মস্কোর শীতের সকাল। সাদা বরফে ঢাকা রাস্তাগুলো নিঃশব্দ। দূরে ক্রেমলিনের ঘণ্টাধ্বনি কানে বাজছে।সেই ভেতরেই কফিশপের এক কোণে বসে ছিল আলিশা পেত্রোভা— রাশিয়ান মেয়ে, বয়স ছাব্বিশ। মাথায় নীল টুপি, কফির কাপ হাতে নরম কণ্ঠে ইংরেজি গান গুনগুন করছিল। সাদা গালগুলো ঠান্ডায় লাল হয়ে উঠেছে।ওপাশে জানালার পাশে বসেছিল এক বাঙালি যুবক, নাম সাইফুল ইসলাম। ইন্ডিয়া থেকে মাস্টার্স করতে এসেছে মস্কো ইউনিভার্সিটিতে। পড়াশোনা করছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে। শান্ত, বিনয়ী, আর চোখে একধরনের নরম দীপ্তি।সেই দীপ্তিতেই হয়তোএকসময় আলিশার চোখ আটকে গেল।
প্রথম দেখা হয়েছিল সেদিনই—
কফিশপের কাউন্টারে আলিশা যখন টাকা দিচ্ছিল, হঠাৎ তার হাত থেকে কয়েন গড়িয়ে পড়ে যায়। সাইফুল নীচু হয়ে তুলে দিয়ে মৃদু হাসিতে বলেছিল,
—“You dropped it.”
আলিশা হেসে বলেছিল,
—“Thank you… You’re not from here, are you?”
সাইফুল মাথা নাড়িয়ে বলেছিল, “No, I’m from India .”
সেই একটুকু আলাপে যেন দুই অচেনা দুনিয়া হঠাৎ এক সেতু পেল।
কয়েকদিন পর, ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে। আলিশা আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করছিল; সাইফুলও একই বিষয়ের ছাত্র।
দু’জনের চোখ আবার মিলে গেল বইয়ের পৃষ্ঠা ঝুঁকে পড়া অবস্থায়।আলিশা এগিয়ে এসে বলল,
—“Hey, Mr. Indian ! We meet again.”
সাইফুল হেসে বলল,
—“Maybe it’s destiny.”
আলিশা খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসি ছিল উষ্ণ, আন্তরিক।তারপর থেকে প্রতিদিন দেখা, কথাবার্তা, একসাথে কফি খাওয়া, বই আলোচনা—সব মিলিয়ে বন্ধুত্বের এক সূক্ষ্ম সুতো বোনা শুরু হলো।
আলিশা একেবারে আধুনিক রাশিয়ান মেয়ে। খোলা চুল, মুক্ত চিন্তা, কোনো ধর্মে বিশেষ বিশ্বাস নেই। কিন্তু সাইফুলের মধ্যে সে কিছু ভিন্ন পেল।
সাইফুল কখনো অশালীন কথা বলত না, মেয়েদের দিকে অনুচিত দৃষ্টিতে তাকাত না, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত, রমজানে রোজা রাখত।
একদিন আলিশা প্রশ্ন করেছিল,
—“Why do you pray five times a day? Doesn’t it feel like a burden?”
সাইফুল শান্ত গলায় বলেছিল,
—“Prayer is not a burden, it’s peace. When I pray, I talk to the One who created me. That’s freedom, not restriction.”
ওই দিন থেকেই আলিশার মনে একটা প্রশ্ন জেগে রইল— “এমন শান্তি কি আমিও পেতে পারি?”
সাইফুল আলিশা বেশি সময় কাটাত নিজেদের স্টাডি নিয়ে,আগে এরকম আলোচনা হতো না কিন্তু আলিশার সাথে সাক্ষাতের পর থেকেই যেন পড়াশোনার গুরুত্ব বেড়ে গেছে।আলিশারও কি এমনই ঘটেছে কিনা! যাইহোক সাইফুল এখানে পড়াশোনা করতে এসেছে, ঘর বাঁধতে আসেনি।
তবুও আলিশা যেন তার হৃদয়তন্ত্রীতে যে সুর তুলেছে, "ইস্পাত ভালো পাইয়াছি গড়িয়া লইয়া যায়।" এই ধ্বনিই বারংবার ধ্বনিত হয়।আলিশা মডান মেয়ে,তবুও অন্যদের মাঝে একটু আলাদাভাবে তাকে অনুভব করা যায়।সাইফুল বুঝতে পেরেছে আলিশা অনুসন্ধিৎসু, দৃঢ়চেতা মহিলা...
দিনের পর দিন আলিশা আর সাইফুলের বন্ধুত্ব বেড়েই চলল। একদিন সাইফুল তাকে নিয়ে গেল মস্কোর পুরোনো মসজিদে—সেন্ট্রাল মস্কো মসজিদ।সেখানে তিলাওয়াত হচ্ছিল সূরা রহমান।
আরবি শব্দের মধুর সুর আলিশাকে কাঁপিয়ে দিল ভেতর থেকে।সে জানল না কেন, কিন্তু চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
সাইফুল পাশে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে বলল,
—“This is Qur’an… Allah’s words.”
আলিশা চুপচাপ বলল,
—“It’s… beautiful.”
সেদিনের পর থেকে আলিশা ইসলামের বিষয়ে জানতে শুরু করল—প্রথমে কৌতূহল থেকে, পরে আগ্রহে, শেষে ভালোবাসায়।
এক শীতের রাতে বরফ পড়ছিল অবিরাম। সাইফুল ক্লাস শেষে আলিশাকে হাউসে পৌঁছে দিতে গেল। হঠাৎ রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আলিশা বলল,
—“Saeef… do you believe in destiny?”
—“Yes,” সাইফুল উত্তর দিল, “Everything happens by Allah’s will.”
আলিশা নিঃশব্দে তার চোখের দিকে তাকাল, তারপর ফিসফিস করে বলল,
—“Then maybe Allah sent you for me.”
সাইফুল থমকে গেল। ঠান্ডা বাতাসেও তার কপালে ঘাম জমল।
সে আস্তে বলল,
—“Alisha… I respect you deeply. But I can’t cross the limits of my faith.”
—“What limit?”
—“In Islam, love is sacred only when it’s within marriage.”
আলিশা দীর্ঘক্ষণ চুপ রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
—“Then teach me your faith.”
পরবর্তী কয়েক মাস আলিশা ইসলাম সম্পর্কে গভীরভাবে জানল।সে কুরআনের অনুবাদ পড়ল, নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী পড়ল।
তার ভেতরে যেন এক নতুন আলো জ্বলে উঠল।
সে বলত,
—“I used to think freedom means doing anything I want. Now I realize freedom means peace inside.”
এক রোদেলা শুক্রবারে, মস্কো মসজিদের ইমামের সামনে দাঁড়িয়ে সে কালেমা পাঠ করল—
> “Ashhadu alla ilaha illallah,
Wa ashhadu anna Muhammadan rasulullah.”
তার নতুন নাম রাখা হলো নূর আলিশা ইসলাম।
সেই মুহূর্তে সাইফুলের চোখে জল এসে গেল।
আলিশা হাসল, বলল—
—“Now I am Noor, your light.”
বিয়েটা হলো ছোট করে, কিন্তু হৃদয়ে বিশাল এক আনন্দ নিয়ে।ইমাম নিকাহ পড়ালেন, দু’জন সাক্ষী রইল।আলিশার বাবা-মা প্রথমে তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন—
“তুমি এক মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করবে? বিদেশি, গরিব?”
কিন্তু আলিশা দৃঢ়ভাবে বলেছিল,
—“He gave me faith, not fear. He taught me peace, not pressure.”
শেষমেশ মা মেনে নিলেন, যদিও বাবা অনেকদিন কথা বলেননি।
বিয়ের পর আলিশা শালিন পোশাক পরা শুরু করল, নামাজ পড়ত নিয়মিত।সাইফুল তাকে বাংলা শেখাতে শুরু করল।
“আমি তোমায় ভালোবাসি”—এই বাক্যটি শিখে নূর প্রতিদিনই বলত মিষ্টি উচ্চারণে।
সাইফুলের পড়াশোনা শেষ হলে সে চাকরি পেল একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায়।তার দেশে ফিরতে পারবে,আর ফিরবেও তার পরিবার পরিজনদের সে ভুলবে না,সে জানে পিতা মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব। কিন্তু আলিশাকে নিয়ে স্থায়ী ভাবে থাকতে কী পারবে? দেশে যা চলছে NRC, বিদেশিদের হ্যারেস। তাই সে বিদেশেই চাকরি নিয়েছে।সেখানে আলিশাকে নিয়ে সোনালী সংসার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে সে। দেশ দেশ নন্দিত এই দেশ,কবি গুরুর 'দেবে আর নেবে মেলাবে মিলিবে' ব্রাত্য হয়েছে।মাতৃভুমির টানে,পরিজনে কাছে ছুটি কাটাতে ফিরে আসতেই হয়----
তারা দেশে ফিরে এল।
ব্যস্ত নগরী রাস্তায়, রিকশায় বসে নূর বলেছিল,
—“So much noise… but so much life!”
সাইফুল হেসে বলল,
—“Welcome to my homeland, my Noor.”
নূর বাংলা খাবার শিখে ফেলল—খিচুড়ি, পোলাও , পান্তা ভাত।পরথম প্রথম অসুবিধা হলে আস্তে আস্তে বাড়ি সকলে মেনে নিলো,মানিয়ে নিলেন।
বাড়ির পাশের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি উঠলে সে থেমে যেত, চোখ বন্ধ করে বলত,
—“It feels like Allah is calling me home.”
প্রতিবেশী সবাই কিন্তু সহজে মেনে নেয়নি।
পাড়ার কিছু লোক বলত, “বিদেশি মেয়ে, দেশে কি মেয়ে ছিল না?”কেউ কেউ কটূ কথা বলত,
“ওর নাম ইসলাম কিন্তু মনের ভেতর...... বিয়ে করেছে না,নিয়ে পালিয়ে এসেছে।”
সাইফুল এসব শুনে কষ্ট পেত, কিন্তু নূর শান্ত স্বরে বলত,
—“Let them say. My Islam is between me and Allah.”
তার ঈমান এত দৃঢ় ছিল যে, ধীরে ধীরে আশপাশের লোকেরা নিজে থেকেই তাকে শ্রদ্ধা করতে শুরু করল।
একদিন স্থানীয় স্কুলে মেয়েদের ক্লাসে নূর বক্তৃতা দিল। বলল,
—“I was born far from Islam, but Allah brought me close. You girls are blessed—you are born in Islam. Keep it alive with love, not fear.”
তার কথায় সবাই মুগ্ধ হয়ে গেল।
➤ এক বছর পর-
এক বছর কেটে গেল। নূর গর্ভবতী হলো।
সাইফুলের চোখে আনন্দের অশ্রু।এক রাতে তারাছাদে বসে আকাশের তারা দেখছিল।নূর বলল,
—“Do you remember the snow in Moscow?”
—“Yes,” সাইফুল হাসল, “You looked like a snowflake then.”
নূর বলল,
—“And now I’ll bring a new light for you.”
সেই সন্তান জন্ম নিল এক রোশন শুক্রবার সকালে—তাদের কন্যা, নাম রাখা হলো আনিকা সাইফুল ।
বিয়ের দুই বছর পর আলিশা তার বাবার কাছে একটি মেল পাঠাল ।চিঠিতে লিখল—
> “Dear Papa,
You once said I was lost. But I am not lost anymore.
I found peace in Allah, love in Saiful, and purpose in life.
I am your same daughter, only brighter now.Love,Noor Alisha.”
তার বাবা রিপ্লাই দিয়েছিলেন—
> “My daughter Noor,
I can see the light in your eyes, even from far away.
Maybe your God is not just yours, but ours too.”
মেল পড়তে পড়তে নূরের চোখে জল এল, আর সাইফুল বলল,
—“See? Allah guides whom He wills.”
নূর তাকে ডাকল—
—“Saeef!”
সাইফুল ফিরে তাকাল।
নূর মৃদুস্বরে বলল,
—“Thank you for showing me Allah.”
সাইফুল হেসে উত্তর দিল,
—“And thank you for becoming my Noor.”
আকাশে ভেসে উঠল আজানের সুর—
“হায়্যা আলাস সালাহ্…”
আর নূর মনে মনে বলল,
> “আমার জীবন এখন এক আলোয় ভরা দুনিয়া—ভালোবাসা, বিশ্বাস আর আল্লাহর রহমতে গড়া।”
----০----
দেশান্তরী
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
64
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating