পুকুর ঘাটের তুলা গাছটি !

গ্রামের বাড়ি আর পুরনো গাছপালা বন জঙ্গল মানেই ভূতের আড্ডাখানা, ছোটবেলা থেকে আমরা এটাই শুনে আসছি । এখন প্রশ্ন হলো আসলেই কি আমরা যেসব ভূতের গল্প আমাদের মুরুব্বীদের কাছ থেকে শুনতাম সেগুলো কি সত্যি ছিল নাকি নিছক কাহিনী মাত্র ।


!! এরকমই শীতকালে মতলব উত্তর উপজেলার এক গ্রামের বাড়ির গল্প এটা !!


সময়টা ছিল তখন ১৯৯৫ সাল ,
রফিক সাহেবের ছোট মেয়ে আমেনা। পুতুলের মতো মেয়েটি যেন বাতাসের আগে আগে দৌড়ে বেড়ায়। বড় বড় চোখ দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে ধনাগোদা নদীর ঢেউ আর নদীর ওপারের দূরের গ্রাম। কত কিছু প্রশ্ন করে যে সে! আর ভূতের গল্প শুনতে খুব ভালোবাসে। বাবার কাছে, মায়ের কাছে, দাদুর কাছে তার একটাই আবদার, ভূতের গল্প শুনবে। আমেনার বাবা-মা দু’জনই পেশায় শিক্ষক। আমেনার বাবা ভূতের গল্প বলতে ভালোবাসেন; কিন্তু আমেনার দাদীর কাছে আছে ভূতের গল্পের ঝুলি। সেই ঝুলি থেকে যখন গল্প বের হতে থাকে, তখন আমেনা তন্ময় হয়ে সেই গল্প শোনে।


আমেনার বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। তাই শীতের ছুটিতে দাদাবাড়ি গেছে। ওর ফুফাতো বোন মনি, সিফা ও সুমনাও আসছে । দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, ছিবুড়ি, পাঁচগুটি খেলে খুব ভালো সময় কাটছে। আর সন্ধ্যা হলেই ওরা গুটিশুটি মেরে দাদিমার সঙ্গে একটা জিনিস দেখতে যায়। আর তাহলো পুকুরপাড়ের ন্যাটায় মাছ পড়ল কি-না। গ্রামের বাড়িতে পুকুরপাড় মানেই ভূতের আড্ডাখানা। পুকুর পাড়ের পশ্চিম পাশে একটা বড় তুলা গাছ আছে। সেটাই নাকি ভূতদের আস্তানা। তবুও চোখ বন্ধ করে হারিকেন নিয়ে ওদের মাছ দেখতে যাওয়া চাই।


ওই তুলা গাছটায় নাকি কত রকম ভূতপেত্নি থাকে। মেছোভূত, পিঠাভূত আরও কত ভূত। পুকুর পাড়ে রানু ফুফুদের যে উঁচু ভিটা আছে, সেখানে বেশ কয়েকটা পুরোনো গাছ আছে। সেখানে নাকি দিনের বেলাও ভূত-পেত্নি দেখা যায়। আমেনাদের দাদাবাড়ির চারপাশ ঘিরেই এত ভূতদের আস্তানা যে, সন্ধ্যা হতেই কেমন যেন গ্রামটা আধিভৌতিক হয়ে যায়।


আজ আমেনার দাদী পিঠা ভাজবে। তারই প্রস্তুতি চলছে। ঢেঁকিতে আটা কোটা হচ্ছে। গাছ থেকে নারকেল পাড়া হয়েছে। দাদা মিয়া সুজাতপুর বাজার থেকে নতুন আখের নতুন গুড় এনেছে। পিঠা বানানো মানে যেন এক মহা উৎসব। এ গ্রামে সন্ধ্যার পর কেউ মাছ ভাজে না। এখান নাকি মেছো ভূতের খুব উৎপাত। কেউ মাছ ভাজতে গেলেই নাকি সুযোগ বুঝে মেছোভূতের বউ গিয়ে ভাজা মাছ চুরি করে আনবেই। তাই কেউ রাতের বেলা মাছ ভাজে না।



আমেনার দাদি আবার খুব সাহসী। সবাই বলে তার সঙ্গে নাকি ভূত-পেত্নিদের যোগাযোগ আছে। ভূতেরা নাকি তার কোন ক্ষতি করতে পারে না । দাদি অবশ্য রাতের বেলা ওদের নাম মুখে আনেন না। ছদ্মনামে ডাকেন। দাদিকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে খালি মুচকি মুচকি হাসেন।



আমেনার দাদি যেদিন পিঠা ভাজেন অনেক পিঠা ভাজেন। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন সবার জন্য পিঠা ভাজেন। আট-দশ কেজি চালের পিঠা ভাজেন। তাই সব কাজ শেষ করে সবাইকে রতের খাবার খাইয়ে দাইয়ে তারপর পিঠা ভাজতে বসেন অনেক রাতে। এরপর পিঠা ভাজতে ভাজতে সকাল হয়ে যায়। রান্নাঘরের চালে টপটপ করে শিশির পড়তে থাকে আর তার তালে তালে দাদিমা পিঠা ভাজেন। সবাই বলে আমেনার দাদি নাকি ভূত-পেত্নিদেরও পিঠা খেতে দেন। তাই তাদের জন্য পিঠা ভাজেন। কেউ কেউ বলে দাদিমার শাশুড়ি নাকি এক পেত্নি সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছিল। তাই পেত্নি অভিশাপ দিয়েছিল। সেই অভিশাপ কাটানোর জন্যই নাকি পিয়ার দাদি ভূত-পেত্নিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছে।



পিয়ার দাদি পিঠা ভেজে চলেছেন। আর তাকে সাহায্য করছে আমেনার মা। পাশে চার বোন পিঠা ভাজা দেখছে। পিঠা কতটা ফুলল, তা নিয়ে চলছে বিস্তর গবেষণা। পিঠা না ফুললে দাদিমা বলে এই তোর গাল ফুলিয়ে বস। না হলে তো পিঠা ফুলবে না। অমনি চার বোন গাল ফুলিয়ে রাখে। ওরা দাদিমাকে জিজ্ঞেস করে আচ্ছা- কী করেছিল বড় মা পেত্নিদের সঙ্গে। একটু বল না। দাদিমা বলেন, এই এখন এসব বলিস না। ওরা বলে, বলো না সেই কাহিনিটা। অবশেষে দাদিমা বলে- এরকম দিনে বড়মা পিঠা ভাজছিলেন। হঠাৎ দেখেন একটা ছোট্ট বউ এসে নাকিসুরে বলছে- পিঠা দে, পিঠা দে, পিঠা দে। অমনি বড়মা পিঠা ভাজার গরম তেল সেই বউয়ের হাতে ঢেলে দিয়েছিল। তখন সেই বউ গরম তেলের ছ্যাঁকা খেয়ে দৌড়াতে থাকে আর কাঁদতে কাঁদতে অভিশাপ দেয়। আসলে ওটা বউ ছিল না, ছিল তুলা গাছের পেত্নি। বউয়ের সাজে পিঠা চাইতে এসেছিল। দাদিমা বলেন, তার কাছে যারা অসেন তারা গভীর রাতে পিঠা নিতে আসেন। তাদের জন্য দাদি নতুন মাটির হাড়িতে পিঠা রাখেন। এইসব বলতে বলতে হঠাৎ আমেনা চিৎকার করে উঠলো । মনি ভয়ে গোঁ গোঁ করতে থাকে। সিফা অজ্ঞান হয়ে যায়।



সুমনা ছিল ওদের মধ্যে বয়সে বড় , কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখে একটা ছোট্ট কালো বাচ্চা এসে লোমশ হাত পাতল রান্নাঘরের জানালায়। আর কিছু ওদের মনে নেই। পরদিন দেখে তুলা গাছের পাশে দাদিমার নতুন মাটির হাড়িটা পড়ে আছে। সেই থেকে ওরা আর পুকুরঘাটে যায় না। এই ঘটনার এক বছর পর দাদীমা হঠাৎ মারা যান। তার ঘাড় মটকানো লাশটি পুকুর ঘাটে সে তুলা গাছের পাশে পাওয়া যায়।



আমেনা ওই রাতের কথা এখনো ভুলেনি , ঐ রাতে যা হয়েছিল সেটা ভেবে এখনও ভয় লাগে তার। দাদীর মৃত্যুটা এখনো তার কাছে রহস্য জনক মনে হয়, হয়তো বড়মা যে ভুলটা করেছিল তার মাসুল দাদীর মৃত্যু ছিলো, কে জানে কি হয়েছিল সেদিন দাদীর সাথে ।


ভূতেরা কি আসলেই এত নির্দয় হয়?
1.36K Views
48 Likes
12 Comments
3.7 Rating
Rate this:
(27)

মন্তব্য

সকল মন্তব্যগুলো (12)

Reader photo
Anisha
28-Aug-2024, 03:19 PM

golpo ta onek Valo cilo

ফজলুল হক রাফি
ফজলুল হক রাফি
29-Aug-2024, 01:13 AM

পুরো গল্পটি পড়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ 😊🩵

Reader photo
তাসনিয়া
24-Aug-2024, 12:24 PM

সুন্দর হয়েছে কিন্তু আর একটু ভয়ের হলে ভালো হতো

ফজলুল হক রাফি
ফজলুল হক রাফি
27-Aug-2024, 05:14 PM

সামনে থেকে আরো ভয়ংকর গল্প লিখার চেষ্টা করব 🤣🤣

Reader photo
sanjida
30-Jul-2024, 05:03 PM

valo

ফজলুল হক রাফি
ফজলুল হক রাফি
31-Jul-2024, 06:14 PM

thank you so much❤️

Reader photo
রানি
05-Jun-2024, 10:00 PM

খুব ভালো🥰🥰🥰

ফজলুল হক রাফি
ফজলুল হক রাফি
12-Jun-2024, 08:10 PM

ধন্যবাদ 😊🩵

Reader photo
Shariya
12-May-2024, 04:54 PM

nice

ফজলুল হক রাফি
ফজলুল হক রাফি
12-May-2024, 04:58 PM

ধন্যবাদ 🩵😊

Reader photo
Abutaher
12-May-2024, 09:52 AM

Good

ফজলুল হক রাফি
ফজলুল হক রাফি
12-May-2024, 02:32 PM

thanks 😊🩵

Reader photo
নুসরাত
08-May-2024, 03:42 PM

অবশ্যই

Reader photo
রনি
15-Apr-2024, 08:53 PM

ভয়ংকর

ফজলুল হক রাফি
ফজলুল হক রাফি
15-Apr-2024, 08:54 PM

oh tai naki

Reader photo
Homaira siddika
08-Apr-2024, 07:21 PM

golpo ta khob valo legese.

ফজলুল হক রাফি
ফজলুল হক রাফি
08-Apr-2024, 11:09 PM

ধন্যবাদ 😊🩵

Reader photo
তোর
06-Apr-2024, 01:24 PM

খুব ভালো হয়েছে

ফজলুল হক রাফি
ফজলুল হক রাফি
07-Apr-2024, 04:27 AM

ধন্যবাদ 🩵😊

Reader photo
তইশি
04-Apr-2024, 01:06 PM

so nice

ফজলুল হক রাফি
ফজলুল হক রাফি
04-Apr-2024, 01:27 PM

thank you 🩵😊

Reader photo
ঊর্মি আক্তার
03-Apr-2024, 06:50 PM

অনেক ভালো লাগলো পড়ে , শুরুটা ভালো থাকলেও গল্প শেষ হতে হতে পুরো মর্মান্তিক ব্যাপার হয়ে গেল। ভালো লিখেছেন, গল্পটা কি সত্যিকারের ছিল নাকি কাল্পনিক?

ফজলুল হক রাফি
ফজলুল হক রাফি
03-Apr-2024, 10:06 PM

ধন্যবাদ পুরো গল্পটি পড়ার জন্য , এটি একটি কাল্পনিক গল্প ছিল 😊🩵