তোমায় ভালোবেসে…
আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম।
আসলে ভালোবাসা এমনই— একবার কারো মধ্যে ডুবে গেলে, নিজের অস্তিত্বটা পর্যন্ত অন্যের চোখে খুঁজে নিতে ইচ্ছে করে।
তোমার নাম ছিল— আয়ান।
আর আমি?
তোমার চোখে আমি ছিলাম "একটা চুপচাপ, বইপাগল মেয়ে", যার নাম তুমি ভুলে যেতে পারতে, কিন্তু আমার চাওয়া তুমি কোনোদিন ভুলতে পারতে না।
তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে। আমি তখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, বাংলা সাহিত্য পড়ি, কবিতা নিয়ে বাঁচি, আর তুমি পড়ো ফিন্যান্স, অঙ্কে ডুবে থাকা এক ব্যস্ত মানুষ।
তবে সেদিন তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে,
"একটা কবিতা সাজেস্ট করবে? যার মধ্যে ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে, অথচ প্রকাশ না হয় স্পষ্টভাবে?"
আমি তাকিয়ে বলেছিলাম,
"জীবনানন্দের 'বনলতা সেন' পড়েছেন?"
তুমি হেসে বলেছিলে,
"পড়েছি। তবে আজ যদি তুমি আমাকে পড়ে শোনাও, তাহলে সেটা নতুন করে শুনব।"
তোমার সেই হাসিটা, আমি ভুলিনি।
সেই মুহূর্ত থেকেই আমার ভেতরে এক অদ্ভুত আলো ফুটে উঠেছিল। প্রথমবার কারো সঙ্গে কথা বলেই মনে হয়েছিল, এই মানুষটা হয়তো আমার বুকের মধ্যে জমে থাকা কষ্টগুলো বুঝবে।
তোমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটা গভীর হতে বেশি সময় লাগেনি।
তুমি আমার জন্য ক্লাস শেষে অপেক্ষা করতে, আমি তোমার জন্য লাইব্রেরিতে চুপ করে বসে থাকতাম। একদিন হঠাৎ বললে,
"তোমার চুলে একটা লাল ফিতেও অনেক সুন্দর লাগে।"
আমি সেদিন জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছিলাম, যাতে তুমি না দেখতে পাও— আমার গাল কীভাবে লাল হয়ে উঠেছিল।
তোমার সঙ্গে সন্ধ্যার আড্ডা, হোস্টেলের বারান্দায় চুপ করে বসে থাকা, কিংবা শহরের ভাঙা রেললাইনের পাশে বসে চায়ে চুমুক— সবই যেন একেকটা কবিতার পংক্তি ছিল।
আমরা কখনো বলতে পারিনি 'ভালোবাসি'।
তবু প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে আমরা একে অপরকে ভালোবেসেছি— নিঃশব্দে।
তবে প্রতিটা গল্পে যেমন হঠাৎ একটা ছায়া নামে, আমাদের মাঝেও নেমে এসেছিল।
তোমার পরিবার তোমার জন্য একজন পাত্রী ঠিক করল— লন্ডনে পড়া শেষ করা, ধনী পরিবারের মেয়ে।
তুমি আমাকে বললে,
"আমি চেষ্টা করব, কিছু একটা করব, তুমি শুধু আমাকে অপেক্ষা করতে দিও।"
আমি মাথা নাড়লাম। চুপচাপ রইলাম।
আমি জানতাম, অপেক্ষা মানে কষ্ট, কিন্তু তোমার জন্য আমি যেকোনো কিছু করতে রাজি ছিলাম।
সেই অপেক্ষা গিয়েছিল ছয় মাস, তারপর একদিন আমি শুনলাম— তোমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
তুমি আর কিছু বলোনি।
আমি আর জিজ্ঞেস করিনি।
তোমার বিয়ের রাতে আমি চুপচাপ বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলাম। তোমার একটা কবিতা আমার বুকের খাতায় আজও লেখা—
“তুমি যেখানেই যাও, আমি ভালোবেসে যাবো।
যদিও তুমিও একদিন ভীষণ ভুলে যাও আমায়…”
তারপর তুমি চলে গেলে আমার জীবন থেকে।
হয়তো একেবারেই না, কিন্তু এমন দূরে, যেখান থেকে আর ফিরে আসা হয় না।
আমি পড়াশোনা শেষ করলাম, একটা স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করলাম। ছেলেমেয়েদের চোখে তোমার চেহারা খুঁজে বেড়াতাম— কেউ যদি তোমার মতো হেসে ফেলে, কেউ যদি তোমার মতো চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।
ভালোবাসা শেষ হয়নি।
আমি বিয়ে করিনি।
কেউ জিজ্ঞেস করলে বলি, “মন ঠিক হয় না।”
কিন্তু আসলে, মন তো আজও তোমার ভরাট হাসিতেই আটকে আছে।
অনেক বছর পর, হঠাৎ একদিন তুমি দেখা দিলে।
স্কুলের বাইরে দাঁড়িয়ে আছো— কোলে একটা ছোট্ট মেয়ে, আর পাশে দাঁড়ানো তোমার স্ত্রী।
তুমি আমাকে দেখলে। আমি মাথা নিচু করলাম। তুমি এগিয়ে এলে।
“কেমন আছো?”
তুমি জিজ্ঞেস করলে।
“ভালো,” বললাম আমি।
মুখে হাসি ছিল, কিন্তু ভিতরে আবার ঢেউ উঠেছিল।
তুমি বললে,
“আজও কবিতা পড়ো?”
আমি মাথা নাড়লাম।
“তোমার জন্য পড়ি না, নিজেকেই পড়াই।”
তুমি কিছু বললে না। শুধু একটুখানি দুঃখ নিয়ে বললে,
“তোমায় ভালোবেসে আমি অনেক কিছু পেয়েছিলাম, কিন্তু সাহস পাইনি।”
আমি হেসে বললাম,
“আমি সাহস দিয়েছিলাম, কিন্তু তুমি নিতে চাওনি।”
তুমি চলে গেলে, আর আমি আবার সেই ভাঙা রেললাইনের দিকে হাঁটলাম।
তোমার চলে যাওয়া মেনে নিয়েছি অনেক আগেই, কিন্তু আজ আবার মনে হলো— ভালোবাসা একবার হয়, আর সেটা আজীবন রয়ে যায়।
তোমায় ভালোবেসে আমি কিছু হারাইনি।
আমি এক রকমের পূর্ণতা পেয়েছি— যে ভালোবাসা ছিল একতরফা, কিন্তু সত্যিকারের।
তোমায় ভালোবেসে…
আমি এখনো প্রতিটি ভোরে ঘুম ভাঙার পর তোমার নামটাই আগে মনে করি।
তোমায় ভালোবেসে…
আমি আজও আমার পৃথিবীটা গুছিয়ে রাখি।
তোমায় ভালোবেসে
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
101
Views
4
Likes
0
Comments
5.0
Rating