অপেক্ষা

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
ময়মনসিংহের গফরগাঁও স্টেশনে একটা পুরনো বেঞ্চে বসে আছে রোকসানা। সন্ধ্যা নামছে, কুয়াশা আস্তে আস্তে জমে উঠছে বাতাসে। প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা, একটা লোকাল ট্রেন আধঘণ্টা আগেই ছেড়ে গেছে। কিন্তু রোকসানা এখনো বসে আছে। পাশে একটা কাপড়ের ছোট ব্যাগ, ভেতরে পুরনো একটা খাতা আর কিছু জামা-কাপড়। খাতার শেষ পাতায় লেখা—
“রোকসানা, আমি ফিরে আসব। অপেক্ষা করো। – মাহিন”

এই একটা লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে রোকসানার পুরো জীবন।

মাহিন ছিল রোকসানার পাশের গ্রামের ছেলে। একসঙ্গে বড় হওয়া, হাটে যাওয়া, মাদ্রাসার মাঠে বসে বিকেল পার করা— সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল তাদের গল্প। মাহিন ছিল গ্রামের স্কুলের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র। ওর স্বপ্ন ছিল শহরে পড়ে বড় কিছু হবে, রোকসানার হাতটা শক্ত করে ধরে বলত,
"তোরে নিয়ে ঢাকা যাবো একদিন, রোকসানা। তোকে শাড়ি কিনে দেব নিউমার্কেট থেকে।"

রোকসানা হেসে বলত,
"আমারে কিনে দিতে হবে না কিছু। তুই পাশে থাকলেই চলবে।"

এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার গল্পটায় ফাটল ধরল তখনই, যখন মাহিন একটা এনজিওর চাকরি নিয়ে ঢাকা চলে গেল।
চলতি পথে বলেছিল,
“ছয় মাস কাজ করে টাকা জমাই, তারপর ফিরে আসি। বাপ-দা’র সঙ্গে কথা বলি, বিয়ে ঠিক করি। তুই শুধু একটু অপেক্ষা করিস।”

রোকসানা খুব শান্ত গলায় বলেছিল,
“তুই শুধু প্রতিদিন সন্ধ্যায় একবার ফোন করিস। তাহলেই চলবে।”

প্রথম মাসে প্রতিদিন ফোন আসত। ঢাকা শহরের ধুলো, ট্র্যাফিক আর নতুন অফিসের গল্প বলত মাহিন। তারপর ফোন আসা কমে গেল— সপ্তাহে একদিন, তারপর দশ দিনে একবার, তারপর ধীরে ধীরে কিছুই না।

মোবাইল নম্বরে বারবার রিং হতো, কিন্তু ধরত না কেউ।

রোকসানার চারপাশে কথা ছড়িয়ে পড়ল—
“মাহিন তো এখন শহরের মেয়েদের সাথে মিশে গেছে।”
“ও কি আর ফিরবে?”
“রোকসানারে তো পাত্তা দিতেই না, শুধু দয়া করে ঘুরত।”

রোকসানা কিছু বলত না। প্রতিদিন বিকেলে চলে যেত গফরগাঁও স্টেশনে। দাঁড়িয়ে থাকত প্ল্যাটফর্মের দক্ষিণ মাথায়। মাহিন যে গেট দিয়ে বের হতো একদিন, সেই দিকেই তাকিয়ে থাকত।

সে জানত না মাহিন আদৌ ফিরবে কি না।
কিন্তু বিশ্বাস ছিল— কথা দিয়েছিল মাহিন, বলেছিল "ফিরব"। আর মাহিন তো এমন না যে কথা দিয়ে ভুলে যাবে!

তিন বছর কেটে গেছে।

রোকসানা এখনো বিয়ে করেনি।
গ্রামের মানুষজন রাগ করে, কুকথা বলে, বাবা-মা কাঁদে। তবু সে একাই থেকেছে। কারণ তার বুকের ভিতর আজও বাজে মাহিনের শেষ বাক্য—
“আমি ফিরব, রোকসানা। অপেক্ষা করো।”

আজকের দিনটা একটু আলাদা।
কারণ আজ ঠিক তিন বছর পূর্ণ হলো মাহিনের চলে যাওয়ার।
রোকসানা ভোরে উঠেই স্টেশনে চলে এসেছে, মনে মনে বলেছে—
“আজ যদি তুই ফিরে আসিস, তবে আমি আর কিছু চাইব না।”

স্টেশনের বাতিগুলো জ্বলছে ঝাপসা আলোতে। হঠাৎ করে হালকা বৃষ্টির ছিটে পড়ে। রোকসানা তার ওড়নাটা একটু গুছিয়ে বসে। তখনই পাশ থেকে এক বয়স্ক মহিলা এসে জিজ্ঞেস করেন,
“মা, এত রাতে এখানে বসে আছো কেন?”
রোকসানা মুচকি হেসে বলে,
“অপেক্ষা করছি।”
“কাউকে?”
“হ্যাঁ। যাকে ভালোবাসি, তাকে।”

মহিলা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন,
“সবাই কি ফিরে আসে?”
রোকসানা জবাব দেয় না। কেবল দূরের ট্রেনের হুইসেলের দিকে তাকিয়ে থাকে।

ঠিক তখনই ট্রেন থামে।
একটু ধোঁয়া, কিছু শব্দ, আর হঠাৎ করেই…
ভীড়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে এক ছায়ামূর্তি।

হাঁটছে ধীরে ধীরে, কাঁধে ব্যাগ, চোখে চশমা, মুখে দাড়ি।

রোকসানার বুক কেঁপে ওঠে।
সে উঠে দাঁড়ায়। চোখ বড় বড় হয়ে যায়।
“মাহিন…?”

ছেলেটা তাকায়।
তার চোখেও বিস্ময়, তারপর… জল।

সে ধীরে ধীরে কাছে এসে দাঁড়ায়।
“আমি ফিরেছি, রোকসানা।”
“এত দেরি হলো কেন?”
“জানতাম না, তুই এখনো অপেক্ষা করবি। সাহস হয়নি ফোন করার। অনেকবার এসেছিলাম ফিরে যেতে। আজও ভাবছিলাম হয়তো তুই… ভুলে গেছিস।”

রোকসানা কোনো কথা বলে না। শুধু ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।

মাহিন হাত বাড়ায়।
“তুই কি এখনো আমার?”
রোকসানা বলে,
“আমি তো কখনো তোর থেকে যাইনি।”

স্টেশনের বাতাস তখন থেমে গেছে।
বৃষ্টি থেমে পড়েছে।
আর তিন বছরের অপেক্ষা তখন একটিমাত্র আলিঙ্গনে শেষ হয়েছে।

রোকসানা জানত না এই রাতটায় মাহিন সত্যিই ফিরবে।
তবু সে প্রতিদিন এসেছিল এই বিশ্বাস নিয়ে—
ভালোবাসা যদি সত্যি হয়,
তবে অপেক্ষা কখনো বৃথা যায় না।
55 Views
7 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: