দ্বিতীয় বসন্ত (৪)

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
লেকের সেই সন্ধ্যা থেকে দিন গড়াতে লাগল। সম্পর্কের ভিত আরও দৃঢ় হয়ে উঠল। তানভীর আর মিথিলা—এই দুই মানুষের মধ্যে একরকম অদৃশ্য টান, যার নাম ভালোবাসা, কিন্তু যার গভীরতা মাপা যাওয়া যায় না সহজে।

তানভীর একদিন অফিস শেষে মিথিলাকে বলল, “মা জানতে চায়, তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারে কি না। মা সবসময় তোমার কথা জানতে চায়, কিন্তু কিছু বলেনি আমায়, কারণ বুঝত—তোমার সম্মতি ছাড়া কিছু চাপিয়ে দিলে তুমি পিছিয়ে যেতে পারো।”

মিথিলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি রাজি আছি। আমিও চাই, যারা তোমার সবচেয়ে আপন, তারা আমাকে জানুক। আমি তো শুধু তোমার না, ওদের জীবনেও জড়াবো।”

তানভীর মৃদু হেসে বলল, “তোমার এমন কথাগুলো শুনলেই মনে হয়, তুমি কেবল একজন মানুষ না—তুমি শান্তির মতো।”

তিন দিন পরের শনিবার, মিথিলা গেল তানভীরের বাসায়। শহরের পশ্চিম দিকের সেই ছোট ফ্ল্যাট, পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি। তানভীরের মা দরজা খুলে হাসিমুখে বললেন, “এসো মা, অনেক গল্প জমে আছে তোমার সঙ্গে।”

মিথিলা প্রথমে একটু সংকোচে ছিল, কিন্তু তানভীরের মায়ের ব্যবহার ছিল এমন যে প্রথম আধা ঘণ্টার মধ্যেই তাদের আলাপ জমে উঠল। শাড়ির রং, প্রিয় রান্না, ছেলেকে নিয়ে অভিমান, এমনকি ছোটবেলার স্মৃতির কথাও উঠে এল। তানভীর মাঝখানে মাঝে মাঝে হেসে বলছিল, “মা, এতসব বলছো কেন?”

তানভীরের মা মিথিলার দিকে তাকিয়ে বললেন, “জানিস মা, আমার এই ছেলেটা কখনো নিজে থেকে কিছু বলতে চায় না। কিন্তু ওর চোখ দেখে আমি বুঝি, তোর নামের আলো কতটা ছড়িয়ে আছে ওর চোখে।”

মিথিলা চুপ করে গেল, হেসে তাকাল তানভীরের দিকে। যেন কোনো এক নীরব প্রতিক্রিয়া, যেখানে ভালোবাসার কোনও শব্দ নেই, কেবল অনুভব আছে।


---

এক সপ্তাহের মধ্যে তানভীরও গেল মিথিলার বাসায়। পুরান ঢাকার এক পুরোনো দোতলা বাড়ি, যেখানে দেয়ালে এখনও হাতের আঁকা ফুলের ডিজাইন আর কাঠের জানালায় নকশা করা গ্রিল।

মিথিলার মা, রুবিনা খাতুন, একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা। গম্ভীর মুখ, কিন্তু ভিতরে ভরা দরদ। প্রথম দেখাতেই তানভীর তার সামনে সংযত হয়ে গেল। সে বুঝল, এই মা চোখ দিয়ে চরিত্র পড়তে জানেন।

রুবিনা খাতুন বললেন, “তুমি যদি সত্যিই আমার মেয়েকে ভালোবাসো, তবে তোমার শুধু প্রস্তাব না, সাহসও থাকতে হবে ওর পাশে দাঁড়াবার।”

তানভীর বলল, “আমি প্রেম করতে জানি না। আমি জানি শুধু একজন মানুষের সঙ্গে বাকি জীবন কেমন করে ভাগ করে নিতে হয়।”

এই কথা শুনে মিথিলা জানালার পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় একটু মুচকি হাসল। তার মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তাহলে সামনে এগোতে পারো।”

এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো যেন তাদের জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু করার জন্য আলাদা ইশারা দিচ্ছিল।


---

তানভীর ও মিথিলা সিদ্ধান্ত নিল—এবার বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হবে।

তানভীর বলল, “আমরা রাজকীয় কিছু করব না। একটা ছোট আয়োজনে, ঘনিষ্ঠ মানুষদের সঙ্গে, একটা সন্ধ্যা—যেখানে থাকবে শুধু আমাদের গল্প, আর কিছু ভালোবাসার মানুষ।”

মিথিলা বলল, “তবে হবে সেই পুরনো ঢাকার মতো এক সন্ধ্যা। খোলা ছাদ, হালকা লাইটিং, আর হারমোনিয়ামে কেউ গাইবে রবীন্দ্রসংগীত।”

তানভীর বলল, “তুমি থাকলেই, সব সুর মেলে মেশে যাবে।”

বিয়ের তারিখ ঠিক হলো ঠিক এক মাস পরে—মাঘ মাসের এক সন্ধ্যায়।

তারা ধীরে ধীরে সব পরিকল্পনা করতে লাগল। আমন্ত্রণ কার্ডের ডিজাইন, পোশাক, ভেন্যু, অতিথিদের তালিকা। সেই ব্যস্ততার মাঝেও, প্রতি রাতে মিথিলা ফোনে বলত, “তানভীর, আমাদের বিয়েটা যেন একটা গল্প হয়—যেটা মনে রাখলে মনে একপ্রকার শান্তি আসে।”

তানভীর বলত, “তোমার সঙ্গে প্রতিটা দিনই তো গল্প হয়, জানো?”


---

তবে ঠিক তখনই, যেন সেই শান্ত জলের ওপর এক ঢেউ এলো।

বিয়ের তারিখের মাত্র ১০ দিন আগে, তানভীর তার বাবার এক পুরনো বন্ধু—মুনির চাচার ফোন পেলেন।

মুনির চাচা, একসময় তানভীরের বাবার ব্যবসায়িক সঙ্গী ছিলেন। বাবা মারা যাওয়ার পর তার সঙ্গে আর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল না। হঠাৎ তার ফোনে তিনি বললেন—

“তানভীর, তোমার বিয়ের খবর শুনে খুব খুশি হয়েছি। কিন্তু একটা কথা বলতে চাই। মিথিলার বাবার নাম তো রিয়াজ উদ্দিন, তাই না?”

তানভীর একটু থমকে বলল, “হ্যাঁ। আপনি কি চিনতেন?”

মুনির চাচা বললেন, “তোমার বাবার সঙ্গে তার একসময় ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব হয়েছিল। এমন কিছু ঘটেছিল, যেটা নিয়ে তোমার বাবার মন ভেঙে গিয়েছিল। আমি সবটা জানি না, কিন্তু একটা সময় তোমার বাবা বলেছিলেন, ‘এই লোকের পরিবারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকবে না।’”

তানভীরের বুক ধক করে উঠল।

ফোন রেখে সে চুপ করে বসে রইল। পুরনো কোনো অন্ধকার, যেটা সে জানতই না, এখন তার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্তের ঠিক আগে এসে দাঁড়িয়েছে।

সে জানত, তাকে এই ব্যাপারে মিথিলার সঙ্গে কথা বলতেই হবে। কিন্তু কীভাবে?

রাতে মিথিলা ফোন করল। বলল, “কাল তুমি একটু মনমরা ছিলে। কিছু হয়েছে?”

তানভীর চুপ করে রইল। কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু মুখ খুলল না।

পরদিন সন্ধ্যায় তারা দেখা করল সেই পুরোনো ক্যাফেতে।

তানভীর বলল, “মিথিলা, আমি একটা কথা জানতে পেরেছি। আমি জানি না এটা আমাদের মধ্যে সমস্যা তৈরি করবে কিনা। কিন্তু আমি চুপ থাকতে পারছি না।”

মিথিলা বলল, “তুমি বলো।”

তানভীর ধীরে ধীরে বলল সবটা—মুনির চাচার ফোন, বাবার পুরনো দ্বন্দ্ব, রিয়াজ উদ্দিন নামটি শুনে তার প্রতিক্রিয়া।

মিথিলা চুপচাপ শুনল। তারপর বলল, “তুমি জানো, আমি আমার বাবাকে খুব ছোটবেলায় হারিয়েছি। মা কখনো এসব বলেননি। আমি জানিই না, আমাদের পরিবারের কোনো দ্বন্দ্ব ছিল কিনা। কিন্তু আমি এটাও জানি—আমি দায়ী না, তুমিও না। আমাদের গল্প আমাদের হাতে লেখা।”

তানভীর বলল, “আমি ভয় পেয়েছি এই ভেবে, যদি এই পুরনো ছায়া আমাদের আলাদা করে দেয়।”

মিথিলা বলল, “তোমার সাহস থাকলে কেউ কিছু আলাদা করতে পারবে না, তানভীর। অতীত আমাদের জন্ম দেয়, কিন্তু ভবিষ্যৎ আমরা নিজেরা বানাই।”

সেদিন তারা নিরব সম্মতিতে ঠিক করল—এই বাধাটা মিথ্যে হতে পারে, কিন্তু যদি সত্যিও হয়, তবু তারা একসঙ্গে মোকাবিলা করবে।


---

বিয়ের আগের দিন, শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির ভিড়ে হঠাৎ তানভীরের মা একটা পুরোনো ডায়েরি এনে দিলেন। বললেন, “তোমার বাবার শেষদিকে লেখা কিছু পাতা ছিল এটা। একবার দেখো।”

তানভীর ডায়েরি খুলে পড়তে লাগল।

সেখানে লেখা ছিল—

“মানুষের জীবনে ভুল হয়। আমি রিয়াজকে ভুল বুঝেছিলাম। হয়তো সে আমার বন্ধু ছিল, আর আমি তাকে হারিয়েছি অহংকারে। যদি আমার ছেলে কোনোদিন তার পরিবারে কোনো সম্পর্ক গড়তে চায়, আমি তাকে আটকাবো না। আমি চাই, ভালোবাসা জিতুক।”



তানভীর ডায়েরি বন্ধ করে ফেলল। চোখে পানি চলে এলো।

সেই রাতেই সে মিথিলাকে ফোন করল। বলল, “আমার বাবা, যার ছায়া আমাকে তাড়িয়ে ফিরত, তিনিই আমাদের মেনে নিয়েছেন—সেই মৃত্যুর পরও।”

মিথিলা বলল, “দেখেছো? ভালোবাসা কখনো হারায় না। শুধু অপেক্ষা করতে হয় সেই পাতাটার জন্য, যেটা বন্ধ ছিল।”


---

পরদিন সন্ধ্যায়, খোলা ছাদে, লাইটিং আর নরম সুরের মাঝে তানভীর আর মিথিলা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিল।

কাজি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি গ্রহণ করছেন?”

তানভীর বলল, “আমি তো সেই অনেক আগেই গ্রহণ করেছি। আজ শুধু নামটা লিখছি কাগজে।”

মিথিলা চোখে জল নিয়ে বলল, “তুমি আমার গল্পের সবচেয়ে সত্যি চরিত্র, তানভীর।”

সন্ধ্যার আলোয়, বন্ধুরা হাসছিল, পরিবার হাততালি দিচ্ছিল। আর তারা দুজন দাঁড়িয়ে ছিল—প্রেমের শহরে, ভালোবাসার ছাদের নিচে, নতুন জীবনের শুরুতে।



চলবে............................
105 Views
10 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: