বৃষ্টি পড়ছে। গাছের পাতাগুলো ভিজে এক ধরনের থমকে যাওয়া নীরবতা ছড়িয়ে রেখেছে চারপাশে। জানালার কাচে জমে থাকা পানির ফোঁটার ভেতর দিয়ে বাইরের দুনিয়াটা যেন আবছা, অস্পষ্ট হয়ে গেছে। আমি চুপচাপ বসে আছি জানালার পাশে রাখা পুরনো কাঠের চেয়ারটায়। কফির কাপটাও ঠান্ডা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, কিন্তু আমার মন গরম হয়ে আছে কোনো এক পুরনো অস্থিরতায়।
তুমি এলে… সেই সকালটা আজও ভুলতে পারিনি আমি।
চার বছর পর হঠাৎ করে তুমি আমার সামনে এসে দাঁড়ালে। মাথায় একটা হালকা নীল ওড়না, চোখে চেনা সেই গভীরতা, আর ঠোঁটে একরাশ হেসে থাকা পুরনো ভালোবাসা।
"তুমি কেমন আছো, অরণ্য?"
তোমার কণ্ঠটা কেমন যেন ভাঙা ছিল, কিন্তু ভেতরে ছিল অদ্ভুত এক শক্তি।
আমি কি ভালো ছিলাম?
না, কখনো না।
তুমি চলে যাওয়ার পর কিছুই ঠিকঠাক ছিল না। আমি কেবল নিজের অস্তিত্বটা বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছি। কাজ করেছি, হাসার ভান করেছি, গল্প লিখেছি, অথচ কোনো গল্পেই পূর্ণতা আসেনি। কারণ, প্রতিটা চরিত্রের ভেতর তুমি ঢুকে পড়তে। আমি হারিয়ে যেতাম, আর প্রতিবারের মতোই ফিরে আসতাম শূন্যতায়।
তুমি চলে গিয়েছিলে হঠাৎ, একরাশ অভিমানে, কিছু না বলেই। সেদিনকার সেই ঝগড়াটা হয়তো খুব সাধারণই ছিল, হয়তো আমরা চাইলে ঠিক করতে পারতাম, কিন্তু তুমি চলে গেলে। বললে না কিছুই, ব্যাখ্যা চাইলেও দিলে না কোনো উত্তর।
আমি হাজারবার ফিরে গেছি সেই শেষ কথোপকথনের দিকে।
"তোমার সঙ্গে বাঁচা যায় না, অরণ্য। তুমি শুধু নিজের মতো ভাবো। আমি যেন কোথাও নেই তোমার দুনিয়ায়।"
আমি চুপ করে গেছিলাম, বলিনি কিছু। হয়তো বলার মতো কিছু ছিলও না তখন।
আর আজ, চার বছর পর, তুমি এসে বললে,
"আমার এখন সব কিছু আছে অরণ্য, কিন্তু তুমি নেই। আমি পুরোটাই পূর্ণ, অথচ ভেতরে একরাশ ফাঁকা।"
তোমার চোখে জল ছিল না, কিন্তু আমি জানতাম কতটা কষ্ট জমে আছে সেখানে। তুমি চলে যাওয়ার পরে আমিও তো দিন গুনেছি। প্রথমে দিন, তারপর সপ্তাহ, তারপর মাস। এরপর সব গুলিয়ে গিয়েছিল। তবে ভুলিনি কখনো।
আমি জিজ্ঞেস করিনি, তুমি কোথায় ছিলে, কার সঙ্গে ছিলে, কতটা দূরে ছিলে। আমি কেবল তাকিয়ে ছিলাম তোমার মুখের দিকে। সেই মুখ যা দেখে আমি একদিন ভাবতাম, এই মুখটাই আমার পৃথিবী।
"তুমি কি এখনো আমাকে ভালোবাসো, অরণ্য?"
তোমার প্রশ্নটা নরম ছিল, কিন্তু ভিতরে ছিল অদ্ভুত এক ঝড়।
আমি কিছু বলিনি, শুধু আমার ডায়েরিটা এগিয়ে দিয়েছিলাম তোমার দিকে।
তুমি খুললে সেটা।
প্রতিটি পাতায় লেখা ছিল— “তুমি এলে তাই…”
তুমি এলে তাই বাঁচতে ইচ্ছে করে,
তুমি এলে তাই আকাশটা নীল হয়ে যায়,
তুমি এলে তাই মৃত গল্পগুলো জীবিত হয়,
তুমি এলে তাই আমার বুকে আবার শব্দের জন্ম হয়।
তুমি কিছুক্ষণ পড়লে। তারপর একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তোমার গাল বেয়ে।
আমার দিকে না তাকিয়েই বললে,
"আমি জানতাম, তুমি ভুলে যাবে না। কিন্তু সাহস হয়নি ফিরে আসার। ভেবেছিলাম, তুমি ঘৃণা করো আমাকে।"
আমি নরম গলায় বললাম,
"ভালোবাসলে ঘৃণা জন্মায় না, হিয়া। কেবল একটা দীর্ঘ অভিমান জন্মায়।"
তোমার চোখে আবার তাকালাম। সেই চোখ… যেখানে আমি একদিন আমার পুরো ভবিষ্যৎ খুঁজে পেয়েছিলাম।
তুমি আস্তে করে আমার হাত ধরলে।
"তুমি কি আবার শুরু করতে পারো, অরণ্য? একেবারে নতুন করে? না কোনো অভিযোগ, না কোনো শর্ত?"
আমি মুচকি হেসে বললাম,
"তুমি তো এলে, হিয়া। তাই সব সম্ভব এখন।"
তুমি আমার বুকের দিকে এগিয়ে এলে। আমি তোমায় জড়িয়ে ধরলাম সেই পুরনোভাবে, যেভাবে একদিন আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম— কখনো ছেড়ে যাব না।
বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে।
কিন্তু ভেতরে আমাদের দুজনের হৃদয়ে গরম এক রোদ উঠে গেছে।
তুমি এলে তাই…
সব হারিয়ে গিয়েও যেন সব ফিরে পেয়েছি আমি।
তুমি এলে তাই…
ভাঙা গল্পটা আবার জোড়া লাগছে,
তুমি এলে তাই…
আমি আবার মানুষ হয়ে উঠছি।
আর এইবার, কোনো দিন তুমি হারিয়ে যাবে না— আমি জানি।
কারণ এবার আমরা একে অপরের গল্পের শেষ লাইনে একসঙ্গে নাম লিখেছি।
তুমি এলে তাই…
আজ আমার জীবনটা পূর্ণ।
তুমি এলে তাই
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
68
Views
5
Likes
0
Comments
5.0
Rating