দেনা পাওনা

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
(১)

ঢাকার ব্যস্ততম মোড়গুলোর একটিতে দাঁড়িয়ে আছে রাফি। পেছনে মেট্রো রেলের শব্দ, সামনে উবারের হর্ন, মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে বিমান—কিন্তু তার মাথায় এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে একটা পুরনো কাগজের খাম। সেই খামে ছিল একটা ছোট্ট নোট, ছিঁড়ে যাওয়া পুরনো এক চিঠির অংশবিশেষ। সেখানে শুধু তিনটি লাইন—

“দেনা-পাওনার হিসেব সবাই চায়। কিন্তু কেউ জানে না—ভালোবাসার দেনা কখনো শোধ হয় না।
যদি সাহস থাকে, চলে এসো পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজারে।
আমি অপেক্ষা করবো… শেষবারের মতো। – সোহা।”

এই শহরে সোহা নামটা রাফির কাছে যেন এক অমর অভিমান। চার বছর আগে সেই মেয়েটাই তার জীবনের সমস্ত খোলনলচে পাল্টে দিয়েছিল। সোহা ছিল ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকা এসে পড়া এক স্বপ্নভরা মেয়ে, আর রাফি ছিল তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসমেট—কিছুটা চঞ্চল, কিছুটা নির্লিপ্ত।

প্রথম দেখা হয়েছিল ‘ফাইন্যান্স থ্রি-ওয়ান’ ক্লাসে। সোহা প্রথম বেঞ্চে বসতো, সব লেকচার নোট করতো, আর রাফি তার ঠিক দুই সারি পেছনে বসে থাকতো, মোবাইলে গেম খেলত। কিন্তু একদিনের ঘটনা সব কিছু বদলে দেয়।

একটা গ্রুপ প্রেজেন্টেশনে সোহা ভুল করে বসে। গলা কাঁপতে থাকে, লাইন ভুলে যায়। সবার সামনে কাঁদতে শুরু করে। তখনই রাফি এগিয়ে যায়, তার পাশ থেকে প্রেজেন্টেশনটা ধরে পড়ে দেয়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

বন্ধুত্ব, ভরসা, অনুভব—সব কিছু মিলিয়ে যেন এক অপূর্ণ প্রেমের গল্প শুরু হয়। কিন্তু কোথাও যেন ছিল এক অদৃশ্য দেয়াল। সোহা কখনো তার পরিবার নিয়ে বেশি কিছু বলত না। শুধু একবার বলেছিল, “আমার জীবনের দেনা-পাওনা অনেক বড়। তুমি যদি জানো, হয়তো আমায় ছেড়ে চলে যাবে।”

রাফি তেমন কিছু বোঝেনি। সে শুধু বলেছিল, “আমি তোমার পাশে থাকতে এসেছি, হিসেব কষতে নয়।”

কিন্তু হিসেব ঠিকই এল। স্নাতক শেষের ঠিক এক সপ্তাহ আগে, সোহা হঠাৎ উধাও। মোবাইল বন্ধ, বাসা ফাঁকা। সে শুধু রেখে যায় একটা চিঠি—

“আমার জীবনের ঋণ তুমি শোধ করতে পারবে না। তাই পালিয়ে গেলাম। ভালো থেকো।”

চার বছর কেটে গেছে। রাফি এখন কর্পোরেট জগতে ভালো চাকরি করে। গুলশানের একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মার্কেটিং হেড। কিন্তু প্রতিদিন সে একই খালি ভাবনায় ডুবে থাকে—কোথায় গেল সোহা? কেন এমন করল?

আর আজ, হঠাৎ করে সেই চিঠির খণ্ডাংশ এল তার অফিসের ঠিকানায়। হাতে লেখা খামে কোনো প্রেরকের নাম নেই। কেবল সেই পুরোনো কলমের অক্ষরে সোহার লেখা।

রাফি আর দেরি করে না। রাত আটটা বাজে যখন সে পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজারে পৌঁছায়। চারপাশে ঘনবসতি, পুরোনো দালান, মাথার উপরে শুকানো কাপড়ের সারি। ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় সেই পুরোনো বাড়ির দিকে যেটা চিঠিতে উল্লেখ ছিল।

একতলা সাদা রঙের একটা বাড়ি। দরজাটা খোলা। ভেতরে পা রেখেই যেন এক অন্য সময়ে চলে যায় রাফি। চারপাশে পুরোনো ছবি, মলিন পর্দা, আর এক কোনায় একটি হারমোনিয়াম রাখা।

"রাফি?"—পেছন থেকে কাঁপা কণ্ঠে ডাকে কেউ।

সে ঘুরে দেখে—সামনে দাঁড়িয়ে সোহা। চুল ছোট করে কাটা, পাতলা শরীর, চোখে চশমা। কিন্তু সেই চোখদুটো ঠিক আগের মতো।

“তুমি এসেছো… বিশ্বাস করিনি,” সোহা বলে।

রাফি কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে বলে, “আমি তো কখনো যাইনি তোমার কাছ থেকে। তুমিই হারিয়ে গেছো।”

সোহা নিচু করে চোখ।

“এতদিন পরে, কেন?” রাফির প্রশ্ন।

সোহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তারপর বসতে বলে একটা পুরোনো কাঠের চেয়ারে।

“তোমাকে যে সব কিছু বলা হয়নি, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পাপ। আমি একটা ঋণের ভেতর জন্ম নিয়েছি রাফি। আমার বাবার আত্মহত্যার পর, আমাদের পরিবার দেউলিয়া হয়ে যায়। মা মানসিক ভারসাম্য হারান। আমি একাই সংসার চালাতাম। টিউশনি, অনলাইন কাজ, লুকিয়ে লুকিয়ে সব কিছু করেছি।

"কিন্তু এক সময় আমি ভেঙে পড়ি। একটা সময়... আমি বাধ্য হয়ে কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নেই।"

রাফি তাকিয়ে থাকে, শুনতে চায় বাকি কথাগুলো।

“আমি একজনের কাছে টাকা ধার নিই, অনেক টাকা। সেসব পরিশোধ করতে না পেরে... আমাকে মডেলিং করতে বলা হয়। একটা এজেন্সিতে কাজ করি। কিন্তু ওটা ছিল সামনের পর্দা। পেছনে চলতো আরেক খেলা। সেই জালে আমি আটকে পড়ি। পালাতে পারিনি। তোমাকে জানালে তুমি আমায় ঘৃণা করতে—এই ভয়েই চলে যাই।”

রাফির চোখে বিস্ময়, দুঃখ, আর ক্ষোভ একসাথে মিশে যায়। সে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার বুকের ভেতরটা যেন জ্বলে যাচ্ছে।

“তুমি জানো, আমি চার বছর ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি? আমি কী করে ভুলে যাই সেসব দিন?”

সোহা চুপ করে যায়। তারপর ধীরে ধীরে বলে, “আমি ফিরে আসিনি তোমার কাছে। এসেছি নিজেকে শেষবার ক্ষমা করার জন্য। আমার মা মারা গেছেন এক সপ্তাহ আগে। আমি এখন মুক্ত। এই বাড়িটা তার শেষ স্মৃতি।”

রাফি তার দিকে এগিয়ে আসে।

“তুমি এখন কী চাও, সোহা?”

সে বলে, “আমি চায় না তুমি আমাকে নিয়ে আবার ভাবো। আমি চাই, তুমি নিজের জীবনে ফিরে যাও। আমাকে শুধু এই এক রাতের জন্য বন্ধু ভেবো—একটি শেষ রাত।”

রাফির চোখ ছলছল করে ওঠে।

“তুমি জানো না, ভালোবাসার দেনা আমি শোধ করতে চাইনি কখনো। আমি চেয়েছি, তুমি আমার পাওনায় থেকো।”

একটা দীর্ঘ নীরবতা এসে নামে। দুই পুরনো আত্মা একে অপরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে—কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো উত্তর নেই, শুধু এক অসীম অভিমান।

রাত গভীর হয়। শহরের আওয়াজ থেমে যায়। কিন্তু সেই পুরোনো বাড়িতে জ্বলতে থাকে একটি বাতি—দেনা-পাওনার সাক্ষী হয়ে।


______________


(২)


রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। পুরান ঢাকার পুরোনো বাড়িটায় বাতি জ্বলছে। শহরের কোলাহল থেমে গেছে অনেক আগেই। চারদিকে শুধু নিস্তব্ধতা, যেন বাতাসও চুপসে বসে আছে সেই বাড়ির বারান্দায়।

রাফি চুপচাপ বসে আছে সোহার সামনে। দুই হাতে কপাল চেপে ধরেছে সে। অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে তার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। সোহা দাঁড়িয়ে জানালার গ্লাসে মুখ ঠেকিয়ে বাইরের অন্ধকার দেখছে। একটাও কথা বলছে না। এই নিরবতা একসময় গলার ভেতরে কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে।

“তুমি কি জানো, আমি তোমার খবর না পেয়ে প্রায় একবছর মানসিক চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলাম?”—হঠাৎ ভাঙা কণ্ঠে বলে রাফি।

সোহা চমকে ঘুরে তাকায়।

“একটা মানুষ হুট করে অদৃশ্য হয়ে গেলে, আর তার জায়গায় ফেলে যায় একটা চিঠি... সেটা শুধু কাগজ না, সেটা হলো বিষ। চার বছর ধরে আমি সেই বিষ নিয়ে বাঁচছি, সোহা।”

সোহা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু বলার ভাষা নেই তার।

“আমি জানতাম তুমি কষ্টে ছিলে। হয়তো তোমার জীবনে এমন কিছু ছিল যেটা তুমি গোপন করো। কিন্তু আমি তো তোমার পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম। তুমি সেই সুযোগটাই দিলে না!”

“তোমার ভালোবাসা পবিত্র ছিল, রাফি। আমি চাইনি সেই ভালোবাসাকে কলঙ্কিত করতে। আমি চেয়েছি তুমি নিজেকে গড়ে তুলো, আমার ছায়া ছাড়াই,”—বলতে বলতে চোখ নামিয়ে আনে সোহা।

রাফি উঠে দাঁড়ায়। জানালার পাশে গিয়ে তার পাশে দাঁড়ায়।

“তুমি জানো, ভালোবাসার একটা অদ্ভুত ব্যাপার কী?”

সোহা চুপ থাকে।

“এটা দেনা নয়, এটা পাওয়া নয়—এটা সবটুকুই দেওয়া। আমি চেয়েছিলাম আমার সবটুকু তোমাকে দিতে। তুমি তা গ্রহণ করো বা না করো, তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু তুমি তা থেকে পালিয়ে গিয়েছিলে।”

একটা দীর্ঘ নীরবতা নামে। তারপর হঠাৎ সোহা কাঁপা গলায় বলে, “তুমি কি আজও আমায় ঘৃণা করো, রাফি?”

রাফি তার চোখের দিকে তাকায়, গভীরভাবে। তারপর আস্তে মাথা নাড়ে।

“না। আমি আজও ভালোবাসি তোমায়। কিন্তু ভালোবাসা মানেই একসাথে থাকা নয়।”

সোহার চোখ ছলছল করে ওঠে।

“তবে কি আজও কোনো আশা নেই?”

“আছে। যদি তুমি নিজেকে ক্ষমা করো, যদি তুমি নিজেকে ভালোবাসো, যদি তুমি ভেবে দেখো—ভুল করে থাকলেও তুমি আজও মানুষ, এবং তুমি পরিবর্তন করতে পারো তোমার আগামীটা… তাহলে সবই সম্ভব।”

সোহা ভেঙে পড়ে। রাফির বুকের উপর মাথা রেখে কাঁদে। সেই কান্না শুধু অনুতাপের নয়, সেই কান্না মুক্তির।

পরদিন সকালে, তারা একসাথে পুরান ঢাকার গলির মধ্যে হাঁটছে। যেন বহু বছর পর দুটো হারানো ছায়া একে অপরকে খুঁজে পেয়েছে।

সোহা বলে, “আমি ঠিক করেছি এখানেই থেকে যাবো। এই পুরোনো বাড়িটা আমি নিজের মতো করে সাজাবো। হয়তো একটা ছোট্ট পাঠশালা খুলবো এখানে। মেয়েদের জন্য—যাদের জীবনেও ছিল অন্ধকার, যাদের জীবনেও ছিল দেনা।”

রাফি তার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলে, “তুমি জানো, এটা তোমার নতুন শুরু। আমি যদি তোমার পাশে থাকতে পারি, সেটা হবে আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।”

সোহা থেমে যায়। চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “তাহলে আর পালিয়ে যাবো না। আসো, দুজন মিলে নতুন করে বাঁচি। যেখানে ভালোবাসা হবে ঋণ নয়, সম্মান।”

ঢাকার ব্যস্ত শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুইটি হৃদয় আবার এক হতে চায়। পাশে বয়ে যাচ্ছে রিকশা, পেছনে দোকানদার হাঁক দিচ্ছে, মাথার উপর দিয়ে মেট্রোরেল ছুটছে। কিন্তু এই দুইটা মানুষ এখন নতুন আলোয় রঙিন।

তাদের সম্পর্কের দেনা-পাওনা কেউ কষতে পারবে না। কারণ এখন তাদের মাঝে শুধু আছে—একটি নতুন সকাল, একটুকরো ক্ষমা, আর পূর্ণতায় মোড়া ভালোবাসা।


___________________






সমাপ্ত..........................................
50 Views
1 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: