Facebook

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
রাত তখন বারোটা ছুঁইছুঁই। সোহানা এখনও মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখে। টিপে টিপে স্ক্রল চলছে— কারো বিয়ে, কারো নতুন ড্রেস, আবার কারো রাগভরা স্ট্যাটাস। একসময় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে— ঘণ্টা দু’য়েক কেটে গেছে। নিজেরই হাসি পায়, “এই ফেসবুকটা না থাকলে হয়তো এত রাত জেগে থাকতাম না!”

তবুও সে লগআউট করে না। কারণ তার জীবনের বড় একটা অংশ এখন এই নীল পৃথিবীর ভেতরেই।

জন্ম এক ধারণার

২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারির এক ঠান্ডা রাতে, মার্ক জাকারবার্গ নামের হার্ভার্ডের এক তরুণ ছাত্র তার ডরমরুমে বসে লিখছিল কোড। উদ্দেশ্য ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেন একে অপরকে চিনতে পারে, মত বিনিময় করতে পারে। তখনো কেউ ভাবেনি, এই ছোট্ট প্রকল্প “TheFacebook” একদিন বদলে দেবে পুরো পৃথিবী।
তখন জাকারবার্গ শুধু বলেছিলেন,

> “মানুষ সংযুক্ত থাকতে চায় — আমি শুধু সেই সংযোগটা সহজ করতে চাই।”

এই সরল ভাবনার মধ্যেই ছিল এক বৈপ্লবিক শক্তি। কয়েক বছরের মধ্যেই ফেসবুক ছড়িয়ে পড়ল গোটা বিশ্বে — আমেরিকা থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত।

ফেসবুকের আগমন ও বাংলাদেশের গল্প

বাংলাদেশে প্রথম ফেসবুক আসে ২০০৮ সালের দিকে, কিন্তু জনপ্রিয়তা পায় ২০১১ সালের পর। গ্রামের ছেলে-মেয়েরাও তখন বলত, “তোর ফেসবুক আছে?”
স্মার্টফোন হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ঢুকে পড়ে এই নতুন জগতে।
একটা নতুন জানালা খুলে গেল—
যেখানে পড়ে থাকা বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা যায়, দূরে থাকা ভাইয়ের খবর জানা যায়, এমনকি প্রেমও শুরু হয় এক টুকরো ‘ইনবক্স’ দিয়ে।

সোহানার মতো অনেকেই প্রথম প্রেম খুঁজে পেয়েছিল ইনবক্সের শব্দে।
কিন্তু সেই প্রেমই কখনও ভেঙেছে এক ‘সিন’ দেখা অথচ রিপ্লাই না দেওয়ার অভিমানে।

ভালো দিকের আলো

ফেসবুকের অন্যতম সৌন্দর্য তার সংযোগ।
দূরে থাকা মানুষকে কাছের করে দেয়।
যে মা প্রবাসে থাকা ছেলেকে দেখতে পারেন না, সে এখন ভিডিও কলেই হাসিমুখ দেখতে পায়।
যে শিল্পী আগে রাস্তায় গান গাইত, সে এখন ফেসবুক লাইভে লাখো দর্শক পায়।
যে ব্যবসায়ী ছোট দোকানে বসে থাকত, সে এখন অনলাইনে বিক্রি করে দেশের বাইরেও পণ্য পাঠায়।

জাকারবার্গ একবার বলেছিলেন,

> “আমাদের লক্ষ্য পৃথিবীকে আরও খোলা এবং সংযুক্ত করা।”

বাংলাদেশে এখন লাখো তরুণ-তরুণী ঘরে বসেই ব্যবসা করছে — বুটিক, খাবার, বই, এমনকি অনলাইন টিউশনও।
ফেসবুক শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত।

কিন্তু আলো যত গভীর, ছায়াও তত লম্বা

সোহানা একদিন হঠাৎ দেখল, তার প্রোফাইল ছবি কেউ বিকৃত করে ছড়িয়ে দিয়েছে।
সে বুঝল, ফেসবুকের এই স্বাধীনতা যেমন মুক্তির, তেমনি বিপদেরও।
একটা ভুল ক্লিক, একটা ভুয়া লিংক— আর গোপন তথ্য চলে যেতে পারে হ্যাকারদের হাতে।
ফেক অ্যাকাউন্ট, মিথ্যা সংবাদ, অনলাইন প্রতারণা, চরিত্র হনন— এইসব অন্ধকার ছায়া ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত।

কখনও মানুষ নিজের দুঃখ মেলে ধরছে ভার্চুয়াল দেয়ালে, আবার কখনও সেই দেয়ালই হয়ে উঠছে বিষাক্ত মন্তব্যের আড্ডা।

আসক্তির শিকল

প্রতিদিন সকালে সোহানা মোবাইল হাতে নিয়ে শুরু করে দিন।
প্রথমে ফেসবুক, তারপরই অন্য কিছু।
খাওয়ার আগে, ঘুমের আগে— এমনকি পড়ার সময়ও।
সে বুঝে ফেলেছে, এটা শুধু একটি অ্যাপ নয়, এটা এক অভ্যাস।
মানুষ এখন বাস্তব কথোপকথনের বদলে ইমোজিতে হাসে, রাগে, ভালোবাসে।
বন্ধুর জন্মদিনে দেখা না করেও “🎂 Happy Birthday!” লিখে মনে করে দায় শেষ।

এই ডিজিটাল ঘূর্ণির ভেতরে বাস্তবতা হারিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে।
মানুষ এখন নিজের চেহারার চেয়ে নিজের “প্রোফাইল” নিয়ে বেশি সচেতন।

সমাজের প্রতিচ্ছবি

তবুও, ফেসবুক আজ সমাজের আয়না।
এখানে দেখা যায় মানুষ কতটা মানবিক, আবার কতটা নিষ্ঠুরও।
কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সবাই সাহায্যের হাত বাড়ায়— আবার কেউ কেউ শুধু ‘রিঅ্যাক্ট’ দিয়ে দায় সারে।
কোনো আন্দোলন, কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ— এখন শুরু হয় এই ভার্চুয়াল দুনিয়া থেকেই।

ফেসবুকের মাধ্যমে অসংখ্য সামাজিক পরিবর্তন হয়েছে —
নিখোঁজ মানুষ খুঁজে পাওয়া গেছে, অসহায়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ হয়েছে, এমনকি অন্যায়ের বিচারও হয়েছে জনমতের চাপে।
কিন্তু একই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কেউ আবার ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি, ঘৃণা, গুজব

উপলব্ধির মুহূর্ত

একদিন রাতে সোহানা সিদ্ধান্ত নিল— কিছুদিনের জন্য ফেসবুক বন্ধ রাখবে।
প্রথমে কষ্ট হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল কিছু একটা হারিয়ে গেছে।
কিন্তু কয়েকদিন পর সে বুঝল, জীবনের অনেক সুন্দর জিনিস আছে এই পর্দার বাইরে — মায়ের মুখ, বইয়ের গন্ধ, বন্ধুর হাসি।

তবুও সে ফেসবুককে ঘৃণা করতে পারল না।
কারণ, এখানেই তো সে নিজের লেখা প্রথম প্রকাশ করেছিল, এখানেই পেয়েছিল অনেক মানুষের ভালোবাসা।
তাই সে বলল নিজেকে—

> “ফেসবুক খারাপ নয়, খারাপ হলো আমাদের ব্যবহার।”

উপসংহার

ফেসবুক এক আয়না —
যেখানে প্রতিফলিত হয় মানুষের মন, সমাজ, ভালোবাসা আর অন্ধকার।
এর জন্ম হয়েছিল সংযোগের জন্য, কিন্তু এখন সেই সংযোগই আমাদের গ্রাস করছে।
এটা যেমন শেখায় একে অপরকে চিনতে, তেমনি শেখায় কিভাবে ভার্চুয়াল দুনিয়ায়ও হারিয়ে যেতে হয়।

সোহানা একদিন আবার ফেসবুকে ফিরে এল—
তবে এবার নতুনভাবে।
সে নিজের সময় ঠিক করে ব্যবহার করে, সত্য-মিথ্যা যাচাই করে শেয়ার করে, এবং নিজের মনের কথাগুলো লেখে এমনভাবে, যাতে অন্য কেউ আলো খুঁজে পায়।

তার স্ট্যাটাসে লেখা থাকে—

> “ফেইসবুক খারাপ নয়, যদি আমরা তাতে একটু আলো জ্বালাই।”
43 Views
2 Likes
1 Comments
5.0 Rating
Rate this: