সাবিনার কথা অমিত, বুড়ো,বাপ্পাদা, বিজুদার মনে আছে কিনা জানি না । আমি ওর কথা ভুলতে পারি নি। আমাদের টিমটা তখন বাংলাস্টিট পত্রিকা প্রকাশের পুরোপুরি দায়িত্ব নিয়েছে সবে সবে। নামকরা লেখকদের কমদামি লেখা গুলোকে দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছিলো বলে ঠিক করেছিলাম, নতুনদের সুযোগ দেবো। ফলে অনেক ফ্রিল্যান্সিং রিপোর্ট যোগ দিয়েছিলেন তখন বাংলাস্টিটে।
সাবিনা মন্ডল সেই সময় এলো আমাদের অফিসে।
লেখার হাতটা খুব ভালো। পরিশ্রমী মেয়ে যেখানে যেতে, বলা হতো চলে যেতো সংবাদ সংগ্রহ জন্য। আমরা ওকে স্থায়ী চাকরি দেবার কথাও ভাবছিলাম। আসলে সত্যিই মেয়েটি খুব ভালো। ভালো দেখতে শুধু নয়। ভালো ব্যবহার। আত্মবিশ্বাসী। বারবার আয়না মুখ দেখে মেকআপ ঠিক করা মেয়ে সে নয়। চোখে হালকা ডার্ক সার্কেল পড়লে সেটা ঠোঁটের হালকা হাসি দিয়ে মেকআপ করা মেয়ে ও।
ও আমাদের বাংলাস্টিটে ওর সময় বেশি দিতো। কারণ ওর তখন বিয়ে ঠিক হয়েছিল। ও বিয়ে আগে একটা স্থায়ী চাকরি জোগাড় করতে চাইছিলো।নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে চাইতো ও। ওর মা শিক্ষিত কিন্তু তাকে চাকরি করতে দেওয়া হয় নি। হলে ওদের সংসারে অতো অভাব থাকতো না। ও তাই চাকরি করতে চাইতো। নিজের অর্থনৈতিক সনির্ভরতার জন্য।ও সাংবাদিক হতে চায়। ও জার্নালিজম নিয়ে পড়াশোনাও করেছে। শুধু ওর পার্সেন্টেজ টা কম। ফলে বড়ো সংস্থা চাকরি হচ্ছে না। আর আমাদের মতো ছোট খাটো সংস্থায় চাকরি হয় কলেজ স্ট্রিট বা নন্দন চত্ত্বরে রেফারেন্স থেকে তাই ওর চাকরি পাওয়া টা কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো। আমরা বলেছিলাম ও একটা ব্যবস্থা করে দেবো। তবে শারদীয়া সংখ্যা সাফল্য ওপর সব কিছু নির্ভর করছিলো। কারণ মালিক লাভের মুখ দেখলেই তবে কর্মী বাড়াবে।
আমাদের টার্গেট ছিলো সেবার যেভাবেই হোক মহালয়ার এক সপ্তাহ আগে বাজারে পত্রিকা পৌছাতেই হবে। ওর এই সংখ্যায় হাদুর দূর্গা নিয়ে ভালো লেখা ছিল। ও জঙ্গল মহলে পর্যন্ত ছুটে গিয়েছিলো লেখা টার জন্য। লেখা নিয়ে আমরা সবাই খুব উৎসাহিত ছিলাম। হাদুর দূর্গা নিয়ে অনেকেই আগ্রহ দেখাবেন আমরা আশায় ছিলাম। কারণ দূর্গা পূজা যেখানে বাঙালির প্রিয় উৎসব সেখানে বাংলাতেই দূর্গা পূজা বয়কট করাটা একটা চমক।
হুদুরদুর্গা হল খেরওয়াল সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর উপাস্য দেবতা। কিছু মানুষ হিন্দুধর্মের মহিষাসুর বলে দাবি করতে চেষ্টা করে।এরা হিন্দুধর্মের দেবী দুর্গাকে খলনায়িকা হিসেবে দেখা তে চায়।
অথচ 'সাঁওতাল' এবং 'অসুর' দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জনগোষ্ঠী এদের গোষ্ঠীর উপকথা অন্য গোষ্ঠীর মিথে সাথে মিশিয়ে যে উদ্ভট কল্পনার সৃষ্টি করা এই মূর্তিটি দেখিয়ে বন্ধ করা যাবে।
পুরাণ অনুসারে 'মহিষাসুরের পিতা রম্ভাসুর ছিলেন কশ্যপ-পত্নী দনুর সন্তান। কশ্যপ ঋষি ছিলেন ব্রহ্মাপুত্র মরীচির পুত্র এবং তাঁর পত্নী দানব কুলজননী দনু হলেন ব্রহ্মানন্দন প্রজাপতি দক্ষের তনয়া। ফলে উক্ত দাবীকৃতদের মতে, পুরান অনুসারে মহিষাসুরের শরীরে ছিল ব্রাহ্মণ্য রক্ত আছে। তাই মহিষাসুর ও দুর্গার লড়াইকে আর্য ও অনার্য দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখানোটা অনুচিত।
হুদূরদূর্গা আসলে একটি ষড়যন্ত্র যা আর্যদের বহিরাগত হিসেবে দেখতে চায়।
ব্রিটিশ ও পরবর্তীতে ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থার উৎপাদন যেসব ঐতিহাসিক, তাঁদের তত্ত্বে আর্যরা কৃষিকার্যে অনভিজ্ঞ যাযাবর জাতি হিসাবেই চিহ্নিত, যারা বর্তমান ভারত উপমহাদেশীয় ভূখণ্ডে ঢুকে অনার্য সভ্যতাকে একই সঙ্গে অধিকার ও আত্মস্থ করে নেয়।
একই সঙ্গে তাঁরা কিন্তু আর্যদের উন্নত ভাষা এবং বৈদিক সাহিত্য দর্শনেরও সদর্থক মূল্যায়ন করেছেন।কিন্তু সাধারণ বুদ্ধি কি বলে যদি কৃষি কাজ না জানতেন আর্যরা তাহলে খাদ্য সংগ্রহ করতেই তো তাদের সময় ব্যয় হতো বেশি। কি করে তারা শিক্ষা সংস্কৃতিতে উন্নত হতো।
হুদুর দূর্গা একটা বড় ষড়যন্ত্র আসলে দূর্গা নারী শক্তির প্রতীক। তাই দূর্গা কে ব্যাশা রূপে দেখানোটা আসলে পুরুষ তান্ত্রিক সমাজের বড় ষড়যন্ত্র। কারণ দূর্গা কে এখানে বীর নয়। ছলনাময়ী হিসাবে দেখানো হয়েছে।রূপবতী দূর্গারকে দেবতাদের পাঠানো ফাঁদ হিসেবে দেখানো হয়েছে। নারী কে পন্য হিসাবে তুলে ধরার আদিম প্রচেষ্টা হুদুর দূর্গা।
যাইহোক পত্রিকা ছাপানোর আগে অনেক কাজ থাকে। সব লেখা সংগ্রহ করে, তা টাইপ করে। ছবি দিয়ে সাজিয়ে, সম্পাদনা করে, সম্পুর্ন বই রূপ দেওয়া হয়। বই ছাপখানায় চলে গেলে আর কিছু সংশোধন করা যায় না। তাই পিডিএফ ছাড়া দিনটা আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।
সেই দিন অনেক রাত হয়ে গেছিলো ওর , লেখাটার ফাইনাল দেখতে দেখতে। বিতর্কিত লেখা ও তাই বারবার লেখাটা বদলাছিলো। প্রতিটা শব্দের ওপর জোর দিচ্ছিলো ও। ওকে অফিস থেকে টেক্সি ভাড়া দেওয়া হলেও । ওতো রাতে বাড়িতে একা ট্যেক্সি করে ফেরাটা, ওর কাছে ঝুঁকি পুর্ন লেগে ছিলো। কারণ কলকাতা কেন কোন শহর নারীদের জন্য নিরাপদ নয় রাতে। তাছাড়া দিল্লি বাসে বয়ফ্রেন্ড সাথে থাকা সত্ত্বেও মেয়েটাকে গন ধর্ষণের ঘটনাটা স্মৃতি আমাদের মনে তখনও টাটকা স্মৃতি হয়ে আছে। তাই ভোরে এক সাথে বাড়ি যাওয়া হবে ঠিক হলো। ও থাকলে অফিসেই। আমাদের প্রুফ দেখার কাজে সুবিধা হবে আমরা খুশি হলাম। ও ফোন করে জানিয়ে দিলো বাড়িতে সে কথা। ও বাড়ি অনেকটাই ওর আয়ের ওপর নির্ভরশীল তাই ততটা আপত্তি করলো না, ওর বাড়ি থেকে।
ভোরবেলা নয় একটু বেলায় আমরা সবাই অফিস থেকে আমরা বেড়িয়ে গেলাম। তারপর পূজার আনন্দে সবাই ব্যাস্ত হয়ে গেলাম। ওর খোঁজখবর অতোটা নেওয়া হয় নি। দীপাবলি সংখ্যা ওর লেখা না আসতেই, ফোন করলাম। ও চাকরি পাকা হয়ে গেছে , এ খবর টাও জানানোর ছিলো। শুনে ও খুশি হলো না । ও বললো কিছু দিন পর যোগ দেবে ও। ওর বিয়ে হবার কথা ছিলো নভেম্বর নাগাদ। তাই আমরা ধরে নিলাম ও আর চাকরি তে যোগ দেবে না।
বহু বছর পরে ওর মায়ের সাথে দেখা হলো একটা গন মিছিলে। রাত দখলের মিছিল।কলকাতায় এক মেডিকেল স্টুডেন্টকে ধর্ষণ করা হয়েছিল কিছুদিন আগে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাতে মেয়েদের কাজ করা উচিত নয়। রাতে কাজ করলে ধর্ষিত হতে হবে। তাই কিছু মানুষ প্রতিবাদ সরূপ রাত দখল ডাক দিয়েছিলো। রাতে মিছিল করে হেটে ছিলো মেয়েরা। ওখানেই মাসিমার সাথে দেখা।
রাত দখলের মিছিলে দেখা হতে । জানতে পারলাম সাবিনা আর নেই। সেইদিন রাতে অফিস থাকার ভুল সিদ্ধান্তের জন্য, ওর বিয়েটা ভেঙে দিয়েছিলো ওর প্রফেসর বয়ফ্রেন্ড। ওকে নাকি সাংবাদিকতা নাম করে ব্যাশাবৃত্তি করে বেড়ায়। তাই ওকে রাতে ফিরতে হয় বাড়িতে এমন অভিযোগ করেছিলো ওর হবু শশুর বাড়ি লোকজন। প্রকাশ্যেই ওরা এসব কথা গুলো বলেছিলেন। ফলে পাড়ার সব লোক জন কথা গুলো শুনে ছিলো। আর তারপর থেকে অনেক কুপ্রস্তাব আসছিলো । টোন টিটকিরি শুনছিলো সাবিনা। আত্মহত্যাও সহজ কাজ নয়। ওটা তেও সফল হতে হয়। চাকরি খবরটা পেয়ে ও নাকি খুব খুশি হয়েছিল। ও ওর মাকে বলেছিলো। দেখো আমি পেরেছি। মনে একটা জোর পেয়েছিলো। চাকরি খবরটা ওর কাছে ছিলো বড় প্রাপ্তি। সফলতার দলিল।তারপর সেই রাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে ফিরলো না ও।
সেই একটা রাত ওনার মেয়ে জীবন একটা ভয়ঙ্কর অন্ধকার নামিয়ে এনেছিল। তাই মা হিসেবে মেয়ের রাতে একা ঘর থেকে বেড়ানোর স্বাধীনতা চাইতে, সেই রাতে মিছিলে হাটলেন আমাদের সাথে। মিছিলে রাতে হাটা সহজ। কিন্তু এ শহরে পথে রাতের বেলায় একা কি হাটতে পারবে কোন মেয়ে কোন দিন এ প্রশ্নটা। সেই রাতে অন্ধকারটার মতো জেগে থাকলো আমার মনের ভিতরে।
সেই রাত
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
45
Views
1
Likes
0
Comments
5.0
Rating