কালো বোরখাওয়ালী

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
বর্ষার এক গভীর সন্ধ্যায়, কলকাতা থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার দূরে, নদিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম আদমপুর। বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে, বাতাসে কাঁপছে তালগাছের মাথা। এই গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার মুসলিম, এবং এখানে একটি বহু পুরনো মসজিদ আর তার পাশেই বিস্তৃত কবরস্থান। কবরস্থানের পাশ দিয়ে একটু এগোলেই ধ্বংসপ্রাপ্ত এক হাভেলি, যার ইতিহাস ঘিরে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন ভয়াল কাহিনি।

লোকমুখে এই হাভেলিকে বলা হয় “কালো বোরখাওয়ালির বাড়ি”।

ইতিহাস পড়তে ভালোবাসে এমন একজন কলেজ পড়ুয়া তরুণ—ইশরাত আলি। সে কলকাতার একটি নামকরা কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র। মুঘল-পূর্ব বাংলার লোককথা নিয়ে গবেষণা করতে সে পৌঁছেছে আদমপুর। গ্রামের মানুষজন খুবই আন্তরিক হলেও, সন্ধ্যার পর কারো মুখে হাসি দেখা যায় না। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত নীরবতা, আর যখন রাত নেমে আসে—গ্রামটা যেন মৃত্যুর দেশে রূপ নেয়।

ইশরাত আশ্রয় নেয় গ্রামের প্রাচীন ও সম্মানিত মৌলভি হাফিজুর রহমান সাহেবের বাড়িতে। মৌলভি সাহেব বয়সে বৃদ্ধ, চোখে চশমা, কপালে গাঢ় চিন্তার রেখা, কিন্তু হৃদয়ে অগাধ দয়া। প্রথম দিনেই মৌলভি সাহেব সতর্ক করে দেন—
“ইশরাত মিয়া, গবেষণা করো ঠিক আছে, কিন্তু হাভেলিটার ধারেকাছেও যেয়ো না। ওখানে রাত নামার পর কেউ যায় না।”

ইশরাত হেসে উড়িয়ে দেয়। “ভূতের গল্পে বিশ্বাস করি না, হুজুর।”

তবে আদমপুরের মানুষ এসব গা ছমছমে গল্প নিছক রূপকথা মনে করে না। তারা জানে, এই হাভেলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নবাবজাদী হালিমা বেগমের গল্প—যিনি সেই হাভেলিতেই বাস করতেন প্রায় ১৫০ বছর আগে।

বলা হয়, হালিমা বেগম ছিলেন অতুলনীয় রূপসী। একনিষ্ঠ পর্দানশীন, সর্বদা কালো বোরখায় মুখ ঢাকা। তিনি গভীরভাবে প্রেমে পড়েন গ্রামের দরিদ্র এক হাফেজ—সাইফুল্লাহর। লোকটি ছিল আল্লাহভীরু, সুন্দর সুরায় পারদর্শী। রাতের পর রাত হালিমা জানালা খুলে শুনতেন তার কণ্ঠে কোরআনের সুরা।

একসময় গোপনে প্রেম জমে ওঠে। কিন্তু সমাজ মেনে নেয়নি এই অসম প্রেম। এক রাতে নবাবের লোকেরা সাইফুল্লাহকে ধরে নিয়ে যায়, মসজিদের পেছনের দেয়ালের পাশে কোরআনের পাণ্ডুলিপি জড়িয়ে তাকে হত্যা করা হয়। হালিমা বেগম সেই খবর শুনে নিজের কালো ওড়নায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন সেই হাভেলির ভেতরে।

সেই রাতের পর হাভেলির মধ্যে কেউ প্রবেশ করেনি। লোকজন বলে, বোরখার আড়ালে ঢেকে থাকা সেই নারী আজও রাতে বের হন, যার চোখের দিকে তাকালেই মৃত্যু নিশ্চিত।

ইশরাত এসব গল্পকে ভয় পায় না। সে ভাবে—লোককথা, অতিরঞ্জিত কাহিনি। তবে যখন নিজের চোখে দেখে সেই হাভেলির সামনে রাত বারোটার সময় এক ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে, সব ধারণা পাল্টে যায়।

ঘটনাটি ঘটে তার তৃতীয় রাতে। গ্রামের কবরস্থানে পুরনো একটি সমাধি নিয়ে ছবি তুলছিল সে। হঠাৎ সে দেখতে পায়—কুয়াশার ভেতরে এক নারী দাঁড়িয়ে, কালো বোরখায় মুখ ঢাকা। মাথা নিচু, হাতে সাদা গোলাপ। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না, তবে তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি অদ্ভুত রকম শান্ত ও বিষাদময়।

ইশরাত সাহস করে জিজ্ঞেস করে—“আপনি কে?”

কোনও উত্তর আসে না। বাতাস থেমে যায়। এরপর ভেসে আসে এক অদ্ভুত সুর—মৃদু সুরা পাঠ। গলার স্বর এমনভাবে কাঁপছিল, মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সমস্ত শোক যেন ওই কণ্ঠে ভেসে উঠেছে।

ছায়ামূর্তিটি বলে—“তুমি কি আমার কথা শুনতে এসেছো? সে ফিরে আসেনি… কিন্তু তুমি এসেছো।”

এরপর অদ্ভুত কুয়াশার ঝাপটা এসে ইশরাতকে ঘিরে ধরে। সে আর কিছু মনে রাখতে পারে না।

পরদিন সকালবেলা গ্রামের কিছু ছেলে দেখে, ইশরাত কবরস্থানের মাঝখানে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তার ঠোঁট ফ্যাকাশে, চোখে রক্তজমা দাগ, আর সে বারবার একই কথা বলছে—“তার চোখ… সেই চোখ… যেন মৃত্যু আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল…”

মৌলভি সাহেব ঘরে নিয়ে এসে দোয়া পড়ে, পানি পড়া খাওয়ান, কিন্তু কিছুতেই ছেলেটি স্বাভাবিক হয় না। এক বৃদ্ধ হাকিম এসে বলেন,
“সে ‘কালো বোরখাওয়ালির’ চোখে তাকিয়েছে। এখন তার আত্মা তাকে তাড়া করবে। তাকে একটাই পথ বেছে নিতে হবে—হালিমার আত্মাকে শান্তি দিতে হবে, নয়তো ওর জীবন শেষ।”

ইশরাতের স্বপ্নে প্রতিদিন আসতে থাকে সেই ছায়া। বোরখা পরা নারী, মুখ ঢাকা, কিন্তু চোখের তীব্রতায় ঘুম কেটে যায়। সে বুঝে যায়, হালিমা বেগম তাকে ডাকছে।

এক রাতে, চন্দ্রগ্রহণের সময়, সে একা বেরিয়ে পড়ে সেই হাভেলির দিকে। গ্রামের সবাই তাকে থামাতে চায়, কিন্তু সে কারো কথা শোনে না। তার হাতে থাকে একটি পুরনো কবিতার পাণ্ডুলিপি—যেটা নাকি সেই হাফেজ সাইফুল্লাহ হালিমার জন্য লিখেছিলেন।

হাভেলির দরজায় সে গায়ে হাত রাখে মাত্র, দরজা খুলে যায় আপনাআপনি। ভিতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, অথচ বাতাস স্থির। হঠাৎ দেয়ালে টানানো আয়নাতে এক ঝলক সে দেখে, নিজের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে হালিমা বেগম।

কোনো আওয়াজ নেই, শুধু চোখে চোখ। তারপর সেই একই ফিসফিসে স্বর—

“সে আমাকে ছেড়ে যায়নি… ওকে তোরা নিয়ে গেলি… কিন্তু তুই এলি…”

ইশরাত তখন সেই কবিতার শেষ লাইনটা পড়ে—
“তুমি বোরখার আড়ালে থেকেও আমার জান্নাত হয়ে উঠেছিলে, হালিমা…”

এই লাইন বলার পর হঠাৎ হাভেলির ভেতর ঝড় ওঠে। জানালাগুলো খুলে যায়, দেয়াল থেকে উড়ে যায় পর্দা, আর কুয়াশার মধ্যে সেই ছায়া ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকে।

শেষবারের মতো সেই ফিসফিসে কণ্ঠ—

“আমি মুক্ত হলাম… এবার আমি যেতে পারি…”

হাভেলির ভেতর আলো হয়ে যায়। যেন শত বছর পরে কারো শোক ঘুচে গেছে।

সেই রাতের পর ইশরাত আর কখনো কথা বলে না, কাউকে কিছু বলে না। সে চলে যায় কলকাতায়, নিঃশব্দে, নিঃসঙ্গভাবে বেঁচে থাকে। মাঝে মাঝে নদীর ধারে বসে থাকে, হাতে সেই পুরনো কবিতার পাণ্ডুলিপি।

এক বছর পর আদমপুরে ফিরে আসে এক পর্যটক সাংবাদিক। সে দেখে, হাভেলির পাশেই তৈরি হয়েছে ছোট একটা মাজার। লেখা রয়েছে— “প্রেম যেখানে অপূর্ণ, সেখানেই আত্মা বাঁধা পড়ে। আজ সে মুক্ত।”

তবে গ্রামের কিছু বাচ্চা মাঝেমাঝে এখনো দেখে—ভোরের কুয়াশায় এক নারী হেঁটে যায় পুকুরঘাটের দিকে, কালো বোরখা পরে। তার পেছনে হাঁটে এক তরুণ ছেলেও। কেউ জিজ্ঞেস করলে, গ্রামের বৃদ্ধেরা শুধু বলেন—
“ভালোবাসা কাউকে কষ্ট দিলে, সে কখনো মরে না—সে ফিরে আসে… আবার…”
44 Views
5 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this: