গ্রামের এক শান্ত বিকেল। গোধূলির রঙে আকাশ যেন আগুনে ছাই মিশিয়ে অদ্ভুত এক জ্যোতি ছড়াচ্ছে। বৃন্দাবনের ঘন বনে দূরের ঝর্ণার শব্দ, পাখির ডাক, আর ধুলোর গন্ধ—সব মিলিয়ে যেন এক অদৃশ্য সুর সৃষ্টি করছে। সেই সুরে মাতোয়ারা হয়ে থাকতো রাধা, যার চোখে ছিল শাশ্বত প্রেমের দীপ্তি।
রাধা গ্রামের মেয়ে হলেও তার সৌন্দর্য ছিল স্বর্গীয়। গম্ভীর চোখে আলো, হাসিতে বসন্তের কোমলতা। তার কোমল হাত আর নাচের ছন্দে যেন প্রতিটি ফুল ও পাতা নৃত্যরত। আর কৃষ্ণ—বাঁশবাজি, বাঁধানো কেশ, নীল ছায়ার মতো শরীর—গ্রামের সেই নদীর তীরে বসে বাঁশি বাজাতে বাজাতে সময়কে থামিয়ে রাখত।
রাধার প্রতিটি নড়াচড়া কৃষ্ণের হৃদয়ে এক অদ্ভুত স্পন্দন জাগাত। কৃষ্ণের চোখে প্রতিটি সূর্যের আলো রাধার হাসিতে মিলত। আর রাধার হৃদয়ও কৃষ্ণের মৃদু হাসিতে বাঁধা পড়ত, যে হাসি কেবল তার জন্যই।
একদিন বিকেল বেলার সেই নদীর ধারে রাধা ফুল তুলছিল। প্রতিটি পদক্ষেপে যেন যেন মাটি তার স্পর্শে আলতো গান গাইছিল। দূরে কৃষ্ণ বাঁশি বাজাচ্ছিল। বাতাসে তার সুর ভেসে আসল রাধার কানে, আর হৃদয় যেন তার ছন্দে নেচে উঠল।
“কৃষ্ণ! তুমি আজও কি আমার জন্যই বাজাও?” রাধা কণ্ঠে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ।
কৃষ্ণ হাঁসতে হাসতে নদীর ধারে এল। “রাধা, এই সুর তো তোমার জন্যই। পৃথিবীর সব সুখের মাঝে, সবচেয়ে মধুর সুখ তোমার কাছে। আমি তো কেবল তোমার হাসি পেতে চাই।”
রাধা লাজুক চোখ নামিয়ে নদীর জলে তার প্রতিফলন দেখল। সে জানত, তার হৃদয় কৃষ্ণের বাঁশিতে বন্দি।
বৃন্দাবনের সেই সুনিপুণ গোধূলি যেন তাদের প্রেমের সাক্ষী। প্রতিটি পাতার নড়াচড়া, প্রতিটি ঝর্ণার ছন্দ—সবই যেন তাদের প্রেমের গল্প বয়ছে।
কিছুদিন পর, গ্রামে অনুষ্ঠিত হলো বসন্ত উৎসব। রাধা আর কৃষ্ণ দুজনেই উপস্থিত। কৃষ্ণ তার বাঁশি হাতে নিয়ে বীণার মতো সুর বাজাচ্ছিল। আর রাধা, তার গাঢ় লাল চুলে সোনার মণি ঝুলিয়ে, ধীরে ধীরে নাচতে নেমে গেল।
কৃষ্ণ চোখে চোখ রেখে বলল, “রাধা, তুমি যেন এই পৃথিবীর একমাত্র ফুল। তোমার হাসি আমার জীবনের সুর।”
রাধা হৃদয় দিয়ে বলল, “কৃষ্ণ, তুমি ছাড়া আমার প্রতিটি দিন শূন্য। তোমার সুর আমার জীবনকে পূর্ণ করে।”
তাদের প্রেম ছিল শুধুই নৈসর্গিক নয়; এটি ছিল আত্মার মিলন। গ্রামে সবাই দেখত তাদের প্রেম, কিন্তু কেউ বলতে সাহস পেত না। কারণ রাধা আর কৃষ্ণের প্রেম ছিল এমন এক গভীর, যা কেবল অনুভব করা যায়।
একদিন কৃষ্ণ বলল, “রাধা, আমার সঙ্গে এসো বৃন্দাবনের সেই গোপী পল্লীতে। সেখানে আমরা একাকী থাকব, আর পৃথিবী আমাদের গল্পের মাঝে হারিয়ে যাবে।”
রাধা লাজুক হয়ে বলল, “কৃষ্ণ, আমি সবকিছু ছেড়ে তোমার সঙ্গে যেতে পারি, কিন্তু আমার পরিবার?”
কৃষ্ণ তার কাঁধে হাত রাখল। “তোমার পরিবারের যত্ন আমি নেব। তুমি কেবল আমার হাত ধরো, আর বাকি সব আমি সামলাব।”
রাধা তার চোখের জলে জলমগ্ন হয়ে কেবল মাথা নাড়ল। সে জানত, এই প্রেমের জন্য জীবনের সব বাঁধা অতিক্রম করতে হবে।
সেই রাত, তারা নদীর ধারে বসে চাঁদের আলোয় একে অপরের হাতে হাত রেখে বসেছিল। নদীর পানি যেন তাদের প্রেমের সপক্ষে সাক্ষী হয়ে ঝলমল করছিল।
“রাধা, এই পৃথিবীতে আমার একমাত্র আনন্দ হলো তোমার সঙ্গে থাকা। তুমি আমার প্রেম, আমার আত্মা, আমার সব।” কৃষ্ণ বলল।
রাধা কানে কানে ফিসফিস করে বলল, “কৃষ্ণ, আমি কেবল তোমার। এই জীবন, পরের জীবন—সবকিছু তোমার।”
তারপর তারা একে অপরের চোখে হারিয়ে গেল। রাতের স্নিগ্ধতার মাঝে, তারা নিজেদের প্রেমের বাঁশিতে আবদ্ধ হলো।
দিনের পর দিন, বৃন্দাবনের পথে পথ চলা, নদীর ধারে বাঁশি বাজানো, ফুল তুলা—সবই তাদের প্রেমকে আরও গভীর করল। গ্রামের লোকেরা বলত, “রাধা আর কৃষ্ণ যেন স্বর্গ থেকে পাঠানো প্রেমের দ্যুতি।”
একদিন, কৃষ্ণ বলল, “রাধা, আমরা শুধু প্রেমে নয়, আমাদের স্নেহ আর ভক্তিতেও এক হয়ে যাই। আমাদের লীলা যেন সারাজীবন মানুষের হৃদয়কে স্পন্দিত করে।”
রাধা হাসল, “হ্যাঁ, কৃষ্ণ। আমাদের প্রেম যেন শুধু আমাদের নয়, সবাইকে অনুপ্রাণিত করে। প্রতিটি চোখে আমাদের ভালোবাসা ঝরে পড়ুক।”
এভাবেই তাদের প্রেম লীলা চলতে থাকল—প্রতিটি গোধূলি, প্রতিটি নদীর ধারা, প্রতিটি ঝর্ণার শব্দে। বৃন্দাবনের পাতা গোপনভাবে তাদের নাম গাইতে লাগল। চাঁদের আলো যেন তাদের হাসি প্রতিফলিত করত।
রাধা আর কৃষ্ণের প্রেম লীলা ছিল এক অমোঘ সঙ্গীত। এটি শুধু দুই ব্যক্তির নয়, বরং সমস্ত প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে গড়ে উঠল। ফুল, নদী, চাঁদ, বাতাস—সবই তাদের প্রেমের অংশ হয়ে উঠল।
সময় চলে গেল। গ্রাম বদলাল, কিন্তু রাধা-কৃষ্ণের প্রেম অম্লান রইল। তাদের লীলা হয়ে উঠল মানুষের মনে এক চিরন্তন গল্প, যা বারবার স্মরণ করায় যে প্রকৃত প্রেম কখনো মরে না, বরং চিরকাল প্রবাহিত হয়।
প্রকৃতপক্ষে, রাধা-কৃষ্ণের প্রেম লীলা ছিল সেই মহা সঙ্গীত, যা প্রতিটি হৃদয়কে উজ্জীবিত করে। প্রেমের প্রতিটি ছন্দ, প্রতিটি হাসি, প্রতিটি দুঃখ—সবই যেন এক চিরন্তন নৃত্য।
এইভাবে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম লীলা বৃন্দাবনের প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, মানুষের হৃদয়কে মধুর স্মৃতি দিয়ে ভরে দেয়।
রাধা-কৃষ্ণের প্রেম লীলা
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
67
Views
2
Likes
0
Comments
5.0
Rating