রাজা-বাদশাদের যুগে

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
পুরনো এক রাজ্যের কথা। এক বিস্তৃত ভূমি, যেখানে নদী, পাহাড়, বন আর মাঠের সঙ্গে মানুষের জীবন মিশে আছে যেন। সেই রাজ্যের নাম ছিল বরুণপুর। বরুণপুর রাজ্য ছিল গড়ে ওঠা—সবুজ ধানক্ষেত, ঝরঝর করে বয়ে চলা নদী, ফল-ফুলে ভরা বাগান আর শান্তিপূর্ণ গ্রাম।

বরুণপুরের রাজা ছিলেন সম্রাট অরিন্দম। তার নাম শুনলেই গ্রামের মানুষদের মনে আশার আলো জ্বলে ওঠত। কারণ তিনি ছিলেন এক শান্তিপ্রিয় শাসক, যিনি যুদ্ধের পথে নয়, শান্তি আর কল্যাণের পথে রাজ্য পরিচালনা করতেন।

রাজা অরিন্দম ছিলেন মধ্য বয়সী, চেহারায় কোমল হাসি আর চোখে এক গভীর বুদ্ধিমত্তা। তার দেহভঙ্গি বলত, তিনি রাজত্ব করলেও কখনো অহংকার করেন না। বরং রাজ্যের প্রতিটি মানুষের সুখ-দুঃখে তিনি নিজের ভাগ্য জড়িয়ে নিয়েছিলেন।

প্রতিদিন সকালে রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলা ছিল তার অভ্যাস। তিনি জানতে চাইতেন তাদের সমস্যা, শুনতেন তাদের গল্প, আর চেষ্টা করতেন সমস্যা সমাধানের।

একদিন সকালে অরিন্দম রাজা গোপনে একটা ছোট নৌকায় করে বরুণপুরের নদের ধারে চলে গেলেন। তার সঙ্গী ছিলেন তার প্রিয় শিক্ষক, বিদ্বান মধুসূদন।

নদীর ওপারে সোনালী ধানের মাঠ চোখে পড়ে, দূরে দূরে গরুর গাড়ি চলেছে, আর গ্রামের মেয়ে বাচ্চারা খেলছে। রাজার মন খুশিতে ভরে ওঠে।

“মধুসূদন,” বললেন অরিন্দম, “এই জনপদটাই আমার প্রাণ। আমি চাই আমাদের প্রতিটি মানুষ যেন সুখী হয়, যেন তারা তাদের প্রকৃতির কাছে ঘেরা এই জীবন উপভোগ করতে পারে। তবে তা সহজ নয়, আমাদের প্রচুর কাজ করতে হবে।”

মধুসূদন হাসলেন, “আপনার মতো এক রাজা থাকলে, বরুণপুর হয়ে উঠবে স্বর্গরাজ্য।”

রাজা নৌকাটি ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে গেলেন নদীর মাঝামাঝি এক ঝোপঝাড়ের কাছে। সেখানে একটি পুরনো বৃক্ষের তলায় বসে এক বৃদ্ধ মৎস্যজীবী মাছ ধরছিলেন।

রাজা অবাক হয়ে বললেন, “এমন এক জায়গায় তুমি মাছ ধরো?”

বৃদ্ধ হেসে বললেন, “হ্যাঁ, মহারাজ। এখানকার জল স্বচ্ছ আর মাছের বিচরণ বেশি। এখানে জলও শান্ত আর বিশুদ্ধ।”

রাজা কিছুক্ষণ বসে মাছ ধরার দৃশ্য দেখলেন, তারপর বললেন, “তোমার জীবন কেমন?”

বৃদ্ধ বললেন, “সহজ। জল ও প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছি। ঝরনা আর নদী আমার বন্ধু। আমি কোনোদিন ধন-সম্পদের চিন্তা করি না। শুধু পরিবার আর নদীর সাথে জীবন কাটাই।”

রাজা এই কথাগুলো শুনে ভাবলেন, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যতটা সুগভীর, রাজ্য ততটাই শক্তিশালী হয়।

পরের দিন রাজপ্রাসাদের রাজকুমারী, সুস্মিতা, তার বাগানের গোলাপের মাঝে বসে ছিল। তার চোখে এক রহস্যময় দীপ্তি ছিল, আর হাতের কাছে ছিল এক প্রাচীন কবিতার পাণ্ডুলিপি।

সুস্মিতা রাজ্যের সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে সম্মান করত। তিনি মনে করতেন, মানুষের হৃদয় ও মন ভালোবাসা আর সৌন্দর্যের দ্বারা পূর্ণ হতে পারে, আর রাজ্য তখনই সত্যিই সমৃদ্ধ হবে।

সেই সকাল বেলা রাজকুমারী বাগানে ঘুরছিলেন, তখন এক ছোট্ট পাখি তার মাথার ওপর থেকে গান গাইতে লাগল।

“প্রকৃতির সুরের মতো, রাজ্যের জীবনও সুরেলা হওয়া উচিত,” ভাবলেন সে।

সেই সময় রাজা অরিন্দম রাজপ্রাসাদে ফিরে এলেন। তার মনে নানা পরিকল্পনা আর চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, রাজ্যে এমন এক উৎসব আয়োজন করবেন যেখানে রাজ্যের সব মানুষ মিলিত হবে, শিল্প-সাহিত্য, গান-বাজনা, আর বিভিন্ন সংস্কৃতি দেখানো হবে।

পরবর্তী কয়েকদিন রাজ্যজুড়ে প্রস্তুতি শুরু হল। গ্রামের লোকেরা আনন্দে মাতল। রাজার আদেশে, গ্রামের প্রতিটি কোণে আর বস্তিতে নতুন নতুন মঞ্চ তৈরি হলো।

এক সকালে রাজা রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন জনসমাগমের মঞ্চে। সবাই একত্রিত হয়ে গান, নৃত্য আর নাটক উপভোগ করছিল।

রাজা দাঁড়িয়ে বললেন, “আমাদের রাজ্য শুধু জমি, নদী আর ধানক্ষেত নয়। এটি মানুষের সৃষ্টিশীলতার ভাণ্ডার। এখানে সব বয়সের মানুষ একসাথে মিলেমিশে একটি পরিবার হয়ে বাঁচে।”

তার কথা শুনে গ্রামবাসীরা আরো উজ্জীবিত হলো।

সন্ধ্যায় রাজা এক বিশেষ কাব্য পাঠ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন, যেখানে গ্রামের বুদ্ধিজীবী কবিরা তাদের সৃষ্টি পাঠ করছিল।

রাজা এক কবির হাত থেকে কবিতা গ্রহণ করে বললেন, “তুমি আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে জীবন্ত রেখেছ। এই জ্ঞানের বীজ বুনে রেখেছ।”

গ্রামের লোকেরা ভাবল, সত্যিই এই রাজ্য যেন একটা জীবন্ত শৈল্পিক বিদ্যালয়।

দিনকাল কেটে যেতে লাগল, বরুণপুরের মানুষদের জীবন বদলাতে লাগল। নতুন স্কুল, নতুন পাঠশালা, যেখানে শুধু গ্রন্থ পড়ানো হতো না, বরং প্রকৃতি ও জীবনের কথা শেখানো হতো।

একদিন বিকেলে রাজপ্রাসাদের বড় বারান্দায় রাজা অরিন্দম তার দুই ছোট ছেলে ও মেয়ে নিয়ে বসে ছিলেন। তারা নদীর ধারে মাছ ধরার গল্প করছিল।

রাজা বললেন, “এই পৃথিবী আমাদেরই নয়। আমাদের দায়িত্ব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করা।”

তার ছেলে প্রশ্ন করল, “বাবা, রাজা হওয়ার মানে কি শুধু ক্ষমতা পাওয়া?”

রাজা মৃদু হাসলেন, “না, অর্থ নয় শুধু। রাজা হওয়ার মানে হলো মানুষের সেবা করা, তাদের সুখ-শান্তির জন্য কাজ করা।”

রাত আসতেই পুরো রাজ্যের আকাশ ঝলমল করল অসংখ্য তারা দিয়ে। সেই রাতে সবাই ঘুমাতে গেল শান্তির মিষ্টি স্বপ্ন নিয়ে।

কিছুদিন পরে রাজ্য জুড়ে এক বন্যা এল। নদীর জল বেড়ে ঘর-বাড়ি তলিয়ে যাচ্ছিল। গ্রামের মানুষ আতঙ্কিত।

রাজা অরিন্দম তৎপর হয়ে বন্যার ক্ষতি কমানোর জন্য ব্যবস্থা নিলেন।

তার আদেশে সেনারা সাহায্যের জন্য বেরোল, শুকনো জায়গায় সবাইকে সরানো হলো। রাজা নিজে প্রতিদিন বন্যার এলাকা পরিদর্শন করতেন, মানুষকে সাহস দিতেন।

বন্যার পর রাজ্যের সব মানুষ মিলেমিশে পুনরায় জীবন গড়ে তুলল।

এই সময় রাজা বুঝলেন, প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ নয়, সমঝোতা করলেই মানুষ ও প্রকৃতির মিলন সম্ভব।

বছর ঘুরে আবার বরুণপুর জুড়ে শান্তি ফিরে এল। রাজা অরিন্দম আরও উদ্যোগ নিলেন, বৃক্ষরোপণ, কৃষির উন্নয়ন, ও গ্রামের জীবনের গুণগত মান বাড়ানোর জন্য।

সে বছর রাজ্য ছিল এক ঐশ্বরিক স্বপ্নের মতো—সবুজ ধানক্ষেত, হাসিখুশি মানুষের ভিড়, আর গানের সুরে ভরা বাতাস।

রাজা বুঝেছিলেন, রাজ্যের প্রকৃত শক্তি তার মানুষ, তাদের ভালোবাসা, ও ঐক্য।

তার জীবন ছিল শান্তি, প্রেম আর দায়িত্বের এক মূর্তি। রাজা অরিন্দম ছিলেন সেই সময়ের প্রকৃত সোনালী আলো, যে আলো আজও মানুষের মনে জ্বলজ্বল করে।
93 Views
7 Likes
1 Comments
4.5 Rating
Rate this: