মীয়স্বজনেরা তার দিকে কৌতূহলের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। কেউ কেউ সহানুভূতি দেখাচ্ছিল, আবার কারো কারো চোখে সন্দেহ ছিল।
অনুষ্ঠান শেষে যখন সবাই চলে যাচ্ছিল, তখন সুলতা দেবী নীলার কাছে এলেন। তার মুখ কঠিন, কিন্তু চোখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
“তুমি কেন এসেছ?” সুলতা দেবীর স্বরে কোনো উষ্ণতা ছিল না।
“অর্ণবকে শেষ বিদায় জানাতে,” নীলা বলল।

“তোমার জন্য আজ আমার ছেলেটা নেই,” সুলতা দেবী বললেন। “আমি তোমাকে কখনো ক্ষমা করব না।”
কথাটা নীলার বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে আর কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু নীরবে চোখের জল ফেলল।
অরবিন্দ বাবু এগিয়ে এসে সুলতা দেবীর হাত ধরলেন। “চলো সুলতা, এবার বাড়ি চলো।”
সুলতা দেবী স্বামীর হাত ধরে চলে গেলেন, কিন্তু যাওয়ার আগে নীলার দিকে শেষবারের মতো ঘৃণা ভরা দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন।
নীলা জানত, অর্ণবের পরিবারের মনে তার জন্য কোনো স্থান নেই। তাদের শোক হয়তো কোনোদিন কমবে, কিন্তু তাদের অভিযোগ আর ঘৃণা হয়তো কখনোই দূর হবে না।
শুভ্রা নীলার হাত ধরে বাইরে নিয়ে এল। “চলো নীলা, এখান থেকে যাওয়া যাক।”
রাস্তার আলোয় নীলার ভেজা মুখ বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল। সে জানত, আজ থেকে তার এক নতুন জীবন শুরু হল—এক নির্বাসিত জীবন, যেখানে তার পরিবারের আর অর্ণবের পরিবারের ঘৃণা তার পথের কাঁটা। সে একা কীভাবে রহস্য উন্মোচন করবে।শ্রাবণের পর অর্ণব, এক এক করে হারিয়ে যাওয়া। রোহিতের হঠাৎ করে বিদেশ চলে যাওয়া।রোহিত তাকে ভালোবাসে অথচ বিয়ে করতে চাইনা,নীলা বুঝে উঠতে পারে না।এখন তার কি করা উচিত।সে একাই সত্য উদঘাটন করবে।সেই আশাতেই নীলা আবার পথ চলতে শুরু করল—এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।

চলবে...
14 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: