আনসারির জীবনে একধরনের নিঃশব্দ অস্থিরতা ঘনিয়ে উঠেছিল গত কয়েক মাস ধরে। শহরের নামী একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে সেলস এক্সিকিউটিভ হিসেবে কাজ করত সে। কর্মঠ, পরিশ্রমী, আর জবাবদিহিতে নিখুঁত—সব মিলিয়ে বসদের প্রিয় একজন। কিন্তু কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট, আর সেইসঙ্গে কোম্পানির অজস্র খরচ কমানোর উদ্যোগ, একদিন হঠাৎই তাকে ছাঁটাইয়ের চিঠি ধরিয়ে দিল।
তখন সবে ফাগুন মাস, বাতাসে একটা মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল। সজল তার ছোট ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিল নিস্তব্ধ আকাশের দিকে। মনে হচ্ছিল যেন আকাশটা আজ একটু বেশি নীল, অথচ তার মনটা ধূসর।
সে বাবা-মাকে কিছু বলেনি। বাবা মারা গেছেন অনেক বছর আগেই, মা রয়েছেন গ্রামে, টাকাটা সময়মতো পাঠালেই তিনি নিশ্চিন্ত। আনসারি ভেবেছিল, চাকরি না থাকলেও কিছুদিন চলে যাবে। প্রভিডেন্ট ফান্ড, কিছু সঞ্চয়—মোটামুটি দুই-তিন মাসের মতো ব্যয় নির্বাহ সম্ভব।
কিন্তু সময় বড়ই নিষ্ঠুর। একটা মাস পেরুতেই বোঝা গেল খরচ আর জমানো টাকার অঙ্কের মাঝে আছে এক চোরাবালি। একদিন হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল। এভাবে আর কতদিন?
সেইদিন বিকেলে সে ফোনে ইউটিউব খুলে বসে ছিল, উদ্দেশ্য ছিল কিছু "ওয়ার্ক ফ্রম হোম" ভিডিও দেখা। হঠাৎই চোখে পড়ল একটা থাম্বনেইল:
"মোবাইলে ট্রেডিং শিখে প্রতিদিন ১০,০০০ টাকা ইনকাম! গ্যারান্টি!"
আনসারি কৌতূহলী হয়ে ক্লিক করল। ভিডিওতে এক লোক স্যুট পরে সোজা ক্যামেরায় তাকিয়ে বলে যাচ্ছে—“বন্ধুরা, এই স্ট্রাটেজি ফলো করলেই আপনি প্রতিদিন ইনকাম করতে পারবেন, কোনো অভিজ্ঞতা লাগবে না, শুধু মোবাইল আর ইন্টারনেট থাকলেই হবে।”
মনে মনে আনসারি ভাবল—"এতো ভালো সুযোগ! এতোদিন ধরে ঘুরে ঘুরে সিভি পাঠাচ্ছি, কোনো চাকরির খবর নেই। যদি এটা সত্যি হয়!"
ভিডিওটা শেষ না হতেই ইউটিউব এলগরিদম আরও ভিডিও সাজিয়ে দিল সামনে—
“৩ দিনে ৩০,০০০ টাকা ইনকাম!”,
“ট্রেডিং নয়, এ হলো অনলাইন মেশিন!”,
“হাজারো তরুণ আজ এই পথেই সফল!”
আনসারি পরের কয়েকদিন শুধু এই ভিডিওগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকল। গুগলে সার্চ করল, কয়েকটা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করল, এমনকি একটানা কয়েক ঘন্টা ইউটিউব ট্রেডিং টিউটোরিয়াল দেখে কাটাল। মনে হচ্ছিল, এটা একটা সুযোগ, একটা রাস্তাই খুলে গেছে যেন।
একদিন সাহস করে সে একটা অ্যাপে অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলল—ফরেক্স ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম। শুরুতে সে চাইল্ড মোডে একটা ডেমো অ্যাকাউন্টে প্র্যাকটিস করল, প্রায় ৪–৫ দিন। আশ্চর্য, প্রতিটা ট্রেডেই লাভ হচ্ছিল! যতটা সহজ মনে হচ্ছিল, ঠিক ততটাই লাভদায়কও যেন।
তারপর একদিন নিজের ২,০০০ টাকা দিয়ে রিয়েল অ্যাকাউন্ট খুলল। প্রথম ট্রেডেই প্রায় ৪০০ টাকা লাভ। সে আনন্দে আত্নহারা! পরের ট্রেডে আরও ৩৫০ টাকা। এইভাবে ২,০০০ থেকে ৩,২০০ টাকা হয়ে গেল মাত্র দুদিনে।
এক রাতে খাওয়া শেষে আনসারি নিজের ঘরে বসে হিসেব কষছিল। যদি সে পুরো ৫০,০০০ টাকা ইনভেস্ট করে এবং একইভাবে লাভ করে, তাহলে মাসে কমপক্ষে ৭৫,০০০–৮০,০০০ টাকা ইনকাম সম্ভব! এমনকি চাকরি থাকতেও সে এতটা পেত না।
নিজের মোবাইলে ট্রেডিং অ্যাপ খুলে সে দেখতে লাগল—"চার্ট", "ক্যান্ডেল", "ইন্ডিকেটর", "বাই", "সেল", এই শব্দগুলো তার কাছে এখন মোটামুটি চেনা হয়ে গেছে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় সে নিজের সঞ্চয় খাতার দিকে একবার তাকিয়ে হেসে ফেলল—“শিগগিরই তুই ৫ গুণ হবি।”
পরদিন সকালে আনসাএকটি কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়। এবার বড় খেলা খেলবে। হাতে থাকা নিজের পুরো সঞ্চয়—৫০,০০০ টাকা—দিয়ে ট্রেডিংয়ে ঢোকে।
টাকা পাঠানোর মুহূর্তে একটু দ্বিধা হয়েছিল, কিন্তু ইউটিউবের সেই ভয়েস তার মাথায় ঘুরতে থাকে—
“যারা ঝুঁকি নিতে পারে না, তারাই সারাজীবন চাকরি করে যায় অন্যের অধীনে। যারা সাহসী, তারাই তৈরি করে নিজের ভবিষ্যৎ।”
সেই কথা মনে করে সে ক্লিক করে দিল—"ডিপোজিট কনফার্ম"।
পরের দুদিন ছিল আনন্দময়। প্রথম দিনেই লাভ প্রায় ৮,০০০ টাকা। সে ভাবল—“ব্যস! এটা তো পাকা হয়ে গেল। আমার মতো সাধারণ একজনের পক্ষে সম্ভব!” সে নিজেকে কল্পনা করল এক সফল ট্রেডার হিসেবে, ল্যাপটপ হাতে বিদেশি ক্যাফেতে বসে।
কিন্তু তৃতীয় দিনে সে একটি ভুল ট্রেড করে বসে। বাজার হঠাৎ উল্টো দিকে চলতে থাকে। সে ভেবেছিল এটা সাময়িক, আবার ফিরে আসবে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে লালচে গ্রাফ নেমে চলল নিচের দিকেই।
২০,০০০ টাকা এক ঝটকায় উড়ে গেল।
সে মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল। ঘামছিল তার হাত-পা। তারপর ভাবল, “এবার একটা বড় ট্রেড করে আগেরটা কভার করে ফেলি।”
এটাই ছিল সবচেয়ে বড় ভুল।
পরের ট্রেডে আরও ১৫,০০০ টাকা উবে গেল চোখের পলকে। আনসারির মনে হল, কারো যেন তার বুকের ওপর এক পাথর চাপিয়ে দিয়েছে। এখন তার হাতে বাকি মাত্র ১৫,০০০ টাকা।
রাতভর সে ঘুমাতে পারেনি। শুধু বারবার মনে হচ্ছিল—“আমার ভুল হয়ে গেল… আমি বুঝে উঠতে পারলাম না।”
পরদিন সকালবেলা আবার একবার শেষ চেষ্টা করল সে, ১৫,০০০ টাকা দিয়ে একটি “হাই রিস্ক” ট্রেড।
সকালের চা-টা খেতেও মন চাইছিল না। চোখ আটকে ছিল ফোনের স্ক্রিনে। ক্যান্ডেলগুলো নেমে যাচ্ছে, আর সঙ্গে সঙ্গে আনসারির হৃদয়ও তলিয়ে যাচ্ছে।
সকাল ১০:৩২।
অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স: ০.০০ টাকা।
---------- ০ -------------
Treading
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
56
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating