তানভীর একগাল হেসে মিথিলার হাত ধরল, এরপর মৃদু ভঙ্গিতে আংটি পরিয়ে দিল। শহরের বাতিগুলো তখন লেকের জলে প্রতিফলিত হয়ে সোনালি আভা ছড়াচ্ছিল। কিছু কিছু গল্প একদিন শুরু হয় ঠিক এভাবেই—না কোনো ঘনঘটায়, না কোনো নাটকীয়তায়, বরং নিঃশব্দে, ভেতর থেকে।
তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা ছিল না, কিন্তু সেই রাতেই তারা বুঝেছিল—তারা একে অপরের।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ যেন স্বপ্নের মতো কেটেছিল। অফিসের ব্যস্ততা সত্ত্বেও তানভীর ও মিথিলা নিজেদের জন্য সময় করে নিত। তারা মাঝে মাঝে অফিস শেষে দেখা করত পুরান ঢাকার কোনো পুরোনো রেস্তোরাঁয়, যেখানে দেয়ালের ফাটলে গল্প জমে থাকে, কিংবা কোনো লাইব্রেরির নির্জন কোণে।
তানভীর আগের চেয়ে অনেক বেশি খোলামেলা হয়ে উঠেছিল, নিজের মনের কথাগুলো বলা শিখেছিল। মিথিলাও আরও সংবেদনশীল হয়ে পড়েছিল তানভীরের প্রতি, বুঝত কখন তার চোখে ক্লান্তি, আর কখন শুধু নিঃশব্দে পাশে থাকা দরকার।
কিন্তু জীবনে সুখ এলেই ছায়ার মতন কিছু অনিশ্চয়তা পেছনে পেছনে হাঁটে।
এমনই এক সকালে, অফিসে ঢুকেই তানভীর শুনল তার প্রজেক্ট বাতিল হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে যেটার জন্য তারা প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ক্লায়েন্ট হঠাৎ করে ফান্ডিং বন্ধ করে দিয়েছে।
পুরো টিম হতভম্ব। তানভীর মুখে কিছু না বললেও ভিতরে ভিতরে বিধ্বস্ত। এর মানে ছিল তার ডিপার্টমেন্টের বড় একটা ধাক্কা, আর তার নিজের দায়িত্বের ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন।
সে পুরোদিন টা চুপচাপ কাটাল। মিথিলা বুঝতে পারছিল, কিছু একটা হয়েছে। সে একাধিকবার তানভীরকে জিজ্ঞেস করলেও, তানভীর শুধু বলল, “সব ঠিক আছে।”
সেদিন সন্ধ্যায় তারা দেখা করেছিল, কিন্তু তানভীর ছিল অন্যমনস্ক। মিথিলা তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি আবার কিসের মধ্যে ডুবে গেছো?”
তানভীর মাথা নিচু করে বলল, “প্রজেক্টটা বাতিল হয়ে গেছে। আমি জানি না, কতটা প্রভাব পড়বে আমার চাকরিতে।”
মিথিলা তার হাত ধরল। “তুমি একা এই লড়াই করো না, বুঝেছো? আমি পাশে আছি। সব সময়।”
তানভীর একটু হেসে বলল, “তুমি পাশে বলেই তো এখনও নিজেকে শক্ত রাখছি।”
কিন্তু কপালে যেন আরও কিছু লেখা ছিল।
পরদিন দুপুরে হঠাৎ করেই অফিসে খবর এলো—হেড অফিস থেকে নতুন একজন রিজিওনাল ডিরেক্টর আসছেন, এবং তিনি কয়েকজন সিনিয়র ম্যানেজারের পারফরম্যান্স রিভিউ করবেন।
তানভীর জানত, এমন সময়েই টানাপোড়েন শুরু হয়। অফিসের রাজনীতি, দোষ চাপানো আর হিসেবের খেলা।
আর তার মাথার ওপর তখনই যেন বজ্রপাত হয়ে এলো—লায়লা আবার ফিরছে, এবার আরও গুরুত্বপূর্ণ পজিশনে। সে হেড অফিসের স্ট্র্যাটেজিক কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছে, এবং তানভীরের প্রজেক্টের সার্বিক বিশ্লেষণ সে-ই করবে।
তানভীর জানত, লায়লা ক্ষত নিয়ে ফিরে এসেছে। আর এখন তার হাতে আছে এমন কিছু ক্ষমতা, যেটা তানভীরের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
মিথিলা জানত না এই খবর।
তানভীর ভেবেছিল বলবে না, কিন্তু এক সন্ধ্যায় মিথিলা হঠাৎ এসে বলল, “লায়লা তো ফিরেছে, শুনেছি। তুমি বলোনি কেন?”
তানভীর বলল, “আমি বলিনি, কারণ জানতাম তুমি কষ্ট পাবে। আমি কনফিউজড নই, মিথিলা। শুধু চেয়েছিলাম তোমার চোখে কোনো শঙ্কা না আসুক।”
মিথিলা চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “আমি তোমার জীবনে বিশ্বাস করতে শিখেছি। কিন্তু বিশ্বাসের জন্যও স্পষ্টতা দরকার।”
তানভীর মাথা নিচু করে বলল, “আমি কথা দিচ্ছি, আমার সিদ্ধান্ত, আমার পথ—সব স্পষ্ট থাকবে। শুধু তুমি আস্থা রেখো।”
মিথিলা বলল, “আমি আছি, তানভীর। কিন্তু তুমি নিজের সাথে যুদ্ধটা সৎভাবে করো।”
এরপর কিছুদিন ছিল অস্থির। অফিসে একের পর এক মিটিং, চাপ, রিভিউ, এবং প্রতিদিনের লড়াই। তানভীর কখনো ক্লান্ত, কখনো হতাশ, কখনো হতভম্ব হয়ে বসে থাকত।
একদিন রাতে, হঠাৎ করেই তার ফোনে মেসেজ এলো—লায়লার।
“Tomorrow’s review will be crucial. Be honest. Be brave.”
তানভীর মেসেজটা দেখে থমকে গেল। এটা হুমকি না সহানুভূতি—সে বোঝে না। কিন্তু সে জানে, পরের দিনটা তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে।
রাতটা সে ঘুমাল না। কাগজপত্র ঘাঁটল, প্রেজেন্টেশন রিভাইজ করল, আর শেষমেশ চুপচাপ বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। ভোরের বাতাসে কুয়াশা, দূরের আলো ঝাপসা, আর বুকের ভেতর ভারি এক শ্বাস।
তখনই ফোন বেজে উঠল—মিথিলা।
“ঘুমাওনি?”
“না,” তানভীর বলল।
“তুমি পারবে। কাল শুধু নিজের চোখে চোখ রেখে সত্যিটা বলবে।”
“তুমি পাশে থাকবে তো?”
“সারাজীবন।”
---
রিভিউয়ের দিন, পুরো অফিসে যেন পিন পড়লেও শব্দ হতো।
তানভীর নিজেকে প্রস্তুত রেখেছিল। সে বোঝে, আজ যদি ভেঙেও পড়ে, তবু নিজেকে ভাঙতে দেবে না।
লায়লা মিটিংয়ে ছিল। তার চোখে অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা, যেন অতীত বলে কিছু ছিল না। সে শুধু একজন কনসালটেন্ট, তানভীর একজন ম্যানেজার।
প্রেজেন্টেশন চলল। প্রশ্ন এলো। প্রতিক্রিয়া এলো।
তানভীর মাথা উঁচু করে সব প্রশ্নের জবাব দিল। শেষ কথা বলার আগে সে বলল—
“ব্যর্থতা আমার হয়েছে, সেটি আমি অস্বীকার করি না। কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি। আমি দল নিয়ে কাজ করেছি, একা নই। আর আমি প্রতিবার ব্যর্থ হয়ে শিখেছি, পরের বার কীভাবে আরও ভালো করতে হয়।”
লায়লা চুপচাপ শুনল। তারপর শুধু বলল, “Thank you. You may leave.”
---
পরের দিন মেইল এলো—তানভীর তার পজিশনে বহাল থাকছে, বরং তাকে নতুন এক মিড-লেভেল প্রজেক্টের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেটা ছিল অনেক বড় জয়, অন্তত তার কাছে।
সন্ধ্যায় সে মিথিলার সঙ্গে দেখা করল লেকের ধারে। বলল, “জানো, আমি ভেবেছিলাম হয়তো সব হারিয়ে যাবে। কিন্তু এখন বুঝি, সাহস নিয়ে দাঁড়াতে পারলে, সব হেরে গেলেও কিছু থেকে যায়।”
মিথিলা হেসে বলল, “আর আমি তো আছি, সব হেরেও তোমাকে জিতিয়ে দিতে।”
তানভীর মিথিলার দিকে তাকিয়ে বলল, “চলো, এবার নতুন এক অধ্যায় শুরু করি।”
মিথিলা বলল, “তুমি যেখানে, সেখানেই তো আমার গল্প শুরু হয়, তানভীর।”
তারা হাঁটতে লাগল, লেকের ধার ধরে, হাত ধরে, গল্পের পাতার মতো এগিয়ে চলল অজানার দিকে।
কেননা জীবন, সব সময়ই নতুন গল্প চায়। শুধু প্রয়োজন হয় একজনকে, যে পাশে থেকে সেই গল্পটা একসাথে লিখবে।
চলবে….......................................
দ্বিতীয় বসন্ত (৩)
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
116
Views
11
Likes
0
Comments
5.0
Rating