কাকার মৃতদেহটা এখনও ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাঝে মাঝে। কি হাসি খুশি মানুষ ছিলো ওর কাকা। কিন্তু মৃত দেহটা কি অসহায় ছিলো। কুকড়ে গিয়েছিলো। ছোট হয়ে গেছিলো বড়ো। ওর কাকা বুড়ো হয় নি।
জানেন ও হয়তো ওর কাকার মৃতদেহটা দেখতেই পেতো না। কিন্তু ভ্যাগের কি পরিহাস ওর হাতেই হলো ওর কাকার শেষকৃত্য । ও দেশে যে দিন ফিরলো সেই দিন ওর কাকা ওর সাথে দেখা করতে এসেছিলো। ও তখন ব্রেকফাস্ট করছে ও শুনতে পেয়েছিলো নিচে ভাড়াটেরা কথা বলছে ওর কাকার সাথে। ওর কাকা ওর খোঁজেই এসেছিলেন। কিন্তু ও সেইদিন অনেক রাতে এসেছিলো, ফলে ভাড়াটেরা বললে দিলো ও আসে নি। ও নীচে নামার আগেই মানুষটা চলে গেলো ,ওর সাথে দেখা হলো না।
ওর কাকা তার এক সপ্তাহ বাদে মারা গেলো। কি কথা বা অভিযোগ নিয়ে ওর কাকা ওর সাথে দেখা করতে এসেছিলো ও জানতে পারলো না। ওর কাকার মৃতদেহটা ও যখন প্রথম দেখেছিলো। তখন চোখটা খোলা ছিলো। ঠোঁট খুব শুকনো। চোখে ছিলো কারো জন্য অপেক্ষা। আর ঠোঁটে জমে ছিলো কিছু না বলা কথা।
ওর কাকা বাস কন্ডাকটর ছিলো। মেট্রো পরিসেবা চালু হবার পর,ওর কাকার বাস রুটটা বন্ধ হয়ে গেলো। তারপর ওর কাকার নিয়মিত কোন কাজ ছিলো না। কখনো বিয়ে বাড়ির রান্নার হেলপার, কখনো বাড়ি রঙ করার কাজ, কখনো গাড়ি ধোঁয়া, কখনো বাড়ি পরিস্কার করার কাজ করতো।
জানেন ওর কাকার কোন কাজ না করলেও চলতো। ওদের বাড়ি অবস্থা তো খুব একটা খারাপ নয়। ওর কাকাকে কোন দিন একটা টাকা কড়ি দিতে হয় নি সংসারে। বরং জলের ট্যাঙ্ক পরিস্কার করলে নগদ পাঁচশ টাকা দেওয়া হতো।ওর কাকা রোজগার করতে নিজের হাত খরচ চলাতে। আর গ্রামের বাড়ি তে কালী পূজা করার জন্য। বাড়ি কোন কাজ করে পয়সা দাবি করতো যখন ঐ পূজা চালনোর বাজেটে কম পরতো। তবে হাতপেতে টাকা নিতো না। কোন কাজের বিনিময়ে টাকা নিতো।
ওর কাকার মৃতদেহটা সৎকার করতে অস্বীকার করেছিলো ওর কাকার নিজের ছেলে। কাকার ছেলেটা অনেক ছোট ছিলো, তখন ওর কাকীমা কাকীর বাপের বাড়িতে গিয়ে আর ফিরলো না। এক ট্যাক্সি ড্রাইভার সাথে চলে গেলো কাকার ছেলেটাকে নিয়ে। কাকার ছেলে বললো " কি করেছে লোকটা আমাদের জন্য। মাসে মাসে হাজার তিনেক টাকা পাঠাতো। সব কিছু করছে দাদা বৌদি ভাইপোদের জন্য। ভাইপোরাই সব কিছু করুক। "
করোনা সময় ওর কাকা কাজের সন্ধানে বেড়াতো। এটা নিয়ে বিবাদ বাধলো ওর ভাইএর বৌএর সাথে। ওর ভাইএর বৌ অভিযোগ ছিলো যুক্তি সঙ্গত। একে দাদার ঘাড়ে বসে খায় ওর কাকা। আবার বাইরে থেকে অসুখ বিসুখ বেয়ে আনবে এটা কেমন কথা। এই কথাটা অপমানের ছিলো ওর কাকার কাছে। অপমান সহ্য না করতে পেরে ঘর ছাড়লো ওর কাকা।
ও চোখের সামনে যখন ওর কাকার মৃতদেহটা ভেসে ওঠে ও আতঙ্ক কেঁপে ওঠে। ওর শরীরটা ঘেমে ভিজে যায়। ওর মতো হাসি খুশি মানুষ ছিলো ওর কাকা। জীবন নিয়ে উদাসীন, কিছুটা বেপরোয়া। দুঃখ ছুতো না ওকে কখনো। কিন্তু মানুষটা হঠাৎ চলে গেলো অনেক অভিযোগ রেখে।
ওর বৌ ওর কাকাকে খুব ভালোবাসতো। ওর বৌ বাড়িতে থাকলে হয়তো ওর কাকাকে বাড়ি থেকে বেড় হতে হতো না।ওর বৌটাও ওর ভাত খায় না আর। কত মানুষের বৌ চলে যায় আজকাল। ওর বৌটাও গেছে। ঠিক ওর কাকার বৌটা চলে গেছে যেমন করে। তাই ওর কাকার অসহায় মৃতদেহটা ওকে খুব কষ্ট দিয়েছে।
যদিও ওর সাথে ওর কাকার কোন তুলনাই চলে না। ওতো ওর কাকার মতো বেকার মানুষ না। ওর টাকা পয়সা আছে, গাড়ি বাড়ি সবই করছে। তবুও ও কেমন যেন ভয় পায়। আসলে পয়সা দিয়ে আপনজন কেনা যায় না। তাই বোধহয় ও কষ্ট পায়, ভয় পায়।
কলুর বদল
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
54
Views
1
Likes
0
Comments
5.0
Rating