মিথ্যে ভালোবাসার গল্প

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
শহরের এক ব্যস্ত রাস্তা, যেখানে মানুষের ঢল থামতে জানে না। রোদ্দুরের তাপে ছায়া খুঁজে বেড়াচ্ছে যারা, তাদের ভিড়ে দাঁড়িয়ে ছিল অর্ণব। সাদা শার্ট, কালো প্যান্টে সে যেন একটু আলাদা, যেন কোন সিনেমার নায়ক। হাতের ফোনে বারবার মেসেজ চেক করছে, কিন্তু কোনো উত্তর নেই। হঠাৎ পেছন দিক থেকে চিৎকার—

“অর্ণব! ওরে অর্ণব!”

এক মিষ্টি কণ্ঠ, যা তাকে ছোটবেলার মতো স্মৃতির খোঁজ দিল। সে ফিরে তাকিয়ে চমকে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল পরমা, তার কলেজের সহপাঠী, আর সেই ছোটবেলার বন্ধুত্বের ছোঁয়া এখন যৌবনের রঙে রঙিন।

“তুই এখানে? কি করছিস?” অর্ণব কণ্ঠে অবাক ভাব।
পরমা হেসে বলল, “আসলে আমি নতুন চাকরিতে ঢুকেছি, আর অফিসটা এখানেই। আরে, দেখ, আমরা একসাথে কফি খেতে পারি না?”

অর্ণব কিছুক্ষণ চিন্তায় ডুবে রইল, তারপর হাঁ করে হেসে বলল, “ঠিক আছে, চল। এই গরমে কফি খাওয়াটা একটু সাহসের কাজ, কিন্তু তুই চাইলে।”

তারা একসাথে ছোট্ট একটি কফি শপে ঢুকে বসল। পরমার চোখে অদ্ভুত আলো, আর অর্ণব কিছুতেই চোখ সরাতে পারছে না।
“তুই কি এখনো সেই সময়ের কথা মনে আছে, যখন আমরা রাস্তায় বসে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করতাম?” পরমা হেসে বলল।
অর্ণব হালকা কাঁপানো হাসি দিয়ে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, মনে আছে। সেই দিনগুলো ছিল একদম আলাদা, নির্ভার।”

কিন্তু তাদের হাসির আড়ালে ছিল মনের অদৃশ্য অন্ধকার। অর্ণবের ফোন বারবার বাজছে, এবং বার্তা আসছে পরমার কাছ থেকে নয়। এটা ছিল ভিকাশ নামের এক বন্ধুর মেসেজ, যার সঙ্গে সে কিছুদিন ধরে ঘনিষ্ঠ।

পরমা গল্প চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল—“আসলে আমি কলেজ ছাড়ার পর অনেক কিছুই পাল্টে গেছে। আমি চেয়েছিলাম একদিন আবার তোর সঙ্গে দেখা করি।”
অর্ণব কষ্টের হাসি দিয়ে বলল, “পরমা, তুই কি জানিস? আমার জীবনে এক সময় তুই যে জায়গা নিয়েছিলে, তা কেউ নিতে পারবে না।”

পরমা একটু অবাক, তারপর মৃদু হাসি—“সত্যি? তবে দেখ, কিছু মানুষ আছে যারা মিথ্যা বলেই শান্তি পায়। তুই কি বুঝতে পারছিস আমি কেমন?”

অর্ণবের মনে হঠাৎ এক অদ্ভুত সংকেত জাগল। চোখের কোণে সে দেখল পরমা ফোনটা নিজের ব্যাগের ভেতর রেখে বারবার চেক করছে। অর্ণবের অভিজ্ঞতা বলে দিচ্ছিল, কিছু একটা ঠিক নেই।

“পরমা, তুই কি আমাকে সব বলছিস?” অর্ণব প্রশ্ন করল।
পরমার চোখে অদ্ভুত লাজ, কিন্তু সে দ্রুত কণ্ঠ নিচু করল—“অর্ণব, আমি সব বলছি না। কিছু কথা আছে, যা আমি এখনো বলতে পারছি না।”

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপচাপ রইল। মনের ভেতরে ঝড় উঠল।

পরমা ফোনে মেসেজ পেল, চুপচাপ ব্যাগ থেকে বের করে। অর্ণব দেখল, সেই মেসেজ আসছে অন্য কারো কাছ থেকে, এবং পরমা হাসছে।

“এটা কি?” অর্ণব ধীরে জিজ্ঞেস করল।
পরমা হালকা কাঁপানো কণ্ঠে বলল, “কিছু নয়, শুধু কাজের কিছু কথা।”

কিন্তু অর্ণব বিশ্বাস করতে পারল না। মনে হলো, সব কিছুই মিথ্যা। সেই মিষ্টি কথার পেছনে লুকানো ছিল ছদ্মবেশ।

পরমা হঠাৎ উঠে বলল, “চল, একটু ঘুরে আসি। এখানে বসে থাকা আমার ভালো লাগে না।”
তাদের হাঁটার পথে অর্ণব মনেই মনে সব কিছু হিসেব করছিল।
“পরমা, তুই কি সত্যি আমাকে ভালোবাসিস?”

পরমা কিছুটা থেমে, অল্পচোখ দিয়ে অর্ণবের দিকে তাকাল। হঠাৎ সে হেসে বলল, “অর্ণব, তুমি বড়ই সংবেদনশীল। সত্যি বলতে কি, আমি শুধু মজা করছি। আমাকে খুব সিরিয়াস নেও না।”

অর্ণবের গলা শুকনো হয়ে এলো। বুকের মধ্যে কোনো ব্যথা ছুঁয়ে গেল। তার চারপাশের রং ধূসর হয়ে এলো।
“তুই… মজা করছিস?” সে হালকা কণ্ঠে বলল।
পরমা হেসে, “হ্যাঁ, তুই খুব সহজে বিশ্বাস করেছিস। আসলে আমি কেবল আমার ইমেজ ঠিক রাখতে চেয়েছিলাম।”

অর্ণব আর কিছু বলল না। চোখের আর্দ্রতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়ে সে হঠাৎ কফি শপ থেকে বের হয়ে গেল।
রাস্তা ভরা মানুষ, কিন্তু তার চারপাশে যেন শুন্যতা। সে হেঁটে যাচ্ছিল, মনে হতো প্রতিটা পদক্ষেপের সঙ্গে তার বিশ্বাসের ধ্বংসাস্তি চলছে।

সন্ধ্যা নেমে এল। শহরের লাইটগুলো জ্বলছে, মানুষ হাসছে, কিন্তু অর্ণবের মনে শুধু একটাই ভাবনা—মিথ্যা ভালোবাসা।

তিনি বুঝতে পারলেন, কখনো কখনো মানুষ যা বলে, তা শুধু নিজের স্বার্থের জন্য। মিথ্যে ভালোবাসা মানুষকে সবচেয়ে ব্যথিত করে। অর্ণব জানত, এই ব্যথা সময়ের সঙ্গে সাথে ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু তার মনের ভেতরে সেই মিথ্যার ছাপ চিরকাল থাকবে।

সে একা হেঁটে চলল, শহরের আলো আর ছায়ার মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছিল, যেন কোনো গল্পের নায়ক, যে কখনো নিজের গল্পের হিরো হতে পারল না।


সমাপ্ত................................
59 Views
2 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: