সোহাগ জল

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
(১)


মাঘ মাসের শেষ সপ্তাহ। হিমেল হাওয়ার কাঁপুনি ধীরে ধীরে পাতাঝরা গাছের ডালে ডালে ছুঁয়ে বেড়াচ্ছে। বিকেলের আকাশে সূর্য লুকোচুরি খেলছে পাতলা মেঘের ফাঁকে, যেন আলো আর ছায়ার এমন মিলনের নামই বাংলাদেশ। গাজীপুরের চৌরাস্তা থেকে সাত কিলোমিটার ভেতরে, একটা গ্রাম-ছোঁয়া শহরতলী—পূর্ব আশুলিয়া। এখানেই পুরোনো এক দোতলা বাড়ি, লালচে ইটের দেয়ালে কালচে ছোপ, সবুজ জানালাগুলোর গায়ে ধুলোর স্তর—তবু একটা আত্মীয়তাবোধ ছড়িয়ে আছে। বাড়ির নাম ‘আলোর কুঁড়ি’। নামটা রেখেছিলেন রূপার বাবা।

রূপা এই বাড়িরই মেয়ে, বয়স ছাব্বিশ। আজ প্রায় পাঁচ বছর হলো তার বাবা—মোঃ হাশেম আলী—স্ট্রোক করে চলে গেছেন। বড় ভাই রাসেল ঢাকায় গার্মেন্টসে ম্যানেজার, স্ত্রী আর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে থাকেন মিরপুরে। রূপার জন্য ওখানে জায়গা নেই, মা-ই তার পুরো জগত। দু’জনের সংসার খুব বড় না হলেও, ভাত আর ডাল–এই দুটো সামলানোও এখন কষ্টের।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে রূপা মুগ্ধ চোখে দেখছে সামনের ধানখেত। বাতাসে ধানের ঘ্রাণ ছড়িয়ে আছে, মাঝে মাঝে শালিকেরা হুট করে উড়ে গিয়ে আবার ফিরে আসে। তার মা রান্নাঘরে পেঁয়াজ কাটছে, মাঝে মাঝে হেঁকে উঠছে—
— “রূপা, তেলটা শেষ হয়ে গেল রে!”
— “তেল তো গত সপ্তাহে শেষ হবার কথা ছিল, তখন আনোনি কেন?”
— “পয়সা ছিল না, তাই।”

এই উত্তর নতুন না, প্রায় প্রতিদিনই এমন হয়। এখন বাজারে এক লিটার তেল মানেই আশি টাকা। বাড়ির চারপাশে আমগাছ, পেয়ারা, আর একপাশে বাঁশঝাড়—তা দিয়েই শীত-গ্রীষ্ম কোনোভাবে পার হয়ে যায়।

রূপা এমএ পাস, বাংলা বিভাগে। ভালো রেজাল্ট করেছিল, কিন্তু চাকরির খবর তার কাছে এখন ঠিক গল্পের চরিত্র। কোচিংয়ে গিয়ে গায়ে গা লাগিয়ে বসা, স্যারদের ধমক খাওয়া—এসব আর ওর ভালো লাগে না। নিজের মতো পড়াশোনা করে আর বিকেলে গিয়ে কিছু বাচ্চাকে প্রাইভেট পড়ায়। সেটা দিয়েই দুই মায়ের ভাত চলে।

এই একঘেয়ে জীবনে একটাই আনন্দ—গ্রামের পাঠাগারটা। কেউ নাম দেয়নি ওটার, সবাই শুধু বলে “পুরোনো লাইব্রেরি।” একটা সময় সেখানে অনেক মানুষ আসত, এখন পাড়ার পাঁচ-ছয়জন বুড়ো ছাড়া আর কেউ যায় না। রূপা ওই লাইব্রেরির শান্ত ঘ্রাণ ভালোবাসে—পুরোনো বইয়ের গন্ধ, কাঠের মেঝে, টিনের চাল, আর নীরব দুপুর।

একদিন হঠাৎ শুনলো, আগের লাইব্রেরিয়ান চাচা—মোসলেম সাহেব—প্যারালাইসিসে পড়েছেন। তাঁর জায়গায় নতুন কেউ এসেছে। নাম—সোহান।

প্রথম দিনই রূপা ওকে দেখেছিল দূর থেকে। গায়ের রঙ ফর্সা নয়, মাঝারি গড়ন, কিন্তু চোখ দুটো ছিল অদ্ভুত। চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালে মনে হতো, লোকটা যেন শব্দ দিয়ে ছবি আঁকে। তার পরনের সাদা পাঞ্জাবি আর নীল জিন্স—একসঙ্গে মানায় না, কিন্তু সোহানের বেলায় লাগত ঠিক।

রূপা প্রথম দিন কথা বলেনি। কিন্তু পরের দিন একটা বই খুঁজতে গিয়ে তার মুখোমুখি হলো।

— “আপনি কি মহাশ্বেতা দেবীর 'অরণ্যের অধিকার' বইটা পেয়েছেন?”
— “এইমাত্র র‍্যাক নাম্বার ৬ থেকে সরালাম। আপনি যদি পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করেন, আমি নিজে খুঁজে দেই।”
— “আপনি নতুন এসেছেন, তাই না?”
— “জ্বি। আমি আসলে ঢাকায় থাকতাম, শিক্ষকতা করতাম। এখন কিছুদিন গ্রামের বাড়িতে। এখানেই দায়িত্বটা নিচ্ছি, যতদিন মোসলেম সাহেব ফিরে না আসেন।”

সোহানের গলায় শহরের ভদ্রতা ছিল, কিন্তু চোখে ছিল একরকম আত্মীয়তার দ্যুতি।

সেই শুরু। এরপর প্রতিদিন রূপা লাইব্রেরি যেত, আর একটু একটু করে দুজনের কথাবার্তা বাড়তে থাকল। মাঝে মাঝে বই নিয়েই, আবার কখনও শুধু হালকা কিছু।

— “আপনার প্রিয় কবি কে?”
— “জীবনানন্দ। তবে জসীম উদ্দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ এখনও মন ছুঁয়ে যায়।”
— “বাহ! আপনি কি লেখেন?”
— “লিখি, কিন্তু ছাপাই না। আমার মনে হয়, কিছু লেখা কেবল নিজের জন্যই হওয়া উচিত।”

রূপার বুকের ভিতরে এক অজানা সুর বাজতে শুরু করলো। এই মানুষটা অন্যরকম। কথা কম, কিন্তু গভীর। সোহান যখন বলতো, “চুপ থাকা মানেই যে দুর্বলতা তা কিন্তু নয়,” তখন রূপার মনে হতো, কেউ তার ভেতরের একান্ত কথাগুলো শুনে ফেলেছে।

রূপার মা ধীরে ধীরে লক্ষ করলো—মেয়ে আগের চাইতে হাসে বেশি। খেতে বসে কথা বলে। মাঝে মাঝে আয়নায় তাকিয়ে নিজের কপালে টিপ দিয়ে দেখে। মা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে, কিছু বলে না। কিন্তু একদিন হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসলো—

— “কোন ছেলের সঙ্গে দেখা করিস, রূপা?”
— “কী বলো মা! আমি... মানে এমন কিছু না।”
— “মা বলেই তো বলি। একজন পুরুষ যদি মেয়ের জীবনে ভালো আলো হয়ে আসে, তাতে দোষ নেই। কিন্তু বুঝে চলিস।”

সেই রাতে রূপা ঘুমাতে পারেনি। ডায়েরি খুলে সাদা পাতায় শুধু একটা লাইন লিখলো—
“সে কথা কয় না, কিন্তু আমার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পায়।”

দিন কেটে যাচ্ছিল, আর একটা অসম্ভব চাওয়া যেন জমতে লাগলো হৃদয়ের কোণায়। রূপার চোখ সোহানকে খুঁজে বেড়াত। এক বিকেলে, লাইব্রেরির পেছনের বাগানে হালকা আলোয় বসে ছিল দু’জন। কথা হচ্ছিল “নীল দরিয়া” উপন্যাস নিয়ে। হঠাৎ রূপা বলে—

— “আপনার চোখে কি আমার কথা কখনও পড়ে?”
সোহান থমকে যায়, তারপর হালকা হাসে—
— “তোমার চোখে অনেক কথা দেখি। কিন্তু আমি অক্ষর গুনে জীবন চলাতে পারি না।”
— “মানে?”
— “আমি বিয়ে করা মানুষ। ঢাকায় স্ত্রী আছে, সন্তান নেই। থাকি না ওদের সঙ্গে, সম্পর্কটাও কাগজে থাকে শুধু। তবু আমি এখনও বাঁধা।”

রূপার শরীর যেন ঝড়ের মুখে পড়ে যায়। মাথার ভেতর হঠাৎ শূন্যতা। সে কিছু বলতে পারে না, শুধু তাকিয়ে থাকে।

সেইদিনের পর রূপা আর লাইব্রেরিতে যায় না। এক সপ্তাহ কাটে। মা জিজ্ঞেস করে, রূপা বলে—"মন খারাপ, বইয়ের প্রতি আর আগ্রহ নেই।"

মাঘ মাসের শেষ বিকেল। গ্রামের রাস্তা দিয়ে একলা হেঁটে রূপা ফিরে আসে বাজার থেকে। হঠাৎ দেখে লাইব্রেরির সামনে সোহান দাঁড়িয়ে। তার হাতে একটা ছোট্ট খাম।
রূপার চোখে চোখ পড়ে যায়।
সোহান কাছে এসে বলে—
— “চিঠিটা রাখো। যদি মন চায়, পড়ো। না চাইলে ছিঁড়ে ফেলে দিও।”
রূপা কিছু বলে না। খামটা নেয়, ধীর পায়ে চলে যায়।

রাতের বেলা সে চিঠিটা খোলে।

"রূপা,

_তোমার নিঃশ্বাসে আমি যে শান্তির শব্দ শুনেছি, তা কোথাও পাইনি। আমি কখনও চাইনি তোমার হৃদয়ে জায়গা করে নিই, কিন্তু তবু তুমি আমাকে সেই জায়গা দিলে।

আমি জানি, আমি একজন ভাঙা মানুষ। তবু যদি কোনো এক বিকেলে এক কাপ চায়ের পাশে তুমি জায়গা রাখো—জানি, আমি আর কিচ্ছু চাইব না।

— সোহান”_



চিঠিটা পড়ে রূপা চুপ করে বসে থাকে অনেকক্ষণ। বাতাস জানালায় কাঁপে। দূর থেকে শীতের রাতের শব্দ আসে। আর তার বুকের ভেতরে একধরনের সোহাগ জমে, জল হয়ে।


________



(২)


রূপা চিঠিটা বন্ধ করে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। বাইরে তখন গভীর রাত, দূরের পুকুর থেকে ব্যাঙের ডাক ভেসে আসছে, আর মাঝে মাঝে কুয়াশার চাদর ভেদ করে রাতের বাতাস জানালার পর্দা নাড়িয়ে দিচ্ছে।

চিঠির প্রতিটা শব্দ গেঁথে গেছে বুকের গভীরে। এত সহজ, এত নরম ভাষায় কেউ কখনও তাকে কিছু বলেনি। অথচ এটাও সত্যি—চিঠির ভাষা যতই সোহাগমাখা হোক, এর বাস্তবতা কাঁটার মতো বিধে। একজন বিবাহিত পুরুষ… আর সে? একটি আটপৌরে মেয়ে, যার সংসার মানেই একটা বিধবা মা, পুরোনো বাড়ির ভাঙা টিন, আর রাতের খাবারে ডাল থাকলেও ডিম থাকে না।

তবু কিছু সম্পর্ক হয়, যাদের নাম দেওয়া যায় না—তাদের হয়তো ঠিকানা থাকে না, কিন্তু শেকড় থাকে।
সোহান তার জীবনে এমন এক নামহীন সম্পর্কের শেকড় গেড়ে ফেলেছে।

পরদিন সকালবেলা, মা বাজারে গেলে রূপা বারান্দায় বসে চিঠিটা আবার পড়ে। প্রথমবার পড়ার চেয়ে দ্বিতীয়বারে অনুভবটা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
হঠাৎ একটা সিদ্ধান্ত নেয় সে।
আজ সে লাইব্রেরিতে যাবে।


---

পাঠাগারে প্রবেশ করতেই একটা ঘন নীরবতা তার দিকে ধেয়ে আসে। ভেতরে তিন-চারজন বয়স্ক মানুষ পত্রিকা পড়ছে, কিন্তু সোহান নেই। রূপা বুকের ভেতরটা ধকধক করতে করতে কাউন্টারের দিকে এগোয়। ঠিক তখনই পিছনের দরজা দিয়ে সোহান ঢোকে।

চোখাচোখি হয়। রূপা প্রথমে চোখ ফিরিয়ে নেয়, কিন্তু সোহান এগিয়ে এসে খুব হালকা গলায় বলে—

— “চিঠিটা পড়েছ?”
— “পড়েছি।”
— “তুমি কিছু বলবে?”
— “বলার আছে অনেক কিছু, কিন্তু ভাষা নেই। তুমি আমার জীবনে এমন এক সময় এসেছ, যখন আমি ভালোবাসা খুঁজিনি—শুধু একটু বোঝাপড়ার আশায় বেঁচে ছিলাম।”

সোহান চুপ থাকে। তারপর ধীরে বলে—

— “রূপা, আমি জানি, আমি তোমাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারি না। আমার অতীত এখনো আমাকে ছাড়ে না। কিন্তু আমি যদি বলি, আমি সত্যিই তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি, তবে কি সেটা পাপ হবে?”
— “ভালোবাসা পাপ নয়, সোহান। পাপ হলো কাউকে নিয়ে স্বপ্ন দেখিয়ে হারিয়ে যাওয়া।”

সোহান দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে।
— “আমি হারাতে চাই না।”
— “তুমি চাইলেই সব হয় না। আমার মা আছেন, আমার বাস্তব আছে। তুমি চাইলে তোমার মতো শহরে ফিরে যেতে পারবে, আমি পারবো না। আমাকে তো এখানেই থেকে যেতে হবে—এই ভাঙা বাড়ি, এই কষ্ট, এই গ্রাম।”

সোহান আর কিছু বলেনি। সেদিন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে, তারা একসঙ্গে বসে ‘সুকান্ত’ পড়েছিল, কিন্তু কোনো কথা হয়নি আর।


---

দিন যায়।
মাঘ শেষ, ফাল্গুন আসে। গাছে গাছে শিমুল ফুটে ওঠে, অথচ রূপার চোখে বসন্ত নেই। একদিন চায়ের কাপ হাতে মা বলে বসে—

— “তোর মুখ শুকনা লাগছে রে, রূপা। কিছু বলবি?”
রূপা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে—
— “মা, একজন মানুষকে ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু ওর অতীত আছে, পরিবার আছে। আমি জানি না, এটা ঠিক কিনা।”
— “ভালোবাসা ঠিক-বেঠিক বুঝে আসে না, মা। কিন্তু তুই যদি জানিস তোর সুখ এতে নেই, তবে ছাড়তে শেখ।”

মায়ের চোখে কোনো দুঃখ নেই, বরং এক ধরনের কোমল দৃঢ়তা।
সেদিন রাতে রূপা চুপচাপ বসে সোহানকে আরেকটা চিঠি লেখে—

সোহান,

তোমার চিঠিটা আমি পড়েছি বারবার। আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো, আমিও সেটা অস্বীকার করি না। কিন্তু কোনো সম্পর্ক যদি নিজের মধ্যে দুঃখ বহন করে নিয়ে শুরু হয়, তবে তার শেষটা শান্তিতে হয় না। আমি চাই না তুমি তোমার নিজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করো।

_তোমার সঙ্গে কাটানো প্রতিটা বিকেল আমার কাছে ‘সোহাগ জল’ হয়ে থাকবে—নরম, স্বচ্ছ, কিন্তু ধরতে গেলেই ফসকে যায়।

তুমি ভালো থেকো।

— রূপা



চিঠিটা নিয়ে পরদিন লাইব্রেরি যায় রূপা। কাউন্টারের পাশে রেখে বলে—
— “সোহান এলে দিয়ে দিয়েন।”
লাইব্রেরির বুড়ো পিয়ন মাথা নাড়ে।
রূপা আর ফিরে তাকায় না।


---

তিন মাস কেটে গেছে।

ফাল্গুন পেরিয়ে বৈশাখ এসে পড়েছে। রূপা এখন গ্রামে একটা স্কুলে পড়ায়, চুক্তিভিত্তিক চাকরি। মাসে আট হাজার টাকা বেতন, কিন্তু তাতেই সে খুশি। মা এখন আগের চাইতে বেশি হাসে, আর রূপা মাঝেমাঝে বিকেলে বাগানে বসে কবিতা লেখে।

সোহানের আর কোনো খবর নেই। লাইব্রেরিতে যাওয়া বন্ধ সে সময়ই, কেউ জানে না সে এখন কোথায়। রূপা খোঁজও করেনি।

কিন্তু কোনো কোনো সম্পর্ক হারিয়েও হৃদয়ে রয়ে যায়—একটা ঠান্ডা জলের মতো, যা সময় হলে গায়ে ছুঁয়ে দেয়। সোহান এখন সেই রকমই। রূপা কোনো অভিমান পোষণ করে না, কোনো অভিযোগও নেই।

একদিন সন্ধ্যায় পোস্টম্যান আসে। চিঠি দেয়।

চিঠিটা খুলে রূপা অবাক হয়।

রূপা,

_তোমার চিঠি পেয়ে আমি ফিরে গিয়েছিলাম ঢাকায়। নিজের ভেতরটা পরিষ্কার করতে চেয়েছি, ভেবেছি অনেক। আমার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়েছি—কোনো যুদ্ধ ছাড়া, শুধুই বোঝাপড়ায়। কারণ আমাদের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই কেবল শূন্যতা ছিল। আমি জানি না, তুমিও এখনো আমাকে মনে রাখো কিনা।

_কিন্তু যদি রাখো, তাহলে আগামী শুক্রবার সকাল ৯টায় আমি তোমার বাড়ির সামনে দাঁড়াব। তুমি যদি মনে করো—এই মানুষটাকে দিয়ে সংসার করা সম্ভব, তাহলে তোমার মা যেন শুধু দরজাটা খুলে দেন।

আমি কিছু চাই না, শুধু একটা জানালার পাশে তোমার সঙ্গে বই পড়তে চাই।

— সোহান



রূপা চিঠিটা পড়ে মাথা নিচু করে বসে থাকে। তার কাঁধের ওপরে মায়ের হাত।
মা বলে—
— “কী বলেছে?”
রূপা কাঁপা কণ্ঠে বলে—
— “সে ফিরছে, মা।”
— “তাহলে তুই ঠিক কর, তোর সোহাগ জল কি এখন নদী হবে?”

রূপার চোখে জল আসে না, কিন্তু ঠোঁটে একটুখানি হাসি ফুটে ওঠে।


---

শুক্রবার।

ঘড়ির কাঁটা ৯টা ছুঁই ছুঁই। রূপার মা দরজার কপাট খুলে দাঁড়িয়ে আছেন। রূপা মায়ের পেছনে, বুক ধড়ফড় করছে। ঠিক ৯টায় বাইরের গেটের শব্দ হয়।

সাদা পাঞ্জাবি পরা এক মানুষ দাঁড়িয়ে।

তার চোখে আত্মবিশ্বাস, ঠোঁটে সংযত হাসি। সোহান।

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা রূপা প্রথমে কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে থাকে।

সোহান ধীরে কাছে আসে।
— “আমি এসেছি, রূপা। যদি আজও আমার মতো ভাঙা মানুষটাকে বিশ্বাস করতে পারো, তাহলে…”
রূপা থামিয়ে দেয়।
— “চুপ। আজ কিছু বলতে হবে না। এসো। মা অপেক্ষা করছে।”

মা দুজনকে ভেতরে নিয়ে যায়। চায়ের কাপের পাশে বসে রূপা দেখলো—সোহানের চোখে আর কোনো দ্বিধা নেই। যেন এই মানুষটিই তার চেনা বারান্দা, তার ধানখেতের বাতাস, তার কবিতার প্রথম লাইন।

শুধু একটি প্রেম নয়, একটি সাহসিকতা—একটি বিশ্বাস—“সোহাগ জল”।

এটা স্রেফ প্রেমের গল্প নয়,
এটা দুজন মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার গল্প।



___________________





সমাপ্ত..........................................
40 Views
2 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: