এক বৃদ্ধের করুণ কাহিনী

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
আশি বছরের বয়োবৃদ্ধ করিম সাহেব। ব্যাংকে টাকা উঠাতে এসেছেন। অনেক লম্বা লাইন। বিশ মিনিট হলো লাঠির উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছেন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়ে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়,তাই বার বার লাঠিতে হাত বদলাচ্ছেন। ইচ্ছে করছিল,কোথাও একটু বসতে।কিন্তু কোন সিট খালি নেই। সবগুলোতেই লোক বসা।তাছাড়া লাইনের সিরিয়াল হারানোর ভয় তো আছেই! তাই বার বার তিনি অসহায় দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলেন ব্যাংকের কর্তব্যরত অফিসারদের দিকে।উদ্দেশ্য,বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া ও বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষটিকে দেখে হয়তোবা সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে কেউ। সেই সাথে এগিয়ে দিয়ে বলবে--চাচা! আপনার চেকটা দিন। আমি টাকা এনে দিচ্ছি। কিন্তু দু'একজন অফিসারের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকেও কোনো লাভ হয়নি। ওরাও খুব ব্যস্ত। কাজে ডুবে আছে। মাথা তুলে এদিক ওদিক তাকানোরও সময় নেই।
ব্যাংকের ম্যানেজার কাদের সাহেব। তিনি আপন আসন থেকে কাঁচের দেয়ালের ভেতর দিয়ে বিষয়টি লক্ষ্য করলেন। লম্বা লাইনের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধের চাহনি,অভিব্যক্তি এবং বারবার লাঠিতে হাত বদলানোর দৃশ্য দেখে বৃদ্ধের জন্য তাঁর খুব মায়া হলো। দেখে মনে হলো,কোন এক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তি জীবনের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে বড় অসহায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন।
আমাদের এই আলোচিত বৃদ্ধের নাম আব্দুল করিম। ম্যানেজার সাহেব চেম্বার থেকে বের হয়ে এসে করিম সাহেবের পেছনে দাঁড়ালেন। সন্মানের সাথেই নিজের ডান হাতটা পিঠে আলতোভাবে রেখে সহাস্যে বললেন--আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন চাচা?
পেছন ফিরে তাকিয়ে করিম সাহেব হতভম্ব । মনে হলো অনেক কাছের কেউ বুঝি এই প্রথম তার গায়ে হাত দিয়েছে। কিন্তু চিনতে পারেননি।ওয়া আলাইকুমুস সালাম বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। কিন্তু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া অন্য কিছুই বলতে পারলেন না।
'আসুন আমার সাথে'বলে হাত ধরে কাদের সাহেব তাকে নিজের চেম্বারে নিয়ে গেলেন। শ্রদ্ধাভরে সামনে পাতানো চেয়ারে বসার জন্য অনুরোধ করলেন। কলিং বেল টিপলেন। পিয়ন আসল।এক গ্লাস পানি আনতে বললেন।তারপর নিজে একটু সহজ হয়ে বসে জিঙ্গেস করলেল--
চাচা!আপনি কি টাকা উঠাতে এসেছেন না জমা দিতে এসেছেন?
উঠাতে এসেছি।
কত টাকা?
এইতো,পঁচাত্তর হাজার টাকা।
আপনি কোথায় থাকেন?
বৃদ্ধাশ্রমে।
কাদের সাহেব কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে গেলেন।ভাবলেন, কথাবার্তা, পোশাক-আশাক আর চাহনিতে ব্যক্তিত্বের ছাপসম্পন্ন এ ব্যক্তি বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন,এ কেমন করে হয়?তাই কৌতূহল মন নিয়ে কৌশলে আবারো জানতে চাইলেন--
চাচা!আপনি বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন, বিষয়টি বুঝলাম না।
না বোঝার কি আছে বাবা! এসবের হিসেব একেবারে অংকের সরল নিয়মের মতোই সহজ।আমি জীবনে ভুল করে যা চেয়েছি, হুবহু তাই পেয়েছি।
আর এ পাওনার বাস্তবতায় শুধু তুমি কেন, আমি নিজেও বড় বিস্মিত!
আপনার গ্রামের বাড়ি কোথায়?
ময়মনসিংহ।
ঢাকাতে কেউ নেই আপনার?
আছে।সবই আছে।শুধু আমি নেই!
তার মানে?
আমার বাসা মূলতঃঢাকার ধানমন্ডিতে।সেই অনেক বছর আগেই পাঁচ কাঠা জায়গার উপর আধুনিক মডেলে তিনতলা বিশিষ্ট বাড়ি বানিয়েছি। কিন্তু সেই বাড়িতে আমি এখন আর থাকিনা।একটি বিদেশী দূতাবাসকে দিয়ে দিয়েছি।বিনিময়ে ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে এক লক্ষ টাকা ব্যাংকে জমা হয়।তা দিয়েই......।
করিম সাহেব আর বেশিক্ষণ কথা বলতে পারেননি।তার আড়ষ্ট কন্ঠ থেমে গেছে।অবুঝ শিশুর মতো দু'চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে ঝর ঝর করে। অনেক কষ্ট করেও নিজেকে সামলাতে পারেননি।
অনেক দিনের জমে থাকা বেদনা কান্না হয়ে বের হতে দেখে কাদের সাহেবের সামনে কিছুটা লজ্জাবোধ করলেও তখন তার করার কিছুই ছিলনা।
কাদের সাহেব ফিসিয়াল টিস্যু এগিয়ে দিলেন।চোখের পানি মুছতে মুছতে করিম সাহেব আরো অনেক কিছুই বলতে চাইলেন।কিন্তু বলতে পারলেন না। একজন ম্যানেজারের রুমে এভাবে কোন একজন গ্রাহক মনের কথা বলতে গিয়ে কান্না করার দৃশ্যটি অন্যরা দেখে ফেলবে। তাই কাদের সাহেব উঠে গিয়ে অর্ধ ঝুলানো পর্দাগুলো টেনে দিলেন। তারপর আবারো চেয়ারে এসে বসলেন।ভাবছিলেন, বৃদ্ধ চাচাকে সান্ত্বনা দিবেন।কিন্তু তাকে তিনি কী সান্ত্বনা দিবেন?সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা যে তিনি হারিয়ে ফেলছেন!অবশেষে শুধু টেবিলের উপর রাখা পানির গ্লাসটি এগিয়ে দিয়ে এতটুকু বলতে পারলেন--চাচা,পানি নিন।একটু শান্ত হোন!!
কয়েক মুহূর্ত পর ম্যানেজার সাহেব কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বললেন--চাচা!আপনার ঘটনা শুনে আমারও খুব খারাপ লাগছে।ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস!মানুষ ভাবে একরকম, হয় আরেক রকম।
এসব নিয়েই মানুষের জীবন!
জ্বি। আপনার কথা সম্পূর্ণ ঠিক!
চাচা!কেন জানি আপনার জীবন কাহিনী শুনতে আমার খুব ইচ্ছে করছে। শোনাবেন কি আপনার জীবনকাহিনী?
'হ্যাঁ' বলে করিম সাহেব একটু সহজ হয়ে নড়েচড়ে বসলেন।তারপর বলতে শুরু করলেন তার বৃদ্ধাশ্রমে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার ইতিকথা--বাবা!আমি ডি.সি ছিলাম। আমার প্রচণ্ড দাপট ছিল। অনেক সন্মান ছিল। হাজারো মানুষের ভিড়ে সরগরম থাকত আমার অফিস। নিঃশ্বাসে সিংহের শক্তি অনুভব করতাম। আমার হাতের ইশারায় উঠাবসা করত হাজারো মানুষ। সামান্য অসন্মানে বাঘের মতো গর্জে উঠতাম। সবাই ভয়ে কাঁপত। আমি মনে মনে খুব আনন্দিত হতাম।
প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে ফাইভস্টার হোটেলে আমার দাওয়াত লেগেই থাকত। সরকারী গাড়ি-বাড়ি, টাকা-পয়সা,নিশ্ছিদ্র প্রহরা বেষ্টিত জীবনের বাইরে দু'মুঠো ভাতের জন্য পথের ধারে পড়ে থাকা মানুষগুলোর জন্য ভাবতে একটুও ইচ্ছে হত না। শহরের আবর্জনার সাথে বেড়ে উঠা এ মানুষগুলোর জীবনযাত্রা দেখতে দেখতে অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।
নিজের সন্তান দু'টোকে গ্রামের বাড়িতে পরিচয় করিয়ে দেইনি কখনো। উল্টো, পৈত্রিক ভিটে-মাটি বিক্রি করে সবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করি আমি। আমি হয়ে যাই ঢাকার অভিজাত পাড়ার বাসিন্দা!দেশের সর্বোচ্চ নামিদামি লোকদের পাড়ায় নিজেকে আবিষ্কার করতে পেরে আমি বড় গর্বিত! সম্পদের মোহে মৃত্যুভয় পালিয়ে যায় বহু আগেই।আমি একদিন মরে যাব,একথাটিও বেমালুম ভুলে যাই।
যাদের জন্য রাজধানীর বুকে সাজিয়েছি এ স্বপ্নমহল, এক সময় উচ্চশিক্ষার্থে তারা বিদেশ চলে গেল। একজন আমেরিকা। বিয়ে করে সেখানেই থেকে গেল। বড় ব্যস্ত জীবন ওদের। স্বামী-স্ত্রী দু'জনই চাকরিজীবী। এ ব্যস্ততম জীবন থেকে কয়েকটি দিন বের করে বাংলাদেশে আসার ফুসরত বিগত দশবছরেও হয়নি ওদের। ওদের কাছে।মাতৃভূমি বড় সেকেলে!ওরা বলে--দরিদ্রতম দেশের তালিকায় একেবারে নিম্নতম স্থানে স্বাধীন বাংলাদেশ। বড় পশ্চাদপদ এ দেশটি!! অর্ধাহারে, অনাহারে কাটানো কঙ্কালসার কতগুলো জীবন্ত মানুষের দেশ এটি!!!
এক সময় আমার স্ত্রী দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। মায়ের মৃত্যুসংবাদ শুনেও সন্তানদের দেশে আসার সুযোগ হয়নি। সামান্য সমবেদনাই ওদের জন্য যথেষ্ট। আমি একা হয়ে যাই। আমি অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী কিংবা রাজনৈতিক নেতাকেও লোমহর্ষভাবে মৃত্যু বরণ করতে দেখেছি।বিচারের রায় কেবলি নিভৃতে কেঁদেছে। আমার মতো একজন অসহায় মানুষকে যদি কেউ খুন করে চলে যায়, এতে কার কি আসে যায়? তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, বাড়িটা ভাড়া দিয়ে আমি বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা হয়ে যাব। বাকী জীবন নিঃসঙ্গতায় কাটিয়ে দিব। এটা একমাত্র পথ না হলেও শেষ পথ হিসেবে অনেক উত্তম মনে করলাম। বাড়ি ভাড়া দিয়েই আমার বৃদ্ধাশ্রমের ভাড়া আর খাওয়া খরচ মিলিয়ে কোনরকম জীবন কেটে যায়।
বৃদ্ধাশ্রমে আপনার জিবন কিভাবে কাটে?
কেমন আর কাটবে!এখানের সবাই বুড়া। সবাই জীবন থেকে ছিঁটকে পড়া মানুষ। এখানে আড্ডা হয় ঠিকই। কিন্তু এ আড্ডায় বেঁচে থাকার কোন গল্প নেই। নেই স্বপ্ন বুনে উজ্জীবিত হওয়ার কোন কল্পকাহিনী। নেই কোন খুশীর আমেজ। অন্যদের জীবনের লোমহর্ষক ও বড় নিদারুণ কাহিনী শুনে মনে হয়, আহ! এ যেন আমার জীবন কাহিনীকেও হার মানায়।এতদিন শুধু নিজের কাহিনী স্মরণ করে কাঁদতাম। এখন অন্যের কাহিনী শুনেও কান্না শেয়ার করে সমবেদনা প্রকাশ করি।
জীবনটাকে বড় খেয়ালিপনা ভেবে অনেক বড় ভুল করে ফেলছি। নিজের অন্ধ দৃষ্টিভঙ্গির দেয়ালের মাঝেই বার বার আবর্তিত হয়েছি। গা ভাসিয়ে দেওয়া জীবনের ঢেউয়ের তালে তালে পথের শেষে নোঙ্গর করতে গিয়ে দেখি আমি সুবিধাবন্চ্ঞিত অসহায়দের একজন! বৃদ্ধাশ্রমের চারদেয়াল আমার কাছে এখন জেলখানা মনে হয়। এ যেন নিজেই নিজেকে কোন এক শেষ ঠিকানার বাসিন্দা বানিয়ে ফেলেছি। মৃত্যু পথের যাত্রীদের এটি সর্বশেষ ইমিগ্রেশন। এখান থেকে ফিরে যাবার আর কোন পথ নেই। ফিরে গিয়েও লাভ নেই। নিয়তির বাধাঁ নিয়মের এটি শেষ স্টেশন। এইতো আর কয়েকশ ঘন্টা পরেই বিদায়ের পালা।
আপনি কি ছেলেদের কাছে গেছেন কখনো?
ইচ্ছা করলেই কি যাওয়া যায়?রিদয়ের সবটুকু ভালোবাসা ঢেলে দিয়ে সন্তানকে গড়েছেন যে জননী,সেই মৃত মাকে যখন শেষবারের মতো দেখে যাবার জন্য ওদের একটুও সময় হয়নি,সেখানে আমাকে নিয়ে যাওয়ার মতো সময় কি তাদের আছে?তাছাড়া লোকলজ্জার ভয়ে ছেলে আমাকে নিয়ে যাবার প্রস্তাব দিলেও বৌমায়ের গড়িমসি দেখে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। যে বৌমা শ্বশুরের সেবায় এগিয়ে আসত,সময়ের বিবর্তনে এখন আমি তার কাছে বড় অসন্মানের পাত্র হয়ে গেছি! আমার অর্জিত টাকায় উচ্চশিক্ষা গ্রহন করা সন্তানের স্ত্রীদের কাছে আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বোঝা!
আপনাকে দেখার জন্য কি কোনো আত্মীয়-স্বজন আশ্রমে আসে?
না। আমি এখন আর কারো আত্মীয় নই!একটি সময় ছিল,আত্মীয়-স্বজন আমার দরজায় লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকত। এখন আমি ওদের দরজায় গিয়ে সামান্যতম সৌজন্যতাবোধও পাইনা। সবাই ব্যস্ত। একটু আপ্যায়ন করার সময় নেই। বাসায় গেলে ওদের মলিন চেহারা দেখে মনে হয়, না যাওয়া-ই উত্তম। তাই ইচ্ছে করেই এখন আর কারো বাসায় যাই না। যেতে ইচ্ছে করে না। তারাও দেখতে আসার প্রয়োজন বোধ করে না।
আপনার কি গ্রামের বাড়িতে যাওয়া-আসা হয়?
সে পথ আমি নিজেই বন্ধ করে দিয়েছি অনেক আগেই।সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করার জন্য সবসময় ওদেরকে গ্রাম থেকে আলাদা করে রেখেছি। আশা ছিল,ওরা অনেক বড় বিদ্বান হবে।দেশ ও জাতির সেবা করবে। কিন্তু আজকের এ সময়ে এসে বুঝলাম, আমি বড্ড ভুল করছি। উচ্চশিক্ষার নামে আমার জীবনের সবটুকু আয় দিয়ে গড়া সন্তান দু'টোকে হাতছাড়া করে ফেলছি। এ যেন নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মেরেছি।
বাল্যবয়স থেকেই সন্তান দু'টো দেখে এসেছে--আমি সস্ত্রীক সন্তান নিয়ে ঢাকা শহরে বসবাস করছি। আমি যেমন আমার মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি কোন দায়িত্ববোধ দেখাইনি তেমনি ওরাও আজ আমার প্রতি হুবহু তাই করছে।এ সবই আমার শেখানো পারিবারিক সংস্কৃতি। এটা ওরা অনুসরণ করছে মাত্র। দোষ ওদের নয়,বরং আমারই!
আজ যদি আমার অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত কিংবা মাদরাসা পড়ুয়া একটি সন্তান থাকত, তাহলে নিশ্চিত, সে প্রতি সপ্তাহ বা মাসে আমাকে দেখতে আসত। জমিনে ফলানো সবজি বা অন্য কোন কিছু নিয়ে। মাটির মায়ায় কখনো কখনো নিজেই ছুটে যেতাম গ্রামের একটু নির্মল বাতাস পাওয়ার জন্য। মোয়াজ্জিনের আজান শুনে পুত্রবধূ গরম পানি এগিয়ে দিত ওজু করে নামাজ পড়ার জন্য। সূর্যোদয়ের পর গ্রামের লোকেরা দৌড়ে আসত,এক নজর দেখা বা একটু কথা বলার জন্য। জীবনের অনেক জমে থাকা দুঃখ। কিন্তু আজ বড় আফসোস হচ্ছে এ জন্য যে,যেটাকে বড় সেকেলে যুগ মনে করতাম, আজ এ সভ্যতায় দাঁড়িয়ে দেখেছি, হারানো সে পুরোনোর মাঝেই সব সুখ নিহিত। ইউরোপের চোখ ধাঁধানো জড়বাদী জীবনের অভিভূত হয়ে যে জীবন আমদানিতে আমরা মরিয়া হয়ে উঠেছি,আজ দেখছি,এসব অন্তঃসারশূন্য অশান্তিময় জীবন। এতে অনেক চাকচিক্য থাকলেও পারিবারিক শান্তি নেই। এ সভ্যতা নারীকে অধিকার আর পয়সার লোভ দেখিয়ে ঘরের বাইরে নিয়ে পরিবার পদ্ধতিকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। যার উদাহরণ আজকের এ বৃদ্ধাশ্রম ও তার বাশিন্দাদের জীবনের করুণ কাহিনী। এদের ভারী নিঃশ্বাসে যেন আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠে।
দেশীয় সংস্কৃতি, ধর্মের অনুশাসন,এসব সেকেলে মনে করে আধুনিকতার ছোঁয়ায় নিজের সন্তানদের ভাসিয়ে দিয়েছি পৃথিবীর নতুন সভ্যতা বিনির্মাণে অংশীদারিত্বের জন্য। কিন্তু আজ এ জীবন সায়াহ্নে এসে বুঝতে পেরেছি--একটি নতুন সভ্যতাকে পাওয়ার প্রতিযোগিতায় নিজেই 'জাহেলিয়্যাত'নামের এক অন্ধকার জীবনকে আহ্বান করেছি। যার বাস্তবতা এখন আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। নিজের প্রতি এ অপরাধের জন্য আমি নিজেই দায়ী। আমি এ অপরাধ শুধু আমার সাথে নয়,তিল তিল করে গড়া ঔরসজাত সন্তানের প্রতিও করছি। তাই এ অন্যায়ের তীব্রতা আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়। বিবেকের তাড়নায় আজ বড় ইচ্ছে করে বলতে--এমন নিঃসঙ্গতার বৃদ্ধাশ্রম জীবন নিয়ে আমি আর বাঁচতে চাই না।
অন্যদের মতো একদিন আমারো বিদায়ের ঘন্টা বেজে যাবে। সেদিন এ বিদায়ের সংবাদ আমার আত্মীয়-স্বজনদের কেউ হয়তো জানবেও না। স্বজন হারানোর বিয়োগ ব্যথা নিয়ে মুখে আঁচল দিয়ে আড়ালে কাঁদতে দেখা যাবে না প্রতিবেশীদের। শেষ বারের মতো লাশের উত্তরাধিকারের অধিকার নিয়ে স্বজনদের কেউ আসবে না আমাকে শেষ গোসল দিতে। খাটিয়ার উপর নতুন কাফনের কাপড়ে জড়ানো লাশ রেখে গ্রামের সর্বস্তরের মানুষদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে জানাযা পাওয়ার নসীব আমার মতো হতভাগ্যের কপালে আর নেই। কারণ,আমি যে এখন বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা!! বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন করিম সাহেব। নীরবে চেয়ে থাকা ছাড়া কাদের সাহেবের আর কিছুই করার ছিল না।

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা! এই ঘটনা লিখতে গিয়ে আমার রিদয় ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেছে। হাত দুর্বল হয়ে পড়েছে। টাইপের গতি কমে এসেছে।আমাকে ক্ষমা করবেন,আমি আর লিখতে পারছি না।একটু কষ্ট করে নিজে নিজে ভাবুন--বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা করিম সাহেবের জীবনে আজ কেন এই নিঃসঙ্গতা?কেন তার রিদয়ে জমে উঠেছে কষ্টের পাহাড়?কেন তিনি দুই সন্তানের জনক হয়েও আজ অসহায়?এখন নিজেরাই নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করুন এবং গভীর চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিন,জীবন কিভাবে পরিচালনা করতে হবে। আপনারা ভাবুন। আমিও ভাবছি!!!
(সূত্র : ইন্টারনেট)
54 Views
3 Likes
1 Comments
5.0 Rating
Rate this: