নীলা
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
অর্ণবের নিথর দেহটা অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে সাদা চাদরে ঢাকা। নীলার দু’চোখ শুকনো, কিন্তু বুকের ভেতরটা যেন হাজারটা পাথরের ভারে ভেঙে যাচ্ছে। গতকাল রাতেও অর্ণবের হাসিমাখা মুখটা সে দেখেছে, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কত স্বপ্ন এঁকেছে দু’জনে। আর আজ? আজ সব শেষ?
অ্যাম্বুলেন্সটা যখন শহরের এক নামকরা বেসরকারি হাসপাতালের ইমার্জেন্সির সামনে এসে থামল, তখন রাতের নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে গেল। হাসপাতালের কর্মীরা দ্রুত স্ট্রেচার নিয়ে এগিয়ে এল। নীলা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল, তার পা যেন মাটিতে গেঁথে গেছে। একজন নার্স এসে তার হাত ধরে আলতো করে বলল, “আসুন দিদি।”
নীলা যন্ত্রচালিতের মতো নার্সের পিছু পিছু গেল। অর্ণবকে যখন ভেতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন তার মনে হচ্ছিল যেন তার নিজেরই হৃৎপিণ্ডটা কেউ ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে। ইমার্জেন্সির বাইরে একটা চেয়ারে সে ধপ করে বসে পড়ল। চারপাশের ব্যস্ততা, ডাক্তার-নার্সদের ছুটোছুটি—কোনোটাই তার কানে ঢুকছিল না। তার চোখের সামনে শুধু ভেসে উঠছিল অর্ণবের মুখ।
কিছুক্ষণ পরেই সাইরেনের তীক্ষ্ণ আওয়াজ ভেদ করে একটা গাড়ি এসে হাসপাতালের গেটে থামল। হুড়মুড় করে কয়েকজন মধ্যবয়স্ক মানুষ ভেতরে ঢুকলেন। তাদের চোখেমুখে উৎকণ্ঠা আর ভয় স্পষ্ট। অর্ণবের বাবা-মা আর কয়েকজন আত্মীয়স্বজন ছুটে এসেছেন খবর পেয়ে।
অর্ণবের মা, সুলতা দেবী, বছর পঞ্চাশের একটু বেশি, কিন্তু এই মুহূর্তে তাকে আরও বয়স্ক দেখাচ্ছে। তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে ইমার্জেন্সির দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন। তার চোখ নীলার উপর পড়তেই তিনি যেন স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তার সঙ্গে আসা অর্ণবের বাবা, অরবিন্দ বাবু, এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজনেরাও থমকে দাঁড়ালেন।
সুলতা দেবী দ্রুত পায়ে নীলার কাছে এগিয়ে এলেন। তার চোখে অবিশ্বাস আর চাপা ক্রোধের আগুন জ্বলছিল। নীলার কাছে এসে তিনি তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন, “তুমি! তুমি এখানে কী করছ? আমার ছেলেকে তুমি শেষ করে দিয়েছ!”
নীলা প্রথমে সুলতা দেবীর কথা বুঝতে পারেনি। তার ভেতরের শোক তখনো এতটাই তীব্র যে বাইরের কোনো আওয়াজ যেন তার মস্তিষ্কে পৌঁছাচ্ছিল না। কিন্তু যখন সুলতা দেবী তার হাত ধরে ঝাঁকাতে শুরু করলেন এবং একই কথা বার বার বলতে লাগলেন, তখন নীলার ঘোর ভাঙল।
“কাকিমা, কী বলছেন আপনি?” নীলার স্বর débil, তার গলা ধরে আসছিল।
“আমি ঠিকই বলছি,” সুলতা দেবী চিৎকার করে উঠলেন। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল, তবে সেই জলে কান্নার চেয়ে বেশি ছিল অভিযোগের উত্তাপ। “তোমার জন্য! শুধু তোমার জন্য আজ আমার ছেলে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। যদি তুমি ওর জীবনে না আসতে, যদি তুমি ওকে ভুল পথে না টানতে, তাহলে আজ এই দিন দেখতে হত না!”
অরবিন্দ বাবু এগিয়ে এসে তার স্ত্রীকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু সুলতা দেবী তখন সম্পূর্ণ রূপে আবেগের বশে। তার কথায় কোনো বাঁধ মানছিল না।
“কীসের ভুল পথ কাকিমা?” নীলার স্বরে অসহায়তা ঝরে পড়ছিল। “আমি কে অর্ণবকে ভালোবাসতাম। অরনব তো আমাকে ভালোবাসত আমি তো একসঙ্গে থাকতে চাইনি…”
“ভালোবাসা?” সুলতা দেবী ব্যঙ্গ করে হাসলেন। “এই তোমাদের ভালোবাসা? আমার ছেলেকে রাতারাতি পথে বসিয়েছিলে তুমি। তার ক্যারিয়ার, তার ভবিষ্যৎ—সব তুমি নষ্ট করে দিয়েছ। শুধু নিজের স্বার্থের জন্য তুমি ওকে ব্যবহার করেছ।”
নীলার মনে হচ্ছিল যেন কেউ তার বুকে ছুরি মারছে। অর্ণবের পরিবারের লোকেরা তাকে এত ভুল বুঝছে? তাদের চোখে সে এত খারাপ?
অর্ণবের এক কাকা এগিয়ে এসে বললেন, “দেখো মা, এখন ঝগড়া করার সময় নয়। আগে দেখা যাক অর্ণবের কী হয়েছে।”
কিন্তু সুলতা দেবী থামার পাত্রী নন। তার ভেতরের জমানো ক্ষোভ যেন আজ বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসছিল। “না, আমি আজ সব কথা বলব। এই মেয়েটার আসল রূপ সবার সামনে আসা উচিত। আমার ছেলেটা কত ভালো ছিল, কত স্বপ্ন দেখত। আর এই মেয়েটা এসে সব শেষ করে দিল।”
নীলার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে শুরু করল। তার কোনো কথা বলার শক্তি ছিল না। যাদের সে অর্ণবের পরিবার বলে জানত, যাদের সে সম্মান করত, তাদের মুখ থেকে এত কটু কথা শুনে সে যেন পাথর হয়ে গেল।
অরবিন্দ বাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কী হয়েছে নীলা? অর্ণবের কী হয়েছিল? তোমরা কোথায় ছিলে?”
নীলা কোনোমতে বলল, “আমরা… আমরা ফ্ল্যাটতে ছিলাম। হঠাৎ কয়েকজন লোক আসে… হঠাৎ করে ওকে মারতে শুরু করে। বুকে খুব ব্যথা বলছিল।”
সুলতা দেবী আবার তেড়ে এলেন। “এই সময় ঘোরার শখ হল তোমাদের? যখন ওর অফিসের এত কাজ ছিল, এত প্রেসার ছিল? তুমি কি চাও ও চাকরিটা ছেড়ে দিক? নাকি তুমি চেয়েছিলে বিপদে পড়ুক?”
নীলা মাথা নাড়ল। “না কাকিমা, আমি এমন কিছুই চাইনি। আমরা শুধু একটু relaxation-এর জন্য গিয়েছিলাম।”
“Relaxation?” সুলতা দেবী যেন আকাশ থেকে পড়লেন। “আমার ছেলেটা দিনের পর দিন খেটে মরে আর তুমি চাও ফুর্তি করতে?
কথাটা শুনে নীলার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। এত ঘৃণা, এত অবিশ্বাস! তাদের ভালোবাসার কি কোনো মূল্যই নেই এদের কাছে?
অর্ণবের ছোট বোন, বছর কুড়ির শ্রেয়া, এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। এবার সে এগিয়ে এসে নীলার দিকে তাকিয়ে বলল, “দিদি, তুমি সত্যি করে বলো তো কী হয়েছিল? আমার দাদাকে আমি খুব ভালোবাসি। ওর যদি কিছু হয়…” শ্রেয়ার গলা ধরে এল।
নীলা শ্রেয়ার চোখের দিকে তাকাল। এই একটি মুখ যেন কিছুটা হলেও সহানুভূতি দেখাচ্ছে। ভাঙা গলায় নীলা বলল, “বিশ্বাস করো শ্রেয়া, আমি কিছুই করিনি। আমরা গাড়িতে ছিলাম, হঠাৎ অর্ণব বুকে ব্যথার কথা বলল। তারপর ও জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।”
ঠিক সেই সময় ইমার্জেন্সির দরজা খুলে একজন ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। অর্ণবের পরিবারের লোকেরা দ্রুত তার দিকে এগিয়ে গেল। নীলা সেখানেই বসে রইল, তার সাহস হচ্ছিল না ডাক্তারের মুখোমুখি হওয়ার।
ডাক্তার গম্ভীর মুখে বললেন, “রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। আমরা চেষ্টা করছি। কিছু টেস্ট করতে হবে।”
কথাটা শুনে সুলতা দেবী কান্নায় ভেঙে পড়লেন। অরবিন্দ বাবু কোনোমতে নিজেকে সামলে ডাক্তারের কাছে জানতে চাইলেন, “কী হয়েছে ওর ডাক্তার? ঠিক কী হয়েছে?”
ডাক্তার বললেন, “প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছে। তবে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না টেস্টের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত। আপনারা অপেক্ষা করুন।”
অর্ণবের পরিবারের লোকেরা কান্নায় ভেঙে পড়ল। সুলতা দেবী বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। অরবিন্দ বাবু শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও তার চোখেমুখে গভীর উদ্বেগ স্পষ্ট।
এই কষ্টের মুহূর্তেও নীলা একা হয়ে রইল। অর্ণবের পরিবারের কেউই তার দিকে ফিরেও তাকাল না। তাদের চোখেমুখে শুধু ঘৃণা আর অভিযোগ। নীলার মনে হচ্ছিল যেন সে কোনো অপরাধ করেছে, যার শাস্তি সে আজীবন ভোগ করবে।
কিছুক্ষণ পর একজন নার্স এসে নীলাকে বলল, “আপনাকে একটু বাইরে অপেক্ষা করতে হবে। ভেতরে এখন রোগীর চিকিৎসা চলছে।”
নীলা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার শরীর দুর্বল লাগছিল, মাথা ঘুরছিল। সে ইমার্জেন্সির বাইরে করিডোরে গিয়ে একটা বেঞ্চে বসল। রাতের নিস্তব্ধতা আবার ফিরে এসেছে, শুধু মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে রোগীর গোঙানির শব্দ আর নার্সদের চাপা কথা।
নীলা আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে অজস্র তারা মিটমিট করছে। তাদের আলোয় যেন এক ধরনের শীতলতা মিশে আছে। নীলার মনে পড়ল অর্ণবের কথা। ও বলত, রাতের আকাশ তার খুব প্রিয়। তারা ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে নাকি মনের সব কষ্ট দূর হয়ে যায়।
কিন্তু আজ নীলার বুকের কষ্ট আকাশ ভরা তারার আলোতেও কমল না। বরং তা আরও বাড়ল। অর্ণব কি সত্যিই তাকে ছেড়ে চলে যাবে? আর যদি যায়, তাহলে এই অপবাদ, এই ঘৃণা নিয়ে সে কীভাবে বাঁচবে?
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। হাসপাতালের কর্মীরা করিডোর পরিষ্কার করতে শুরু করেছে। নীলা তখনও সেই বেঞ্চে বসে। তার শরীর অবশ হয়ে গেছে, মনে কোনো অনুভূতি নেই।
অবশেষে ইমার্জেন্সির দরজা আবার খুলল। ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। তার মুখের দিকে তাকিয়ে নীলার হৃৎস্পন্দন যেন থেমে গেল।
অর্ণবের পরিবারের লোকেরা আবার ডাক্তারের দিকে ছুটে গেল। সুলতা দেবী হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন। অরবিন্দ বাবু ডাক্তারের হাত ধরে কাতর স্বরে বললেন, “আমার ছেলে… ও কেমন আছে ডাক্তার?”
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “দুঃখিত। আমরা অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু…”
কথাটা শেষ না হতেই সুলতা দেবী মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। শ্রেয়া চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। অরবিন্দ বাবু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন, তার মুখ সাদা হয়ে গেছে।
নীলা তখনও সেই বেঞ্চে বসে। ডাক্তারের কথাগুলো যেন তার মস্তিষ্কে কোনো আঘাতই হানল না। সে শুধু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
অর্ণব আর নেই। কথাটা যেন তার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। যে মানুষটা গতকালও তার পাশে ছিল, যার উষ্ণ স্পর্শ সে অনুভব করেছে, যার মিষ্টি হাসি সে দেখেছে—সে আর নেই?
হঠাৎ সুলতা দেবী কাঁদতে কাঁদতে নীলার দিকে আঙুল তুলে বললেন, “তুমি! তুমিই আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছ। তোমার জন্যই আজ আমার ছেলেটা চলে গেল। আমি তোমাকে কখনো ক্ষমা করব না!”
অন্যান্য আত্মীয়স্বজনেরাও নীলার দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকাল। তাদের চোখেমুখে শুধু একটাই কথা—এই মেয়ের জন্যই অর্ণবের মৃত্যু হয়েছে।
নীলা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার পায়ে কোনো জোর ছিল না। সে একবার অর্ণবের পরিবারের দিকে তাকাল। তাদের চোখের ঘৃণা আর অভিযোগ তার হৃদয় এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল।
তার মনে হল, এই পৃথিবীতে তার আর কোনো স্থান নেই। অর্ণবকে হারানোর শোক আর তার পরিবারের ঘৃণা—এই দুটো বোঝা নিয়ে সে কীভাবে বাঁচবে?
নীলা নিঃশব্দে হাসপাতালের করিডোর থেকে বেরিয়ে গেল। ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। শহরের রাস্তায় অল্প কিছু মানুষের আনাগোনা শুরু হয়েছে। নীলা উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে লাগল। তার মনে কোনো চিন্তা নেই, কোনো গন্তব্য নেই। শুধু একটাই অনুভূতি—তার জীবন থেকে সব আলো নিভে গেছে।
পেছনে পড়ে রইল অর্ণবের নিথর দেহ আর তার পরিবারের অভিশাপ।
চলবে....
41
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating