ঘুরে এলাম পাকিস্তান

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
ছেলেটার নাম আদিব। ঢাকার ধানমণ্ডির এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে মিডিয়া স্টাডিজ পড়ে। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, পকেটে নোটবুক, আর মাথায় হাজারটা প্রশ্ন। ক্যামেরা ঘাড়ে ঝুলিয়ে ঘোরে শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে—ডকুমেন্টারি বানানোর খোঁজে।

কিন্তু এইবার সে যা ভেবেছে, তা পুরো অন্যরকম।

একটা স্কলারশিপের সুবাদে তার সুযোগ হয় পাকিস্তানের ইসলামাবাদে একটা আন্তর্জাতিক ভিজুয়াল আর্টস ফেস্টিভ্যালে অংশ নেওয়ার। বাংলাদেশ থেকে বাছাই হওয়া একমাত্র প্রতিনিধি সে-ই।

তবে সবার আগে সমস্যা একটাই—বাড়িতে বলা! আদিব জানে, পাকিস্তান মানে তার মায়ের চোখে যুদ্ধ, বাবার চোখে শত্রুতা। তবু বহু সাহস করে জানায়। মা কিছু না বলে চুপচাপ রান্নাঘরে চলে যান। বাবা কেবল একবার বলেন—

— “যা খুশি করিস, কিন্তু মাথা নিচু করিস না।”


---

প্রথম দিন: একা যাত্রা, ভিন্ন দেশ

ফ্লাইটটা ছিল রাত ৯টার। হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে নেমেই একটা অদ্ভুত অনুভূতি। কেউ নেই পাশে—না মা, না বন্ধু, না স্যর। শুধু নিজে আর ব্যাগ। গন্তব্য—ইসলামাবাদ।

তিন ঘণ্টার মধ্যে সে পৌঁছে যায় পাকিস্তানের রাজধানী শহরে। বিশাল বিমানবন্দর, ঝকঝকে ফ্লোর, শীতল হাওয়া—কিন্তু তবুও কোথাও যেন একটা অচেনা অনুভূতি।

বাইরে অপেক্ষা করছিলেন তার গাইড—ফারহান আলি, একদম পাকিস্তানি টিপিকাল হোস্ট, লম্বা কুর্তা, মাথায় সাদা টুপি।

— “ওয়েলকাম টু পাকিস্তান, ব্রাদার আদিব!”

একটা হালকা হাসি আসে তার মুখে। প্রথমবার কোনো অচেনা মানুষ ‘ভাই’ বলে ডাকল, এত আন্তরিকভাবে।


---

দ্বিতীয় দিন: পাকিস্তানি শহরের ভেতর

ইসলামাবাদ শহরটা ভীষণ সাজানো-গোছানো। ঢাকার কোলাহল থেকে এসে যেন শহরের নিঃশব্দতা কানে লাগে। আদিব থাকে একটি গেস্ট হাউসে, যেখানে অন্যান্য দেশের শিল্পীরাও আছেন—ভারত, শ্রীলঙ্কা, ইরান, এমনকি প্যালেস্টাইন থেকেও।

আদিবের সাথে রুম শেয়ার করে একজন পাকিস্তানি ছাত্র—নাম সাদ আফতাব। সে পড়ছে মিডিয়া অ্যান্ড কালচার স্টাডিজে। প্রথমদিকে একটা অদৃশ্য দেয়াল ছিল তাদের মাঝে।

কিন্তু তৃতীয় দিন সকালে, যখন দু’জন একসাথে কফি খেতে বসে, সাদ জিজ্ঞেস করে—

— “তোমাদের দেশে কি এখনও মনে করা হয় আমরা সবাই জঙ্গি?”

আদিব চমকে যায়। সে সরাসরি বলে না কিছু, কেবল মাথা নিচু করে বলে—

— “আমাদের বইগুলো এখনো ১৯৭১-এ আটকে আছে। তোমাদেরটা?”

সাদ হেসে ওঠে।

— “আমাদের বইয়ে তোমাদের নামই নেই।”

দু’জনেই চুপ করে যায়।


---

চতুর্থ দিন: বন্ধুত্বের জন্ম

ফেস্টিভ্যালে তাদের দলগত কাজ করতে হয়। সেখানে ভারতীয় শিল্পী অনামিকা, এক আফগান ছেলে আমির, এবং আদিব ও সাদ—এই চারজন মিলে একটি ভিজ্যুয়াল আর্ট তৈরি করে। বিষয়: “বর্ডারলেস হার্ট”—সীমাহীন হৃদয়।

প্রজেক্টের মাঝে সাদ একদিন হঠাৎ বলে,

— “চলো, তোমাকে একটা জায়গা দেখাই।”

তারা যায় দামনে-কোহ—ইসলামাবাদের কাছে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এক দর্শনীয় স্থান। সন্ধ্যার আলোয় চারদিক ঝকঝক করছে, শহর নিচে, তারা ওপরে।

সেখানে বসে সাদ বলে—

— “আমার নানা বাংলাদেশে মারা গিয়েছিলেন, ১৯৭১-এ। আমি ছোটবেলা থেকে শুনেছি, কিন্তু কাউকে দোষ দিতে শিখিনি। যুদ্ধ কেবল মানুষের তৈরি। মানুষ চাইলে এটাও পার করে যেতে পারে।”

আদিব অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে।

তারপর বলে—“আমার দাদু শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু তুমি এখন আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।”

সাদ হাত বাড়িয়ে দেয়। দুই দেশ, দুই ইতিহাস, কিন্তু দুই হৃদয়ের মাঝে তখন কোনো সীমান্ত নেই।


---

পঞ্চম দিন: পাকিস্তানি সংস্কৃতি, আর নিজেকে নতুনভাবে দেখা

ফেস্টিভ্যালে সেই দিন ছিল লোকজ সংস্কৃতির প্রদর্শনী। আদিব সেদিন প্রথমবার পরল শালওয়ার-কামিজ, মাথায় পাকিস্তানি স্টাইলের টুপি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই চিনতে পারছিল না।

বাংলাদেশি স্টলের পাশে দাঁড়িয়ে যখন সে তার ডকুমেন্টারি চালায়, সেখানে এসে দাঁড়ায় এক বৃদ্ধ। চোখে চশমা, মুখে দাড়ি।

ডকুমেন্টারি শেষে তিনি এগিয়ে এসে বলেন—

— “তোমার কাজ দেখে চোখে পানি চলে এলো। এই গল্পটা তোমাদের না, আমাদের সবার।”

আদিব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “আপনি কে?”

— “আমি রাজা সিদ্দিক। এই শহরে থাকি ১৯৭৫ থেকে। কিন্তু জন্ম হয়েছিল তোমাদের কুমিল্লায়। বাংলাদেশ আমার প্রথম প্রেম।”

আদিব কেবল তাকিয়ে থাকে। কিছু শব্দ ব্যর্থ হয়ে যায়।


---

ষষ্ঠ দিন: মানুষ চিনে ফেলা

একটা ছোট ঘটনা ঘটেছিল সেদিন। আদিব ও সাদ এক রেস্টুরেন্টে খাচ্ছিল। পাশের টেবিল থেকে এক যুবক এগিয়ে এসে প্রশ্ন করে—

— “তুমি ইন্ডিয়ান না?”

— “না, বাংলাদেশি।”

— “বাহ! আমার মা বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন। তুমি তো আমাদের ভাই।”

আদিব অবাক হয়, আবার চিনে ফেলে—মানুষ আসলে একটাই। পাসপোর্ট আর পতাকা তাদের আলাদা করে, কিন্তু হাসি আর গল্প এক করে।

সেদিন রাতে তারা বারান্দায় বসে প্ল্যান করে—দুই বন্ধু মিলে একদিন বানাবে একটা ফিল্ম, দুই দেশের ছেলে-মেয়ের প্রেম নিয়ে, যাদের ভাষা আলাদা, জাত আলাদা, ধর্ম আলাদা—কিন্তু ভালোবাসা একটাই।


---

সপ্তম দিন: বিদায়বেলা

সকালে বিমান ধরার সময় সাদ তাকে জড়িয়ে ধরে বলে—

— “পরে আসবি কিন্তু। আমাদের লাহোর, করাচি দেখাতে পারলাম না।”

আদিব কেবল হেসে বলে—“তুই আগে ঢাকা আয়। বুড়িগঙ্গা, বইমেলা, আর আমার আম্মার হাতে রান্না করা ভুনা খাসি—সব তোর জন্য রেডি থাকবে।”

বিমানে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে সে। নীল আকাশের নিচে ঝাপসা হয়ে আসা শহরটার নাম ইসলামাবাদ, কিন্তু সেখানে সে রেখে এসেছে একটা বন্ধুত্ব, কিছু গল্প, কিছু চোখের জল আর বহু প্রশ্নের উত্তর।


---

শেষকথা

দেশ, ভাষা, ইতিহাস—সব কিছুতেই বিভাজন হয়তো থাকবে। কিন্তু আদিব বুঝেছে—মানুষের হাসিতে কোনো পাসপোর্ট লাগে না, গল্প বলার জন্য ভিসা লাগে না, আর মনে ভালোবাসা থাকলে ভূগোল কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
83 Views
6 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: