ভাইয়া

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
গল্পটি পড়বেন মজা না পাইলে এমবি ফেরত....
কাজিনের বিয়ের দাওয়াত খেতে এসে শুনলাম বর পালিয়ে গিয়েছে। মেজো কাকা বাবাকে ধরেছে,তার সম্মান যেভাবে হোক রক্ষা করতে হবে।

ফলস্বরূপ বোলির পাঠা হতে হলো আমাকে। বাবা-মা আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছা না জেনেই মেজো কাকার সম্মান বাঁচাতে আমার সাথে বিয়ে ঠিক করে ফেললো তাদের মেয়ের।

খবরটা শোনার পর আমারও ইচ্ছা করছিলো বরের মত পালিয়ে যেতে,কিন্তু সে পথও বন্ধ করে দিয়েছে আবার বুদ্ধিজীবী বাবা।
এমনভাবে বগলদাবা করে ধরে রেখেছে,যেন আমি চোখের দৃষ্টি হারানো পথভোলা এক পথিক।

শেষমেশ কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে ছোট থেকে যাকে কোলেপিঠে করে বড় করলাম,তার সাথে বিয়েতে বসতে হলো। কি লজ্জা কি লজ্জা!

লজ্জায় ইচ্ছা করছে ইঁদুর মরা বি*ষ খেয়ে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করি। কি লাভ এই স্বার্থপর দুনিয়াতে বেঁচে থেকে।
কত ইচ্ছা ছিলো ধুমধাম করে বিয়ে করার,ফটোগ্রাফারের সামনে বর সেজে স্টাইল মেরে ফটো তুলে ফেসবুকে আপলোড করার।
কিন্তু অন্যেজনের ফেলে যাওয়া বউকে বিয়ে করছি এইটা বন্ধুমহলে জানাজানি হলে ফটো আপলোড তু দূরকাবাত,আইডিটাই ডিএক্টিভ করা লাগবে।

বাবাকে অনেক করে বুঝানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু বাবা আমার এক কথার মানুষ। সে তার ভাইকে একবার যখন কথা দিয়েছে তখন সে কথা দুনিয়া উল্টে গেলেও নড়চড় হবেনা।

যে মেয়েটা সারাদিন ভাইয়া ভাইয়া করে মুখ দিয়ে ফ্যানা তুলে ফেলতো,সে এখন আমাকে বর বলে ডাকবে! আর আমিই বা তাকে... না আর ভাবতে পারছিনা।

বন্ধুরা এসে সবাই ধরেছে, -'মামা তুমি জিতছো। সুমি তো আর কম সুন্দরী না। তোর মত বলদের কপালে ওমন একখান মেয়ে জুটেছে তোর সাত কপালের ভাগ্য। যা রুমে যা,নতুন বউ ঘরে রেখে বাহিরে মশা মেরে কি লাভ?'

কথাগুলো বলে একপ্রকার জোর করেই ভিতরে ঢুকিয়ে বাহির হতে লক করে রেখে চলে গেলো।
এই প্রথম নিজের রুমে ঢুকতে গিয়ে সংকোচবোধ হচ্ছে।

ভিতরে ঢুকে বিছানার কাছে যেতেই সুমি ঘোমটা তুলে বললো, -'ভাইয়া কেমন আছো?'

ভ্যাবাচেকা খেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম।স্বামী কম বড় ভাই ফিলিংসটা বেশি হচ্ছে। ইচ্ছা করছে মাথায় হাত দিয়ে আশির্বাদ করে দেই। বড় ভাই হিসাবে এতটুকু তো করতেই পারি।

নিজেকে শান্ত করে বললাম, -'আচ্ছা দেখো,এখন তো আমরা স্বামী-স্ত্রী তাই না? বিয়েটা যেহেতু হয়েই গিয়েছে, আমাকে এখন থেকে আর ভাইয়া ডাকবে না। কেমন?'

-'আচ্ছা ঠিক আছে ভাইয়া।'

-'আবার?'

পরদিন সকালে নাস্তার টেবিলে সবাই বসে নাস্তা করছি এমন সময় সুমি পরোটা দিতে গিয়ে বলে বসলো, -'ভাইয়া তোমাকে আরেকটা পরোটা দেই?'

আমার তো লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার মত অবস্থা। এদিকে মাথা তুলে দেখলাম, বাবা-মা দুজনেই মুখ টিপে হাসছে অন্যদিকে তাকিয়ে।
ভিষণ রকমের রাগ উঠলো। এইভাবে আমার জীবনটা তেজপাতা বানিয়ে দিয়ে আবার হাসছে।
এতদিন কি তাহলে মা সত্যি বলতো,আসলেই কি আমাকে হাসপাতাল থেকে কুড়িয়ে এনেছিলো?'

অনেক বুঝিয়েও সুমির মুখ থেকে ভাইয়া ডাকটা বন্ধ করতে পারিনি। ও যখন বেশিরকম এক্সাইটেড হয়ে যায় তখনই আমাকে মাঝেমধ্যে ভাইয়া ডেকে ফেলে।

বিয়ের কয়েকমাস পর ভাবলাম বউকে নিয়ে একটু কেনাকাটা করে আসি।
বিয়ের পর তো নিজ হাতে কোনকিছুই কিনে দিইনি।

বিকেলে সুমিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম কেনাকাটার উদ্দেশ্যে।
বেরুবার সময় পইপই করে বলে দিয়েছি যাতে লোকজনের সামনে কোনভাবেই আমাকে ভাইয়া না বলে।

কয়েকটা দোকান ঘুরলাম,সবকিছু ঠিকঠাক।
একবারো ভাইয়া ডাকেনি। তা দেখে আমিও খানিকটা আস্বস্ত হয়েছি।
হয়তো মেয়েটা এবার একটু হলেও বুঝেছে আমার মনের বেদনাটা।

কিন্তু না,বিপত্তি তার ঘটানোই লাগবে।
শপিং শেষ করে চলে আসছি,হঠাৎ করে পিছন থেকে উত্তেজিত কণ্ঠে ডেকে উঠলো, -' ভাইয়া,ওই টি শার্ট টাতে কিন্তু তোমাকে দারুন লাগবে।'

আমি পিছু ফিরে তাকাতেই সুমি জিহ্বায় কামড় মেরে বুঝাতে চায়লো তার ভুল হয়ে গিয়েছে।
হাজার হলেও বউ তো,আর পুরুষের জন্মই তো হয়েছে ক্ষমা করার জন্য।
দিলাম ক্ষমা করে। চুপচাপ গিয়ে টি শার্ট টা কিনে নিলাম।,
দোকান থেকে বেরুতে যাবো,ঠিক তখনি পাশ থেকে একজন মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা ডেকে বললো, -' ওটা তোমার বোন? খুব মিষ্টি তো দেখতে। বিয়ে হয়েছে?'

আমি রাগ চেপে রেখে বললাম, -'না আন্টি। তবে সুযোগ্য পাত্র পেলে দিয়ে দিবো। আর কতদিন বাবার ঘরে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবো।'

ভদ্রমহিলা মৃদু হেসে বললেন, -'আমার ছেলে সামনে মাসেই কানাডা থেকে ফিরবে। তোমার বোনটাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তোমার বাবার নাম্বারটা দাও,আমি বাসায় গিয়ে নয়নের বাবাকে বলে তোমাদের বাসায় যাবো।'

-'আপনার নাম্বারটা দিন আন্টি। আমি বাসায় গিয়ে বাবা-মাকে বলবো। তারা যদি রাজি থাকেন,তাহলে আমিই ফোন করে বলবো আপনাদের।'

ভদ্রমহিলা সাদা মনে তার নাম্বারটা দিয়ে গেলো।
একটু পরে সুমি এসে জানতে চায়লে বললাম, -'ভদ্রমহিলা তার ছেলের জন্য তোমাকে পছন্দ করেছেন। আমি ফোন দিলেই মহিলা তার স্বামীকে নিয়ে দেখতে আসবে তোমাকে।'

সুমি দাঁত কড়মড় করে বললো, -'কি বলছো এসব? নিজের বউকে আবার বিয়ে দিবা! কথাগুলো বলতে একটুকুও বাধলো না তোমার মুখে?'

-'বাধবে কেন? মানুষ সমাজে যেভাবে মুখটা হা করে ভাইয়া বলে চেচিয়ে উঠো,তাতে তো যে কেউই ধরে নিবে,তুমি আর আমি ভাই-বোন।'

সেদিনের পর থেকে আর কখনো সুমি আমাকে মানুষের সামনে ভাইয়া বলে ডাকেনি।
আর আমাকেও বিপত্তিতে পড়তে হয়নি।

বিয়ের একবছর পর...

দোকানে খদ্দের সামলাচ্ছি,এমন সময় দেখলাম সুমি ফোন দিয়েছে।
আমি রিসিভ করে লাউডস্পিকার দিয়ে বললাম, -'হ্যাঁ বলো।'

ওপাশ হতে খুশি মাখা কণ্ঠে চেচিয়ে বলে উঠলো, -' ভাইয়া আমি মা হতে চলেছি।'

কথাটা শুনে দোকানে থাকা কাস্টমার রা সবাই একজোটে বোলে উঠলো, -'কংগ্রাচুলেশনস আশিক ভাই। আপনি মামা হতে চলেছেন।'

কলটা কেটে দিয়ে খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে নিজের মনেই বললাম, -'তুমি আর এজন্মে শুধরাবে না। নিজের বিয়ে করা বউ এমনভাবে মা হওয়ার সংবাদটা দিলো, নিজের এখন বাবা কম মামা হওয়ার ফিলিংসটা বেশি হচ্ছে।'

সমাপ্ত.
1.26K Views
60 Likes
19 Comments
4.1 Rating
Rate this: