দুই নৌকাতে পা দিয়ে পার হওয়া যায় না
মাহির এক সরকারি অফিসে চাকরি করে। সংসার চলছে মোটামুটি। প্রেম করে বিয়ে করছে পাঁচ বছর, স্ত্রী সায়মা শান্ত, ঘরকন্নায় মনোযোগী, কিন্তু দু’জনের মধ্যে কথোপকথন আগের মতো নেই। দিনের বেশিরভাগ সময় কাজের চাপে কাটে, বাসায় ফিরেও মোবাইল বা টিভিতে ডুবে যায় মাহির।
অফিসে নতুন জয়েন করল রিমা। হাসিখুশি, প্রাণবন্ত। কাজের ফাঁকে সহকর্মীদের সাথে গল্পে মেতে থাকে। প্রথম দিকে মাহির শুধু পেশাগত কথা বলত। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ যেতে না যেতেই ছোটখাটো কথা, লাঞ্চের সময় একসাথে বসা, একে অপরের শখ-আগ্রহ শেয়ার করা শুরু হলো।
রিমা জানত না মাহির বিবাহিত। মাহিরও বলেনি।
তার মনে হয়, "এটা তো শুধু বন্ধুত্ব… বলে দিলে হয়তো এই স্বাভাবিকতাও নষ্ট হবে।"
কিন্তু বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে হয়ে উঠল আলাদা অনুভূতি।
একদিন অফিসের ক্যান্টিনে বসে রিমা হেসে বলল,
— "তুমি এমন কেন? সবসময় চুপচাপ থাকো, অথচ কথা বললে মনে হয় অনেক কিছু জমে আছে ভেতরে।"
সেদিন রাতে মাহির বাসায় ফিরে সায়মাকে দেখল রান্নাঘরে ব্যস্ত। কথা বলতে ইচ্ছে করল, কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবে বুঝল না। আবার ফোন হাতে নিয়ে রিমার সাথে চ্যাট করতে লাগল।
এভাবেই দুই জগত তৈরি হলো—
বাসায় সায়মা, যিনি তার জন্য রান্না করে, কাপড় ধোয়, অপেক্ষা করে।
আর অফিসে রিমা, যিনি তার সাথে হাসে, কথা বলে, তার মনের খালি জায়গা ভরে দেয়।
মাহির বুঝতে পারল সে দুই নৌকায় পা দিয়ে চলেছে। কিন্তু নিজের কাছে যুক্তি দিল—"আমি কারো ক্ষতি করছি না, দু’জনকেই ভালোবাসি নিজের মতো করে।"
সমস্যা শুরু হলো যখন রিমা হঠাৎ একদিন বলল—
— "মাহির, তোমাকে আমার ভালো লাগে… সত্যি বলতে গেলে আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।"
মাহির চুপ। চোখ নামিয়ে বলল— "আমারও ভালো লাগে তোমাকে…"
এর কয়েকদিন পর রিমা মাহিরের বাসার সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখল, বারান্দায় একজন মহিলা জামা মেলছে। পাশের এক প্রতিবেশী বলল—"ওই তো মাহির ভাইয়ের বউ।"
সবকিছু যেন মুহূর্তে ভেঙে পড়ল রিমার ভেতরে। পরদিন অফিসে গিয়ে সরাসরি বলল—
— "তুমি আমাকে কেন বলেনি যে তুমি বিবাহিত?"
মাহির শব্দ খুঁজে পেল না। বলল—"আমি বলতে পারিনি… ভেবেছিলাম তুমি দূরে সরে যাবে।"
রিমা কাঁদতে কাঁদতে বলল—
— "তুমি শুধু মিথ্যা বলোনি, আমার অনুভূতিকে খেলনার মতো ব্যবহার করেছো। আমি আর থাকতে পারব না এখানে।"
দুই সপ্তাহের মধ্যে রিমা অন্য চাকরি নিয়ে চলে গেল।
বাসায় ফিরে দেখে সায়মার আচরণেও পরিবর্তন। আসলে একদিন সে মাহিরের ফোনে কিছু চ্যাট দেখে ফেলছিলো। তর্ক হলো, কান্না হলো, তারপর সায়মা ব্যাগ গুছিয়ে বাবার বাড়ি চলে গেল।তার ৩ দিন পরই ডিভোর্স পেপারে সাইন করে পাঠিয়ে দিয়েছে সায়মা।
মাহির বুঝল—সে সত্যিই দুই নৌকায় পা দিয়েছিল, কিন্তু শেষে কোনো তীরেই পৌঁছাতে পারল না।
খালি বাসা, ফাঁকা অফিস ডেস্ক—সবকিছুতে যেন প্রতিধ্বনি বাজে তার নিজের ভুলের।
জীবনের শিক্ষা:
কখনও কখনও একজন মানুষ একসাথে দুই সম্পর্ক ধরে রাখতে চায়, মনে করে এটা সম্ভব। কিন্তু সত্য হলো—এভাবে গেলে শেষমেশ দুই কূলই ভেসে যায়, আর থেকে যায় শুধু শূন্যতা।
✍️ Ripon Khan ✍️
102
Views
1
Likes
1
Comments
5.0
Rating

সকল মন্তব্যগুলো (1)
ভাল লাগছে