গোধূলি লগ্নে প্রনয় গুঞ্জন

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
#গোধূলি_লগ্নে_প্রনয়_গুঞ্জন
#কানিজ_ফাতেমা
#পর্ব_২

উঠোনের এক কোণে কপালে হাত ঠেকিয়ে চুপচাপ বসে আছেন মতিউর রহমান। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। গলার শিরা কাঁপছে।তার চোখ দিয়ে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে।

কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন,
“ আমি পারলাম না,আমার মেয়েটার বিয়ে দিতে।আল্লাহ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন আমার দিক থেকে।

তার বুকফাটা কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।উপস্থিত আত্মীয়রা এখনো গুনগুন ফুসফুস করছে।কেউ আবার তাচ্ছিল্য ভরে চোখ ফিরিয়ে ফেলে।

গোধূলির সৎ মা বিলকিস বেগম সজোরে হাতে তালি দিয়ে উঠলো। ব্যঙ্গাত্মক গলায় মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“ আমি বলেছিলাম না তোমার এই অলক্ষী কালো মেয়েকে কেউ নেবে না। দেখলে তো আমার কথার মিল আছে কিনা।

মতিউর রহমান কোন কথা বলছে না। চুপচাপ নির্বিঘ্নে কথাগুলো শুনছে।

বিলকিস বেগম পুনরায় গলা উঁচিয়ে তেছড়া স্বরে আবার বলা শুরু করল,
“ এখন তোমার এই অলক্ষী কুৎসিত মেয়েকে, কে বিয়ে করবে। এই মেয়েকে নিয়ে এখন কি করবে তুমি।এই বয়সে বিয়ে ভেঙে গেল, এখন তো সারাজীবন ঝুলেই থাকবে ঘাড়ে। এই মেয়েকে আমি আর ঘরে তুলব না। আমারও মেয়ে আছে। ওর সাথে থাকলে ওকে বিয়ে দিতে পারব না। এখন যা করার করো তুমি।

তার প্রতিটা শব্দ বিষের মতো ঘুরে ফিরে গোধূলির বুকের মধ্যে বিঁধে যায়। ও আর চুপ থাকতে পারে না। তির্যক কন্ঠে গর্জে ওঠে,
“ মা, তুমি এমন কথা বলছো কেন? আমিও তো তোমার মেয়ে।

বিলকিস বেগম রাগে ফোঁস ওঠেন,
“ চুপ কর, তোর মত কয়লার খনি আমার মেয়ে হতে পারে না। জন্মের সময় তো মাকে খেয়েছিস এখন আমার সংসারটাকে খাওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিস। তুই একটা অলক্ষী। যেখানে যাবি সেখানেই সবকিছু ছারখার হয়ে যাবে।

এই অপমানের শব্দগুলো ওর কানের পর্দা ফাটিয়ে দেয়। চোখ থেকে দুই ফোঁটা চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে গোধূলির। মতিউর রহমান বিলকিস বেগমকে থামানোর অনেক চেষ্টা করে। কিন্তু পারেন না। উনি উল্টো আরো অনেক কটু কথা শোনাতে থাকে এই গোধূলি কে।বিয়ে বাড়ির অতিথিরা একে একে বেরিয়ে যেতে শুরু করে।কেউ সহানুভূতির চোখে তাকায় না, সবাই কটাক্ষের সাথে ঠোঁট বাঁকিয়ে চলে যায়।

এমন সময় হঠাৎ এক নারী কণ্ঠ ভেসে এলো,
“ এই মেয়ে কে আমি আমার ছেলের জন্য চাই

মহিলার কথা শুনে ওখানে উপস্থিত সবাই চমকে উঠল।সবার দৃষ্টি গেল সেই নারীর দিকে। পরনে দামি শাড়ি,
চোখে আত্মবিশ্বাস। বয়স পঞ্চাশোর্ধ হবে, কিন্তু ব্যক্তিত্বে তিনি অনন্য।

তিনি সামনে এসে দাঁড়ালেন। সবার দিকে তাকালেন এক নজর। স্বগোতক্তি গলায় বলল,
“ ওর দাম বোঝার ক্ষমতা আপনাদের নেই। কিন্তু আমি জানি, সে কত মূল্যবান। আমি এই মুহূর্তেই ওকে আমার পরিবারের অংশ করতে চাই।

মতিউর রহমান হতবাক,
" আপনি কে

উনি ইস্মিত কণ্ঠে উত্তর দিলেন,
“ আমি ইয়াসমিন কবির। আমার ছেলে আরশাদ কবির প্রনয়।সে একজন অ্যাকাউন্টিং এর লেকচারার।ওর বয়স ৩০। আমার ছেলের পাঁচ বছর বয়সী এক মেয়ে আছে। বছর চারেক আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় আমার ছেলের বউ মারা গেছে। জীবন মৃত্যুর উপর তো কারো হাত নেই। এখন আপনার মেয়েকে আমার ঘরের বউ করে পাঠাতে রাজি আছেন।

মতিউর রহমান কিছুটা ইতস্তত বোধ করছেন।খানিকটা আমতা আমতা করে বললেন,
“ ইয়ে মানে আপনার ছেলে

ইয়াসমিন কবির মতিউর রহমানের আমতা আমতা করে কথাটা বুঝে ফেললেন,
“ আমি ওর মা। আমার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।এই বিয়েতে আমার ছেলে রাজি থাকুক বা না থাকুক, আমি এই মেয়েকেই আমার পরিবারের পুত্রবধূ হিসেবে চাই

সবাই স্তব্ধ।প্রনয় হ্যান্ডসাম, সুদর্শন, রাগী, আত্মমর্যাদা সম্পন্ন এক ব্যক্তি।সেও সেখানে উপস্থিত ছিলো। সাদা পাঞ্জাবি,পায়জামায় গম্ভীর চেহারায় প্রনয় দাঁড়িয়ে আছে।তার মুখে বিরক্তি মাখানো অভিব্যক্তি। তার চোখ বলে দিচ্ছে এই সিদ্ধান্ত তার জন্য একেবারেই
অপ্রত্যাশিত

প্রনয় আর নিজেকে সংযত করতে পারল না। গলা চড়িয়ে বলল,
“ আম্মু, তুমি কি বলছো

ইয়াসমিন কবির ছেলের কথার কাঠ কাঠ জবাব দিলেন,
“ আমি যা বলছি, সেটাই হবে।

রাগে প্রনয়ের কপালের মাঝখানে চওড়া ভাঁজ পরলো।ও তেতিয়ে উঠল তীব্র বেগে,
“ অসম্ভব আমি এই বিয়েতে রাজি না। আমি মীরার স্থান দ্বিতীয় কাউকে দিতে পারবো না। আর ভাবনা কে সৎ মায়ের হাতে তুলে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।

ইয়াসমিন কবিরের কণ্ঠে দৃঢ় স্বর,
“ তোমার মতামতের দরকার নেই, প্রনয়।তুমি জানো, আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয় না।

ছেলের কথার তোয়াক্কা না করে ওখানে উপস্থিত সবার সামনে ইয়াসমিন কবির ঘোষণা দিলেন,
"এই মুহূর্তে আমার ছেলের সঙ্গে ওনার মেয়ের বিয়ে হবে। কাবিন নামা তৈরি করা হোক

গোধূলি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।সে কি করবে?
একদিকে অপমান, অন্যদিকে এমন একটা অপ্রত্যাশিত এক বিয়ের প্রস্তাব। গোধূলি ওর বাবার দিকে তাকালো। মতিউর রহমান স্থির দৃষ্টিতে, থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। ওনার চাহনি বলে দিচ্ছে এই বিয়েতে উনার সাঁই নেই। কিন্তু সে নিরুপায়।উনি ভিতরে ভেতরে টানাপোড়েনে জর্জরিত এক বাবা।উনি জানেন, বিয়ে ভাঙা মেয়েকে সহজে কেউ বিয়ে করতে চায় না। তার উপর মেয়ের গায়ের রঙ শ্যাম বর্ণ, যা সমাজ এখনো তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উপেক্ষা করে। সমাজের এই তাচ্ছিল্য আর উপেক্ষার চেয়ে এই সম্বন্ধ ‌ঢের ভালো।হয়তো এর থেকে ভালো সম্বন্ধ উনি তার মেয়ের জন্য খুঁজে পেতেন না। তাই উনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও বুকে পাথর চাপা দিয়ে চুপ করে আছেন। গোধূলি ভেবেছিল তার বাবা এই বিয়ের প্রস্তাবে প্রতিবাদ করবে। কিন্তু ওর সেই ভাবনা নিরাশার অতল গহবরে হারিয়ে গেল। গোধূলি বাবার মৌনতাকে সম্মতি হিসেবে ধরে নিল। ওর ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো নিভৃত বুকের বিক্ষিপ্ত শ্বাস।নিয়তির নির্মম করাঘাত সে মুখ বুঝে মেনে নিতে বাধ্য হল।

বিয়ের কাজী এসে উপস্থিত হলো।সাক্ষী বসানো হলো।প্রনয়ের চোখে বিদ্রোহের আগুন।সে বিয়ে করতে চায় না, কিন্তু মায়ের হুকুম অমান্য করার ক্ষমতা নেই তার। বিয়ের নিয়ম কানুন অনুযায়ী লেখালেখি শেষে, ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী কিছু বাক্য উচ্চারণ করে প্রনয় কে কাজী কবুল বলতে বলল।

প্রনয়েরর চোয়াল শক্ত করে,দাঁতে দাঁত চেপে বসে আছে।রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে।

ইয়াসমিন কবির কঠোর গলায় নির্দেশ ছাড়লেন,
“ কবুল বলো, প্রনয়

প্রনয়ের চোখ জ্বলজ্বল করছে রাগে, হতাশায়।কিন্তু মা কে সে কখনো অসম্মান করার সাহস করে নি
আজকেও প্রনয় তার অন্যথা করলো না।

প্রনয় একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে, দাঁত চিবিয়ে বলে,
" কবুল

গোধূলির বুক ধক করে উঠল। শব্দটা যেন আকাশ ভেঙে ঝরে পড়ল গোধূলির কানে। ধড়ফড় করে উঠল তার হৃদয়। অজানা অশ্রুতব্য অনুভূতি মিলেমিশে যেন বুক চেপে ধরল তাকে।

কাজি এবার কনে মুখী হলো,
" তুমি কি আরশাদ কবির প্রনয় কে স্বামী হিসেবে কবুল করছো

গোধূলির মনের ভেতর অস্থিরতার ঝড় উঠেছে।গলার স্বর কোথাও গিয়ে আটকে গেল। চোখের কোণে অশ্রুর ঝিলিক। হঠাৎ ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল তানভীরের মুখ।

যে একদিন বলেছিল, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না। সেই মানুষটাই ওর গায়ের রঙের জন্য ওকে প্রত্যাখ্যান করে চলে গেলো। অন্তরীক্ষ কেঁপে উঠল ওর।চোখ জোড়া জলে ভরে উঠেছে ওর।বুকের ভেতর হাহাকার, তবু ঠোঁট শক্ত।সে চোখ তুলে এক ঝলক প্রনয়ের দিকে তাকাল। ওর চোখে মুখে রাগের গাঢ় ছায়া।তবু গোধূলি জানে পিছু হটার বা পালানোর কোনো কোনো পথ নেই।ধীরে ধীরে ঠোঁট নাড়ল সে।

কণ্ঠে কম্পন, কিন্তু শব্দে দৃঢ়তা,
" কবুল

শব্দটা উচ্চারিত হতেই চেয়ারের হাতল চেপে বসে থাকা প্রণয় হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল।চোয়াল শক্ত, চোখে রাগের আগুন।বুক দ্রুত ওঠানামা করছে তার। এক মুহূর্তও না তাকিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল সে।ভারী পায়ের শব্দে ঘরের নিস্তব্ধতা কেঁপে উঠল।দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেল প্রণয়।

পেছনে রইল শুধু গোধূলির নিঃশব্দ কষ্ট আর অপূর্ণ চোখের জল। গোধূলির জীবন আজ অন্য রকম ভাবে এক নিমেষে বদলে গেল।

গোধূলির মনে ঘুরছে একটাই প্রশ্ন,
" বিয়ে টা হলো, কিন্তু এটা কি সত্যিকারের সংসার হবে,না কি এটা শুধুই একটা টানাপোড়েনের সম্পর্ক হতে চলেছে

#চলবে...
52 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: