(১)
ঢাকার এক কোণে, পুরান ঢাকার অলিগলি পেরিয়ে একটা তিনতলা বাড়ি। বাইরের দিকটা সাদা, তবে রং চটে গেছে অনেকদিনের। জানালার গ্রিলগুলোতে কিছু জং ধরা দাগ, কিন্তু ভেতরে যেন অন্য এক জগত। বাড়িটার নিচতলায় যে পরিবারটা থাকে, তাদের নাম “রায়হান পরিবার”—সাধারণ মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবার, তিন বোন, এক ভাই, মা আর এক ক্যান্সার আক্রান্ত বাবা।
রায়হান, পরিবারটির বড় ছেলে, মাত্র ২৬ বছর বয়স। একটি বেসরকারি কোম্পানিতে জুনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে চাকরি করে। বাবা-মায়ের চিকিৎসা, তিন বোনের পড়াশোনা আর সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব তার কাঁধে। রায়হানকে দেখতে তেমন কিছুই নয়—সাধারণ গড়ন, ফর্সাও না, কালোও না, মাঝারি ধরনের চেহারা, তবে চোখ দুটো যেন অদ্ভুত গম্ভীর আর ক্লান্ত। এই ক্লান্তির পেছনে আছে রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে চিন্তা করা, কষ্ট চেপে রাখা আর নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেওয়ার ইতিহাস।
বড় বোন শিমু বিবাহযোগ্য, কিন্তু পাত্রের বাড়ি যখনই আসে, তারা ফেরত যায়—দুই কারণে। এক, পাত্রের মা সবসময় বলে, "এত রোগা মেয়ে, স্বাস্থ্য ভালো না"; দুই, পরিবারে উপার্জনক্ষম একমাত্র ব্যক্তি রায়হান। পাত্রপক্ষ ভয় পায় দায়িত্ব নিতে। মা, আমেনা বেগম, প্রতিবারই নিজেকে দোষারোপ করেন। আর বাবার শরীরে দিন দিন ক্যান্সার এমনভাবে ছড়াচ্ছে যে এখন ঘরের মাঝেই অক্সিজেন সিলিন্ডার রাখতে হয়।
রায়হান প্রতিদিন সকাল সাতটার দিকে বাসা থেকে বের হয়। অফিস শুরুর আগে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে ফজরটা সে বাসায় পড়েই বের হয়, আর তারপর বাসা থেকে সদরঘাট পর্যন্ত হেঁটেই যায়। এই হাঁটার মাঝে তার মাথায় ঘোরে—বাবার চিকিৎসার টাকা, বোনদের ভবিষ্যৎ, আর তার নিজের জীবনটা কোথায় যাচ্ছে। হঠাৎ একদিন, অফিস থেকে ফেরার পথে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে।
সেদিন মাঘ মাসের সন্ধ্যা, হালকা কুয়াশা। রায়হান সদরঘাট থেকে ফিরছিল রিকশায়। গলির মোড়ে একটা কালো বোরকা পরা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। মেয়েটি চোখ তুলে চাইল, এবং রায়হানের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই তার বুক কেঁপে উঠল। ঠিক যেন এই চাহনির মধ্যে কিছু ছিল—অপরাধবোধ? কান্না? একটা আত্মার মতো?
রিকশা পেরিয়ে গেল, কিন্তু মেয়েটার চাহনি রায়হানকে এমনভাবে কাঁপিয়ে দিল যে সে কিছুক্ষণ থেমে গেল। ফিরে তাকাতে গিয়েও তাকাল না—ভয় যেন ধরা পড়বে। পরদিন, সেই একই জায়গায় মেয়েটিকে আবার দেখল। এবারও মেয়েটি তাকালো।
তৃতীয় দিন সে নিজেই এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, "আপনি এখানে দাঁড়িয়ে থাকেন কেন?"
মেয়েটি নিচু গলায় বলল, “আপনি রায়হান ভাই?”
হতবাক রায়হান জিজ্ঞেস করল, “আপনি আমাকে চেনেন?”
মেয়েটি মাথা নিচু করে বলল, “হয়তো চিনি, হয়তো অনেক আগে থেকেই...”
রায়হান স্তব্ধ। মেয়েটি বলল, “আমি ফারিহা… নূরজাহান রোডের মাদ্রাসা থেকে পড়তাম… একবার আপনার মা আমাকে সাহায্য করেছিলেন, মনে আছে?”
রায়হান চমকে গেল। “তুমি সেই এতিম ফারিহা?”
মেয়েটি হেসে বলল, “হ্যাঁ ভাই, আমি সেই এতিম… এখন বাসা নেই, কোথাও থাকি না। বাঁচতে ইচ্ছে করে না... কিন্তু একদিন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করেছিল। সেই চাহনিটাই আমার শেষ ইচ্ছা ছিল... আমি জানতাম আপনি এখান দিয়েই যাবেন।”
রায়হান কিছু না বলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। এরপর প্রতিদিন তারা দেখা করতে থাকে। ফারিহা বাসা-বাড়িহীন, বেঁচে আছে মসজিদের পাশে একটা ঘরে থেকে। সে নরম স্বরে বলে, “আপনার মতো মানুষ আমার জীবনে আগে আসলে আমি হয়তো অন্যরকম জীবন পেতাম। আমাকে কেউ কখনো ভালোবাসেনি।”
রায়হান কাঁপা কণ্ঠে বলে, “ভালোবাসা... আমার জীবনে এই শব্দটারই অভাব… শুধু দায়িত্ব আর দুঃখ…”
এইভাবে দিন চলতে থাকে। ফারিহার মধ্যে রায়হান খুঁজে পায় শান্তি, আর ফারিহা রায়হানের মধ্যে খুঁজে পায় আশ্রয়। কিন্তু তারা জানে, এ সম্পর্ক সমাজ মানবে না। একদিক থেকে ছিন্নমূল এতিম মেয়ে, আরেকদিকে মধ্যবিত্ত পরিবারে সংসারের বোঝা বয়ে চলা যুবক।
একদিন ফারিহা বলে, “আপনি কি চান না আমি আপনার জীবনে থাকি?”
রায়হান চুপ করে থাকে।
ফারিহা বলে, “আপনি না বললেও আমি চলে যাব না। আমি আপনার অন্তরাত্মা হয়ে থাকতে চাই। কেউ জানবে না, কেউ দেখবে না, কিন্তু আপনি আমার সঙ্গে কথা বলতে পারবেন, কাঁদতে পারবেন, হাসতেও পারবেন... আপনি যদি একা হয়ে যান, আমি থাকব। ছায়ার মতো, চোখে দেখা যাবে না, কিন্তু আমি থাকব।”
রায়হান ভেতরে কেঁপে উঠে। সে জানে, এই মেয়ে সত্যিই ভেতর থেকে অনুভব করে, আর তার এতদিনের জমে থাকা কান্নাগুলো বের হতে চায়।
তারপর একদিন ফারিহা আর আসে না। রায়হান প্রতিদিন সেই মোড়ে যায়, দাঁড়িয়ে থাকে, অপেক্ষা করে। কোথাও খোঁজ পায় না। এক সপ্তাহের মাথায় সে মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে জানতে পারে—একটা মেয়ে কিছুদিন এখানে ছিল, নাম বলত না, শুধু বলত "আমি কারো অপেক্ষায় আছি"। কয়েকদিন আগে তার লাশ মিলেছে পাশের গলি থেকে—মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি, তবে চোখে ছিল গভীর শান্তির ছাপ।
রায়হান তার সব অনুভব এক মুহূর্তে হারিয়ে ফেলে, কিন্তু কিছু একটা জেগে ওঠে তার মধ্যে। একটা অদ্ভুত শান্তি, একটা অদৃশ্য উপস্থিতি। সে বুঝতে পারে, ফারিহা চলে গেলেও, তার আত্মা রায়হানের অন্তরে রয়ে গেছে।
সে এখন নিজের দায়িত্বগুলো আরেকটু বেশি ভালোবাসা দিয়ে পালন করতে শেখে। তিন বোনের পড়াশোনা, বাবার চিকিৎসা, মা’র কষ্ট—সব কিছুতেই যেন ফারিহার ছায়া খুঁজে পায় সে। রাতে বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করলে তার কানে একটাই আওয়াজ ভেসে আসে—“আমি তোমার অন্তরাত্মা…”
রায়হান জানে, এই সম্পর্ক সমাজ মানে না, কিন্তু তার মন জানে, এই অদেখা ভালোবাসা, এই অমূর্ত অনুভব—এই যে কোনো নাম নেই, অথচ আছে—এটাই তার জীবনের সবচেয়ে সত্যি পাওয়া।
_________
(২)
রায়হানের জীবনে ফারিহার মৃত্যুর পর থেকে যে অদৃশ্য নীরবতা নেমে এসেছিল, তার গভীরতা ছিল অপরিমেয়। নিঃসঙ্গতার ভেতরেও যেন একটা অদ্ভুত শক্তি খুঁজে পেয়েছিল সে — একরাশ সাহস, একরাশ নতুন স্বপ্নের উদয়।
রাতের আঁধারে নিজের ঘরে বসে রায়হান চোখ বুজে ভাবত, “ফারিহা আমার অন্তরাত্মা। সে চলে গেলেও তার আত্মার সঙ্গী আমি হয়ে থাকব। এখন আর একা নই।”
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে, গলির মোড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হল কেউ পিছনে হাঁটছে। পেছন ফিরে দেখল, কারো নেই। কেবল বাতাসের শব্দ। মনে হল, ফারিহা যেন তার পাশ দিয়ে চলে গেলো। সে একটু এগিয়ে গেল, বাতাসের মধ্যেই ভেসে আসল ফারিহার হালকা গলায় কণ্ঠস্বর, “আমি আছি, রায়হান ভাই, আমি তোমার সঙ্গে আছি।”
তার পর থেকে রায়হানের জীবনে অনেক পরিবর্তন আসতে শুরু করল। সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, জীবন শুধু বেদনা আর দায়িত্বের বোঝা নয়, জীবন হলো ভালবাসা, স্বপ্ন আর বিশ্বাসের এক অনন্য সমন্বয়।
একদিন অফিসের কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে, রায়হান রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার পথ আটকে দিল এক ছেলে। ছেলেটি ছিল প্রায় দশ-বারো বছর বয়সী, হাতে একটা ভাঙা বেলুন আর কিছু টাকা। সে রায়হানের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাইয়া, একটু টাকা দিতে পারবেন? আম্মু অসুস্থ, ওষুধ কিনতে হবে।”
রায়হানের চোখে কাঁদার ঝাপটা এলো। সে তার পকেট থেকে টাকাটা ছেলেটির হাতে ধরিয়ে দিল। সেই ছোট্ট মুহূর্তে সে বুঝতে পারল, নিজের জীবনে এমন অনেক ফারিহা আছে যারা সাহায্যের অপেক্ষায়। সে সিদ্ধান্ত নিল, তার জীবন শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যদের জন্যও বদলে যাবে।
রায়হান বাড়ি ফিরে মা আমেনার কাছে গেল। “মা, আমি এখন থেকে তোমাদের জন্য আর কষ্ট করব না, আমি অন্যদের জন্যও কাজ করব।” মা, যার চোখে তার ছেলেকে নিয়ে অনিশ্চয়তার ছায়া, এবার চোখে স্বপ্নের দীপ দেখতে লাগল।
রায়হান শুরু করল একটি ছোট ব্যবসা, যেটা তাকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন করে তোলে। পাশাপাশি বাড়ির মেয়েদের পড়াশোনার জন্য অতি প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করল। সে জানত, ফারিহা তার অন্তরাত্মা, তার মধ্যে থেকে বলছিল, “জীবনকে ভালোবাসো, ভালোবাসতে শিখো।”
তারপর এক সন্ধ্যায়, রায়হানের চোখে একবারে আবারও ফারিহার মুখ ভেসে উঠল। সে তখন বুঝতে পারল, জীবনের নানা বাঁধা আর কষ্ট পার হয়ে আসল সফলতা আসে অন্তরাত্মার সেই অনন্ত ভালোবাসা থেকে। সে বলল, “ফারিহা, তুমি আমার অন্তরাত্মা, তুমি আমার সাহারা। তোমার জন্য আমি এখন সত্যিকারের জীবন যাপন করব।”
রায়হানের জীবনে ধীরে ধীরে ফিরে আসল হাসি, স্বপ্ন, আর একটা নতুন আত্মবিশ্বাস। সমাজের চোখে হয়তো সে এক সাধারণ মধ্যবিত্ত ছেলে, কিন্তু তার অন্তরাত্মায় ছিল এক অসীম ভালোবাসার আলো, যা তাকে কখনো হারাতে দেয়নি।
মেয়েদের জন্য ভালো পাত্র খুঁজে পাওয়া গেল, বোনেরা সুন্দর করে পড়াশোনা শেষ করল। বাবা কিছুটা সুস্থ হলেন। আর রায়হান? সে নিজের জীবন আর দায়িত্বের মাঝে বেঁচে ছিল এক নতুন আলোয়, এক নতুন বিশ্বাসে, যে অন্তরাত্মার শক্তি অজস্র কষ্ট আর দুঃখের মাঝেও জীবনকে করে দেয় সুন্দর আর পূর্ণ।
গল্প শেষ হল একটি বাস্তব জীবনের স্বপ্ন আর আত্মার মিলনের মাধ্যমে, যেখানে অন্তরাত্মা শুধু এক অদৃশ্য শব্দ নয়, বরং জীবনের সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা আর সাহসের নাম।
______________
সমাপ্ত..........................................
অন্তরাত্মা
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
47
Views
2
Likes
0
Comments
5.0
Rating