বিরাট গাছের ছায়ায় জমিদারের বাড়ি থেকে দূরে, পাকা রাস্তা থেকে খানিকটা ঢিলে মাটি ও বাঁশের বেড়ার ভিতরে লুকানো ছিল ফকির আলীর ছোট্ট কুঁড়েঘর। বছর পঁইত্রিশ, দাড়ি-মোছ আছে, চোখে গভীর ভাবনা।
সে ছিল গাঁয়ের কৃষক—নির্জন বাংলার এক ছোট্ট গ্রামে, যেখানে মানুষ শোষণ আর দুঃখের মাঝেও বেঁচে থাকার লড়াই চালাত। তার বাড়ির সামনে ছোট্ট এক টেবিল, সেখানেই বসে সন্ধ্যা পড়ে গ্রামের লোকজন আসত। কেউ দুঃখ শোনাত, কেউ পরামর্শ নিত। ফকির আলী ছিল তাদের নেতা।
জমিদারের বাড়ির ভেতর আর্থিক জোর ও রাজনৈতিক ক্ষমতার খেলাই চলে। জমিদার ছিল এক ধনী, ক্ষমতাধর মানুষ, যিনি তার অধীনে থাকা মানুষের জীবন কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। জমিদারের দোসররা ছিল ফকির আলীর জীবনের শত্রু, কারণ তারা চাইল গরিব মানুষের দুঃখ বোঝে না, তাদের ওপর নির্যাতন চালায়।
একদিন বিকেলে, জমিদারের কুশীলবরা গ্রামে এসে ঘোষণা করল—কর বৃদ্ধির কথা। মানুষ চুপ করে শুনল, কারোর মুখে কিছু বলতে সাহস ছিল না।
ফকির আলী উঠে দাঁড়ালেন,
— “আমরা এত দিন ধরে দাসত্ব করেছি, আর কখনো কর দিতে হবে, সেটা সীমা পার করে চলেছি। এখন সময় এসেছে আমরা একত্রিত হয়ে আমাদের অধিকার চাইব।”
গ্রামের যুবকরা প্রথমে দ্বিধায় পড়লেও ফকির আলীর চোখে দেখে সাহস পেয়েছিল। তারা একসঙ্গে গ্রামের বড় মাঠে জড়ো হল।
মাঝে মাঝে জমিদারের দোসররা এসে বাধা দিলেও, তারা বুঝেছিল মানুষকে চাপিয়ে রাখা যায় না।
ফকির আলীর ছোট ছেলে মিজান, বয়স ছিল মাত্র বারো, বাবার পাশে ছিল। সে বলল,
— “বাবা, আমি বড় হয়ে আপনাদের সঙ্গে দাঁড়াবো।”
তাদের সংগ্রাম শুরু হল, কিন্তু জমিদারের দোসররা কঠোর। তারা রাতের অন্ধকারে গ্রামে ঢুকে তাণ্ডব চালায়, কৃষকের খেতখামার পুড়িয়ে দেয়, ফসল নষ্ট করে।
ফকির আলী সবার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,
— “আমরা যদি ভয়ে দমে যাই, তাহলে হারিয়ে যাব। সাহস করতে হবে, এক হয়ে লড়াই করতে হবে।”
গ্রামের মানুষের মধ্যে একটা নতুন শক্তি জেগে উঠল। তারা একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে শুরু করল।
একদিন গ্রামের পাশের নদীতে এক মেয়ের খবর এল, সে অনাথ, দুঃস্থ, অসুস্থ। কেউ তাকে সাহায্য করতে চাইছিল না।
ফকির আলী ছুটে গেল তার কাছে, মেয়েটাকে হাতে তুলে নিয়ে গ্রামের হাকিমের কাছে নিয়ে গেল।
মেয়েটি ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগল। গ্রামের মানুষ দেখল, ফকির আলী শুধু সংগ্রামী নন, মানবিকও।
জমিদারের লোকজন এই মানবিকতা দেখে হতবাক। তাদের ভয় হয়েছিল ফকির আলীর জনপ্রিয়তা থেকে।
তাদের এক পরিকল্পনা ছিল—ফকির আলীকে গ্রাম থেকে দূরে সরিয়ে দিতে হবে। তারা সুতোর খুঁজি শুরু করল।
তবে ফকির আলী জানতেন, এটা সহজ নয়। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস ছিল তার ওপর।
একদিন জমিদার নিজে এল গ্রামের কাছে। ভয়ে নয়, কৌশলে।
— “ফকির আলী, তুমি একটা মহান মানুষ। কিন্তু তুমি কি বুঝতে পারছো, আমি রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করছি? তোমাদের বঞ্চনা হলে আমি কেমন করব?”
ফকির আলী শান্ত ভঙ্গিতে বলল,
— “জমিদার ভাই, আইন-শৃঙ্খলা নয়, আমাদের অধিকার-অধিকার রক্ষা কর। মানুষের সুখ চাই। করের বোঝা কমাও।”
জমিদার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল,
— “তুমি কি আশ্বাস দিতে পারো, তোমরা শান্তি বজায় রাখবে?”
ফকির আলী বলল,
— “আমাদের আশ্বাস হচ্ছে, আমরা শুধু শান্তি চাই, অধিকার চাই। তার জন্য লড়াই করব।”
এই কথোপকথনের পর জমিদারের দোসরদের আচরণ কিছুটা পরিবর্তিত হয়। কিছু ন্যায্য কর মওকুফ করা হয়।
গ্রামের মানুষ খুশি হলেও সাবধান ছিল। তারা বুঝত, এই সংগ্রাম সহজ নয়।
দিন, মাস, বছর কেটে গেল। ফকির আলীর নেতৃত্বে গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে তাদের অধিকার পেতে শুরু করল।
ফকির আলী আর্থিক ভাবে খুব সমৃদ্ধ না হলেও, তার নাম ছিল গ্রামে এক আদর্শ মানুষ। তার ছোট ছেলে মিজানও বড় হয়ে গ্রামের নেতা হয়।
একদিন গ্রামের বড় গাছের তলায় বসে ফকির আলী বলল,
— “মিজান, মনে রেখো, মানুষের অধিকার রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।”
মিজান মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
ফকির আলীর সংগ্রাম সেই যুগের কথা বয়ে নিয়ে চলে—রাজা-বাদশার ছায়ায় গ্রামের মানুষের জীবন, যেখানে ক্ষমতার ছায়ায় লুকানো ছিল মানবতার আলো।
রাজা-বাদশার যুগে
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
132
Views
5
Likes
1
Comments
0.0
Rating