তানভীরের মনে যেন ঝড় উঠেছে। লায়লার ফিরে আসা, অফিসের চাপে একটানা কাজ, আর মিথিলার সামনে নিজের দুর্বলতাকে গোপন রাখার চেষ্টা—সবকিছু মিলে তার মধ্যে এক অদ্ভুত ক্লান্তি জমে উঠছিল।
আজ বেশ ভোরে অফিসে এসেছিল সে। কেবিনে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। ঢাকা শহরের ভোরবেলা অন্য রকম, তুলনামূলক শান্ত, কুয়াশাভেজা বাতাসে ভেসে বেড়ায় একধরনের ধূসর বিষণ্ণতা। তানভীর জানে, এই শান্ততা ক্ষণিকের। কয়েক ঘণ্টা পরই আবার শোরগোলে ভরে যাবে এই শহর।
ফোনটা বাজল হঠাৎ। স্ক্রিনে নাম—লায়লা।
তার বুক ধক করে উঠল। সে ফোনটা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত ভাবল, তারপর কেটে দিল। কিন্তু মন তার শান্ত থাকল না। লায়লা ফিরে এসেছে হঠাৎ, যেন কোনো সিনেমার পুরোনো চরিত্র আবার ঢুকে পড়েছে চলমান গল্পে। কিন্তু তানভীর ভালো করেই জানে—সব গল্পে ফ্ল্যাশব্যাক থাকা মানেই নয় যে পুরোনো অধ্যায় আবারও শুরু হবে। কখনও সেটা বোঝানোর জন্য আসে, যে সেই অধ্যায়টা পেরিয়ে যাওয়ার সময় হয়েছে।
দুপুরের দিকে মিথিলা কেবিনে এল। চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল, তানভীর কিছু একটা আঁচ করল। মিথিলার মুখে একটা অদ্ভুত কঠিনতা, চোখে প্রশ্ন।
“লায়লা আবার কেন এসেছে?” মিথিলা সরাসরি জিজ্ঞেস করল।
তানভীর একটু থমকে গেল। তারপর ধীরে বলল, “ও ক্লায়েন্ট কোম্পানির প্রতিনিধি হয়ে এসেছে। আমার কন্ট্রোলের বাইরে ছিল ব্যাপারটা।”
মিথিলা নরম কণ্ঠে বলল, “তুমি তার সঙ্গে আবার কথা বলছ?”
তানভীর চুপ করে রইল। কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ নয়।
কিছুক্ষণ পর সে বলল, “মিথিলা, আমি এখন এমন একটা জায়গায় আছি যেখানে তোমার সঙ্গটাই আমার সবচেয়ে বড় শান্তি। লায়লা একটা অতীত, তার ছায়া পড়ে গেলেও আমি জানি, আজ আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি।”
মিথিলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর মৃদু হেসে বলল, “আমিও চাই, তোমার পাশে থাকতে। কিন্তু প্রতিটা মানুষেরই একটা সীমা থাকে, তানভীর। আমি চাই তুমি নিজের ভেতরের সব দ্বিধা সরিয়ে ফেলো।”
তানভীর কিছু বলল না। মিথিলা চলে গেল।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা শহরের পুরনো ক্যাফেতে একা বসে ছিল তানভীর। সে আর মিথিলা এখানে অনেকবার এসেছে। একই টেবিলে, জানালার ধারে, আর প্রতিবার তারা কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে জীবনের গল্প বলেছে। আজ সেই টেবিলই কেমন ফাঁকা ফাঁকা মনে হচ্ছিল।
তানভীর ভাবছিল—সত্যি কি সে এখনো লায়লার স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসেনি? না কি জীবনের ব্যস্ততা, চাপ, আর নিজের সংযত স্বভাব তাকে অনুভব করতে দিচ্ছে না আসল ভালোবাসার রূপ?
ফিরে এসে সে একটা সিদ্ধান্ত নিল—সব দ্বিধা মুছে, স্পষ্ট করে মিথিলার সামনে দাঁড়াবে।
পরদিন অফিসে তানভীর প্রথমেই মিথিলার ডেস্কে গিয়ে দাঁড়াল।
“আজ সন্ধ্যায় সময় আছে তোমার?” সে জিজ্ঞেস করল।
মিথিলা একটু চমকে তাকাল। তারপর বলল, “আছে। কোথায়?”
“কফির দোকানে নয়। লেকের ধারে।”
সন্ধ্যা ছয়টায় তারা দুজনই লেকের ধারে হাঁটছিল। বাতাসে ছিল স্নিগ্ধতা, আর গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়ছিল শহরের বাতি।
তানভীর একসময় থেমে গিয়ে মিথিলার দিকে তাকাল।
“তুমি আমার জীবনে এমন সময় এসেছ, যখন আমি নিজেকে অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিলাম,” সে বলল। “তোমার সঙ্গে কথা বললে, তোমার চোখের দিকে তাকালে আমি মনে করি, আমি আবার মানুষ হতে পারি। আমি জানি, আমি নিখুঁত নই। আমি জানি, আমার পেছনে আছে অনেক ভাঙা স্মৃতি। কিন্তু আমি চাই, সামনে যদি কারো হাত ধরে হাঁটি, সেটা তুমি হও।”
মিথিলা চুপ করে তার কথা শুনছিল। তারপর ধীরে বলল, “তানভীর, আমি চাই তোমার সঙ্গে থাকতে। কিন্তু আমাদের সম্পর্ক যদি সত্যিই কিছু হয়, তাহলে সেটা হতে হবে স্পষ্ট। আমি চাই না, কোনো অনিশ্চয়তায় আমরা একে অপরকে টেনে রাখি। তুমি ঠিক করো—তুমি কী চাও?”
তানভীর জানত, এটা কোনো খেলা নয়। এটা জীবন, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এমন একজন মানুষ, যার জন্য সে ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে শুরু করেছে।
সে হাত বাড়িয়ে দিল। “আমি চাই, আমাদের দুজনের ভবিষ্যৎ একসাথেই লেখা হোক।”
মিথিলা হাত ধরল। তাদের মাঝে কথা ছিল না, কিন্তু ছিল একরকম নিরব চুক্তি।
পরবর্তী দিনগুলোতে তানভীর আরও পরিবর্তিত হতে লাগল। লায়লার ফোন এলে আর সে ধরত না। অফিসের চাপ কমেনি, কিন্তু মানসিক ভার কমে গেছে। সন্ধ্যাগুলোতে সে মিথিলাকে নিয়ে ছোট ছোট জায়গায় যেত—মেলার মাঠ, বইমেলা, এমনকি পুরান ঢাকার রাস্তা ঘুরে বেড়ানো।
কিন্তু একদিন মিথিলা হঠাৎ বলল, “তানভীর, আমার একটা অফার এসেছে। চট্টগ্রামের হেড অফিস থেকে ট্রান্সফার রিকোয়েস্ট।”
তানভীর চমকে উঠল। “তুমি যেতে চাও?”
“আমার পেশাগত জীবনের জন্য এটা ভালো হবে। কিন্তু আমি তোমার কথা ভেবে দ্বিধায় পড়েছি।”
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমি চাই না তুমি আমার জন্য নিজের ক্যারিয়ার থামিয়ে দাও। যদি তুমি যাও, আমি অপেক্ষা করব। আর যদি না যাও, আমি পাশে থাকব।”
মিথিলা চোখে জল নিয়ে বলল, “তুমি আমায় আরও বেশি ভালোবাসতে শেখাও, তানভীর।”
তানভীর জানে, ভালোবাসা মানে শুধু একসাথে থাকা নয়, কারো পথকে শ্রদ্ধা করা। তারা ঠিক করল, সম্পর্ক থাকবে, শহর আলাদা হলেও মন এক থাকবে।
মিথিলা চট্টগ্রাম গেল। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তারা ফোনে কথা বলত। একসাথে বসে না খেতে পারলেও, একসাথে অনুভব করত একাকীত্ব, সময়, আর দূরত্বের মানে।
তানভীর একদিন মায়ের কাছে গিয়ে বলল, “মা, তুমি কি মনে করো দূরত্ব ভালোবাসাকে দুর্বল করে?”
মা মৃদু হেসে বলল, “না রে। ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, দূরত্ব শুধু তাকে আর শক্ত করে তোলে। সময়মতো সে ফিরে আসে—আরও গভীর হয়ে।”
তানভীর জানত, সে মিথিলাকে হারাবে না।
একটা সময়, মিথিলা ঢাকায় ফিরে এলো—এক প্রমোশনের মাধ্যমে।
আর সেদিন সন্ধ্যায়, লেকের ধারে, সেই পুরোনো বেঞ্চে বসে, তানভীর একটা ছোট বাক্স বের করল। তার ভেতরে ছিল একটা সাদাসিধে আংটি।
সে বলল, “তুমি কি আবার আমার পাশে থাকবে? শুধু প্রেমিকা হয়ে নয়, জীবনসঙ্গী হয়ে?”
মিথিলা চোখে জল নিয়ে বলল, “আমি তো সেই অনেকদিন আগেই রাস্তাটা ধরে হাঁটতে শুরু করেছি, তানভীর। আজ শুধু তোমার পাশে এসে দাঁড়ালাম।”
শহরের বাতাসে সেদিন কোনো কোলাহল ছিল না—শুধু একজোড়া মানুষের নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা, একসাথে পথচলার গল্প।
চলবে..............................
দ্বিতীয় বসন্ত (২)
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
86
Views
8
Likes
0
Comments
5.0
Rating