আমাদের আমতলা

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তের এক অজপাড়া গ্রাম— নাম তার আমতলা। নামের উৎস গ্রামে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকশো বছরের পুরনো আমগাছ। সেই গাছটিকে ঘিরেই গ্রামের হাট, মেলা, আড্ডা— সব আয়োজন হয়। গ্রামের লোকজন বলে, “আমতলা ছাড়া আমাদের গ্রাম কল্পনাই করা যায় না।”

আমতলা গ্রাম শান্ত-স্নিগ্ধ। কাঁচা রাস্তার দুই ধারে ধানখেত, পুকুর, তালগাছ, আর বটতলায় বসে থাকা বুড়োদের আড্ডা। মানুষজন পরস্পরের দুঃখ-সুখ ভাগাভাগি করে নেয়, কেউ অভাবে পড়লে অন্যের বাড়ি থেকে চাল-ডাল পৌঁছে যায়। এই ঐক্যই গ্রামটাকে আলাদা করে তুলেছে।

গ্রামের কেন্দ্রবিন্দু হলো আমতলা স্কুল। কাঁচা টিনশেড ঘরে পড়াশোনা হয়, কিন্তু শিক্ষক মহব্বত আলী স্যার প্রাণ দিয়ে পড়ান। তিনি সবসময় বলেন—
“আমাদের আমতলার ছেলেমেয়েরাও একদিন বড় হয়ে মানুষ হবে, শহরের কারো চেয়ে কম নয়।”

গ্রামের গর্ব হলো নদীভাঙা মোক্তার আলী। নিজের জমি হারিয়ে এখন ভ্যান চালায়, কিন্তু তবুও কখনো মুখে দুঃখের কথা আনে না। সে বলে—
“আমতলার মাটিতেই আমার সুখ। নদী যদি ভাঙে, তাও তো এই মাটিই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।”

তবে আমতলার সবকিছু এত মসৃণ ছিল না। কিছুদিন হলো গ্রামে এক নতুন রাস্তা হওয়ার কথা উঠেছে। রাস্তা হবে ভালো, কিন্তু সেটা হলে গ্রাম ছাড়িয়ে যাবে বাজারের দখল। আমতলার মানুষ তখন দুই ভাগে বিভক্ত হলো।
একপক্ষ বলল—
“রাস্তা হলে আমাদের উন্নতি হবে, কাজের সুযোগ বাড়বে।”
অন্যপক্ষ বলল—
“রাস্তা হলে বাইরের লোক এসে আমাদের শান্তি নষ্ট করবে, জমি হারাবো।”

গ্রামে শুরু হলো উত্তেজনা। একসময় ঝগড়া পর্যন্ত গড়াল।
কিন্তু তখনই গ্রামে দাঁড়িয়ে গেলেন প্রবীণ হাশেম মোল্লা। সাদা দাড়ি, লাঠি হাতে তিনি বললেন—
“আমতলা আমাদের ঘর। ঘরের ভেতরে ঝগড়া করলে ঘরই ভেঙে যায়। আমরা যদি এক হয়ে না থাকি, তবে রাস্তা হোক বা না হোক, আমরা টিকে থাকতে পারবো না।”

তার কথায় গ্রাম যেন থমকে গেল। সবাই বুঝল, ঐক্যের চেয়ে বড় কিছু নেই।
শেষমেশ সিদ্ধান্ত হলো— রাস্তা হবে, তবে গ্রামের স্কুল, মাঠ, হাট— সবকিছু আগের মতোই রক্ষা করা হবে।

রাস্তা হলো, আমতলায় বাজার জমল, ছেলেমেয়েরা শহরে পড়তে গেল। কিন্তু আজও গ্রামের মানুষ যখন বিকেলে আমতলার পুরনো আমগাছের নিচে বসে, তখন বলে—
“আমাদের আমতলা শুধু একটা গ্রাম নয়, এটা আমাদের শেকড়।”


*******

গল্পটি কাল্পনিক। ☺️☺️
54 Views
1 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: