কাশফুল

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
ঠিক মনে নেই কবে থেকে স্বপ্নটা দেখছি প্রথম।সম্ভবত সালটা 1999 কি তার আগে। যুক্তিতর্ক বন্ধুদের সাথে অনেক আলোচনা  করেও এখন অব্দি বুঝতে পারিনি এই একই স্বপ্ন কেন আমি মাঝে মাঝে দেখি.,একই স্বপ্ন প্রতিবার।
আমি সারাদিন অনেক কাজ করতে হয় আমাকে, সুতরাং যখন ঘুমাই অনেক গভীর ঘুমে থাকি।
শুধু এক লাইনের একটা স্বপ্ন।
"সবুজ দুই ধান ক্ষেতের মাঝখানের আইল দিয়ে একটা মেয়ে লাল শাড়ি পড়ে দৌড়ে যাচ্ছে তার পর কাশ বনে হারিয়ে গেলো। আর আমি তার পিছু করতে করতে হঠাৎ পড়ে গেলাম, তারপর চারি দিকে শুধু হাসির শব্দ।"

কাশফুল মানেই শরতের শুভ্রতা, নিঃশব্দ ভালোবাসা আর প্রকৃতির এক অনন্য শান্ত সৌন্দর্য। এই ফুল যেন প্রকৃতির গভীর ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি যেখানে বাতাসে দোল খেয়ে ওঠে স্মৃতির ঢেউ। হেমন্তের আগমনে সাদা কাশফুল ছুঁয়ে যায় হৃদয়, জাগিয়ে তোলে আবেগ, কাব্য আর প্রেমের অনুভব।অথচ আমার কাছে এ যেনো হারিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক। আকাশ আর মাটি মিলেন মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায় যেনো এই কাশ বন।
আমার জীবনে কোন তুমি নেই, কিন্তু তুমি ছিলোনা এমনটি নয়। কাশফুল হোক কিংবা তুমি—দু’জনেই মনের খুব কাছে, কিন্তু ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, শুধুই অনুভব করা যায়।কাশফুলে প্রেম আছে, কিন্তু তার সাথে আছে নিঃসঙ্গতার ছায়া—যেমন করে কিছু মানুষ হাসে, ভেতরে অসীম কষ্ট নিয়ে। তেমনি আকাশটাও যেনো হাসছে ঐ কাশবনে।

যাইহোক স্বপ্নটা দেখে ঘুম থেকে জাগার পরে কখনো বুক ধরফর করে না। অস্বস্তি লাগেনা। একদম নরমাল থাকি আমি এক ফোটা ঘামিও না।
রিসেন্টলি এক সাইক্রিয়াটিস্ট বন্ধুর সাথে আলাপ করছিলাম হাসতে হাসতে বলেছিলাম।বন্ধু আমি তো এমন এমন দেখি স্বপ্নে, অথচ আমি কোন দিন এমন ঘন কাশ বন দেখি নি বাস্তবে আর এখন তো বয়স 45 ছুঁই ছুঁই কোন মেয়ে পিছু ছুটে বেরনোর বয়স তো আমার নেই ও।
বন্ধু হেসে হেসে উত্তর দিল "জীবন নিয়ে এত প্রেসার নিও না, হাসতে খেলতে পার করো, কিন্তু তুমি কোনদিন গ্রামে গিয়েছিলে?? "

আমি উত্তর বুঝতে না পেরে আবারও জিজ্ঞাসা করলেও সে আর কোন উত্তর আমাকে দেয়নি।
কি বুঝালো সে?
ভালোবাসা এক ভয়ংকর অসুখের নাম।
এ অসুখে পড়ে বিপরীত মানুষটিকে ছাড়া  মানুষ নিঃস্ব হয়ে যয়া। কত মানুষ এই অসুখে আক্রান্ত হয়ে বৈরাগী হয়েছে
তার হিসাব নেই।
ছোটবেলায় গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গেলে সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম জোক আর আরশোলাকে। আমি ছেলে হলেও ভয় পেতাম। আম বাগানে গেছি। রিঙ্কু জিগাসা করলো। " বুবাই দা কিরে তোর হাতে আংটি কিসের?"
আমি বললাম" কই বলতে বলতে হাতের দিকে তাকিয়ে বানরের মতো লাফালাফি ঝাকাঝাকি শুরু করলাম! হাতে তো জোক!"
আর একবার তো উড়ন্ত আড়শোলা দেখে ভয় পেয়ে উপর থেকে ধানের গোলার ভেতর পড়ে গিয়েছিলাম!
কই হারিয়ে গেল সেই দিনগুলো?? পিসির বাড়ি যাও বন্ধ হয়ে গেলো ওই রিঙ্কুর জন্যেই। পিসি কথায়" ওরা ওকে ওষুধ করেছে।  তাই ও ওদের জন্য পাগল। ওর ও বাড়ির লোক জনকে উপকার করতে চাইছে। ওদের জন্য পিরিত উথলে উঠছে। তাই ওকে গ্রামের বাড়িতে না পাঠানোই ভালো। আর চোখে চোখে রাখো। কানঘুসো যা চলছে তা একটু সময় গেলেই ঠিক হয়ে যাবে  কিন্তু ছেলেটাকে আগে বাচাও"
তারপর হঠাৎ একদিন গোলপার্ক ওখানে পুরোনো বইএর দোকানে একটা বই কেনার জন্য দরদাম করছি। পিছন থেকে একটা মেয়ে ডাকলো "বুবাই দা না " গলাটা খুব চেনা। পিছনে ঘুরতেই বুকের ভিতর একটা চিন চিন করে ব্যাথা উঠলো। মেয়েটা কেউ নয়। রিঙ্কু চিন চিন করে বুক ব্যাথা ওঠার কারণ ওর কপালে চওড়া সিঁদুর। ও লেক ওখানে একটা ছোট ঘর ভাড়া থাকে বর ট্যাক্সি চালক। আমার চেনা ছেলে পুকাই বিয়ে করেছে। ও আমার জন্য অনেক বেশি বদনাম হয়ে গেছে তাই সাত তারাতারি বিয়ে করে নিতে হয়েছে। ও ওর বাড়িতে নিয়ে গেলো না। লেকে  বসেই কথা হলো। দেখা হবে না ওর সাথে আর বললো। তবুও আমি জানিয়ে দিলাম, গোলপার্ক আমি কবে কবে আসি।

একদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। লাইব্রেরী থেকে বেরিয়ে দেখলাম ও দাড়িয়ে আছে। ওর বর হাসপাতালে ওর টাকার দরকার। ও আমার কাছে এসেছে সাহায্য জন্য। ও সাথে হাসপাতালে গেলাম। প্রয়োজনীয় টাকা পয়সা দিলাম। ও বললো " সব টাকা ঠিক শোধ করে দেবে। "
আমি মজা করে বললাম " আসল যত দিন শোধ না হচ্ছে। সুদ দিতে হবে।  সুদ হিসেবে আমার সাথে দেখা করতে হবে। "
ও হেসে সম্মতি দিলো। দেখা হলো, কথা হলো, ঘনিষ্ঠতর হলো সম্পর্ক। ওর স্বপ্ন ছিলো সিনেমার নায়িকা হবে। সেটা ওর মৃত স্বপ্ন যদিও, তবুও আমি ওকে ছোট খাটো  অভিনয়ের সুযোগ করিয়ে দিলাম।  ওর প্রথম রোজগার থেকে পাঞ্জাবি কিনে দিলো। সুযোগ পেয়ে আমি ওকে একটা শাড়ি আর অনেক গুলো সাজার জিনিস কিনে দিলাম। শেষ যে দিন ওর সাথে দেখা হয়েছিল সেইদিন ও আমার দেওয়া শাড়িটাই পরে এসেছিলো। অনেকক্ষন গল্প পর বললো। "কাছেই তো আমার বাড়ি যাবে আজ আমার বাড়ি। "
আমি বললাম " আমি তো অনেক বার যেতে চেয়েছি তুই তো নিয়ে যাস নি। কিন্তু আজ তো অনেক রাত হয়ে গেছে।"
ও বললো " আজ চললো পংকাই দুই দিনের জন্য পুরুলিয়া গেছে, প্লিজ চললো না। সুদ নয়, আসল পাবে। "
আসল পাবার লোভে গেলাম ওর বাড়ি। বাড়ি নয় ছোট এক কামরা ঘর, সাথে রান্না ঘর বারন্দা। রাত কাটাতে অসুবিধা হলো না। কিন্তু অসুবিধা হলো। সপ্তাহ দুই ও যখন আর্য দেখা করলো না। ধৈর্য বাধ ভাঙতে আমি চলে গেলাম ওর বাড়ি। কিন্তু কিছু সুবিধা করতে পারলাম না। সব ঘর গুলোই এক। ওর ঘরটা চিনতে পারলাম না। বারবার খোঁজ খবর নেওয়া পর বিবরণ শুনে বললো। ওর বর অশান্তি করে চলে যাওয়ার পর একমাস ছিলো এখানে তারপর  ও চলে গেছে।
আমি সব বাধা নিষিদ্ধ অমান্য করে গ্রামের বাড়ি গেলাম। গিয়ে শুনলাম পংকাই গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আর রিঙ্কুর খোজ কেউ জানে না। ও হারিয়ে গেছে শহরের জন অরন্যে। কিন্তু কাশ বনে হারিয়ে যাওয়া মেয়েটা রিঙ্কুর নয় অন্য কেউ। কিন্তু সে কে আমি চিনতে পারছিনা কিছুতেই। পোঁচিশ বছরের পুরনো স্বপ্ন কিন্তু মূখটা দেখতে পেলাম না কখনো।

তবে স্বপ্নের মেয়েটার মুখ যেমন আমি খুঁজেছি তেমন ওকে খুঁজেছি সব সময়, বিভিন্ন শহরে গ্রামে ছুটেছি, কারণ রিঙ্কুকে কখনো বেনারস, কখনো বৃন্দাবন, কখনো মথুরা দেখা গেছে। আমি ওকে সন্ধানে অনেকবার গেছে এখানে ওখানে। আর পথে ওরকম কাশবন দেখেছি। কাশবন সাদা রঙ দেখা মন খুশিতে ভরে যায়, কারণ ওটা উৎসবের প্রতীক। কিন্তু সারা বছর কাশবনের কথা কারো মনে আসে না।
হু রিঙ্কুর আমার জীবনে শরৎ এর মতো। সুখ পেয়েছি, সহাগ পেয়েছি , পেয়েছি আনন্দ। কিন্তু কাশবন মতো ও হারিয়ে গেছে অপ্রয়োজনীয় স্মৃতির ভিড়ে। কিন্তু সত্যিই আমি ওকে বারোমাস চাই। শুরু উৎসবের আয়োজনে নয়। আমি গ্রীষ্মে রোদে শুকিয়ে যেতে চাই। বর্ষায়  ভিজতে চাই। হেমন্তে ওর বিরহের কাতরাতে চাই  , শীতে ওর ওম চাই, বসন্ত ওর গায়ের গন্ধ মেখে রঙিন করতে চাই জীবন।
কাশ বনে হারিয়ে যাওয়া মেয়েটার মুখ আমি দেখতে পাই নি। কিন্তু রিঙ্কুর কাশবন মতো হারিয়ে গেছে আমার জীবন থেকে।

36 Views
1 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: