তানভীর ও মিথিলা—এখন আর শুধু প্রেমিক-প্রেমিকা নয়, বরং জীবন সঙ্গী।
নতুন সংসার শুরু হলো ঢাকার উত্তরার এক ছোট ফ্ল্যাটে। জানালার পাশে বারান্দা, বারান্দার এক কোণে ছোট্ট গাছেদের সারি, আর ড্রইংরুমের এক কোনায় বইয়ের তাক—যেখানে প্রথমে সাজানো ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম আর হুমায়ূন আহমেদের বই, আর ধীরে ধীরে যোগ হতে লাগল নতুন বইয়ের ঘ্রাণ।
তানভীর প্রতিদিন অফিস শেষে মিথিলার বানানো চা খেত বারান্দায় বসে, আর মিথিলা তার কাঁধে মাথা রেখে বলত, “এই ছোট সংসারটাই যেন আমার গোটা জগৎ।”
তানভীর মুচকি হেসে বলত, “এই জগৎ আমি গুছিয়ে রাখব, যতদিন আমার নিশ্বাস আছে।”
তাদের জীবনে কোনো বিলাসিতা ছিল না, কিন্তু ছিল সময়, ভালোবাসা, আর স্নিগ্ধতা।
প্রথম কয়েক সপ্তাহ যেন কেটে গেল চোখের পলকে। দুজনে একসাথে বাজার করতে যেত, রান্নাঘরে একসাথে হেসে হেসে কাজ করত, সন্ধ্যায় গান চালিয়ে একে অপরের পাশে বসে থাকত।
তবে নতুন সংসারে যেমন সুখ থাকে, তেমনি আসে ছোট ছোট ভুল বোঝাবুঝি।
একদিন সকালে তানভীর অফিস যাওয়ার তাড়ায় নাস্তা না করেই বেরিয়ে গেল। মিথিলা তার পেছন পেছন বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে চুপচাপ রইল। রাতে ফিরে এসে যখন তানভীর দরজা খুলল, তখন মিথিলা বলল, “তুমি আমার কথা না শুনেই বেরিয়ে গেলে। আমি কি তোমার বাড়ির লোক না?”
তানভীর কাঁধে ব্যাগ রেখে বলল, “তুমি আমার সবকিছু। কিন্তু মাঝে মাঝে তাড়াহুড়োয় ভুল হয়ে যায়।”
মিথিলা বলল, “আমি কিচ্ছু চাই না। শুধু চাই, তোমার মনটাও যেন এ ফ্ল্যাটেই থাকে, অফিসের টেবিলে না পড়ে থাকে সবসময়।”
তানভীর ধরা গলায় বলল, “তোমার কথার ভেতরেই যে আমার ঘরবসতির মানে লুকিয়ে থাকে, সেটা আমি প্রতিদিন শিখি।”
এক চুমু, এক নিঃশ্বাস, এক ক্ষমাপ্রার্থনায় আবার ঠিক হয়ে যায় সব।
---
তাদের জীবনে ধীরে ধীরে রুটিন গড়ে উঠল। অফিস, সংসার, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, মাঝে মাঝে সিনেমা দেখা কিংবা বইমেলাতে যাওয়া।
একদিন মিথিলা তানভীরকে বলল, “তুমি কি জানো, আমি প্রায়ই ভাবি, তুমি না থাকলে আমি কী করতাম?”
তানভীর হাসল, “তুমি কি ভুলে গেছো, আমি তো ঠিক উল্টোটা ভাবি—তুমি না থাকলে আমি মানুষ হয়ে উঠতাম না।”
মিথিলা মুচকি হাসল, “তুমি আগে ছিলে একা, আর আমি ছিলাম অর্ধেক। এখন আমরা দুজনে মিলেই পুরো।”
তাদের সেই কথার মুহূর্তে যেন কাব্য ছিল।
---
তবে ঠিক এমনই এক নির্ঝঞ্ঝাট সকালে, অদ্ভুত এক চিঠি এসে পৌঁছাল।
চিঠিটা ছিল একেবারে অচেনা হাতে লেখা, হলুদ খামে। প্রেরকের নাম লেখা ছিল না। শুধু বাইরে লেখা—“জনাব তানভীর আহমেদ, খুব জরুরি।”
মিথিলা ডাকে সেটা পেয়ে এনে দিল তানভীরের হাতে। “তুমি আবার কার সঙ্গে এত গোপনে যোগাযোগ করো?”—সে হাসতে হাসতে বলল।
তানভীরও মজা করে বলল, “কোনো রহস্যময় ভক্ত নয় তো?”
কিন্তু চিঠি খুলে পড়া মাত্রই তাদের মুখের হাসি উবে গেল।
চিঠিতে লেখা—
“তোমার বাবার মৃত্যুর পেছনে যা বলা হয়েছিল, তা পুরোটা সত্যি নয়। রিয়াজ উদ্দিনের সঙ্গে তার যে দ্বন্দ্ব ছিল, সেটাই একসময় তাকে ভেঙে দিয়েছিল। কিছু অসমাপ্ত হিসেব আছে, যা হয়তো আজও জেগে আছে পুরান ঢাকার এক পুরনো ফাইলবক্সে—দেওয়ানবাগের ৭ নম্বর গলিতে, লাল টিনের ঘরের নিচে। খুঁজলে পাবে। বাকিটা তোমার সিদ্ধান্ত।”
তানভীর আর মিথিলা দুজনেই স্তব্ধ। তারা অনেক কষ্টে অতীতকে পেছনে রেখে সামনে এগোতে শিখেছিল। কিন্তু এই চিঠি আবার সেই অতীতকে তুলে আনল, এবং এবার যেন আরও গভীরভাবে।
তানভীর চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে বলল, “আমি ভেবেছিলাম বাবার সেই বিষণ্ণতা কেবল সময়ের ফল। কিন্তু যদি কোনো অন্যায় হয়ে থাকে, কোনো চাপা কিছু, সেটা জানার অধিকার কি আমার নেই?”
মিথিলা বলল, “তুমি যা বিশ্বাস করো, সেই পথেই হাঁটো। আমি আছি।”
---
পরদিন তারা গেল দেওয়ানবাগ, ৭ নম্বর গলি।
পুরান ঢাকার সেই পথের কাঁপানো রিকশা, রাস্তায় শুকাতে দেওয়া জামাকাপড়, আর গলির শেষে দাঁড়িয়ে থাকা লাল টিনের এক পুরনো দালান।
সেখানে একজন বুড়ো কেয়ারটেকার ছিল, নাম মতিউর মিয়া। সে বলল, “আপনি কি মুনির সাহেবের ছেলে?”
তানভীর চমকে গিয়ে বলল, “আপনি চিনেছেন?”
মতিউর মিয়া হেসে বলল, “আপনার বাবার সঙ্গে বহু বছর কাজ করেছি। উনি সবসময় বলতেন, আমার ছেলেকে একদিন সত্যি জানতে হবে।”
সে তাদের নিয়ে গেল এক ভাঙা ঘরের ভেতর, কাঠের আলমারির পেছনে লুকিয়ে থাকা এক ফাইলবক্সের কাছে।
“এটা উনি রেখে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ছেলেকে দিলে দিও একদিন,” মতিউর বলল।
তানভীর কাঁপা হাতে খুলল ফাইলবক্স।
তার ভেতরে ছিল পুরনো হিসেবের খাতা, কিছু কাগজ, আর একটা রেজিস্টার যেখানে লেখা ছিল—
“পার্টনারশিপ ভেঙে যাচ্ছে কারণ রিয়াজ আমাকে ঠকিয়েছে।”
আরেকটা পৃষ্ঠায় লেখা—
“কিন্তু পরে বুঝলাম, পুরো ব্যাপারটাই ছিল ভুল বোঝাবুঝি। আমি হিসাব ভুল পড়েছিলাম। নিজের অহংকারেই বন্ধু হারালাম।”
তানভীরের চোখে জল চলে এলো।
সে বলল, “আমার বাবা আর মিথিলার বাবা—তারা দুজনেই ভেবেছিলেন, অপরজন দোষী। কিন্তু ভুলটা ছিল হিসাবের, মন-মানসিকতার, না-জানার।”
মিথিলা হাত ধরল তার, বলল, “তাহলে এখন আমাদের একটাই দায়িত্ব—এই ভুল ইতিহাসকে ঠিক করা।”
তানভীর বলল, “আমাদের সন্তান যেন কোনোদিন ভুল ইতিহাস না শোনে, মিথিলা। আমি চাই তারা জানুক, তাদের দুই দাদা কেবল বন্ধু ছিলেন না, তারা একে অপরকে মিস করেছিলেন—তাও চিরতরে হারিয়ে ফেলার পর।”
---
ফেরার পথে রিকশায় মিথিলা মাথা রাখল তানভীরের কাঁধে। বাতাসে ছিল পুরান ঢাকার গন্ধ—পুরনো গল্পের মতো।
তানভীর বলল, “এই চিঠিটা কে পাঠিয়েছে জানি না। কিন্তু সে চাইছিল সত্য সামনে আসুক।”
মিথিলা বলল, “তবে হয়তো কেউ আমাদের দেখছে দূর থেকে—ভালোবাসা দিয়ে, অনুতাপ দিয়ে।”
তানভীর বলল, “তোমার মনে আছে, একদিন তুমি বলেছিলে—‘তুমি আমায় আরও ভালোবাসতে শেখাও?’ আজ আমি বলি, তুমি আমায় ভালো মানুষ হতে শেখাও, প্রতিদিন।”
মিথিলা চুপচাপ তার হাতে আঙুল গুঁজে দিল। বলল না কিছু, কিন্তু জানাল—ভালোবাসা কখনো গলা তুলে বলে না, সে শুধু পাশে থেকে প্রমাণ রাখে।
---
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে তানভীর তার বাবার সেই পুরনো চিঠিগুলো, ডায়েরি আর কাগজ গুছিয়ে একটা বাক্সে রাখল। তারপর বলল, “এই বাক্সটা আমরা রেখে দেব আমাদের আলমারির ওপরে। সময় হলে, আমাদের সন্তানকে দেখাবো। বলব—ভুল ইতিহাস না, সত্যিকারের ইতিহাসই গল্পের মতো সুন্দর।”
মিথিলা মাথা নেড়ে বলল, “তুমি গল্প বানাও, আর আমি তার পৃষ্ঠা সাজিয়ে রাখি।”
সেই রাতে, তারা একসাথে ছাদে গেল।
তারা চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। মিথিলা বলল, “তোমার সঙ্গে জীবন মানেই একেকটা নতুন চ্যাপ্টার—কখনো সুখের, কখনো রোমাঞ্চের, কখনো রহস্যের। কিন্তু প্রতিটা চ্যাপ্টারের শেষে লেখা থাকে—‘চলবে…’”
তানভীর বলল, “আর আমি চাই, শেষ অধ্যায়ে লেখা থাক– ‘তারা একসাথে ছিল, যতদিন গল্পের পাতাগুলো ওড়া বন্ধ করেনি।’”
তারা দুজন চুপ করে বসে রইল। নিঃশব্দে যেন ছাদে বয়ে চলছিল ভালোবাসার বাতাস, সেই বাতাস যেখানে চিঠি আসে, ভুল ঠিক হয়, আর ভালোবাসা আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়।
সমাপ্ত...........................................
দ্বিতীয় বসন্ত (অন্তিম পর্ব)
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
127
Views
12
Likes
0
Comments
5.0
Rating