ডাক্তার জামাই

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
বাবা-মা বড় তোয়াজ করছিলো চিনু দালালকে। আম বাগান বেঁচে হবু ডাক্তার জামাইকে নার্সিং হোম বানিয়ে দেবে বলে। আমাদের স্বাদের আমবাগানের জন্য আমার কষ্ট হচ্ছিল। টাকাপয়সার প্রতি আমার লোভ নেই কিন্তু বাজারের কারবাইডে পাকা আম আর গাছ পাকা আমের স্বাদে মধ্যে বিস্তর ফারাক। যাইহোক মা-বাবার সব উৎসাহ জল ঢেলে দিলো সঞ্জয়। ঘরে খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো আমি, খুশি হলাম ডবোল, আম বাগানের জন্য শুধু নয় , দলে ভারী হবার খুশিতেও আত্মহারা হলাম আমি।

বহু বছর ধরেই সঞ্জয়কে জামাই হিসেবে মনে মনে ঠিক করে রাখাছিল এ বাড়ি থেকে। তাই লরি থেকে লাগেজ প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের সাথে সাইকেলটা আবিস্কার হওয়ায় হতাশ হলো সবাই। সাইকেল যদিও সাস্থ্য সচেতনতার প্রতীক। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনে সাথি হলে বড়ো দুঃশ্চিন্তার। আর একজন জনপ্রিয় ডাক্তার বাবু যখন হাসপাতালে যায় সাইকেলে তখনতো তা খুবই চিন্তার।কারণ গরুর ডাক্তারেরও নাকি আজকাল বি এম ডাবলুর বাইক নিয়ে ঘোরে মথুরা বৃন্দাবনে।

প্রায় একযুগ আগের কথা । আমার রাজনৈতিক গুরু রুদ্রদা হঠাৎ হারিয়ে গেছিলো আমাদের মানচিত্র থেকে। যখন আবির্ভাব হলেন তিনি তখন, এসে মায়ের রান্নার প্রসংশায় পঞ্চমুখ , বুঝতে পারলাম কিছু ফন্দি আঁটছে রূদ্রদা । পরে আবিষ্কার করালাম, সঞ্জয় মেধার জোরে স্কলারসিপ পেয়ে ডাক্তারি পড়তে হাজির হয়েছে এ শহরের এক নামকরা ম্যেডিকেল কলেজে। কিন্তু হোস্টেল পায়নি , মেসে যাওয়ার টাকা নেই। তাই আশ্রয় চাই মাস খানেকের জন্য। কিন্তু বাড়ি তাকে ছাড়তে হয়নি আর। কারন শুধু একটা ঘর নয়, মা বাবা সহ আমার বোনের মনটিও সে দখল করেছিলো নিজের মিষ্টি স্বভাব দিয়ে।

কিন্তু পাশ করে গ্রামে একটি হাসপাতালে চলে গেল ও। যোগাযোগ ছিলো আমাদের ওর সাথে । দূরত্ব অনেকটা হওয়ায় সবকিছু তো জানতে পারিনি আমরা। স্বভাব চরিত্রের দিকে ভালো। সুনাম তো বেশ। সবাই এক ডাকে চেনে ওকে। কিন্তু সুনাম অর্জন করলেই যে অর্থনৈতিক ভাবে সফল হয়না সে আমাদের মাথায় ঢোকেনি তখন। সফলতা হলো বাহ্যিক, শান্তি, সুখী হওয়া অন্তরে। শান্তির জন্যই নাকি সেবা করে গেছে ও।

এক সময় পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় ব্যবসা ছিলো অস্ত্র ব্যবসা । এখন হয়েছে স্বাস্থ্য ব্যবসা সবচেয়ে বড়ো ব্যবসা। দেবতারাও মরতে ‌ভয় পায় । তাইতো অমৃত এর মন্থনের সময় অসুরদের সাথেও বন্ধুত্ব করেছিলেন তারা। তাই মানুষের মৃত্যু ভয় আছেই। আর এই ভয়কে কাজে লাগিয়ে কিছু মানুষ আয় করছে অনেক টাকা। পেট্রোল, কিংবা বিদ্যুৎ এর দাম বাড়লে বিক্ষোভ টিক্ষোভ হয় কিন্তু ওষুধ এর দাম নিয়ে কেউ কি কথা বলে? বনধের বিরুদ্ধে যে সব দল বিরোধিতা করে, সেই সব দল আজ মহামারী জুজু ‌দেখিয়ে লকডাউন করছেন আজকাল। এটাই মৃত্যু ভয়।

যাইহোক এক বন্ধুর মুখেই শুনেছিলাম পাঁচ হাজার টাকার পেসমেকার লাখ টাকায় বেচা হয়, তাতে অধিকাংশ টাকাটাই যায় ডাক্তার বাবু আর অন্যান্য বাবুদের ঘরের। শুনেছি বিল বারানোর জন্য নাকি নার্সিং হোম গুলোতে, মৃত ব্যক্তিকেও এরা জীবিত বলে চালিয়ে যায়। অথচ সঞ্জয় সাইকেল করে এমার্জেন্সি রোগী দেখতে যাওয়া ডাক্তার বাবু । এ ডাক্তার বাবু প্রেসক্রিপশনে কোন পরীক্ষা করা কথা থাকেনা, উল্টে থাকে সস্তা সস্তা ওষুধ। অনেক দোকানে নাকি রাখেই না ওসব ওষুধ। সারাজীবন টিভির পর্দায় দেখতে পাই আমরা বাড়তে হলে খেতে হবে হেলথ ড্রিক্স , ও বলে পেটভরে ডালভাত খেয়ে খেলাধুলা করতে। ইমুন্টি পাওয়ার বারতে খেতে হবে চৌদ্দ শাক, তুলসী পাতা।গেদাল পাতার ঝোল খেলেই পেট ভালো থাকবে। ও বলে গাঁয়ের মানুষের অতো অসুখ বিসুখ হতেই পারে না, বড়ো জোর পেটখারাপ,জ্বর, সর্দিকাশি। তাই মাঝেমধ্যেই থানকুনি পাতা আর তুলসী পাতা খেলে নাকি ওর মতো ডাক্তারে দরকার নেই ও গ্রাম।

যাই হোক এতক্ষনে বুঝতেই পারছেন আমার বাবা কেন হতাশা হয়েছেন। আমি আনন্দিত হলাম আর আম খাওয়াটা বন্ধ হবে না আমার। তবে এ শহরের হাসপাতালে ওর চাকরি থাকবে তো? আসলে ওকে গ্রামের লোকজন ভগবান ভাবলেও, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ওকে বিদায় দিয়েছে। কারণ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা হলে, নার্সিং হোম চলবে কি করে? তবে মা বাবা সঞ্জয়কে নিয়ে গর্ব করলেও দুশ্চিন্তায় পড়লেন খুবই। ভালোমানুষ হওয়া ভালো । কিন্তু ভগবান হওয়াটা তো বিপদজনক। কারণ ভগবানের কপালে নকুল দানা ছাড়া কিছুই জোটে না।

79 Views
2 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: