সোহান নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে তাকাচ্ছিল। আকাশের নীল ধীরে ধীরে অরবিন্দ্রা গোলাপী ও কমলার মিশ্রণে রঙিন হয়ে উঠছিল। গোধূলির সেই নরম আলো তার চেহারায় পড়লেই যেন এক অদ্ভুত শান্তি ভেসে আসত। কিন্তু আজ, সেই শান্তি কিছুটা খণ্ডিত—কারণ তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল নাজমা।
নাজমা। এই নামটি সোহানের জীবনে এক অন্যরকম জেগে থাকা আবেগের সূচনা। কলেজের প্রথম দিনে তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। নাজমা ছিল শান্ত, কোমল, আর কল্পনাতীত সৌন্দর্যের মালিক। কিন্তু আজকের সে দৃঢ়, যেন নিজের পৃথিবীর কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে।
“সোহান…” নাজমার কণ্ঠে নরম ভাওয়না লুকিয়ে ছিল। সে আস্তে করে নদীর ধারে এসে দাঁড়াল। নদীর ঠাণ্ডা হাওয়া তাদের দুজনের মধ্যে নরম স্পর্শ তৈরি করল।
“নাজমা, তুমি কি ঠিক আছ?” সোহান একটু কণ্ঠ কমিয়ে জিজ্ঞেস করল।
নাজমা তার চোখের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল। “হ্যাঁ… সব ঠিক আছে। শুধু কিছু বলার আছে।”
সন্ধ্যার আলো নদীর জলে রিফ্লেক্ট করে নরম কমলার মতো ঝিলমিল করছে। সোহান অনুভব করল, এই মুহূর্তটি তাদের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ পালা।
“সোহান, আমি… আমি তোমাকে বলতে চাই, আমি…” নাজমা হঠাৎ থেমে গেল। কানে এমন শব্দ ভেসে এলো, যেন সময় থেমে গেছে।
সোহান হেসে বলল, “বলো, আমি শুনছি।”
নাজমার চোখের মধ্যে সোনালি আলো ফুটে উঠল। “আমি… তোমাকে ভালোবাসি।”
সোহানের বুকের ভেতর কিছু কেটে গেছে। সে নীরবভাবে নাজমার দিকে এগোল। বাতাসে তাদের হাওয়া মিলিত হল, আর নদীর জল তাদের প্রতিফলন দেখাল। সোহানের হাত নাজমার কাঁধে পড়ল, আর সে শান্তভাবে মাথা ঝোঁকল।
“আমি ও তোমাকে ভালোবাসি, নাজমা… অনেকদিন ধরে।”
গোধূলির সেই রঙিন আকাশের নিচে দুজনের মন এক অদ্ভুত মিলনে আবদ্ধ হলো। নদীর কণ্ঠে মৃদু ঢেউ, পাখির গান, আর হালকা হাওয়ার নরম ছোঁয়া—সবকিছু যেন তাদের ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দিচ্ছিল।
এরপর তারা নদীর ধারে একপাশে বসে গল্প করতে লাগল। কলেজের স্মৃতি, শিশু কালের ছোটখাটো সুখ, এবং নিজেদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সব কিছু মিলিয়ে। নাজমা বলল, “সোহান, আমি চাই তুমি আমার জীবনের প্রতিটি ক্ষণে থাকো।”
সোহান হেসে বলল, “আমি থাকব, নাজমা। প্রতিটি গোধূলি, প্রতিটি রোদ, প্রতিটি বৃষ্টি—আমি তোমার পাশে থাকব।”
তাদের এই মুহূর্তের গভীরতা ছিল অমোঘ। কিন্তু জীবনের পথে সবসময় সহজ সময় আসে না। নাজমা আসলে ঢাকা শহরের এক নামকরা পরিবারের সন্তান। তার পরিবারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তার বিয়ের জন্য ইতিমধ্যেই একজন পরিবার পরিচিত যুবক নির্ধারিত।
সোহান জানত, এই পথ সহজ নয়। কিন্তু সে ঠিক করল, নাজমাকে নিজের জীবন থেকে কখনো আলাদা হতে দেবেনা।
পরদিন, সোহান নাজমাকে নিয়ে শহরের প্রাচীন বটগাছের ছায়ার তলায় বসেছিল। চারপাশে ল্যাম্প পোস্টের নরম আলো, আর হাওয়ার মৃদু ঝাপটা—সবকিছু যেন গল্পের মতো।
“নাজমা, আমাদের পরিকল্পনা করা উচিত। আমি চাই তুমি নিজের ইচ্ছা অনুসারে জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে পারো।” সোহান ধীর কণ্ঠে বলল।
নাজমা হেসে বলল, “আমি চাই তুমি জানো, আমার জীবন তোমার পাশে কাটাতে চাই। কিন্তু পরিবার…” তার কণ্ঠে অশ্রু এলোমেলো ঝাপটা তুলল।
“চিন্তা করো না। আমরা সব ঠিক করব। ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তবে সে সব বাধা পেরোতে পারে।” সোহানের দৃঢ় দৃষ্টিতে নাজমা নতুন শক্তি পেল।
এরপর দুজন সিদ্ধান্ত নিল—যে কোনো বাধা থাকুক না কেন, তারা একসাথে থাকবে। তারা ছোট ছোট গোধূলির যাপন শুরু করল—কলেজে মধুর আলাপ, নদীর ধারে লুকানো হাসি, শহরের ল্যাম্প পোস্টের তলায় হাত ধরে হাঁটা।
একদিন, সোহান নাজমাকে নিয়ে শহরের প্রাচীন লাইব্রেরিতে গেল। সেখানে, বইয়ের খাম্বার আর ধুলোমাখা পুরনো বইয়ের মধ্যে তাদের চোখ মিলল।
“নাজমা, আমাদের সম্পর্ক যেন এই বইয়ের মতো হয়—যে সময়ের সঙ্গে যত গড়ায়, ততই মধুরতা বাড়ে।”
নাজমা হেসে বলল, “হ্যাঁ, সোহান… আমাদের গল্প যেন সেই বইয়ের মতো হয়ে যায়, যা সব সময় নতুন করে পড়তে ইচ্ছে করে।”
কিছু সপ্তাহ পরে, নাজমার পরিবার তার বিয়ের আয়োজন শুরু করল। তবে নাজমা এবং সোহান একসাথে থাকার জন্য নির্ভীকভাবে পরিকল্পনা করল। তারা শহরের এক ছোট্ট মসজিদের পাশে গোপনে মঙ্গল ফর্ম পূরণ করল, নিজেদের প্রতিজ্ঞা বিনিময় করল।
সন্ধ্যার আকাশে ধূসর রঙের মিশ্রণ, আর নদীর পাশে লুকানো আলো—সবকিছু যেন তাদের এই নতুন জীবনের সাক্ষী।
“সোহান, আমরা সত্যি একসাথে। আর এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত।”
সোহান নাজমার হাতে হাত রেখে বলল, “নাজমা, এই গোধূলি লগ্ন যেন আমাদের জীবনের প্রতিটি দিনেই থাকে।”
এরপর তারা শহরের ছোট্ট কফি শপে বসে, একসাথে রোদ ও চায়ের গন্ধে মিশ্রিত হয়ে গল্প করল। জীবন তাদের কাছে কঠিন হলেও, ভালোবাসা তাদের এক নতুন আকাশের দিকে এগোতে শিখালো।
কয়েক বছর পরে, সোহান এবং নাজমা এক সুন্দর নদীর ধারে তাদের ছোট্ট বাড়ি বানাল। প্রতিটি সন্ধ্যা তারা একসাথে নদীর ধারে বসে গল্প করত, গোধূলির আলোতে হাত ধরে হাঁটত।
নাজমা বলল, “সোহান, এই গোধূলি লগ্ন আমাদের জীবনের প্রতিটি দিনেই থাকুক।”
সোহান হেসে বলল, “হ্যাঁ, নাজমা… এই আলো, এই নদী, এই মুহূর্ত—সবই আমাদের ভালোবাসার সাক্ষ্য।”
নদীর পানি ধীরে ধীরে সোনালী আলো ছড়াচ্ছিল, আকাশ কমলার এবং গোলাপী রঙের সমাহারে ভেসে যাচ্ছিল। সোহান ও নাজমার চোখে চোখ রেখে তাদের হৃদয়ের গভীর প্রেমকে স্বীকৃতি দিল।
এভাবেই তারা একসাথে জীবনযাপন করল, সুখ-দুঃখে, আবহে-রঙে, প্রতিটি গোধূলি লগ্নকে সোনালী স্মৃতিতে পরিণত করে।
গৌধুলি লগ্ন
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
40
Views
1
Likes
1
Comments
5.0
Rating