আজ অনেকক্ষণ গীতের সাথে কথা হচ্ছিলো। ও আমরা অনেকটা সময় নষ্ট করলো , বলে বিরক্ত হচ্ছিলাম। আপনি বলবেন একটা সুন্দরী মেয়ের সাথে কথা বলতে সবার ভালো লাগে আমি এমন কেন বলছি। আসল বাস্তবে ভালোবাসা আজকাল অভিনয়। ভালো মানুষের মুখোশ পরে থাকি আমরা , আসলে সবাই আমরা খুব স্বার্থপর।আমরা ভালোবাসি শব্দটি ব্যবহার করি। কিছু প্রসংসা করে আমরা মেয়েদের মনের গোপন কোনে বসবাস করি।কিন্তু "পরকীয়া প্রেম "আসলে একাকী মেয়েদের থেকে যৌন সুযোগ সুবিধা পাওয়ার নাম।কোন দায়িত্ব নিতে জানে না। শুধু সম্পর্কে ভোগ করতে জানে।
গীতের চোখে আমি ওর ভালোবন্ধু । ওর কাছে আমি একটা নিরাপদ আশ্রয়। যেখানে ও মনের কথা গুলো বলতে পারে। ও একজনের বিবাহিত স্ত্রী। কিন্তু সমাজ আমাদের সম্পর্কে খারাপ চোখে দেখলেও ও পরোয়া করে না। কারণ ওর যুক্তিতে ওর বর ওকে সময় দিতে পারে না, তাই ওর বেচে থাকার জন্য একটা সম্পর্ক চাই যেখানে ও প্রান পায়।আসলে দার্শনিক ব্যাখ্যায়, পরকীয়াকে কেবল একটি "অন্যায়" হিসেবে না দেখে এর কারণগুলো বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে "attention seeking disorder" বা রোম্যান্সের প্রতি আসক্তির মতো মানসিক বিষয়গুলিও অন্তর্ভুক্ত।
আমি ওর সাথে বন্ধুত্ব তৈরি করেছিলাম, কারণ ওকে আমি বিয়ে করতে চাইতাম। কিন্তু সেই সম্ভবণা শেষ, ও একটা বড়ো ঘরে বিয়ে হয়েছে। ওর বর সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মেছে। আলু ভাতে মারকা ছেলে হয়েও ওর বর ভালো একটা বৌ পেয়েছে। দিনের শেষে বাড়ি ফিরে বৌয়ের সাথে যৌন ক্রীড়া শেষ, বীর্য পতন করে , ক্লান্ত হয়ে নাক ডেকে ঘুমায়। তখন একা একা থাকা গীতের আমার কথা মনে পড়ে। ওর বুকের ভিতর যে হাজার কথার পাহাড় জমে থাকে তার শ্রোতা হিসেবে আমাকে খোজে। আমার ওর গল্প শুনে কি লাভ।এই মুহূর্তে আমার ওকে দরকার নেই তাই ওকে সময় দেওয়াটা আমার কাছে খুবই বোকামির কাজ।
আজকে তো ওর করা গল্পটা আমার মাথা যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ভীষণ রাগ উঠছিলো ওর উপর। ও বাপের বাড়ি থাকতে কাঁথা সেলাই, আসন বোনার মতো হাতের কাজ শিখে ছিলো। এখন ও বড়লোকের বৌ, ঘরে চারটে মানুষের জন্য সাতটা কাজের লোক আছে। ঘরের কুটিটা নাড়তে হয় না ওকে। তাই উল আর ছেড়া বস্তা, দিয়ে অসময়ে বসে, বসে, ও একটা বসার আসন তৈরি করেছে। ওর বুদ্ধি দেখুন ওর বাড়িতে চেয়ার টেবিলে ভরা, মাটি বসে ভাত খাওয়া হয় না । আসনের বানানোর দরকার ছিলো? কি দরকার ছিলো পাপোশ বানাতে পারতো। বরকে দিবি তো উল দিয়ে মাফলার বানা, সোয়েটার বানা। আসন বানালি কেন??
ওর বর আবার ওর চেয়ে আরো এক কাঠি ওপরে। সে নাকি আজ ব্যবসার কাজে অফিস যায় নি। সেই আসন নিয়ে গিয়ে পড়ার চায়ের দোকানে বেঞ্চ ওপর আসন পেতে সারাদিন বসে ছিলো। কৌতূহলী মানুষদের তো বলে ছিলো। যারা ব্যপারটা দেখেনি তাদেরকেও ডেকে দেখিয়ে বলছে ওর বৌ কত গুনী । ওকে কতো ভালোবাসে ওর জন্য আসন বানিয়েছে। তবে উপহার পেয়ে ওর বর যত খুশি না হয়েছে তার চেয়ে উপহার দিয়ে বেশি খুশি হয়েছে গীত। ওর কথা বার্তায় যা বুঝতে পারলাম। এটাই হয়তো আমার বিরক্তির কারণ কষ্টের কারণ। একটা হতাশার কারণও আছে। উপহার সঠিক মূল্যায়ন আমি কোন দিন করতে শিখি নি।
ঈশ্বরের দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহার ছিলো তিতলি। অথচ তিতলি দেওয়া উপহারটার আমি মর্যাদা দিই নি সেইদিন। তিতলি কথায় আসি, ও শিক্ষিত মেয়ে। বানিজ্য নিয়ে পড়াশোনা করছে। চাকরি করতে চায় না সে। হতে চায় উদ্যোক্তা। অথচ গরীব ঘরের মেয়ে। আমার সাথেই হংসেশ্বরী মন্দির গিয়ে, ও টেরাকোটা কাজ দেখা ছিলো। হঠাৎ মাথা এলো ওর পোড়ামাটির গহনা তৈরী করবে। হাতের কাজটাও শিখলো। টেরাকোটা গহনা শুধু নয়। ওর সৃজনশীল ক্ষমতা দিয়ে নতুন নতুন হস্ত শিল্পের নির্দশন তৈরি করছে। বাংলার আলপনা, পটচিত্রকে নিয়ে পোশাক তৈরি করলো। ও আমার জন্যই দুই পাঞ্জাবি তৈরি করলো একটা আলপনা অন্যটিতে পটচিত্রকে আঁকালো। আর দুইটোতে লিখলো আমার লেখা দুটো কবিতা। অদ্ভুত সুন্দর হয়েছিল কাজ দুটো।
তিতলি আমার প্রেরণা ছিলো। আমার সব অপ্রকাশিত গল্পের প্রথম পাঠকছিলো ও। ও সমালোচনা শুনে , আমি আমার গল্প গুলোতে প্রয়োজণীয় পরিবর্তন করে প্রকাশ করতাম। আর জনপ্রিয়তা লাভ করতো গল্প গুলো। ওর উৎসাহে আমার কলম সচল ছিলো। বৈশাখ মাসের রৌদ্র ভরা দিনে ও ছিল গাছের ছায়ার মতো আশ্রয়।
ওর সাথে আমার পরিচয় হয়, বিশ্বজিৎ দার বাড়ি। ওর মামাতো বোনের মেয়ে ছিলো তিতলি। বিশ্বজিৎ একজন দক্ষ পরিচালক ছিলো। ওর কাছে যেতাম স্ক্রিপ্ট রাইটারের কাজটা শিখতে। তবে এখন ও মুদি দোকান চালায় ছবি তৈরি করা ছেড়ে দিয়েছে। ওর কাছে কারণ বাংলা বাণিজ্যিক ছবি তৈরির অনেক সমস্যা আছে। ও মৌলিক গল্পের ওপর কাজ করতে চায়। তাই যথাযথ বাজেটের অভাব হয় ওর কাছে। বলিউড-হলিউডের অনুকরণ করে ও ছবি তৈরি করতে রাজি ছিলো না। আপনি সাহিত্যিক হলে এটা বোঝানো সহজ হবে। অনুবাদ সাহিত্যের দিকে দেখুন, মুল সাহিত্যের গভীরতা ও সূক্ষ্মতা যথাযথভাবে তুলে ধরতে না পারা যায় না অনুবাদ সাহিত্যে। অনুবাদে সাংস্কৃতিক ভিন্নতা ও ভাষার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রাখাটা, একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যার ফলে অনেক সময় অনুবাদের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অদক্ষ শিল্পী ব্যবহার, দর্শকদের রুচির পরিবর্তন হওয়ায় , ও সরে এসেছে সিনেমা তৈরির জগতে থেকে।
তিতলির সাথে যে দিন আমার শেষ দেখা হলো। সেদিন বিশ্বজিৎদার জন্মদিন ছিলো। সারপ্রাইস হিসেবে ও আমার জন্য পাঞ্জাবি দুটো তৈরি করে এনেছিলো। ওর উপহার পেয়ে আমার মন সমুদ্র মতো আনন্দিত হয়ে উঠেলো। ও কিন্তু ভুলে গিয়েছিল, ওর মামার জন্মদিনের কথা। লোকটা যখন সিনেমা তৈরি করতো তখন এই দিনটায় অনেক মানুষ ভিড় করতো ওর বাড়িতে । এখন কেউ খোঁজ নেয় না। আমি আর ও একটা কেক কিছু জলখাবার কিনে ট্যাক্সি করে হাজির হলাম বিশ্বজিৎদার বাড়ি। ইচ্ছে ছিলো দুটো পাঞ্জাবি দুই জনে পড়ে, দুই বন্ধু সেলিব্রেট করবো দিনটাকে।
কিন্তু বিশ্বজিৎদা সেটা হতে দিলো না। ও বললো
" আমি কোন দিন তোমার আর তিতলি সম্পর্ক মেনে নেবো না। তোমার কথায় তিতলি যে দিন হঠাৎ করে শাড়ির বিজ্ঞাপনে, মডেল হতে রাজী হয়ে গেলো , সেইদিন বুঝতে পেরে ছিলাম তোমরা সম্পর্কে আছো। কিন্তু প্রতিবাদ করতে পারে নি কারণ কনফার্ম করতে পারে নি বলে। কিন্তু আমার বাড়ি থেকে তোমার ওর পরিচয়। আমি আত্মীয় স্বজনদের কাছে আর ছোট হতে পারবো না তোমাদের জন্য। তোমার আমি গুরু, গুরু না মানো ভালো বন্ধু। আজ আমার জন্মদিনের উপহার হিসেবে, আমি আজ ই তোমার সাথে ওর সম্পর্কে সমাপ্তি চাই। "
নীরবে আমি বিশ্বজিৎদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম তখনই। ও আমরা পিছনে পিছনে বেরিয়ে এসেছিলো । তবে দুই জনের মধ্যে কিছুটা দুরত্ব ছিলো।কোন কথাই বলছিলাম না দুজনে। পথে একটা আস্তাকুঁড়ে আমি ওর দেওয়া পাঞ্জাবি দুটো ফেলে দিলাম। ওর পাঞ্জাবি দুইটো ফেলে দিতে ও ছুটে এসে আমার কলার ধরে জিজ্ঞাসা করলো " ওগুলো ফেলে দিলে কেন? "
আমি উওর দিলাম "সম্পর্ক যেখানে শেষ সেখানে তার স্মৃতি বহন করে কি লাভ?? "
,,,
উপহার
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
46
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating