কালো জাদু

বাংলার ঘনসবুজ এক গ্রাম, নাম সোনারপুর। সোনারপুরের পাড়ায় সবাই শান্তিপ্রিয়, প্রকৃতির কাছে নিবেদিত। নদীর কল-কল শব্দ আর পাখির ডাক যেন এই গ্রামের প্রাণ। কিন্তু এই শান্তির ভেতর একটা গোপন কথা লুকিয়ে আছে—একটা কালো জাদুর ছায়া, যা দশকের পর দশক ধরে গ্রামবাসীদের ভীত করে রেখেছে।

রুমি ছিল সোনারপুরের এক তরুণী, সতের বছর বয়সী, সাদাসিধে মিষ্টি মেয়ে। তার মা-বাবা মারা গেছে ছোটবেলায়, দাদা-মামা তাকে বড় করেছে। কিন্তু রুমির দাদা ছিলেন গ্রামের মানুষদের চোখে রহস্যময়। কেউ বলতে ভালোবাসত না, কারো কারো মনে জেগে থাকতো তার প্রতি একটা ভয়ের ভাবনা।

গ্রামের বাচ্চারা শীতের সন্ধ্যায় একসঙ্গে জড়ো হয়ে রুমির বাড়ির পাশ দিয়ে চলতো না। তারা বলতো,
— “দাদার কাছে গেলে বাঘের আত্মা নেমে আসে।”
— “রুমি যখন চোখে তাকায়, মনে হয় সে অন্ধকারের জগত থেকে কথা বলছে।”

রুমি কখনো এসব কথার প্রতি মন দেয় না। তার জীবনের একমাত্র আশা ছিল স্নাতক শেষ করে বড় হয়ে শহরে পড়াশোনা করা।

একদিন গ্রামের স্কুলে শহর থেকে নতুন শিক্ষক আসেন—মাসুম। ঢাকার এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, গ্রামবাসীর মাঝে শিক্ষা ছড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন।

মাসুম খুব দ্রুত রুমির সাথে বন্ধুত্ব করলো। তারা অনেক সময় একসাথে পড়াশোনা করত, গাছের নিচে বসে গল্প করত। কিন্তু মাসুম লক্ষ্য করেছিল, রুমির মাঝে কিছু একটা রহস্য আছে।

এক রাতে যখন তারা একসাথে বনের পানে হাঁটছিল, হঠাৎ রুমির চোখে অদ্ভুত আলো ঝলমল করলো, আর সে কিছু অচেনা ভাষায় উচ্চারণ করতে শুরু করল। মাসুম ভয় পেয়ে গেল, আর সঙ্গে সঙ্গে রুমিকে ধরে নিয়ে বাড়ি ফিরল।

ঘরে এসে রুমি বুঝতে পারল, তার দাদার সেই কালো জাদুর প্রভাব তাকে ছুঁয়ে গেছে। সে নিজেও ভয় পাচ্ছিল।

রুমির দাদা, হযরত আজিজ, একসময় গ্রামের সবচেয়ে ভয়ংকর জাদুকর ছিল। সে কালো জাদুর মাধ্যমে ক্ষমতা অর্জন করেছিল। কিন্তু তার আত্মার কিছু অংশ সেই কালো জাদুর সঙ্গে লিপ্ত ছিল, যা রুমির রক্তে প্রবাহিত।

রুমি মাসুমকে জানাল, সে নিজেকে মুক্ত করতে চায়, কিন্তু কিভাবে জানে না।

মাসুম সিদ্ধান্ত নিল, সে রুমির সাহায্য করবে। তারা দুজন সন্ধান করল গ্রামের এক প্রাচীন গুহার, যেখানে হযরত আজিজ কালো জাদু শিক্ষা দিত।

গুহার ভেতর কালি মূর্তি, জাদুমন্ত্র, প্রাচীন গ্রন্থ—সবকিছু ছিল ভয়ঙ্কর।

এক রাতে, তারা গুহায় ঢুকল, যেখানে কালো জাদুর শক্তি সবচেয়ে বেশি প্রবল। রুমি জানাল, তার দাদার আত্মা এখনো সেখানে বন্দী।

তারা একসাথে প্রাচীন মন্ত্র পাঠ করল, অন্ধকারের শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করল।

ভয়ের মধ্যে, রুমি ও মাসুম একে অপরের সাহস দিয়ে নিজের ভয় কাটিয়ে উঠল।

শেষে, কালো জাদুর শক্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে লাগল, গুহা আলোয় আলোকিত হল।

গ্রামের মানুষ বুঝতে পারল, রুমি মুক্ত হয়েছে, আর মাসুম সেই অন্ধকার জগতের বিরুদ্ধে এক নতুন আলো।

রুমি আর মাসুমের বন্ধুত্ব গড়ে উঠল গভীর ভালোবাসায়, যা অন্ধকার জাদুরও কাছে শক্তিশালী ছিল।
221 Views
5 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই