ঢাকা শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো এক বিল্ডিংয়ের পাঁচতলা। সিঁড়িগুলো একটু খাটো, দেয়ালে আঁকা পুরনো রঙের দাগ, নীচের বারান্দায় শুকাতে দেওয়া জামাকাপড়, আর মাঝেমাঝে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। এই পাঁচতলার ছোট্ট এককোণে থাকে একজন মেয়ে—নিশাত।
নিশাত, বয়স পঁচিশ, অতটা লম্বা নয়, মুখে স্থিরতা আছে, চোখে গম্ভীরতা। তার দিনগুলো কাটে নিঃশব্দে—একটু বই, একটু গান, মাঝেমাঝে জানালায় বসে আকাশ দেখা। তার ঘরের জানালাটা উত্তরদিকে খোলে, যেখানে প্রতিদিন বিকেলের আলো গিয়ে দেয়ালের ছায়ায় গলে যায়।
প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা সে বসে জানালার পাশে। তার একটাই অভ্যাস—চুপ করে বসে থাকা। সে কাউকে ফোন করে না, কারো ফোনও আসে না। পরিবার বলতে কেবল একটি ছোট্ট পোষা বিড়াল—নাম তার সাদা। তার বাবা-মা থাকেন চট্টগ্রামে। যোগাযোগ হয় না বহুদিন। কী এক পারিবারিক দুর্ঘটনার পরে সম্পর্কের সেতু ভেঙে গেছে।
তবুও নিশাত বাঁচে। কারণ সে জানে—এখানে আকাশ নীল।
শহরের কোলাহলে আটকে থাকলেও সে প্রতিদিন নিজেকে বোঝায়, “সব ঠিক আছে নিশাত, একদিন ঠিক ঠিক জায়গায় পৌঁছাবে।” সে কাউকে বলে না, কিন্তু একাকীত্ব তার নিত্য সঙ্গী।
তার পাশের ফ্ল্যাটে নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে। ছেলেটির নাম তামিম। শান্ত, ভদ্র, চোখে একটা নির্জন আলো। ছেলেটির জীবন নিয়েও যেন একরাশ গল্প জমে আছে। প্রথম দিন থেকেই সে নিশাতকে লক্ষ্য করে। মেয়েটির চুপচাপ থাকা, আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা, কিংবা সাদা বিড়ালটিকে কোলে নিয়ে বসে থাকা তাকে অদ্ভুতভাবে টানে।
একদিন তামিম সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল, নিশাত তখন জানালায় বসে ছিল। হঠাৎ ঝড়ের হাওয়ায় তার পড়া বইটা উড়ে যায় নিচে। তামিম সেটা কুড়িয়ে এনে তার হাতে দিয়ে বলল,
“বইটা খুব ভালো লাগছে বুঝি?”
নিশাত এক ঝলক তাকিয়ে মৃদু হাসল, “হ্যাঁ, একটু বাঁচার চেষ্টা।”
তামিম থমকে গেল। এমন জবাবের মানে বোঝা যায় না সবসময়, কিন্তু তার চোখে কষ্ট স্পষ্ট। সে শুধু বলল, “বাঁচার চেষ্টাটা চলুক। বই যতক্ষণ আছে, পথ থামে না।”
সেই ছোট্ট কথাটার পর নিশাত একদিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি এখানে নতুন?”
তামিম হেসে বলল, “হ্যাঁ। পুরোনো শহর, নতুন জীবন খুঁজতে এসেছি।”
তারপর আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব হলো। তবে সেই বন্ধুত্ব ছিল নিরব। তারা একে অপরকে ফোন করতো না, বারান্দা থেকেই কথা বলত, বই বিনিময় করত, আর সন্ধ্যার আকাশের রঙ মিলিয়ে মিলিয়ে গল্প করত।
নিশাত একদিন বলল, “তুমি জানো, আমার একবার মনোচিকিৎসকের কাছে যেতে হয়েছিল?”
তামিম চুপ করে থাকল।
“মানসিক অবসাদ অনেক কিছু কেড়ে নেয়, এমনকি নিজেকে ভালোবাসার শক্তিটাও। তখন আকাশ ধূসর মনে হয়, এমনকি গাছের পাতাও হালকা বিষাক্ত মনে হয়।”
তামিম বলল, “আমি জানি।”
নিশাত তাকিয়ে থাকল তার দিকে।
“তিন বছর আগে আমার বোন আত্মহত্যা করেছিল। ঠিক এমনভাবেই সবকিছু ত্যাগ করে। আমিও ভেঙে পড়েছিলাম। আজো সে ফিরে আসে না, কিন্তু তার কথা মাথায় রেখে আমি বেঁচে থাকি। ওর জায়গায় আমি নতুনভাবে পৃথিবী দেখতে চাই।”
নিশাতের চোখে অশ্রু। তারা কথা বলেনি আর কিছু, শুধু দু’জন জানালার পাশে বসে সন্ধ্যার আকাশে তাকিয়ে ছিল। আকাশ সেদিন খুব নীল ছিল।
পরদিন নিশাত একটা ছোট্ট চিরকুট রেখে যায় তামিমের দরজায়—
“তুমি জানো? এখানে আকাশ নীল।
এবং এই নীল আমি তোমার চোখে দেখি।”
তারপর শুরু হলো এক নীরব ভালোবাসা। তারা একে অপরের গল্প পড়ে, না বলা কথাগুলো বোঝে, মাঝে মাঝে একসাথে ছাদে যায়। নিশাত আবার আঁকা শুরু করল, তামিম কবিতা লিখল।
তাদের ভালোবাসা ছিল নিরব, গভীর, কথাহীন। তারা কখনো ‘ভালোবাসি’ শব্দটি বলেনি। কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা বুঝে ফেলেছিল—ভালোবাসা অনেক কিছুই না বলেও প্রকাশ পায়।
একদিন সকালে নিশাতের ঘরে সাদা বিড়ালটা একা একা বসে ছিল। নিশাত নেই। তামিম খুঁজে বের করল—নিশাত হাসপাতালে ভর্তি। বিষণ্ণতা আবার ফিরে এসেছে, এইবার গাঢ়ভাবে।
তামিম তার পাশে ছিল সবসময়, নিশাতের হাত ধরে বলত, “তুমি জানো, আমি তোমার অপেক্ষা করছি। আমি বিশ্বাস করি, তুমি ফিরবে।”
একদিন নিশাত চোখ খুলে তাকাল, কপালে হাত রাখল তামিমের।
“তুমি জানো তামিম,” তার কণ্ঠ কাঁপছিল, “তুমি না থাকলে, আমি হয়তো ফিরে আসতাম না।”
তামিম হাসল, “তুমি জানো? আমি যে দিন তোমাকে প্রথম দেখি, সেই দিন থেকেই আমার কাছে আকাশ নীল ছিল না—তুমি এসে দিলে সেই রঙ।”
তারা দু’জন হাসল।
দিন কাটে। হাসপাতাল থেকে ছুটি পায় নিশাত। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়। তামিম তার জন্য ছোট্ট একটা বারান্দার বাগান তৈরি করে। নিশাত সেখানে বসে ছবি আঁকে, আর তামিম গান গায়।
আর এখন?
তারা দু’জন মিলে একটা ছোট্ট ক্যাফে খুলেছে—নাম দিয়েছে “নীল আকাশ”। সেখানে আসে যারা হতাশ, যারা চুপচাপ, যারা হারিয়ে গেছে জীবন থেকে। তারা এখানে চা খায়, বই পড়ে, গান শোনে, আবার বাঁচে।
নিশাত আর তামিম এখনো হাতে হাত রেখে বসে সন্ধ্যার আকাশ দেখে।
আকাশ এখন সবসময় নীল মনে হয়।
আর তাদের হৃদয়ে আজীবন লেখা থাকে—
“এখানে আকাশ নীল...”
এখানে আকাশ নীল
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
144
Views
9
Likes
0
Comments
5.0
Rating