অবশেষে বিয়ে

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
সকাল আটটা। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় হঠাৎ এক অদ্ভুত শীতলতা নেমে এসেছে। রাস্তার ধারে থাকা কফিশপের জানালায় বাষ্প জমে গেছে, আর তার ওপাশে বসে আছে দুইজন— এক ছেলে, এক মেয়ে। তারা মুখোমুখি, কিন্তু তাদের মাঝে জমে আছে হাজার কথার নীরবতা।

"তুমি জানো, আজ আমার বিয়ে," বলল মেয়েটা। ঠোঁটের কোণে এক হালকা হাসি, চোখে ক্লান্তি আর এক চিলতে অপূর্ণতা।

ছেলেটা তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, "জানি।"

"তুমি কিছু বলবে না?"

ছেলেটা একটু চুপ করে রইল, যেন মনে মনে কিছু হিসেব মেলানোর চেষ্টা করছে। তারপর বলল,
"বলার অনেক কিছু ছিল, কিন্তু সময় মতো বলা হয়নি। এখন বললেও কি কিছু বদলাবে?"

মেয়েটা হালকা হেসে বলল, "তুমি না বললেও আমি জানতাম, তুমি ভালোবাসো। জানতাম সেই দিন থেকেই, যেদিন আমি প্রথমবার অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম আর তুমি সারা রাত আমার পাশে ছিলে।"

ছেলেটার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। একটু চমকে গিয়ে বলল,
"তাহলে তুমি চলে গেলে কেন?"

"কারণ আমি ভেবেছিলাম, তুমি সাহস করে কিছু বলবে। তুমি বলবে, হায়াৎ, তুমি আমার পৃথিবী। কিন্তু তুমি চুপ ছিলে। আমি অপেক্ষা করেছি, প্রতিদিন, প্রতি রাত। শেষ পর্যন্ত পরিবার যখন অন্য কোথাও বিয়ের কথা তুলল, আমি ভেঙে পড়ে হ্যাঁ বলেছিলাম। হয়তো তখন চাইছিলাম তোমার মুখ থেকে একটা 'না' শুনতে। কিন্তু তুমিও চুপ ছিলে।"

ছেলেটার নাম রাফি। সে একজন ফটোগ্রাফার, খুবই সংবেদনশীল আর আত্মভোলা।
হায়াৎকে সে ভালোবেসেছিল তার চোখে প্রথম দেখা সেই আকাশভরা বিষণ্নতা দেখে।
আর হায়াৎ?
সে ভালোবেসেছিল রাফির নিঃশব্দ যত্ন আর নির্ভেজাল উপস্থিতি।

তারা একসঙ্গে কতো কিছু করেছে— রোদের দুপুরে ছাদে বসে গল্প, বৃষ্টির দিনে হাত ছুঁয়ে হেঁটে যাওয়া, সন্ধ্যার চায়ের কাপে ভাগ করে নেওয়া কষ্ট, আর রাতের গভীরে নিরব ভালোবাসার আলাপে জমে থাকা অনুচ্চারিত অনুভব।

কিন্তু সব কিছুর মধ্যেই একটা জড়তা ছিল, এক অদৃশ্য প্রাচীর— যা কখনো পেরোনো হয়নি।

"তুমি জানো, আমি এখনো চাই, কেউ এসে বলুক— ‘চলো হায়াৎ, আমি তোমায় নিয়ে যাব। অন্য কাউকে নয়।’" হায়াৎ আস্তে বলল।
"তুমি কি এখনও চাও?" রাফি জিজ্ঞেস করল।

"যদি তুমি হও সেই কেউ… তবে হ্যাঁ।"

এক মুহূর্ত নীরবতা। রাফির চোখে কিছু ঝলমলে হয়ে উঠল। এরপর সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল,
"চলো, হায়াৎ।"

"কোথায়?"

"চলো, পালাই।"

"রাফি, এটা সিনেমা না। তুমি এতদিন চুপ ছিলে, আর আজ...?"

"আজ তুমি বিয়ে করছো, আজ আমি হারিয়ে ফেলব সব। তাই আজ সাহস করে দাঁড়িয়েছি। আমি জানি, অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু যদি তুমি একবার বলো, ‘চলো’— আমি তোমায় নিয়ে চলে যাবো। অন্য কোথাও, অন্য জীবনে, শুধু তুমি আর আমি।"

হায়াৎ চুপ করে তাকিয়ে থাকল তার দিকে। এরপর ধীরে ধীরে বলল,
"আমি তো সেইদিন থেকেই অপেক্ষা করছিলাম তোমার এই কথাটার জন্য।"

হায়াৎ উঠে দাঁড়াল। দুই হাত এক করে বলল,
"চলো, রাফি।"

শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে তারা বেরিয়ে পড়ল নতুন জীবনের খোঁজে। কোনো পরিকল্পনা নেই, কোনো গন্তব্য নেই— শুধু ভালোবাসা আর সাহস।

তাদের চলে যাওয়ার খবর চুপিচুপি পৌঁছে গেল হায়াতের বাড়িতে। প্রথমে চিৎকার, কান্না, অভিমান— কিন্তু শেষে একরাশ নিরবতা। মা জানতেন, মেয়ের চোখে যে আলো তিনি বিয়ের আগের রাতে দেখেননি, সেটাই ভালোবাসা। বাবাও বুঝেছিলেন, জোর করে ধরে রাখা যায় দেহ, হৃদয় নয়।

তিন দিন পর রাফি আর হায়াৎ ফিরে এল শহরে। হাতে একটুকরো বিয়ের কাগজ, যেটায় লেখা—
“রাফিউল করিম ও হায়াৎ বিনতে জামান, এই মূহূর্তে স্বামী-স্ত্রী হিসাবে বৈধভাবে একত্রে জীবন শুরু করল।”

তারা কিছু বলেনি। শুধু দাঁড়িয়ে ছিল দু’জনে পাশাপাশি। হায়াতের বাবা এগিয়ে এসে বললেন,
"তোমাদের আশীর্বাদ করি। সুখে থেকো।"

আর মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
"তোমার চোখে আজ শান্তি দেখছি, হায়াৎ। এই শান্তির জন্যই তো মা হয়েছি।"

তাদের জন্য আর কিছু চাওয়া ছিল না।
তারা ভালোবেসেছিল। সময় হারিয়েছিল। সাহস পায়নি। তবু শেষমেশ ভালোবাসার জয় হয়েছিল।

অবশেষে বিয়ে হলো।
এটা শুধু একটুকরো কাগজের নয়, এ এক জীবনের প্রতিজ্ঞা।
যেখানে দেরি হয়েছে, ভুল হয়েছে, তবু ভালোবাসা জিতেছে।
তারা একসঙ্গে পথ চলা শুরু করল—
বুকের ভিতর পুরে রাখা প্রতিটা “আমি চাই” নিয়ে,
ভবিষ্যতের সমস্ত “আমরা” তৈরি করতে।
73 Views
4 Likes
0 Comments
5.0 Rating
Rate this: