তবুও আমি তোমাতেই

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
ঢাকার এক প্রান্তে পুরনো ধাঁচের ভাড়া বাসায় থাকে অনিরুদ্ধ। বয়স মাত্র বাইশ। ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি সাহিত্যে পড়ছে। জীবনের ভেতরে অজস্র স্বপ্ন, অথচ চারপাশের দারিদ্র্য তাকে প্রতিনিয়ত আঘাত করে যায়। বাবা নেই বহু বছর হলো, মায়ের সেলাই মেশিনের শব্দই সংসারের ভরসা। তবুও ছেলেটা পড়াশোনা ছাড়েনি, লড়াই করছে প্রতিদিন।

জীবনে প্রথমবারের মতো প্রেমে পড়া অনিরুদ্ধের কাছে যেন অন্য এক জগৎ। সেই প্রেমের নাম সুবর্ণা।
সুবর্ণা ধনী পরিবারের মেয়ে। বংশের ঐতিহ্য, আলিশান বাড়ি, গাড়ি, চাকচিক্য— সবকিছুতেই তার চারপাশ ঝলমল করে। কিন্তু সুবর্ণার মনটা একেবারেই আলাদা। সে ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতায় ভুগে। বাবা সবসময় ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত, মা সমাজের পার্টি, গেটটুগেদার আর ক্লাবেই মশগুল। সুবর্ণার দিকে কেউ কখনো মন দিয়ে তাকায় না।

এই শূন্যতার ভেতরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে দেখা হয়েছিল তাদের। অনিরুদ্ধের হাতে একখানা মোটা ইংরেজি উপন্যাস, চেহারায় অগোছালো কিন্তু ভেতরে গভীর মনোযোগ। সুবর্ণা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিল। অনিরুদ্ধের চোখের চাহনিতে এক অদ্ভুত রকম মমতা আর তীব্র কষ্ট জমে ছিল। সেই কষ্টমাখা চোখেই হয়তো সুবর্ণা নিজের নিঃসঙ্গতার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছিল।

সেদিনই দু’জনের প্রথম কথা।
তারপর থেকে একে অপরের মধ্যে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিতে লাগল ভালোবাসা।

অনিরুদ্ধ সবসময় সুবর্ণাকে তার সহজ-সরল কথায় মুগ্ধ করত। আর সুবর্ণা অনিরুদ্ধের স্বপ্নবাজ চেহারায় ভরসা পেত। ধনী-গরিবের ফারাক যেন তাদের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

কিন্তু ভালোবাসা যতই গভীর হচ্ছিল, ততই চারপাশের বাস্তবতা তাদের ঘিরে ধরছিল এক অদৃশ্য শিকলের মতো।



সুবর্ণার পরিবার কিছুই জানত না। তবুও ভিতরে ভিতরে অনিরুদ্ধ ভয় পেত। অনেকবার সে চেয়েছিল সুবর্ণাকে দূরে সরিয়ে দিতে, বলত—
“তুমি অন্যরকম জগৎ থেকে এসেছো সুবর্ণা। আমি তোমার জন্য নই।”

কিন্তু সুবর্ণা একরাশ জেদ নিয়ে বলত—
“ভালোবাসার কি কোনো শ্রেণি আছে অনি? যদি থাকে, তবে আমি সেই শ্রেণি ভেঙে তোমাকেই চাইবো। তুমি ছাড়া আমার জীবন অসম্পূর্ণ।”

এই কথাগুলো শুনলেই অনিরুদ্ধের বুক কেঁপে উঠত। যেন এক জীবনের শক্তি ফিরে পেত।

তবুও তার মনের গভীরে ভয় লুকিয়ে থাকত।



সময় কেটে যাচ্ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন প্রায় শেষের পথে। সুবর্ণা তখনও অদম্য ভালোবাসায় অনিরুদ্ধের হাত ধরে রেখেছে।
কিন্তু হঠাৎ করেই ঝড় নেমে এল।

এক বিকেলে সুবর্ণার মা হঠাৎ অনিরুদ্ধকে তাদের গাড়ি থেকে নামতে দেখে ফেললেন। শহরের ব্যস্ত সড়কে দাঁড়িয়ে অনিরুদ্ধ সুবর্ণার সাথে হেসে কথা বলছিল। সেই দৃশ্য তার মায়ের চোখ এড়াল না।

সেদিন রাতেই সুবর্ণার ঘরে এক তীব্র ঝড় বয়ে গেল।
“তুমি কি ভেবেছো আমরা কিছুই জানবো না? ওই ছেলেটা কে? গরিবের ছেলে? সে কি তোমার যোগ্য?”

সুবর্ণা প্রথমবার সাহস করে বলে ফেলল—
“মা, আমি তাকে ভালোবাসি।”

এক চড়ের শব্দে যেন পুরো পৃথিবী কেঁপে উঠল।
সুবর্ণার মা চিৎকার করে বললেন—
“এই সম্পর্কের কথা ভুলেও ভেবো না। তোমার বিয়ের জন্য তোমার বাবার ব্যবসার পার্টনারের ছেলেকে ঠিক করা হয়েছে। আগামী মাসেই বাগদান।”

সেই রাতে সুবর্ণা সারারাত কেঁদেছিল। আর অন্য প্রান্তে অনিরুদ্ধ অনুধাবন করেছিল, ঝড় এবার সত্যিই তাদের জীবনে নেমে এসেছে।



পরদিন সুবর্ণা অনিরুদ্ধকে জানাল সবকিছু। অনিরুদ্ধ স্তব্ধ হয়ে গেল। কিছু বলার মতো শব্দ খুঁজে পেল না।
শেষমেশ শুধু বলল—
“সুবর্ণা, তুমি যদি সুখী হও, আমি চুপচাপ সরে যাবো।”

সুবর্ণা কেঁদে ফেলল—
“না অনি, আমি তোমাকে ছাড়া কিছুই চাই না। তুমি যদি থাকো তবে সব ঝড় আমি সামলাবো।”

অনিরুদ্ধের বুক কেঁপে উঠল। সে জানত, ধনী পরিবার কোনোদিনও তাদের সম্পর্ক মেনে নেবে না। কিন্তু তবুও সুবর্ণার দৃঢ় চোখের দিকে তাকিয়ে সে আবারও বিশ্বাস করতে চাইলো ভালোবাসায়।



দিন গড়াতে থাকল। সুবর্ণার বাড়িতে বাগদানের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। আর সেই সাথে শুরু হলো সুবর্ণার বিদ্রোহ।
সে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিল, কারো সাথে কথা বলল না। একদিন সে পালিয়ে এসে অনিরুদ্ধের ছোট্ট ভাড়া বাসায় দাঁড়াল ভিজে কাপড়ে।
বৃষ্টি ঝরছিল ঝমঝমিয়ে।

“আমি আর পারছি না অনি... আমাকে বাঁচাও...”

অনিরুদ্ধ প্রথমবার অনুভব করল, ভালোবাসা আসলে কোনো যুক্তি মানে না। সে সুবর্ণাকে জড়িয়ে ধরে বলল—
“তাহলে এসো, যেখানেই যাই না কেন, একসাথে থাকবো।”

কিন্তু পৃথিবী কি এত সহজে ভালোবাসাদের ছাড় দেয়?



দু’জনের পালানো সফল হলো না। কিছুদিন পরই সুবর্ণাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। অনিরুদ্ধকে হুমকি দেওয়া হলো—
“তুমি আর যদি ওর কাছে আসো, তোমার জীবন শেষ করে দেব।”

সেই দিন থেকে অনিরুদ্ধ আর সুবর্ণার সাথে দেখা করতে পারল না। তবুও তাদের প্রেম থেমে থাকল না। গোপনে ফোনে কথা হতো, রাতে জানালার নিচে দাঁড়িয়ে চিঠি দিত অনিরুদ্ধ।



অবশেষে এল সেই দিন। সুবর্ণার বিয়ে। বাড়ি সাজানো হলো আলোকসজ্জায়, অতিথির ভিড়ে মুখরিত। সুবর্ণা লাল শাড়িতে বসেছিল অচেনা এক পুতুল হয়ে। চোখের কোণে অশ্রু জমে উঠেছিল।

আর অন্যদিকে, অনিরুদ্ধ একা বসেছিল নদীর ধারে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছিল, কিন্তু তার ভেতরে ছিল অন্ধকার।
সে ভাবল—
“সব হারিয়েও আমি কেনো এখনো শুধু তোমাকেই চাইছি সুবর্ণা? কেনো তোমার চোখের জল আমি মুছতে পারছি না?”



বিয়ের পর সুবর্ণা চলে গেল বিদেশে, স্বামীর সাথে। আর অনিরুদ্ধ থেকে গেলো একা, তার ভাঙা জীবনের ভেতর। সে চাকরি করতে শুরু করল, মায়ের চিকিৎসার খরচ সামলাতে লাগল।

কিন্তু হৃদয়ের ভেতর থেকে গেল একটাই সত্য—
“তবুও আমি তোমাতেই...”



বছরের পর বছর কেটে গেল। একদিন হঠাৎ করেই অনিরুদ্ধ ডাক পেল সুবর্ণার কাছ থেকে।
সে দেশে ফিরেছে। তার বিয়ে টেকেনি। সংসার ভেঙে গেছে।

সেদিন সন্ধ্যায় তারা দেখা করল পুরনো লাইব্রেরির আঙিনায়।
সুবর্ণার চোখে তখনো সেই চেনা ভালোবাসা।
কিন্তু অনিরুদ্ধের চোখে ক্লান্তি, অভিজ্ঞতার রেখা।

সুবর্ণা কাঁপা গলায় বলল—
“অনি... আমি এখনো তোমাকেই চাই। তুমি কি আমাকে ফিরিয়ে নেবে?”

অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর মৃদু হেসে বলল—
“তুমি কি জানো সুবর্ণা, আমি আজও প্রতিদিন তোমার নামেই বেঁচে আছি? যত কষ্টই হোক, আমি তোমাকেই ভালোবেসেছি। তবুও আমি তোমাতেই...”

সেই মুহূর্তে তারা দু’জন একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। পৃথিবীর সবকিছু ভেঙে গেলেও, ভালোবাসা আবারও ফিরে এল তাদের জীবনে।


---

সমাপ্তি

মানুষের জীবন সবসময় মসৃণ পথে চলে না। ভালোবাসা মাঝে মাঝে কষ্টের সাগরে ডুবিয়ে দেয়, আবার সেই কষ্টই ভালোবাসাকে অমর করে তোলে।
অনিরুদ্ধ আর সুবর্ণার গল্প তাই শেষ পর্যন্ত শুধু একটাই প্রমাণ রাখে—

“তবুও আমি তোমাতেই...”
44 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: