অপেক্ষা

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
(১)


ঢাকার শাহবাগ মোড়। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাতাসে একধরনের আলাদা ঘ্রাণ থাকে—আলো-আঁধারি, ভিজে পাতার গন্ধ, আর মানুষের স্বপ্নভরা কথোপকথন। সন্ধ্যা নামছে ধীরে ধীরে, চারপাশে কোলাহল বাড়লেও কেউ কেউ নিজেদের ভিতরের নির্জনতায় ডুবে থাকে। তেমনই একজন, নীল শার্ট পরা, ফ্রেমের চশমা চোখে, একটা ডায়েরি হাতে বসে আছে রবীন্দ্র সরোবরের বেঞ্চে।

ওর নাম অনিক মাহমুদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে পড়ছে মাস্টার্সে। চেহারায় নিরীহ গোছের, কিন্তু চোখে গভীর চিন্তার ছায়া। লেখালেখি করে, কবিতা লেখে, আর সবচেয়ে বড় কথা—সে অপেক্ষা করে।

তিন বছর ধরে সে প্রতিদিন বিকেলে এই বেঞ্চেই বসে। প্রতিদিন, একই সময়ে। কেউ জানে না সে কাকে খুঁজছে, কাকে চায়, কাকে মনে রাখে।

তার ডায়েরিতে লেখা—

"কিছু কিছু ভালোবাসা দেখা যায় না, বোঝা যায়। কিছু কিছু অপেক্ষা কখনো শেষ হয় না, শুধু একেকটা দিন কমে যায় জীবনের ক্যালেন্ডার থেকে।"

তিন বছর আগে, ঠিক এই বেঞ্চেই তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল এক মেয়ের। নাম—মায়া সিদ্দিকী।

তখন তারা অনার্স থার্ড ইয়ার। দুজনেই ছিল সাহিত্যের ভক্ত, বইমেলায় দেখা, কবিতা পাঠে কথা, আর তারপর সন্ধ্যার আড্ডায় প্রেম। মায়া ছিল প্রাণবন্ত, চঞ্চল, আর অনিক ছিল ধীরস্থির। দুই বিপরীত মেরুর মানুষ, অথচ একে অপরের প্রতি তীব্র আকর্ষণ। তারা বই পড়ত একসাথে, কবিতা আদান-প্রদান করত, আর এই রবীন্দ্র সরোবরে বসেই গানে মিশে যেত তাদের নির্জন ভালোবাসা।

কিন্তু তারপর… হঠাৎ একদিন মায়া বলল—

"আমাকে হয়তো চলে যেতে হবে।"

"কোথায়?" — অনিক চমকে উঠেছিল।

"আমার বাবা চাচ্ছেন আমি কানাডায় চলে যাই। মামার বাসায়, পড়াশোনার জন্য। এই জায়গা, এই শহর, আমাদের সব… ছেড়ে যেতে হবে।"

"তুমি যেতে চাও?" — অনিকের প্রশ্নে ছিল আতঙ্ক।

মায়া চোখ নামিয়ে বলেছিল, "চাই না, কিন্তু আমি যাইনি তো কী হয়েছে? আমার জায়গায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবার।"

"তুমি কি ফিরে আসবে?"

মায়া তখন হাসিমুখে বলেছিল—

"তুমি কি অপেক্ষা করবে অনিক?"

অনিক কিছু বলে না। শুধু মাথা নাড়ে।

"তাহলে কথা দাও, এই বেঞ্চে প্রতি শুক্রবার ঠিক বিকেল পাঁচটায় তুমি থাকবে। আমি যদি ফিরে আসি, তবে এই বেঞ্চেই ফিরে আসব।"

"কিন্তু যদি না আসো?"

"তাহলে তুমি জানবে, আমি কোথাও হারিয়ে গেছি। কিন্তু ভালোবাসাটা… সেটার মৃত্যু হবে না।"

এই ছিল তাদের শেষ কথা। এরপর মায়া সত্যিই চলে যায়। ফোন নম্বর, মেসেঞ্জার, সব বন্ধ হয়ে যায়। কেবল একটা অপেক্ষা বেঁচে থাকে অনিকের ভেতর।


---

আজ তিন বছর পরও, সেই শুক্রবার বিকেল, সেই একই বেঞ্চে অনিক অপেক্ষা করছে। হাতে ডায়েরি, চোখে একরাশ প্রশ্ন। মায়া কি সত্যিই ফিরবে?

এই তিন বছরে অনিকের জীবনেও বদল এসেছে। বাবা মারা গেছেন, মা গ্রামের বাড়িতে। চাকরির সুযোগ এসেছিল একটি নিউজ চ্যানেলে, তবু সে সাহিত্য ছাড়েনি। আয় কম, তবু লেখালেখির জন্য একটা ছোট্ট ফ্রি-ল্যান্স কাজ করে যায়।

কিছু বন্ধু অনিককে পাগল ভাবে।

"তুই কি পাগল নাকি রে? একটা মেয়ের জন্য তিন বছর ধরে অপেক্ষা করছিস?"

"তোর তো জীবন থেমে গেছে অনিক।"

কিন্তু অনিক জানে, তার জীবনের একটা অংশ যেখানে আটকে আছে, সেখানে অপেক্ষা না করলেই বরং থেমে যেত জীবনটা।


---

অন্যদিকে মায়া, এখন কানাডার মন্ট্রিয়েল শহরে। মাস্টার্স শেষ করে একটি ব্যাংকে চাকরি করছে। শহর ঠান্ডা, নিয়মিত তুষার পড়ে, কিন্তু মায়ার ভেতরটা আগুনে পোড়ে।

তিন বছর ধরে সে অনিকের ফেসবুক প্রোফাইল খুলে চুপচাপ দেখে যায়। কিছুই আপডেট নেই, তবু চেক করে। মেসেঞ্জারে বারবার টাইপ করে, আবার ডিলিট করে। ফোন করতে চায়, কিন্তু সাহস পায় না।

একদিন মায়ার বন্ধু আফরিন জিজ্ঞেস করল—

"তুই ফিরে যাবি না, মায়া?"

"ফিরতে পারি না। পরিবার চায় না, সমাজও নয়।"

"কিন্তু তোর মন?"

"আমার মন প্রতিদিন ফিরে যায়। অনিক যে এখনো বসে থাকে সেখানে, জানালেও বিশ্বাস করবে না কেউ…"


---

ঢাকায় আবার শুক্রবার। আজ একটু বেশি ভিড়। বইমেলা চলছে। শাহবাগ জমজমাট। অনিক আজ একটু দেরি করে এসেছে। হাতে ফুলের মতো একটা খাম, তাতে কবিতা লিখেছে মায়ার জন্য।

সে জানে না, আজকের দিনটা কেমন হবে। প্রতিটি শুক্রবারের মতোই, আজও সে জানাল না কাউকে—ভিতরে ভিতরে আজ তার বিশ্বাস একটু বেশি। আজ মায়া আসতে পারে।

বিকেল পাঁচটা দশ। অনিক চোখ বুঁজে বসে। হঠাৎ পেছনে একটি মেয়েলি কণ্ঠ—

"তুমি কি এখনো অপেক্ষা করো?"

অনিক ধীরে ঘুরে তাকায়। বুক ধড়ফড় করে।

কিন্তু না। মায়া না। এক নতুন মেয়ে দাঁড়িয়ে। চেহারায় মায়ার মতোই কিছু ছায়া।

"তুমি কে?" — অনিক প্রশ্ন করে।

"আমি রূপা। সাহিত্যের ছাত্রী। তোমার লেখা কবিতা পড়ি আমি। ফেসবুকে অনুসরণ করি। আজ সাহস করে এসেছি কথা বলতে।"

অনিক হেসে ওঠে। তার চোখে অল্প ধোঁয়াশা জমে।

"তুমি জানো, আমি কাউকে খুঁজছি।"

"জানি। জানি তুমি অপেক্ষা করছো, তাকে যে ফিরে আসবে না হয়তো। তবুও অপেক্ষা করো।"

"তুমি কেন এসেছো?"

"কারণ আমি জানি, কেউ যদি কারো জন্য এমনভাবে অপেক্ষা করতে পারে, সে মানুষ খারাপ হতে পারে না। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম, তুমি এখনো ভালোবাসতে পারো কি না।"

অনিক চুপ করে থাকে। রূপা বসে পড়ে পাশে।

"তুমি চাইলে গল্প করো। কবিতা পড়ো। আমি শুনবো। আমি শুধু শুনতেই এসেছি।"

বাতাসে একটুখানি নিরবতা নেমে আসে। অনিক খামের ভিতর থেকে একটি কবিতা বের করে পড়তে শুরু করে।

"তুমি না ফিরে এসেও ফিরে এসেছো,
প্রতিটি পাতায়, প্রতিটি বিকেলে,
তোমার নামেই লেখা থাকে
আমার নিরব অপেক্ষার অক্ষর।"

রূপা নিঃশব্দে শুনে যায়।

আর অনিক… সে জানে, হয়তো মায়া ফিরবে না কখনোই। হয়তো সে জানে না, তার কবিতার পাঠক কেউ একজন পাশে বসে আছে, এক নতুন গল্পের শুরুতে।


_________________________________________



(২)


শীত পড়ে গেছে শহরে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ, বাতাসে হালকা ধোঁয়া আর বিকেলের আলোয় একধরনের ধূসর বিষণ্ণতা। ঢাকা শহরের পরিচিত ব্যস্ততা থাকলেও, কারও কারও জীবনে সময় যেন চলতেই চায় না—তাদের জন্য প্রতিটি বিকেল একইরকম।

অনিক মাহমুদের জন্য এখন আর শুধু শুক্রবার নয়, প্রতিটি দিনই অপেক্ষার দিন। মায়ার চলে যাওয়ার পর তিন বছর, আর এবার যেন সেই শূন্যতা আরও বেশি বড় হয়ে উঠেছে।

রূপা এখন নিয়মিত আসে রবীন্দ্র সরোবরের সেই বেঞ্চে। প্রথম কয়েকদিন শুধু শ্রোতা ছিল, এখন কথা বলে, কবিতা আদান-প্রদান করে, চা খায় একসাথে। দুজনের মাঝখানে একটা সমঝোতা তৈরি হয়েছে—অনিক এখনও অপেক্ষা করছে, আর রূপা জানে সেই অপেক্ষাকে ভাঙা যায় না।

রূপা একদিন বলল—

"তুমি কি জানো অনিক, আমি মাঝে মাঝে ঈর্ষা করি… মায়ার প্রতি তোমার ভালোবাসার গভীরতাকে।"

অনিক কিছু বলেনি। শুধু মৃদু হেসে বলেছিল—

"ভালোবাসা যদি চাওয়ার হতো, তাহলে এতদিনে ভুলে যেতাম। এটা তো পাওয়ার জন্য নয়, অনুভব করার জন্য।"

"তবু আমি থাকি তোমার পাশে… জানো কেন?"

"কেন?"

"কারণ ভালোবাসা একপাক্ষিক হলেও, অপেক্ষা দু'জনের হতে পারে। আমি অপেক্ষা করি সেই মুহূর্তটার জন্য—যেদিন তুমি বলবে, আর মায়ার জন্য নয়, এবার নিজের জন্য বাঁচতে চাও।"

অনিক এবার তাকাল রূপার দিকে। চোখে মুগ্ধতা, কৃতজ্ঞতা, কিন্তু কেবল তা–ই নয়—একটা চিরন্তন দুঃখও।

"রূপা, আমি চাই তুমি থাকো। কিন্তু আমি চাই না তুমি আমার প্রতিচ্ছবি হয়ে বাঁচো। নিজেকে হারিও না আমার ভুলে যাওয়া প্রেমে।"

রূপা হেসে ফেলল। "তুমি এতই সরল যে তোমার কষ্টেও আমি আশ্রয় খুঁজে পাই।"


---

এই শহরে যেমন হঠাৎ বৃষ্টি নামে, ঠিক তেমনি হঠাৎ হঠাৎ পুরোনো চিঠি খোলা হয় মনেও। সেই বিকেলে হঠাৎ অনিকের ঘরে আসে এক চিঠি—একটা পুরোনো ডাকযোগে পাঠানো খাম। ওপরে লেখা, ‘মায়া সিদ্দিকী’।

হাত কাঁপতে থাকে অনিকের। ভিতরে ছোট্ট একটি চিঠি।

*"তিন বছর! আমি ফিরে আসতে পারিনি অনিক, কারণ ফিরলে সবাইকে হারাতাম। কিন্তু প্রতিদিন আমি ঘুমিয়েছি তোমার লেখা পড়ে, চোখ বুজেছি তোমার কণ্ঠস্বর কল্পনা করে।

আমি জানি তুমি এখনো অপেক্ষা করছো, কিন্তু আমিও অপেক্ষা করেছি। তোমার ক্ষমা চাইবো না, শুধু চাইবো—যদি কোনোদিন আমরা আবার একসাথে বসতে পারি সেই বেঞ্চে, তাহলে তুমি আমার চোখে তাকিয়ে বুঝবে, আমি ভালোবাসতে ভুলি নাই।

আর যদি কখনো ফিরে আসি, তুমি যদি তখনো শূন্য থেকো, তাহলে… তখন আমি তোমার গল্পে ফিরে আসবো।"*



চিঠি পড়ে অনিকের চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। চিঠিতে প্রেরণের তারিখ এক বছর আগের। মানে, চিঠিটা পৌঁছাতে লেগেছে এক বছর… অথবা ভাগ্য ঠিক এই সময়টাই বেছে নিয়েছে।

সেই রাতের পর অনিক কারও সঙ্গে আর বেশি কথা বলেনি। এমনকি রূপার সাথেও দেখা দেয়নি এক সপ্তাহ। ঘরেই থেকেছে—চুপচাপ, নির্জন।


---

রূপা একদিন চলে আসে ওর বাসায়।

"তুমি চিঠির পর থেকে নিঃশব্দ হয়ে গেছো।"

অনিক ধীরে বলে, "আমি জানি না মায়া কোথায়, ফিরে আসবে কিনা। আমি কেবল জানি, আমি আর আগের মতো সেই বেঞ্চে বসে থাকতে পারছি না।"

"তাহলে?"

"তবে আমি বুঝতে পারছি, মায়া আর আমার মাঝে এক দীর্ঘ নদী পড়ে গেছে—আমরা হয়তো একই তীরে দাঁড়াতে পারব না।"

"তুমি কি বলতে চাচ্ছো, শেষ করে দিতে চাও অপেক্ষা?"

"আমি বলতে চাচ্ছি… হয়তো অপেক্ষা শেষ নয়, রূপা। শুধু আমি তার রূপ বদলে দিচ্ছি।"

রূপা এবার চোখে জল নিয়ে বলে, "তাহলে আমি থাকতে পারি?"

অনিক বলে, "তুমি থেকো… তবে ভুল বোঝো না। আমি তোমাকে এখনো ভালোবাসি না। কিন্তু তোমার পাশে থাকলে যেন নিজের ভেতরের শূন্যতা একটু কম লাগে।"

রূপা শুধু বলে, "তুমি যেমন বলো। আমি ঠিক এখানেই থাকবো, যতদিন তোমার গল্পে আমার একটুখানি ছায়াও থাকে।"


---

নতুন বছর শুরু হলো। জানুয়ারির হালকা হিমে ঢাকা শহর আবার প্রাণ ফিরে পেল।

রাত দশটা। অনিক তার ফ্ল্যাটে একা বসে আছে। কোলাহল নেই, চুপচাপ। বইয়ের তাক সাজিয়ে রাখছিল হঠাৎই।

একটা পুরোনো খামে চোখ পড়ে গেল। ভিতরে মায়ার হাতের লেখা এক পৃষ্ঠা।

পড়তে পড়তে অনিক হঠাৎ হাসল। নিজেই বলল, "তুমি কি জানো, আমি অপেক্ষা করতে করতে বুঝে গেছি, কিছু কিছু মানুষ শুধু স্মৃতিতেই সবচেয়ে বেশি সুন্দর।"

সে উঠে পড়ে, বইটা গুছিয়ে রাখে।

তারপর হঠাৎ...

টং টং টং...

কলিং বেল বাজে।

সেই চেনা ধ্বনি। একরাশ নিস্তব্ধতার মাঝে হঠাৎ বেজে ওঠা।

অনিকের বুক ধড়ফড় করে ওঠে। সে দাঁড়িয়ে পড়ে। নিঃশ্বাস বন্ধ করে এক মুহূর্ত। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে দরজার দিকে।

সে ভাবে...

"মায়া?"

জুতা না পরে, দৌড়ে যায় দরজার দিকে। কাঁপা হাতে দরজা খুলে........


_____________________



সমাপ্ত..........................................
65 Views
7 Likes
1 Comments
5.0 Rating
Rate this: